kalerkantho


একটি অবিশ্বাস্য এবং দুটি হাস্যকর গোল

বেল-বীরত্বে রিয়ালের ‘হ্যাটট্রিক’

২৮ মে, ২০১৮ ০০:০০



বেল-বীরত্বে রিয়ালের ‘হ্যাটট্রিক’

সের্হিয়ো রামোসের সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে যাওয়ার পরই কঁকিয়ে উঠেছিলেন। তাঁর ওই যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখের ভাষায় শিউরে ওঠে লিভারপুল সমর্থকরা। দৌড়ে মাঠে ঢোকেন চিকিৎসকরা। সবাইকে স্বস্তি দিয়ে ফেরেন তিনি। কিন্তু মিনিট পাঁচেক পর আর পারলেন না। কাঁধের ইনজুরি নিয়ে মাঠ থেকে বেরিয়ে যান মোহামেদ সালাহ। হাপুস নয়সে কাঁদতে কাঁদতে।

৯০ মিনিটের ফুটবলীয় দ্বৈরথ শেষে লিভারপুলের অনেকের চোখেই জল। কিন্তু গোলরক্ষক লরিস কারিয়াসের মতো কারোর নয়। দুচোখ বেয়ে নামছে অশ্রুধারা, দুহাত জোড় করে গ্যালারিতে থাকা ‘অল রেডস’ সমর্থকদের কাছে গিয়ে চাইছেন ক্ষমা। একবার, দুইবার, বারবার। আর তা অমার্জনীয় ওই দুটি ভুলের জন্য।

চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালের গল্পটি অনেকাংশেই লেখা এ দুজনের কান্নায়। রিয়াল মাদ্রিদের শ্রেষ্ঠত্বের সৌধ আঁকা তাঁদের ট্র্যাজেডির ক্যানভাসে। এ দফার হ্যাট্রটিক এবং সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ ট্রফিতে সালাহ-লরিয়াসের অশ্রুজল মিশে রয়েছে নিশ্চিতভাবে। আর গ্যারেথ বেলের বীরত্ব; তাঁর ওই অবিশ্বাস্য ভলি। ৩-১ গোলে রিয়াল মাদ্রিদের এই বিজয়ে লিভারপুলের দীর্ঘশ্বাসের ওড়াউড়ি রইবে আরো অনেককাল।

ইউরোপিয়ান কাপের আদ্দিকালে প্রথম পাঁচ আসরেই চ্যাম্পিয়ন হয় রিয়াল মাদ্রিদ। এবার ছিল সর্বশেষ পঞ্চম আসরের মধ্যে চতুর্থ ফাইনাল। আগের তিনবারই ট্রফি জেতে রিয়াল। ওদিকে লিভারপুল ফাইনালে উঠল ১১ বছর পর। তাদের কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপের পেছনে সর্বশেষ পাঁচ ফাইনাল হারের বাজে রেকর্ড। এই জার্মানের সামনে যখন পাঁচের প্যাঁচ খোলার চ্যালেঞ্জ, ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর সামনে ছিল নিজের পঞ্চম চ্যাম্পিয়ন লিগ জয়ের হাতছানি।

লিভারপুলের তুরুপের তাস ছিলেন সালাহ। এ মৌসুমে এরই মধ্যে ৪৪ গোল করেছেন যিনি। তাঁর নেতৃত্বে কিয়েভের ফাইনালে ‘অল রেড’দের শুরুও দুর্দান্ত। গোলের কয়েকটি হাফচান্সও তৈরি হয় প্রথম ২৫ মিনিটে। এরপরই সালাহর ইনজুরি, মিনিট পাঁচেক পর বেরিয়ে যাওয়ায় বদলে যায় খেলার ধারা। মুঠো আলগা হতে থাকে লিভারপুলের, আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয় রিয়াল মাদ্রিদের। ইনজুরির কারণে রাইট ব্যাক দানি কারভাহালের বেরিয়ে যাওয়াতেও ব্যাহত হয়নি তা।

প্রথমার্ধে গোল হয়নি তবু। দ্বিতীয়ার্ধের ষষ্ঠ মিনিটে এগিয়ে যায় রিয়াল মাদ্রিদ। কারিয়াসের শিশুতোষ ভুলে। বল হাতে ধরে পাস দিতে যান সতীর্থকে কিন্তু ঠিক সামনে থাকা করিম বেনজিমার ৬ ফুট ১ ইঞ্চির বিশাল শরীরটাই যেন দেখলেন না। কারিয়াসের হাত থেকে ছোটা বলে পা বাড়িয়ে সহজতম গোল করলেন ফরাসি ফরোয়ার্ড। লিভারপুলের কৃতিত্ব মিনিট চারেক পরই সাদিও মানের গোলে সমতায় ফেরে। কিন্তু ইসকোর বদলি হিসেবে নামা গ্যারেথ বেলের জাদুর সামনে আবার স্তম্ভিত। মাঠে নামার মিনিট পাঁচেকের মধ্যে অবিশ্বাস্য এক ওভারহেড কিকে গোল করেন ওয়েলস উইঙ্গার। আর ৮৩তম মিনিটে বেলের দূরপাল্লার শটে হাস্যকর আরেক গোল খেয়েছেন কারিয়াস। ম্যাচ শেষে রিয়াল মাদ্রিদের উল্লাসের বিপরীতে তাঁর অমন অপরাধী কান্না সত্ত্বেও অনেক লিভারপুল সমর্থক অনেক দিনই ক্ষমা করতে পারবেন না এই গোলরক্ষককে।

লিভারপুল কোচ ক্লপ কাঠগড়ায় দাঁড় করাননি কারিয়াসকে। তবে সালাহর ইনজুরি ভুলতে পারছিলেন না কিছুতেই, ‘সালাহকে করা চ্যালেঞ্জটি খুব বাজে ছিল, অনেকটা রেসলিংয়ের মতো। এর আগ পর্যন্ত ভালো খেলছিলাম আমরা। বলের দখল ছিল, সুযোগ তৈরি করছিলাম এবং ওপরে প্রেস করে খেলছিলাম প্রথম ৩০ মিনিট। তবে ১০ বছর পর কেউ আর মনে রাখবে না আমরা কিভাবে হেরেছি। সবাই মনে রাখবে রিয়াল মাদ্রিদ জিতেছে।’ ভাগ্যকেই বরং দুষছেন তিনি, ‘এমন ম্যাচ জিততে কিছুটা ভাগ্য লাগে; আমাদের তা ছিল না। ছিল দুর্ভাগ্য। এখন ম্যাচের দিকে তাকিয়ে অনেকগুলো মুহূর্তের দিকে তাকিয়ে ভাবতে পারি, কিভাবে তা হলো। যদি সব কিছু অত খারাপ না হতো, আমরা জিততেও পারতাম। যদি সালাহ মাঠে থাকত, যদি কারিয়াস ভুলগুলো না করত...!’

রিয়াল মাদ্রিদের এসব ভাবার সময় কই! হ্যাটট্রিক শিরোপা জয়ের আনন্দে বিভোর তারা। এর মধ্যেও কিছুটা হয়তো ছন্দপতন রোনালদোর ম্যাচ-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায়, ‘চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়টা উপভোগ করছি খুব। রিয়াল মাদ্রিদের কাটানো সময়গুলো আসলেই দারুণ ছিল। আমার কিছু কথা বলার আছে সমর্থকদের; যা শিগগিরই বলব।’ রিয়ালের সময়কে ‘অতীত’ করে দেওয়া রোনালদোর ওই কথাতেই বিস্ফোরণ; অসন্তুষ্টি এবং সে সূত্রে দলবদলের স্পষ্ট ইঙ্গিত যা। তবে এমন আনন্দের মুহূর্তে তা নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতে রাজি নয় ক্লাব প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেস থেকে শুরু করে কোচ-অধিনায়ক-খেলোয়াড়রা। জিদান যেমনটা বলেছেন, ‘এই মুহূর্তে ক্রিস্তিয়ানোর কথা ভাবছি না। আজকের ম্যাচ, আজকের অর্জনের কথাই ভাবছি। আর রোনালদোর রিয়ালে থাকা উচিত। ও রিয়াল মাদ্রিদেই থাকবে। এই ক্লাবের জন্য ও যা করেছে, তা বলে শেষ করা যাবে না।’

জোড়া গোলে এই ফাইনাল জয়ের নায়ক গ্যারেথ বেলের কথাতেও অসন্তুষ্টির ছায়া, ‘আমি নিয়মিত খেলতে চাই। সেটি হচ্ছে না। এই ফাইনালেও প্রথম একাদশে ছিলাম না। এরপর মাঠে নেমে যা করার, করেছি। কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার এজেন্টের সঙ্গে বসব।’ একাদশে না থাকা বেলের অসন্তুষ্টি যৌক্তিক বলে মেনে নিচ্ছেন জিদানও।

কিন্তু লিভারপুল সমর্থকরা কোনো যুক্তিতেই সান্ত্বনা দিতে পারছেন না নিজেদের। সালাহর ইনজুরির জন্য, কারিয়াসের দুটি ভুলের জন্য। তবে ইতিহাস তো আর মাথা ঘামাবে না এসব নিয়ে। বরং রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাস তৈরির মুহূর্ত হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে এই ফাইনাল। তাদের হ্যাটট্রিকের জন্য। তাদের ১৩তম শিরোপার জন্য! এএফপি, মার্কা



মন্তব্য