kalerkantho



মেসিকে দেখার ২২ মিনিট

১৪ জুন, ২০১৮ ০০:০০



মেসিকে দেখার ২২ মিনিট

ওই তো দেখা যায় জাদুকরকে! নিঃশ্বাস দূরত্বে নয়, স্পর্শসীমায়ও নয় সত্য—কিন্তু দৃষ্টির সম্মুখে বটেই! কত দূর দাঁড়িয়ে তিনি, বড়জোর ১০-১২ গজ! এ আর এমন কী!  সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার যিনি, সেই লিওনেল মেসিকে দেখছি এত কাছ থেকে! এত্ত কাছ থেকে!

মুখের সঙ্গে দাড়িটা মানিয়ে গেছে অনেক দিন। গায়ে আর্জেন্টিনার সাদা অনুশীলন জার্সি; নীল রঙের শর্টস। কালো রঙের টাইটসে পায়ের নিচের অংশ পুরোপুরি ঢাকা। আর সবুজ রঙের বুট। মাঠের সাইডলাইনে মেসি ব্যস্ত ছিলেন কোচ হোর্হে সাম্পাওলির সঙ্গে কথায়। হুড়মুড় করে ঢোকা শ দেড়েক সাংবাদিকের জটলার দিকে আড়চোখে তাকালেন বোধকরি একবার। এরপর হাঁটা ধরলেন মাঠের ভেতরে। অনুশীলনের আরো খানিকটা বাকি রয়েছে যে!

পরের দৃশ্যে মেসি অনেক দূরে। মাঠের ভেতরে। ছোট্ট লিলিপুটের মতো দেখাচ্ছে তাঁকে, তবে মনের দুরবিনে চোখ রাখলেই চলে আসছেন কাছে! মেসি এবার হাসিমুখে খোশগল্পে ব্যস্ত সের্হিয়ো আগুয়েরোর সঙ্গে। দু-তিন পাসে ডান ও বাঁ পাশ থেকে ক্রস হচ্ছে পেনাল্টি এরিয়ায়; ওই বলে হেড করে, পা লাগিয়ে গোল করার চেষ্টা আর্জেন্টাইনদের। গনসালো হিগুয়াইন, পাউলো দিবালা, হাভিয়ের মাসচেরানো, লো সেলসোদের। মহানায়কের সঙ্গ ছেড়ে আগুয়েরোও গিয়ে যোগ দেন তাতে। কিন্তু মেসি দাঁড়িয়ে থাকেন ঠায়।

অপেক্ষায় বলে বল; ওই জাদুকরী বাঁ পায়ের স্পর্শের জন্য। অপেক্ষায় থাকি আমরাও; মেসি-বলের অপূর্ব সেই প্রেমের মিলন দেখার জন্য।

অপেক্ষার অবসান হয় না। মেসিকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য এবার আসেন এনসো পেরেস। থাকলেন কিছুক্ষণ। এরপর কোচ সাম্পাওলির সঙ্গে আরেক দফা আলোচনা। দীর্ঘ আলোচনা। কোচ গিয়ে অন্যদের দেখভাল শুরু করেন; মেসি বসে পড়েন। এক মিনিট, দুই মিনিট, তিন মিনিট—অনেকক্ষণ। মেসি আর বসা থেকে ওঠেন না।

উঠলেন সবার সঙ্গে। মাঠ থেকে বেরিয়ে এলেন পায়ে পায়ে। আবার একটু দাঁড়ানো সাইডলাইনে; এবারও পাশে আগুয়েরো। এরপর কার্টে গিয়ে বসেন পেছনের সিটে; আগুয়েরো-মার্কোস রোহোদের সঙ্গে। ছোট্ট গাড়িটি মেসিকে নিয়ে চলে গেল চোখের আড়ালে; স্মৃতির সিন্দুকে অমূল্য মিনিট বিশেক উপহার দিয়ে।

আর্জেন্টিনা দল রাশিয়া এসেছে তিন দিন আগে। ঘাঁটি গেড়েছে মস্কোতেই। মস্কো মানে মস্কো না, শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে ব্রোনিিসতে। কাল সাতসকালে সেই শহরের উদ্দেশে যাত্রা। ভাষাগত সমস্যার কারণে কাউকে তো বোঝানোই মুশকিল; সে কারণে মেট্রো বাদ। উবার ডেকে মেসিদের খোঁজার মিশন শুরু। পথের যানজটে ব্রোনিিসতে গিয়ে পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা।

ওখানে যাওয়ার পথে বিস্ময়, গিয়েও বিস্ময়। পথের বিস্ময়ের কারণ শহর ছাড়িয়ে বনজঙ্গল ছাড়িয়ে এক গ্রামের মতো জায়গায় আর্জেন্টিনার আস্তানা। নিরিবিলি অনুশীলনের জন্যই এমনটা হয়তো। আর ব্রোনিিস গিয়ে বিস্ময়, একে-ওকে কতজনকে জিজ্ঞেস করেও মেসিদের হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না। অবশেষে ফিফার লোগোর সংকেত দেখে এগিয়ে পৌঁছানো যায় সিরোজেকিন স্পোর্টস স্কুলের ওই ট্রেনিং সেন্টারে।

বিশ্বকাপের সময় এটিই বেসক্যাম্প আর্জেন্টিনার। শহরের কোলাহল থেকে একেবারে দূরে।

বাইরে সাংবাদিকদের ভিড়; বেশির ভাগই আর্জেন্টাইন। বাংলাদেশের সাংবাদিক আর্জেন্টিনার অনুশীলন কাভার করতে এসেছেন শুনে তাঁদের চোখে স্থির হয়ে ঝোলে বিস্ময়। কমপ্লেক্সের ভেতরে ঢোকার পরও দুপাশে জলধারার মধ্য দিয়ে অনুশীলনের জায়গা পর্যন্ত পৌঁছতে আরো ১৫ মিনিটের হাঁটাপথ। মাঝে দেখা মেলে আর্জেন্টিনা দলের থাকার জায়গায়। ওপরে খেলোয়াড়দের ছবি নিয়ে বিশাল আকারের হোর্ডিং; সবচেয়ে বড় ছবিটা মেসিরই। ইনজুরির কারণে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়া সের্হিয়ো রোমেরোও রয়েছেন দেখি সেখানে! একটু এগিয়ে যেতেই অবশেষে দেখা মেলে মেসিদের। পাশের অস্থায়ী গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে ট্রফিজয়ী দলটির অনুশীলন দেখার সুযোগ।

অনুশীলনে বলে পা ছোঁয়াননি মেসি। তবে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের ভয়ের কিছু নেই। সাংবাদিকদের সামনের ওই ওপেন ট্রেনিং সেশনে বিশ্রামে ছিলেন; আগের রুদ্ধদ্বার অনুশীলন করেছেন পুরোমাত্রায়। আর ওপেন সেশনে বাকি করেছেন মূলত শ্যুটিং প্র্যাকটিস। তাতে হিগুয়াইনের দারুণ ভলিতে দুর্দান্ত গোল যেমন আছে; তেমনি বেশ কটি দৃষ্টিকটু মিসও। একেবারে হিগুয়াইনসুলভ। তবে উদ্দীপনার তাঁর কমতি নেই। একটি শট গোলরক্ষক ঠেকানোর পর ফিরতি শটে গোল করে কী উল্লাস! আগুয়েরো ছিলেন সপ্রতিভ। ইনজুরি কাটিয়ে ফেরার প্রতিশ্রুতি তাঁর প্রতি মুভমেন্টে। ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে চলে আসা হাভিয়ের মাসচেরানোর উৎসাহেরও কমতি ছিল না।

তবে সব ছাপিয়ে আর্জেন্টিনা দলের অনুশীলন দেখা মানে আসলে মেসিকেই দেখা। নাই-বা বলে পা ছোঁয়ালেন; তবু চোখের দেখা তো! কিন্তু ২২ মিনিট দেখায় আর কি আর মন ভরে! ওই যে হেঁটে হেঁটে চলে যাচ্ছেন, তাঁর আকৃতি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হচ্ছে—পেছনে পড়ে থাকা ফুটবল জাদুকরের ছায়াটি আমার চোখে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে।

ওই ছায়ায় প্রাপ্তির সব উল্লাস; অপ্রাপ্তির হাহাকার শুধু বিশ্বকাপ না জেতায়। কে জানে, হয়তো ১৫ জুলাই লুঝনিকি স্টেডিয়ামের ফাইনাল শেষের সংবাদ সম্মেলনে আবার তাঁকে দেখব! বিশ্বকাপ জয়ের উচ্ছ্বাসে; পূর্ণতার আনন্দে!

 



মন্তব্য