kalerkantho


‘পাঁচের প্যাঁচ’ খোলার ফাইনাল

নোমান মোহাম্মদ   

২৬ মে, ২০১৮ ০০:০০



‘পাঁচের প্যাঁচ’ খোলার ফাইনাল

পাঁচ! চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে আজকের রিয়াল মাদ্রিদ-লিভারপুল দ্বৈরথের আবহসংগীত এই সংখ্যাটিই। পাঁচ!

ইউরোপের মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের এই প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল ‘ইউরোপিয়ান কাপ’ নাম নিয়ে। যার প্রথম পাঁচটি শিরোপাই রিয়াল মাদ্রিদের। ক্লাবের ইতিহাসের স্বর্ণসময় নিঃসন্দেহে সেটি। আজকের ফাইনাল যদি জিততে পারে রোনালদো-রামোস-ক্রোসরা, তাহলে তাঁরা নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জ জানাবেন দি স্তেফানো-গেন্তো-পুসকাসদের। এটি যে সর্বশেষ পাঁচ বছরে চতুর্থ ফাইনাল রিয়াল মাদ্রিদের! আগের তিনটি জিতেছে, আজকেরটি জিতলেই হয়।

পাঁচের সঙ্গে সখ্য রয়েছে লিভারপুলেরও। রিয়াল মাদ্রিদ না হয় সর্বোচ্চ ১২ বার ইউরোপসেরা হয়েছে, কিন্তু এই ইংলিশ ক্লাবটির মাথায়ও তো সে মুকুট উঠেছে পাঁচবার। ‘আমরা পাঁচবার জিতেছি’—লিভারপুলের খেলা থাকলেই তাই কোরাসে এ গান গেয়ে ওঠেন সমর্থকরা। ইউরোপসেরা আসরে তাদের পাঁচ শিরোপার স্মৃতি উসকে দিয়ে। ক্লাবের বর্তমান কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপের জন্য অবশ্য পাঁচের প্যাঁচ অন্য রকম। নিজ দল নিয়ে সর্বশেষ পাঁচ ফাইনালে যে হেরেছেন এই জার্মান! বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের হয়ে তিনবার; লিভারপুলের হয়ে দুইবার। সেই প্যাঁচ কাটার অভিযান এবার ক্লপের।

পাঁচের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোরও; সঙ্গে আবার আরেক বন্ধুতার আহ্বান। এখন পর্যন্ত বিশ্বসেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতিতে ব্যালন ডি’অর জিতেছেন পাঁচবার। আজকের ফাইনাল জিতলে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের সংখ্যাও হয়ে যাবে পাঁচ। সেই ২০০৮ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে প্রথমটির পর সর্বশেষ চার মৌসুমে আরো তিন পালক যুক্ত রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে। আজ সংখ্যাটিকে পাঁচে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ তাঁর।

সম্ভাবনার পাল্লা হেলে রিয়াল মাদ্রিদের দিকে। আর তা সাম্প্রতিক সাফল্যের কারণে। সর্বশেষ পাঁচ মৌসুমে এটি তাদের চতুর্থ ফাইনাল; অথচ লিভারপুল চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল খেলছে সেই ২০০৫ সালের পর। সে ফাইনালেও অবশ্য আন্ডারডগ ছিল ‘অল রেডস’। এসি মিলানের বিপক্ষে ০-৩ গোলে পিছিয়ে পড়ার তো মনে হচ্ছিল সব শেষ। কিন্তু সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচ ড্র করে লিভারপুল; এরপর টাইব্রেকারে জেতে শিরোপা। আজকের ফাইনালের  আন্ডারডগ তকমা নিয়েও তাই নিশ্চয়ই আপত্তি থাকার কথা নয় লিভারপুলের।

রিয়ালের অর্জনের ক্যানভাসটা অনেক বড়। এই প্রতিযোগিতা চ্যাম্পিয়নস লিগ নাম ধারণের পর কোনো ক্লাব কখনো টানা দুইবার শিরোপা জিততে পারেনি। রিয়াল মাদ্রিদ তা করে দেখিয়েছে। কোচ জিদানের অধীনের টানা দুই শিরোপার পর এবার তাদের সামনে হ্যাটট্রিকের সুযোগ। ডিফেন্ডার রাফায়েল ভারান এ কারণেই বলতে পারছেন, ‘আমরা এরই মধ্যে ইতিহাস রচনা করেছি; তা আরো চালিয়ে যেতে চাই। আমি এখনো মনে করি না, এই অর্জনের মাহাত্ম্য আমরা বুঝতে পারছি। যখন এই পথচলা শেষ হবে, তখন হয়তো বুঝতে পারব। অভিজ্ঞতা থেকে জানি, চ্যাম্পিয়ন লিগ জেতা কতটা কঠিন। আবার এই অভিজ্ঞতাই আপনাকে সাহস জোগায়।’

তা ওই অভিজ্ঞতা দিয়ে এবার চ্যাম্পিয়নস লিগে একের পর এক বাধা টপকেছে রিয়াল মাদ্রিদ। দ্বিতীয় থেকেই দেখুন না। ফরাসি চ্যাম্পিয়ন প্যারিস সেন্ত জার্মেই, ইতালিয়ান চ্যাম্পিয়ন জুভেন্টাস ও জার্মান চ্যাম্পিয়ন বায়ার্ন মিউনিখকে হারিয়ে আজ কিয়েভে তারা। লিভারপুলের পথচলা তুলনামূলক কিছুটা সহজ। নকআউট পর্বের তিন ম্যাচের মধ্যে কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যানচেস্টার সিটিই ছিল সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ; এর আগে পরে পোর্তো ও রোমা। আর ফাইনাল জিতলে সেটি যে অবিশ্বাস্য কিছু হবে, তা বলতে অকপট কোচ ক্লপ, “যদি আমরা ফাইনালে জিতি, তাহলে সেটি হবে সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ফুটবল পথচলার অন্যতম। এখন পর্যন্তও আমাদের যাত্রাটি রোমাঞ্চকর। রিয়াল মাদ্রিদ কি ভাবছে, ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে, ফাইনালে আমরা লিভারপুলকে পেয়েছি?’ আমার তা মনে হয় না।”

নিজের পাঁচ ফাইনালে হারের তেতো অভিজ্ঞতা পেছনে। তবে তা মাথায় আনতে চান না লিভারপুল কোচ, ‘গুরুত্বপূর্ণ কিছু অর্জনের জন্য ভোগার প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হয়। এটাই জীবন। আর যদি নিশ্চয়তা চান, তাহলে তো ফাইনালে না উঠলেই হয়। বাসায় বসে থাকবেন কিংবা ছুটি কাটাতে চলে যাবেন।’ শিরোপার মাহাত্ম্য বুঝিয়েছেন তিনি, ‘লিভারপুলের ট্রেনিং গ্রাউন্ডে কিন্তু সিলভার মেডেলের কোনো জায়গা নেই। আমাদের তাই অনেক কাজ বাকি এখনো। চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল খেলা দারুণ ব্যাপার। শিরোপা জেতাটা আরো অনেক বেশি দারুণ।’

লিভারপুলের এই পথচলায় সবচেয়ে বড় অবদান আক্রমণের ত্রিফলা—মোহামেদ সালাহ, রবের্তো ফিরমিনো ও সাদিও মানের। তিনজন মিলে এ মৌসুমে করেছেন ৯০ গোল। চ্যাম্পিয়নস লিগেও সর্বোচ্চ ৪৬ গোল লিভারপুলের। রিয়াল মাদ্রিদের ত্রিফলা রোনালদো-বেল-বেনজিমা হয়তো অমন ফর্মে নেই। চ্যাম্পিয়নস লিগে এখন পর্যন্ত এক মিনিটও তিনজন খেলেননি একই সঙ্গে, সর্বশেষ চার ম্যাচে পাঁচ গোল দিলেও বেলের তাই একাদশে অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা কম। আর ত্রিফলায় পিছিয়ে থাকলেও ব্যক্তিগত গোলসংখ্যায় কিন্তু সবচেয়ে এগিয়ে রোনালদো। ১৫ গোল দিয়ে শীর্ষে; সেমিফাইনালে বায়ার্নের বিপক্ষে দুই ম্যাচ ছাড়া গোল করেছেন প্রতিটিতে।

পাঁচের লড়াইয়ে আজ শেষ হাসির জন্য নিশ্চিতভাবেই মুখিয়ে থাকবেন রোনালদো। এবং রিয়াল মাদ্রিদও। আর ‘পাঁচের প্যাঁচ’ তাড়ানোর অভিযানে ক্লপ। সে সূত্রে লিভারপুলও।

 


মন্তব্য