kalerkantho


উদ্বোধনের দিনে ইয়েশিনের বেদনার রং

নোমান মোহাম্মদ, মস্কো থেকে   

১৫ জুন, ২০১৮ ০০:০০



উদ্বোধনের দিনে ইয়েশিনের বেদনার রং

পরনে সেই কালো পোশাক। কালো হ্যাট, কালো জার্সি, কালো শর্টস, কালো মোজা, কালো বুট। শুধু শুধুই তো আদুরে নাম ‘ব্ল্যাক স্পাইডার’, ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ হয়নি। গোলপোস্টের সামনে তিনি, তবে তা ফুটবলের আয়তকার তেকাঠি নয়। এটি ত্রিভুজাকৃতির। এবং তিনি উড়ছেন। গোলপোস্ট ছাড়িয়ে আরো ওপরে; বলের সঙ্গে গ্লাভসের বন্ধুতা। লেভ ইয়েশিনকে তো এভাবেই মানায়!

আবার কাঁটাতারে ঘেরা হয়ে ডিনামো মস্কো স্টেডিয়ামের পাশের পার্কে অবহেলায় পড়ে থাকাটা তো তাঁকে মানায় না। বিশেষত বিশ্বকাপ ফুটবলের কালকের উদ্বোধনী দিনে।

ব্রাজিলের যেমন পেলে, আর্জেন্টিনার ডিয়েগো ম্যারাডোনা—ঠিক তেমনি রাশিয়ার লেভ ইয়েশিন। একজন গোলরক্ষক তাঁর দেশের সর্বকালের সেরা ফুটবলার, এটি অবিশ্বাস্য। আবার গ্লাভস হাতের কেউ যে ব্যালন ডি’অর জিততে পারেন, সেটিই অকল্পনীয়। ইয়েশিনের ক্ষেত্রে হয়েছে ঠিক তাই। ১৯৬৩ সালে সেই যে ব্যালন ডি’অর জিতেছেন, এর আগে-পরে আর কোনো গোলরক্ষক তা জিততে পারেননি। সেই ইয়েশিনের দেশে হচ্ছে বিশ্বকাপ, ফিফার পোস্টারেও রয়েছেন তিনি—তবে কাল টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী দিনে তাঁর ভাস্কর্যকে ওভাবে অনাদরে-অবহেলায় পড়ে থাকতে দেখে স্বর্গ থেকে নিশ্চয়ই চোখের জল ফেলেছেন।

১৯৫০ সালে ক্যারিয়ার শুরু করে ১৯৭১ সালে অবসর—পুরোটা সময়ই ডিনামো মস্কো ক্লাবে কাটিয়েছেন ইয়েশিন। সে ক্লাবের স্টেডিয়ামের সামনে তাঁর মূর্তি স্থাপিত হয়েছে অনেক আগে। তবে স্টেডিয়াম সংস্কারের জন্য এখানেই গোলরক্ষকের ঠাঁই পাশের পার্কে কাঁটাতার ঘেরা অবস্থায়। দুইবার মেট্রো বদল করে ডিনামো স্টেশনে নামার পর তা খুঁজে বের করতে গলদঘর্ম হতে হলো। কেউ জানেন না; কেউ বলতে পারেন না। শেষে দিমিত্রি নামের এক চাকরিজীবী খবর দেয়, ‘এই পার্কের ভেতর একটি মূর্তি দেখেছি। গিয়ে দেখো, সেটি খুঁজছ কি না।’

হ্যাঁ, তাই খুঁজছি। কিন্তু আমার মতো করে কেউ তা খোঁজে না। পাশ দিয়ে কতজন যাচ্ছেন-আসছেন, কেউ ফিরেও তাকাচ্ছেন না ইয়েশিনের দিকে!

অথচ কী অবিশ্বাস্য এক ক্যারিয়ারই না কাটিয়েছেন! গোলরক্ষক পজিশনে বিপ্লব এনেছেন রীতিমতো। ইয়েশিনের সময়ে গোলরক্ষকের কাজ ছিল ৯০ মিনিটজুড়ে গোলের নিচে দাঁড়িয়ে থেকে বলের অপেক্ষা করা। চুপচাপ। ইয়েশিন তা বদলে দিলেন। যে কারণে ফ্রান্স ফুটবল লিখেছে, ‘গোলরক্ষক পজিশনে বিপ্লব এনেছেন ইয়েশিন। অতিরিক্ত ডিফেন্ডার হিসেবে কাজ করা, কাউন্টার অ্যাটাক শুরু করার মতো কাজগুলো তাঁর আগে কেউ করেনি।’ ১৯৫৮ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত চারটি বিশ্বকাপ খেলেছেন। ১৯৫৬ সালে অলিম্পিক স্বর্ণপদক জিতেছেন। ১৯৬০ সালে প্রথম ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপও। সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা হালের রাশিয়ার ফুটবল ইতিহাসে যা সর্বোচ্চ সাফল্য।

ইয়েশিনকে নিয়ে সমকালের সতীর্থদের মুগ্ধতাও ছিল আকাশছোঁয়া। ইংল্যান্ডের টম ফিনি যেমন ১৯৫৮ বিশ্বকাপের পেনাল্টির স্মৃতিচারণা করেন এভাবে, ‘তুলনামূলক দুর্বল ডান পায়ে পেনাল্টি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই আমি। কারণ ইয়েশিন আমার ডান পায়ের পেনাল্টি হয়তো দেখেছে। আমি নার্ভাস ছিলাম? অবশ্যই। যখন বল বসিয়ে পেছনে ঘুরে রান আপের জন্য হাঁটা শুরু করি, দেখি আমার কয়েকজন সতীর্থ উল্টো ঘুরে তাকিয়ে আছে। ওরা দেখার মতো অবস্থায় ছিল না। বোঝেন তাহলে আমার অবস্থা কী! তবে আমি কিন্তু গোল করেছিলাম। আমি গ্রেট ইয়েশিনকে পরাস্ত করে গোল করেছি!’ ১৯৬৩ সালে এক প্রীতি ম্যাচে তাঁর পেনাল্টি ঠেকানোর পর ইতালির সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় সান্দ্রো মায়োসা বলেছিলেন, ‘ইয়েশিন আমার চেয়ে ভালো ফুটবল খেলে।’ পর্তুগালের কিংবদন্তি ইউসেবিওর মুগ্ধতা, ‘বিংশ শতকের সেরা গোলরক্ষক ইয়েশিন।’

তবে খ্যাতির এই চূড়ায় ওঠা সহজ হয়নি ইয়েশিনের জন্য। মাত্র ১১ বছর বয়সে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগুনের আঁচ লাগে শ্রমিক পরিবারে জন্ম নেওয়া ইয়েশিনের। নািসদের ভয়ে পালিয়ে যান নিজের বাড়ি ছেড়ে। যে কারণে পরে নিজের আত্মজীবনীতে ইয়েশিন লিখেছেন, ‘আমার শৈশব শেষ হয়ে গেছে ১১ বছর বয়সেই। কারণ আমার প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে অপেক্ষায় থাকত এক টুকরো রুটি জয়ের; একটু চিনি পাবার।’ পরে ফুটবলের আশ্রয়ে সেরাদের সেরা হয়েছেন ঠিক, তবে সে পথেও কাঁটা ছিল কত!

১৯৬২ চিলি বিশ্বকাপ যেমন। স্বাগতিকদের কাছে হেরে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় হয়ে যায় সোভিয়েত ইউনিয়নের। ৩২ বছর বয়সী ইয়েশিন খুব ভালো খেলেননি। দুটি গোলেই দায় ছিল। চিলি থেকে ফেরার পর দেখেন বিমানবন্দরে সমর্থকরা প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে লেখা ‘ইয়েশিন অবসর নাও’, ‘তোমার পেনশন নেওয়ার সময় হয়েছে’ ইত্যাদি। তাঁর বাসার জানালা ভেঙে ফেলে ক্ষুব্ধ সমর্থকরা। গাড়িতে লেখা হয় অপমানজনক লেখা; হুমকি দিয়ে পাঠানো হয় চিঠি।

এর প্রতিক্রিয়া কিভাবে দেখান ইয়েশিন? পরের বছর ব্যালন ডি’অর জিতে। আর কতটা বিনয়ী ছিলেন তিনি? বিশ্বসেরা খেলোয়াড়ের সেই পুরস্কারের মঞ্চে তাঁর প্রতিক্রিয়া, ‘বিশ্বসেরা খেলোয়াড় কী, আমি তো বিশ্বসেরা গোলরক্ষকই নই। সেটি ভ্লাদিমির বিয়ারা।’

ইয়েশিনের জীবনের শেষটা ট্র্যাজেডির। অসুখের কারণে অপারেশন করে এক পা কেটে ফেলতে হয়। পাকস্থলীর ক্যান্সারে ১৯৯০ সালে মারা যান তিনি। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার ঠিক এক বছর আগে।

সেই সোভিয়েত তথা রাশিয়ায় কাল শুরু হয়ে গেল বিশ্বকাপের আসর। কিন্তু ডিনামো মস্কো ক্লাবের পাশে কাঁটাতার ঘেরা হয়ে যে আছেন ইয়েশিন, সেটি জানেন ক’জন! যেমনটা জানেন না, ১৯৬০ ইউরো জয়ের পর উল্লসিত এক দর্শক তাঁর মাথার ক্যাপ নিয়ে যাওয়ার পর বিকল্প আর কোনো ক্যাপ কখনোই পরেননি এই গোলরক্ষক। আর ‘কালো মাকড়সা’ ‘কালো চিতা’ নামে পরিচিত হলেও ইয়েশিনের পোশাকের রং কিন্তু কালো ছিল না। সেটি গাঢ় নীল!

বেদনার রং!



মন্তব্য