kalerkantho


ইতিহাসে মেয়েদের ছবি

বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে

ক্রীড়া প্রতিবেদক : ‘ওই, ওয়াইড দে’! গ্যালারি থেকে আমজনতার হুল্লোড় বলে মনে হলেও এটি আসলে তা নয়। সবাই মিলে গোল হয়ে টেলিভিশনে মেয়েদের এশিয়া কাপ ফাইনালের অন্তিম মুহূর্ত দেখতে দেখতেই এই দাবিটা শোনা গেল মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমে। জেতার জন্য ২ রানের প্রয়োজনীয়তার মুখে ব্যাট ধরা জাহানারা আলমকে যখন ম্যাচের শেষ বলটি করতে চলেছেন ভারত অধিনায়ক হারমানপ্রীত কাউর, তখনই কোনো একজন ক্রিকেটার পরিণত হয়ে গেলেন সাধারণ এক ক্রিকেট দর্শকে। বলটি ওয়াইড হলো না, কিন্তু সেটি মিড উইকেটে ঘুরিয়ে জাহানারা দৌড় শুরু করতেই তামিম ইকবালের উত্তেজনাও ছড়িয়ে পড়ল সবার মাঝে, ‘হয়ে যাবে, হয়ে যাবে।’ হয়েও গেল এবং সঙ্গে সঙ্গেই মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের কিনরারা একাডেমি ওভালে মেয়েদের বাঁধভাঙা উল্লাসের ঢেউ আছড়ে পড়ল মিরপুরের ড্রেসিংরুমেও। মাশরাফি বিন মর্তুজা-তামিমদের সঙ্গে জয়োৎসবে শামিল হলো পুরো দলও।

তামিম ওই মুহূর্তটি নিজের মোবাইলে ধারণ করায় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও সেটি ভাইরাল হয়ে গেছে। তবে অদেখা এ রকম আরো হাজারো খণ্ড খণ্ড উল্লাসের জোয়ারও কাল নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে তুলেছেন সালমা খাতুনরা। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে মাত্র ৬৩ রানে অল আউট হওয়ার মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল যাঁদের এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টি অভিযান। এমন পারফরম্যান্সের পর দেশ ছাড়ার আগে অধিনায়কের বলে যাওয়া কথাগুলোকে বাগাড়ম্বর বলেই মনে করছিলেন সিংহভাগ লোক। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে টানা পাঁচ জয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে সালমারা যেন ছাড়িয়ে গেছেন কল্পনার সব সীমানাই। এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে বিধ্বস্ত হওয়ার দুঃসহ স্মৃতিও মেয়েদের ভালো কিছু করার আশায় ভরসা দিতে পারছিল না। কিন্তু পাকিস্তানকে হারিয়ে দিতেই অন্য চেহারার বাংলাদেশ একই আসরে দুইবার হারাল ভারতকে। যারা সালমাদের কাছে হারার আগে এশিয়া কাপে টানা ৩৩ ম্যাচ অপরাজিত ছিল। আগের ছয় আসরের প্রতিটির চ্যাম্পিয়নরা এবার দেখল তাদের দর্পচূর্ণ করে সালমাদের এশিয়ার সেরা হতে।

সেরা হওয়ার পথে তারা এমন এক কাজ করল, যেটি কখনো পারেনি ছেলেদের দলও। সেই ২০১২ সালের এশিয়া কাপের ফাইনাল থেকে শুরু করে আফগানিস্তানের বিপক্ষে সদ্যসমাপ্ত সিরিজের শেষ ম্যাচ—ছেলেরা কিছুতেই পারছিল না শেষ ওভারে জেতার জন্য ৯ রানের সমীকরণ মেলাতে। কী আশ্চর্য, এবার সালমাদেরও জেতার জন্য দরকার ছিল ৯ রানের। জাহানারার ব্যাটে সেই রান দেশের জন্য নিয়ে এলো প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপাও। দুটি এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলেছে ছেলেদের দল। সেই সঙ্গে তিনটি ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টের ফাইনালও। কিন্তু ট্রফি অধরাই থেকে যাচ্ছিল। মেয়েরা প্রথম সুযোগেই সেটি ছুঁয়ে ফেলল।

এরপর ব্যাখ্যাতীত আনন্দেই ভেসে যাচ্ছিলেন অধিনায়ক সালমা, ‘এশিয়া কাপ জেতায় খুব খুশি। এটা যে কত বড় ব্যাপার, সেটি ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আমরা গ্রুপে ভারতের বিপক্ষে জিতেছিলাম। আজ ফাইনাল ছিল। খুশি যে আজও আমরাই জিতেছি।’ প্রচণ্ড স্নায়ুচাপ সামলে ফাইনালেও ভারতকে হারানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে এমন মনোবল, ‘আমাদের হারানোর কিছু ছিল না। কিন্তু ওদের হারানোর ছিল অনেক কিছু।’ অথচ এই অর্জনের চূড়ায় পৌঁছানোর পথটা খুব সহজ ছিল না সালমাদের। বলা যায় অনেক বাধার পাহাড় ডিঙিয়েই তারা দেশকে এই সাফল্য এনে দিয়েছেন। একেই ম্যাচ খেলার সুযোগ তেমন ছিল না মেয়েদের। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের আগে ১৪ মাস তো কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচই ছিল না। অবশ্য ঘরোয়া ক্রিকেটেও নিয়মিত খেলার সুযোগ ছিল না মেয়েদের। সমাজের রক্তচোখ, পরিবারের বাধা, শারীরিক ও মানসিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে নিত্য লড়াই করে তবু কিছু মেয়ে খেলাটায় মনপ্রাণ সঁপে দিয়েছিলেন। তেমন কোনো প্রাপ্তির আশা না থাকার পরেও, খেলার সুযোগ সীমিত হওয়ার পরেও। মাঠ সংকটের কথা বলে যেমন এই মৌসুমেই মাঠে গড়ায়নি মেয়েদের প্রিমিয়ার লিগ। মেয়েদের ক্রিকেটের নির্দিষ্ট কোনো সূচিও নেই। অনুশীলন শিবিরও নিয়মিত নয়। গত মৌসুমের জাতীয় লিগে তাদের মাত্র ৬০০ টাকা ম্যাচ ফিও হয়েছিল খবরের শিরোনাম। সালমাদের শিরোপা তাই সেসব উপেক্ষার একটা জবাবও। সেটিই স্পষ্ট করে দিচ্ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরীর বক্তব্য, ‘মেয়েদের দলের স্পন্সরশিপ তো এখন ছেলেদের জাতীয় দলের স্পন্সরশিপের আওতাধীন। কিন্তু এই সাফল্যের পর আমাদের আলাদাভাবে ভাবতে হবে। কারণ স্পন্সর আকৃষ্ট করার মতো নিজস্ব মূল্য ওরা তৈরি করতে পেরেছে।’ পেরেছে অনেক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে পাওয়া এই সাফল্যেই।

 



মন্তব্য