kalerkantho


খেলাটা উপভোগ করতাম তাই খেলতাম

২৫ মে, ২০১৮ ০০:০০



খেলাটা উপভোগ করতাম তাই খেলতাম

ছবি : মীর ফরিদ

ঢাকার ডাকসাইটে পাড়া আজিমপুর। একদা ঢাকার মহল্লাভিত্তিক কর্তৃত্বের কেন্দ্র ছিল নিউমার্কেট সংলগ্ন এ জনপদ। শিক্ষা-সংস্কৃতির সঙ্গে দেশের ক্রীড়াঙ্গনেও বিপুল প্রভাব-প্রতিপত্তির সে সুদিন আর নেই। তবে রয়ে গেছেন আজিমপুরের স্বর্ণালি সময়ের সাক্ষী হয়ে অনেকে। যেমন সরওয়ার ইমরান। মনের আনন্দে দাপটে ক্রিকেট খেলেছেন, আরো বেশি নাম করেছেন কোচিংয়ে। বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের কোচ ইমরানের সেকাল-একালের রোমাঞ্চকর সব গল্প এ সপ্তাহের সাক্ষাত্কারে তুলে এনেছেন নোমান মোহাম্মদ

 

 

প্রশ্ন : কথোপকথন শুরু করতে চাই বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট দিয়ে। দেশের ইতিহাসের প্রথম টেস্টে জাতীয় দলের কোচ আপনি—এটি কতটা গর্বের?

সরওয়ার ইমরান : অবশ্যই গর্বের। তবে সত্যি বলতে কি, তখন ব্যাপারটি সেভাবে বুঝতে পারিনি। সব স্বপ্নের মতো ঘটছিল। আরেক আনন্দের জায়গা, বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টে আমি কোচ; আমার বিকেএসপির ছাত্র দুর্জয় (নাঈমুর রহমান) অধিনায়ক। ও বিকেএসপির প্রথম ব্যাচের ছাত্র। সেবার ক্রিকেটে ৩৩ জন ছাত্র ভর্তি হয়। এদের মধ্যে বেশির ভাগই ফুটবলে সুযোগ না পেয়ে। দুর্জয়ও তা-ই। ও বলত, ‘স্যার, আমি তো ফুটবলার হতে চাই।’ দুর্জয় তখন ব্যাটিং করে আর লেগ স্পিন বোলিং। ওকে দেখে বলেছিলাম, ‘তুই ক্রিকেট খেল। একদিন জাতীয় দলে খেলতে পারবি। বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক হতে পারবি।’ সত্যিই ও তা হয়েছে। আর বাংলাদেশের প্রথম টেস্টে অধিনায়ক দুর্জয়, সে দলের কোচ আমি—এটি আমার জন্য সত্যি অনেক বড় প্রাপ্তি।

প্রশ্ন : সেই টেস্টের স্কোয়াড ও একাদশ নির্বাচন নিয়ে তো কম জল ঘোলা হয়নি। সেরা দুই পারফরমার আমিনুল ইসলাম ও হাবিবুল বাশারকে খেলানোর কথা ছিল না। কোচ হিসেবে তখন আপনার ভূমিকা কী ছিল?

ইমরান : সুমনকে (হাবিবুল) দলে ঢুকিয়েছেন সাবের ভাই (সাবের হোসেন চৌধুরী, বিসিবির তত্কালীন প্রেসিডেন্ট)। নির্বাচকরা প্রথমে যে দল দেন, তাতে কিন্তু সুমন ছিল না। সাবের ভাই এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘সুমন দলে নেই কেন?’ আমি বলি, ‘এটি নির্বাচকদের জিজ্ঞেস করুন।’ উনি আবার জিজ্ঞেস করেন, ‘দল নির্বাচনের সভায় আপনি ছিলেন না?’ আমি বলি, ‘ছিলাম। এডি বারলোও ছিলেন। আমরা দুজন সুমনকে নিতে চাই। কিন্তু গত বেশ কিছু ম্যাচে ওর যেহেতু রান নেই, নির্বাচকরা তাই রাখেননি।’ তিন নির্বাচক তানভীর হায়দার, রকিবুল হাসান ও তানজীব আহসান সাদের সঙ্গে কথা বলে সুমনকে দলে ডাকার ব্যবস্থা করেন সাবের ভাই। ১৪ জনের স্কোয়াড হয়ে যায় ১৬ জনের। সুমনের সঙ্গে ঢোকে এনামুল হক মনি।

প্রশ্ন : আর আমিনুল ইসলাম?

ইমরান : বুলবুলের ব্যাপারে কথাটি উঠেছিল ভিন্ন কারণে। তখন আবাহনী-মোহামেডান রেষারেষি খুব। এর সূত্র ধরেই বুলবুলকে বাদ দেওয়ার কথা শোনা যাচ্ছিল। তখনকার সময়ে একাদশ ঠিক করতেন কোচরা। অধিনায়কসহ অনেকের সঙ্গে কথা হতো যদিও। তো ওই সময় বুলবুলের বাদ পড়ার গুঞ্জন ওঠে। সাবের ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করেন ওর ব্যাপারে। আমি বলি, ‘অবশ্যই বুলবুল খেলবে। এত দিন দেশকে সেবা দিয়েছে, এখন প্রথম টেস্টে খেলবে না কেন?’ সাবের ভাই আমার কথা মেনে নেন।

প্রশ্ন : এ দুজন অমন ভালো করায় নিশ্চয় খুব তৃপ্ত হয়েছেন?

ইমরান : ওদের দলে নেওয়াটা আমার একক সিদ্ধান্ত ছিল না। কিন্তু প্রচণ্ড চাপের মুখেও বুলবুল-সুমনকে দলে নেওয়ার পক্ষে ছিলাম। ওরা যখন তাই ভালো করে, আমারও খুব ভালো লেগেছে।

প্রশ্ন : আর বাংলাদেশ টেস্ট খেলার আগেই ‘টেস্ট ব্যাটসম্যান’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন যিনি, সেই জাভেদ ওমর বেলিমকে প্রথম টেস্টের একাদশে না রাখার কারণ ছিল কী?

ইমরান : বুলবুল-সুমনকে আমি একাদশে চেয়েছিলাম, রাখতে পেরেছি। জাভেদকে চেয়েও পারিনি। তখন অপি (মেহরাব হোসেন), বিদ্যুত্রা (শাহরিয়ার হোসেন) ভালো ফর্মে। দল সংশ্লিষ্ট সবাই ওপেনার হিসেবে ওই দুজনকে চায়। আমি গোল্লাকে নিতে চাইলেও পরে সবার কথা মেনে নিই।

প্রশ্ন : এত বছর পর পেছন ফিরে তাকিয়ে কী মনে হয়, ভারতের বিপক্ষে ওই প্রথম টেস্টটি আমরা অন্তত ড্র করতে পারতাম? বিশেষত প্রথম ইনিংসে চার শ রান করার পর?

ইমরান : অবশ্যই ড্র করতে পারতাম। পারিনি অনভিজ্ঞতার কারণে। এখানে কিছু ঘটনার কথা বলি। টেস্টের তৃতীয় দিন শেষে আমি বাসায় এসেছিলাম। রাতে শেরাটন হোটেলে ফিরে দেখি লবিতে একজন সাংবাদিক বসা। ছোটখাটো একটি ছেলে সাপ্তাহিক ২০০০ পত্রিকার...

প্রশ্ন : নাম কি সাইফুল হাসান রিকু?

ইমরান : হ্যাঁ, সাইফুল। তিনি আমার সঙ্গে কথা বললেন। জিজ্ঞেস করেন, ‘টেস্টে বাংলাদেশের লক্ষ্য কী?’ আমি বলি, ‘ড্র করতে চাই। কারণ এখনো ১৮০ ওভারের খেলা বাকি। প্রথম ইনিংসে ৪০০ করলেও দ্বিতীয় ইনিংসে আমাদের ভালো ব্যাটিং করতে হবে।’ সাংবাদিক সাইফুল বলেন, ‘আপনি নেতিবাচক কথা বলছেন। সবাই তো জিততে চাইছে।’ এই চাওয়াটাই আসলে আমাদের সর্বনাশ করে দেয়। সবাই ধরে নেয় যে, বাংলাদেশ এই টেস্ট জিতে যাবে। তৃতীয় দিনে ড্রেসিংরুমে তো আমি নিজেই পা ফেলার জায়গা পাচ্ছিলাম না। এত এত লোক সেখানে! অধিনায়ক, ক্রিকেটারদের সঙ্গে সবাই কথা বলছে কিভাবে জেতা যায়। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়। দ্বিতীয় ইনিংসে ১০০-র মধ্যে অল আউট হয়ে ম্যাচ হেরে যাই। যদি পা মাটিতে রেখে ড্রয়ের চিন্তা করতাম, যদি খেলাতেই মনোযাগ রাখতাম—তাহলে আমাদের হারতে হতো না।

প্রশ্ন : এবার একটু শুরুর কথা জানতে চাই। কোচ হবার আগে তো ছিলেন খেলোয়াড়। খেলাধুলায় আগ্রহ কি আজিমপুর কলোনিতে থাকার সুবাদেই?

ইমরান : ঠিক তাই। আমার জন্ম আজিমপুরে। আব্বা মজিবর রহমান ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা, মা শামসুন্নাহার বেগম গৃহিণী। পাঁচ ভাই, পাঁচ বোনের মধ্যে আমি ছয় নম্বর। আব্বার চাকরির সূত্রে থাকতাম আজিমপুর কলোনিতে। আমাদের বাসা ছিল নিচতলায়; দরজা খুললেই মাঠ। খেলাধুলাকে ভালোবাসতে তাই সময় লাগেনি। আর খেলতাম ফুটবল-ক্রিকেট-ভলিবল সব ধরনের খেলাই।

প্রশ্ন : বেশি ভালোবাসার খেলা?

ইমরান : ফুটবল। পুরো দেশেই তখন ফুটবলের জোয়ার, এটি একটি কারণ। আরেকটি কারণ আজিমপুর কলোনিতে আমরা যেদিকটায় থাকতাম, ওখানে ফুটবলের চল ছিল বেশি। মালা ভাই, শহীদ ভাইরা ফুটবলে মাতিয়ে রাখতেন আমাদের। এমনিতে অবশ্য সব ধরনের খেলাই হতো। আর আমাদের খেলোয়াড় করে তোলায় আজিমপুর কলোনির অনেক অবদান। ক্রিকেটের জালাল ভাই, দৌলত ভাই, সাজু ভাই, মন্টু ভাই, প্রিন্স, সুরু, মনির—এঁরা সবাই আজিপুরের। এখন যে চ্যানেল আইয়ের সাংবাদিক শামীম, ও ছিল বাঁহাতি পেসার—সেও আজিমপুরের। ফুটবলের পনির, টেবিল টেনিসের রচি-কচি, জুডোর হিরু—এঁরা সবাই আজিমপুর কলোনির। ওখানকার খেলাধুলার পরিবেশ আমাদের খুব সাহায্য করেছে।

প্রশ্ন : ফুটবলে আপনার পজিশন?

ইমরান : রাইট ব্যাক। তবে দলের গোল করার প্রয়োজন হলে সেন্টার ফরোয়ার্ডেও খেলতাম।

প্রশ্ন : বিভাগীর পর্যায়ে খেলেছেন?

ইমরান : মালা ভাইয়ের অধীনে অনুশীলন করতাম তো। তাঁর দ্বিতীয় বিভাগের দল লালবাগ স্পোর্টিংয়ে সুযোগ পাই। এটি ম্যাট্রিক পাস করার পর পরই। কিন্তু অনুশীলনে আমাদের দলেরই মনিরের সঙ্গে সংঘর্ষে ব্যথা পাই হাঁটুতে। তখন তো এসবের তেমন চিকিৎসা ছিল না। ফুটবল চালিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে আর সম্ভব হলো না।

প্রশ্ন : এরপরই ক্রিকেটে?

ইমরান : ক্রিকেটে তখন সুযোগ আসে। দ্বিতীয় বিভাগের একটি দল ছিল ‘প্রান্তিক’। মালিক দল চালাতে পারছিলেন না। আজিমপুরের আমাদের বলেন, সে দলের দায়িত্ব নিয়ে খেলতে। কিন্তু মাঠে গিয়ে দেখি, ওখানে আরেক দল হাজির। আসলে প্রান্তিকের মালিক তাঁদেরও বলেছিলেন, দল করে খেলতে। আম্পায়াররা পড়েন ফ্যাসাদে। শেষে ঠিক হয়, আমাদের দলের পাঁচজন ও ওদের দলের ছয়জন নিয়ে একাদশ গড়া হবে। তাতে আমি সুযোগ পাই কিন্তু ভালো করতে পারিনি। কিন্তু দ্বিতীয় খেলায় ইউনাইটেড হিরোস দলের বিপক্ষে ৪৬ রান করার পাশাপাশি নিই ২ উইকেট। পরদিন অবজারভার পত্রিকায় আমার নাম আসে। ক্রিকেটার হওয়ার উৎসাহ পাই তাতে।

প্রশ্ন : আজিমপুরের ক্লাব ইয়াং পেগাসাসের কারণেও কি বাড়তি উৎসাহ ছিল না?

ইমরান : না, তা বলা যাবে না। কারণ আজিমপুরে কলোনিতে ইয়াং পেগাসাস ক্লাব ছিল গ্যারেজ ফিল্ডের ওপাশে। নিউ বিল্ডিংয়ে ওদিকে বড় বড় সরকারি কর্মকর্তারা থাকতেন। ওখানে ক্রিকেট খেলা হতো বেশি আর ওখানকার ছেলেপুলেরা বেশ ভদ্রও। আমাদের এই আজিমপুর ছাপরা মসজিদের এদিকে আবার ফুটবলের জোয়ার। মারামারি হতো, রংবাজিও। পরে আমি পুরোপুরি ক্রিকেটে চলে এলেও তাই ইয়াং পেগাসাসের প্রভাব তেমন পড়েনি। বরং আমার বড় ভাই কর্নেল কামালের প্রভাব ছিল। উনি পাকিস্তান আমলে জিমখানা, ভিক্টোরিয়ার মতো ক্লাবে ক্রিকেট খেলেছেন। বুয়েট দলের অধিনায়ক ছিলেন। এটি ছিল বড় অনুপ্রেরণা। আর পুরোপুরি ক্রিকেটে চলে আসার সিদ্ধান্ত আলতাফ ভাইয়ের ক্যাম্পে গিয়ে।

প্রশ্ন : খুব কঠোর অনুশীলন নাকি করাতেন?

ইমরান : আরে বাব্বা, কঠিন মানে! পত্রিকায় খবর দেখে আমার বন্ধু শেখ শামীমের সঙ্গে যাই ঢাকা স্টেডিয়ামে। আড়াই শ-তিন শ ছেলে এসেছিল। খাওয়ার পর তিনটি স্টেডিয়াম সাত চক্কর দিতে বললেন। ওখানেই তো অনেকে বমি-টমি করে অবস্থা কাহিল। যে ২০-২৫ জন ছেলে সাত চক্কর শেষ করতে পারে, আমি তাদের একজন। আর তাঁর ওই ‘হাই ক্যাচ’-এর গল্প নিশ্চয়ই শুনেছেন?

প্রশ্ন : হ্যাঁ, ক্যাচ প্র্যাকটিসের জন্য ব্যাট দিয়ে অনেক উঁচুতে বল পাঠাতেন।

ইমরান : ঠিক তাই। এত ওপরে উঠে যেত যে, অনেক সময় বলই আর দেখতে পেতাম না। মেশিন দিয়েও এত ওপরে বল ওঠানো সম্ভব না। আর সেই ক্যাচ যাঁরা ঠিকঠাক অনুশীলন করত, মাঠে আর ক্যাচ মিস হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আলতাফ ভাইয়ের কাছে আমার ঋণের শেষ নেই। আগে আমি অফ স্পিনের পাশাপাশি ব্যাটিং করতাম। আলতাফ ভাই আমাকে অফ স্পিনার থেকে পেসার বানিয়েছেন।

প্রশ্ন : কারা কারা ছিলেন ওই ক্যাম্পে, মনে আছে?

ইমরান : নেহাল, প্রিন্স, সুরু, আলী আহসান বাবু, আইয়ুব, শান্টু, দোলা, মঞ্জু—এমন অনেক ক্রিকেটার বেরিয়েছে আলতাফ ভাইয়ের ক্যাম্প থেকে। এ ছাড়া ১৯৭৮ সালে ব্রিটিশ কোচ স্টিভেন উইলকিনসনের অধীনে আমরা অনুশীলন করি। সেখান থেকে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলে পাই সুযোগ। এই দলটির বিদেশে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই সফরটি পরে আর হয়নি।

প্রশ্ন : আলতাফ ভাইয়ের ক্যাম্পে তো যোগ দেন প্রান্তিকে খেলার পর?

ইমরান : পরের বছরই। এরপর খেলি দ্বিতীয় বিভাগের আরেক দল লালবাগ ইউনিয়নে। আর ১৯৭৯ সালে প্রথম খেলি প্রথম বিভাগে; উদিতিতে। এরপর শান্তিনগর, গুলশান ইয়ুথ, সাধারণ বীমা, সূর্যতরুণের মতো অনেক ক্লাবে খেলেছি।

প্রশ্ন : ইয়াং পেগাসাসে খেলেননি কখনো?

ইমরান : না। আগেই বললাম না, আমাদের আর ওদের বেড়ে ওঠার সংস্কৃতি ছিল একেবারে আলাদা। আমাদের এদিকের খেলোয়াড় ওদিকে খেলত না, ওদের খেলোয়াড় আমাদের এদিকে না। আরেকটি ব্যাপার হলো, আমি যখন অন্য ক্লাবে ১৫ হাজার টাকায় হয়তো খেলছি, তখন ইয়াং পেগাসাসে বিনা পারিশ্রমিকে খেলতে হতো। এসব মিলিয়েই তাই যাওয়া হয়নি।

প্রশ্ন : ক্রিকেট কোচিং তো শুরু করেছেন খেলোয়াড়ি জীবন থেকেই। পাতিয়ালায় ওই কোর্স আসার পরপরই কি?

ইমরান : হ্যাঁ। এটি আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আব্বা সরকারি চাকরি থেকে অবসরে গেলেন ১৯৮৩ সালে। আজিমপুর কলোনির বাসাটি তাই ছেড়ে দিতে হবে। অথচ আমাদের জন্য ওই বাসায় থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আব্বার অফিসে আমি যদি ছোটখাটো চাকরি নিই, তাহলে তা থেকে যাবে। আমি তাতে রাজি নই একেবারে; কিন্তু কী করব, বুঝতে পারছিলাম না। তখন পাতিয়ালায় ওই কোর্সের খবর জানতে পারি। স্কলারশিপ নিয়ে ১০ মাসের জন্য দেশের বাইরে চলে যেতে পারছি—এ কারণে সরকারি চাকরিতে ঢুকতে হয়নি।

প্রশ্ন : পাতিয়ালায় ওই ব্যাচে অন্যান্য খেলায় আর কারা ছিলেন?

ইমরান : ফুটবলে গোবিন্দদা ও জসিম উদ্দিন, অ্যাথলেটিকসে কিতাব আলী ভাই ও শামীমা সাত্তার মিমু, সাঁতারে মোখলেস ভাই, জিমন্যাস্টিকসে দীপু ভাই, কাউসার ভাই ও ইকবাল ভাই।

প্রশ্ন : কোচ হিসেবে প্রথম দল কোনটি?

ইমরান : পাতিয়ালা থেকে দেশে ফিরি ১৯৮৪ সালে। গুলশান ইয়ুথের কোচ কাম খেলোয়াড় এবং অগ্রণী ব্যাংকেরও কোচ। অর্থাৎ দুটি দলের দায়িত্ব আমার ওপর।

প্রশ্ন : পারিশ্রমিক?

ইমরান : (হাসি) অগ্রণী ব্যাংকে চুক্তি পাঁচ হাজার টাকার। কিন্তু প্রথম মৌসুমে পাই পাঁচ শ টাকা। আর গুলশান ইয়ুথে চুক্তি ২২ হাজার; ক্রিকেটার হিসেবে ১৫ হাজার এবং কোচ হিসেবে ৭ হাজার। পুরোটা যে পাইনি, তা নিশ্চয়ই আর বলতে হবে না!

প্রশ্ন : সরকারি চাকরি তো ফাঁকি দিতে পেরেছেন পাতিয়ালায় গিয়ে। ফেরার পর যে চা বাগানের চাকরি হয় আপনার ও নাজমুল আবেদীন ফাহিমের; ওই গল্পটি একটু যদি বলেন?

ইমরান : এটি আরেকটু পরে, ১৯৮৭-র শুরুর দিকের ঘটনা। আমি তখন গুলশান ইয়ুথের কোচ। আর খেলোয়াড় সাধারণ বীমার। সে ক্লাবের কোচ জালাল ভাই। উনি একদিন বললেন, ‘তোমার তো গ্র্যাজুয়েশন আছে। জেমস ফিনলে চা বাগানের অ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজার হিসেবে দুই-তিনজন ক্রিকেটার নেবে। করবে নাকি?’ ইন্টারভিউ দিতে গেলাম আমি, ফাহিম ও শ্যামল। আমার আর ফাহিমের চাকরি হয়ে গেল। ওরা বেশ কিছু কাগজপত্র দিল; ফরম ফিলাপের মতো করে তা পূরণ করে দিতে। আমি ঢাকা ফেরার পর কেবলই মনে হতে লাগল, ‘আমি পাতিয়ালায় কোচিং ডিগ্রি নিয়ে এসেছি; এখন ঢাকা লিগে ক্রিকেট খেলছি, কোচিং করাচ্ছি—কেবল ভালো বেতনের জন্য এসব ছেড়ে যাব?’

প্রশ্ন : গেলেন না!

ইমরান : না। তখনকার দিনে এই চাকরিতে না যাওয়া বিরাট ঘটনা। ক্রিকেট খেলে বছরে পাই ১২-১৫ হাজার টাকা। আর জেমস ফিনলের চাকরিতে মাসিক বেতন সাড়ে তিন হাজার টাকা। সঙ্গে থাকার বাংলো, চাকর-বাকর, মোটরসাইকেল এবং বছরে একবার ইউরোপ-আমেরিকা সফর। আমি এই চাকরি করব না সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বাসায় তাই আগুন লেগে গেল। আর্মিতে থাকা বড় ভাই বললেন, ‘এই চাকরি আমাকে দে; আমি করব। আর তুই কিনা করবি না!’ এর কয়েক মাস পর বিকেএসপির চাকরিতে মুখরক্ষা কোনোমতে।

প্রশ্ন : সেখানে বেতন?

ইমরান : ১৬৫০ টাকা। জেমস ফিনলের চাকরির সঙ্গে তুলনা হয় না। তবে ভালোবাসার ক্রিকেটের সঙ্গে তো থাকতে পেরেছি। আমি না গেলেও ফাহিম চা বাগানের ওই চাকরি করে বেশ কিছুদিন।

প্রশ্ন : বিকেএসপিতে যাওয়ার সুযোগ হয় কিভাবে?

ইমরান : পুরান ঢাকার ইস্কান্দার ভাইয়ের কাছ থেকে বিকেএসপির খবর পাই। উনি ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি সেক্রেটারি রশিদ সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে বললেন। তার আগে ক্রিকেটার রকিবুল ভাইয়ের সঙ্গে। রকিবুল ভাইকে বলি, ‘সাভারে গিয়ে চাকরি করব কিভাবে?’ উনি বলেন, ‘আরে যাও, গিয়ে দেখো ভালো লাগে কিনা।’ আমার এমনই ভালো লাগল যে, পারলে আর ঢাকায়ই আসি না। ক্রিকেট মৌসুমে কেবল দিনে এসে খেলে যাই লালমাটিয়ার হয়ে।

প্রশ্ন : পরে তো বিকেএসপিতে নাজমুল আবেদীন ফাহিমকেও নিয়ে যান?

ইমরান : হ্যাঁ। গুলশান ইয়ুথের কোচিং করাতে মাঠে গিয়ে দেখি, বেঞ্চে ফাহিম বসে আছে। ওকে জিজ্ঞেস করি, ‘তুমি এখানে কী করো?’ ও বলে, ‘চা বাগানের চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। এখন বেকার।’ এরপর ওকে নিয়ে নিই বিকেএসপির ক্রিকেট কোচিংয়ে।

প্রশ্ন : ফুটবলের জোয়ারের সময় বিকেএসপিতে ক্রিকেট কোচিং নিশ্চয় কঠিন ছিল?

ইমরান : কিছুটা কঠিন তো বটেই। দুই ফুটবল মাঠের মাঝের জায়গায় পিচ বানিয়ে অনুশীলন করাতাম। তবে ছাত্র-শিক্ষক আমাদের সবার আন্তরিকতা ছিল। যে কারণে অনেক কষ্ট গায়ে মাখিনি।

প্রশ্ন : বিকেএসপির ছাত্রদের মুখে শুনেছি, গিটার বাজিয়ে ভালো গান গাইতেন আপনি...

ইমরান : আরে নাহ্, ভালো আর কি! সন্ধ্যার পর ওখানে কোনো কাজ নেই তো। সবাই মিলে আড্ডা মারতাম। ফাহিম ভালো গিটার বাজাত; ওর কাছ থেকে আমি শিখে নিই। এরপর চলত গান।

প্রশ্ন : আড্ডার সবচেয়ে জমজমাট গান ছিল কোনটি?

ইমরান : আবার এলো যে সন্ধ্যা, ওই দূর পাহাড়ের ধারে—এমন কিছু গান।

প্রশ্ন : বিকেএসপি দল নিয়ে ঢাকা লিগেও তো খেলেছেন কোচ কাম খেলোয়াড় হিসেবে। সে গল্পটি একটু যদি বলেন?

ইমরান : ১৯৯০ সালে বিকেএসপি দল নিয়ে যাই বম্বেতে। এর আগের বছর আমি লালমাটিয়া ছাড়ি। সেবার জুডোর ব্ল্যাক বেল্ট সাব্বির তখন উদিতির ম্যানেজার; আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ও বলে, ‘তুই খেলে দে দোস্ত’। আমি বলি, ‘আমি একা খেলে হবে নাকি? দল তো করতে হবে। আমি বিকেএসপির টেন-ইলেভেনে পড়ে, এমন ছেলেদের আনব। তোদের গত বছরের দল থেকে ভালো কয়েকজনকে রেখে দে।’ তাই হলো। দুর্জয়, রোকন, রাহুল, শিপন, সাজিদ, টিপুসহ সাতজনকে নিই বিকেএসপি থেকে। ওদের পুরনো তিন খেলোয়াড়কে রাখি। আমি তো আছিই, আর সঙ্গে নিই ফাহিমকে। এই মোট ১২ জন। আরো দু-একজন থাকলেও একাদশ এদের মধ্য থেকেই। সেবার প্রথম বিভাগ থেকে আমরা সম্ভবত রানার্স-আপ হয়ে প্রিমিয়ারে উঠি।

প্রশ্ন : যেহেতু এটি বলতে গেলে প্রায় আপনারই দল, সে দলের এমন সাফল্যের পরই কি দেশের ক্রিকেট পরিমণ্ডলে আপনার পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে?

ইমরান : এর একটি বড় ভূমিকা ছিল। আর প্রিমিয়ারে উঠেও আমরা খুব ভালো খেলি। কোনো সিনিয়র ছাড়া, কোনো বিদেশি ছাড়া লিগের পাঁচ ম্যাচ জিতে যাই। সবাই জানত যে, এটি মোটামুটি আমারই দল। যেখানে আমার বিকেএসপির অনেকগুলো ভালো ভালো ক্রিকেটার রয়েছে; ওরাও তো আমার হাতে তৈরি। এসব মিলিয়েই তাই বিশেষত কোচ হিসেবে পরিচিতি পাই। কিন্তু দুই বছর পর দলটি ভেঙে যায়।

প্রশ্ন : কেন?

ইমরান : অনেকে অন্যান্য দলে চলে যায়। এখানে বড় একটা ঝামেলা হয় রকিবুল ভাইয়ের সঙ্গে। উনি একদিন মাঠে এসে খুব হইচই করেন তাঁর ছেলে সাজিদকে নিয়ে। বলেন, ‘সাজিদকে তোমরা মাত্র ১২ হাজার টাকা দিচ্ছ। ওর তো আরো অনেক বেশি টাকা পাওয়া উচিত। আমি ওকে নিয়ে যাব।’ আমি বলেছি, ‘নিয়ে যান। কারণ উদিতির টাকা-পয়সার টানাটানি আছে। এর চেয়ে বেশি কিভাবে দেবে?’ এর জের ধরে আমাদের আরেক কোচ মুনীর সাজিদকে টিমবাস থেকে নামিয়ে দেয়। ঘটনা অনেক দূর গড়ায়। বিকেএসপি থেকে মুনীরের চাকরিও যায়। ওর শিক্ষাগত যোগ্যতায় কিছু ঘাটতি ছিল, সেটিকে সামনে এনে চলে যায় চাকরি। সব মিলিয়েই আমি আর পরের বছর উদিতির সঙ্গে থাকিনি।

প্রশ্ন : কোথায় গেলেন?

ইমরান : সূর্যতরুণে। বিকেএসপির সব বাচ্চা বাচ্চা ছেলেদের নিই দলে। এখন যে ক্রীড়া সাংবাদিকতা করে আতিফ আজম, ওকেও সূর্যতরুণে নিয়েছিলাম। ওর হাতের পাঞ্জা দেখবেন, এত্ত বড়। দারুণ উইকেটরক্ষক ছিল আর সাহসী ব্যাটসম্যান।

প্রশ্ন : ছাত্রদের নিয়ে যে শিক্ষক হয়েও একই দলে খেলতেন—কোনো সমস্যা হতো না?

ইমরান : না, ওদের নিয়ে সমস্যা হয়নি কখনো। তবে দর্শকদের নিয়ে হয়েছে। শেষ দিকে আমার ফর্ম তো ভালো ছিল না। মনে আছে, সিটি ক্লাব মাঠের এক ম্যাচে শূন্য রানে আউট হয়ে ফিরছি। ক্রিজে যাচ্ছিল রোকন; ও তখন মনে হয় নাইন বা টেনে পড়ে। ওকে বলি, ‘তুমি মারবে না, ধরে খেলবে।’ কিন্তু রোকন শুধু ছক্কা মারতে চাইত। মারতে গিয়ে মিড অফে ক্যাচ দিয়ে আউট। ফেরার পর ওকে বকা দিয়ে বলি, ‘অ্যাই, তোমাকে না বলেছি মেরে খেলবে না। এটা কী করলে?’ সিটি ক্লাব তো খোলা মাঠ; পাশ থেকে লুঙ্গি পরা এক দর্শক বলে উঠল, ‘ওরে যে বকেন, আপনে করছেনডা কী! আপনিও শূন্য মারছেন, ও-ও শূন্য।’ এরপর আমার আর বলার কী থাকে!

প্রশ্ন : ওই শূন্যর পাশাপাশি সেরা কয়েকটি পারফরম্যান্সের কথা যদি একটু বলেন?

ইমরান : ঢাকা মাঠে আমি তিনবার ৮ উইকেট পেয়েছি। এক দিনের ম্যাচে এই রেকর্ড আর কারো আছে কি না, আমি জানি না। দ্বিতীয় বিভাগে গুলশান ইয়ুথের হয়ে ইস্ট এন্ডের বিপক্ষে; প্রথম বিভাগে গুলশান ইয়ুথের হয়ে শান্তিনগরের বিপক্ষে এবং উদিতির হয়ে সাধারণ বীমার বিপক্ষে নিই ৮ উইকেট। আরো দুটি ম্যাচের কথা মনে আছে। পাতিয়ালায় কোচিং কোর্সের ফাঁকে এসে গুলশান ইয়ুথের পক্ষে কয়েকটি ম্যাচ খেলেছি। এক ম্যাচের শেষ দুই বলে চার এবং ছক্কা মারি। শেষ বলের ছক্কাটি ছিল ৭৯ বিশ্বকাপ ফাইনালে ভিভ রিচার্ডসের হেঁটে এসে ফ্লিক করে মারা ছয়ের মতো। প্রতিপক্ষ দলের দাড়িওয়ালা উইকেটরক্ষক হাঁ করে তাকিয়ে ছিল। এই দাড়িওয়ালা ছেলেটিই নাজমুল আবেদীন ফাহিম; ওর সঙ্গে সেদিনই পরিচয়। আরেকবার সাধারণ বীমার হয়ে মোহামেডানের বিপক্ষে ম্যাচ। দামাল সামারে পর পর দুই বলে আউট করি নেহাল ও রকিবুল ভাইকে। লিগেও দুই দলের দেখা। এবারও নেহালকে আউট করার পর ক্রিজে আসেন রকিবুল ভাই। অনেক সময় নিয়ে গার্ড নিলেন। আগের বলে যেহেতু আউটসুইং করেছি, এবার জোরের ওপর করলাম অফ কাটার। রকিবুল ভাই ছেড়ে দিলেন, বোল্ড! উইকেট ছেড়ে চলে যেতে যেতে গজরাচ্ছিলেন, ‘ওই মিয়া, মাজারে থাকো নাকি? দোয়া-দুরুদ পইরা বল করছ নাকি? তুমি রকিবুলকে বোল্ড কইরা দিলা!’ খুব মজা পেয়েছিলাম সেদিন।

প্রশ্ন : আপনার ক্রিকেটার ক্যারিয়ার কত দিনের?

ইমরান : ১৯৭৭ ও ৭৮ সালে খেলেছি দ্বিতীয় বিভাগে। এরপর ১৯৯৭ পর্যন্ত প্রিমিয়ার ও প্রথম বিভাগের দলে।

প্রশ্ন : মোহামেডান কিংবা আবাহনীতে কখনো খেলেননি?

ইমরান : না।

প্রশ্ন : কেন?

ইমরান : ক্রিকেটার হিসেবে অতটা সিরিয়াস ছিলাম না। কখনো মনে হয়নি যে আবাহনী-মোহামেডানে খেলতে হবে। কিংবা কখনো মনে হয়নি, জাতীয় দলে খেলতেই হবে। খেলাটি উপভোগ করতাম, তাই খেলতাম। খুব কঠোর পরিশ্রমও করতাম না।

প্রশ্ন : সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পেয়েছেন কত?

ইমরান : মৌসুম হিসাব করলে ৮০ হাজার। তবে ১৯৮২-৮৩ মৌসুমের কথা বলতে পারি। সেবার রফিক ভাই ১৭ হাজার টাকায় যান আবাহনীতে; আর আমি ১৪ হাজারে শান্তিনগরে। আর কোচ হিসেবে নব্বইয়ের পরের দিকে ৫০-৬০ হাজার টাকা করে পাচ্ছিলাম। ১৯৯৬ সালে আবাহনী কোচ করে নিয়ে গেল একেবারে দুই লাখ টাকায়।

প্রশ্ন : সেবার আবাহনীর পারফরম্যান্স কেমন ছিল?

ইমরান : লিগ, দামাল সামার ও রিপোর্টার্স কাপ তিন প্রতিযোগিতাতেই চ্যাম্পিয়ন। পরের বছরও লিগ চ্যাম্পিয়ন হই। বাকি দুই টুর্নামেন্টের মধ্যে একটিতে। তৃতীয় বছরে লিগ না জিতলেও জিতি বাকি দুই টুর্নামেন্ট। বড় দল আবাহনীতে যোগ দিয়েই এমন সাফল্য কোচ হিসেবে আমার পায়ের নিচের মাটি শক্ত করে দেয়। এর আগে তো ছোটদের দল নিয়ে সাফল্য পেয়েছিই। সারা দেশের আন্ত স্কুলে যেমন চ্যাম্পিয়ন করিয়েছি বিকেএসপিকে। ১৯৯১ সালে আমি স্কলাস্টিকায় যোগ দিই। সাপ্তাহিক বন্ধের দুদিন শুক্র ও শনিবার ওখানে কোচিং করাতাম। তাতে বেতন পেতাম প্রায় ১০ হাজার টাকা; বিকেএসপির বেতনের চার গুণ। স্কলাস্টিকাকেও পর পর তিনবার আন্ত স্কুলে চ্যাম্পিয়ন করাই আমি।

প্রশ্ন : ঢাকা ক্লাব ক্রিকেটে কর্মকর্তা বা সমর্থকদের রোষানলে পড়েননি কখনো?

ইমরান : নাহ। একটি ঘটনা শুধু মনে পড়ছে। ২০০৯-১০ সালের দিকে। আমি তখন আবাহনীর কোচ, সাকিব অধিনায়ক। ফতুল্লায় ম্যাচ জিতলাম, এখন শেষ ম্যাচে আবাহনী-মোহামেডানের মধ্যে যারা জিতবে তারাই চ্যাম্পিয়ন। ফতুল্লার ম্যাচ শেষে সাকিব মাঠে দাঁড়িয়ে আমাকে হাসতে হাসতে বলল, ‘স্যার, ক্লাব পুরো টাকা দেয়নি এখনো। টাকা না পেলে মোহামেডানের বিপক্ষে ম্যাচ কিন্তু ছেড়ে দেব!’ আশেপাশে অনেক সমর্থক ছিলেন; তারা শুনেছেন। শেষ ম্যাচের শেষ বলে মোহামেডানের পাইলট চার মেরে দলকে জিতিয়ে দেয়। এরপর সমর্থকরা এসে ধরে আমাকে, ‘সাকিব কয় নাইক্কা ম্যাচ ছাইড়া দিব। আপনি ওরে খেলাইছেন, ও-ই তো আবাহনীকে এই ম্যাচে হারাইছে।’ কোচ হিসেবে আরেকটি ভয়ংকর ব্যাপার দেখছি ইদানীং। গত দুই-তিন বছর গুলশান ইয়ুথের হয়ে দ্বিতীয় বিভাগে ছিলাম। ওখানকার আম্পায়ারিং যাচ্ছেতাই। আম্পায়ার মাঠে এসে ঘোষণা দেয়, আজ ১২টার মধ্যে খেলা শেষ করতে হবে। আমি ওদের জিজ্ঞেস করেছি, ‘তোমরা ওপরের নির্দেশ মেনে এসব করো কেন? চাকরি কেন ছেড়ে দাও না?’ ওরা উল্টো প্রশ্ন করেছে, ‘তাহলে আপনি কি আমার বউ-বাচ্চাকে খাওয়াবেন?’ এর উত্তর নেই।

প্রশ্ন : জাতীয় দলের কোচ হিসেবে আপনার শুরু তো ২০০০ সালের এশিয়া কাপে?

ইমরান : হ্যাঁ, এর আগে ১৯৯০ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ দলে সহকারী কোচ ছিলাম। আর ২০০০ সালে আবাহনী পর পর ১৩ ম্যাচ জিতে লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আমাকে জাতীয় দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় এশিয়া কাপের জন্য। ওখানে আমরা খারাপ খেলিনি। এরপর কেনিয়ায় নকআউট বিশ্বকাপ ও দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যাবে বাংলাদেশ। আমি ও দীপু রায় তখন থাকতাম জাতীয় দলের সঙ্গে। ওই সফরে কোচ হওয়ার দৌড়ে আমি পিছিয়ে ছিলাম। কারণ ফিজিও গ্যাভিন যে নিজের সিদ্ধান্তে দল খেলাত, তা মানতাম না। আমার পক্ষে ছিলেন কেবল সাংবাদিকরা। ঠিকই আমাকে কোচ নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর প্রথম টেস্টের আগেও একই ঘটনা। এবার দীপু চৌধুরী এগিয়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাকেই দেওয়া হয় দায়িত্ব।

প্রশ্ন : এর পরও বিভিন্ন সময়ে ছিলেন জাতীয় দলের সঙ্গে...

ইমরান : ২০০৩ বিশ্বকাপের পর দায়িত্ব পাই আবার। ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ত্রিদেশীয় সিরিজ ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের জন্য। পরে ২০০৭ সালে জাতীয় দলের বোলিং কোচ হই, ২০০৮-এর শেষ পর্যন্ত ছিলাম। ২০১০ সালে আবার বোলিং কোচ হই। ২০১০ এশিয়ান গেমসে কোচ হিসেবে জিতি স্বর্ণপদক। ২০১৪ সালে ভারতের বিপক্ষে তিন ওয়ানডের সিরিজে জাতীয় দলের অন্তবর্তীকালীন কোচ হই আবার।

প্রশ্ন : বারবার দায়িত্ব পেয়েছেন স্বল্প সময়ের জন্য। দীর্ঘ মেয়াদে জাতীয় দলের কোচ হওয়ার স্বপ্ন দেখেন না?

ইমরান : এখন আর দেখি না। স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দিয়েছি। কারণ দেশের কোচদের কোনো রকম মূল্যায়নই করা হয় না। আমি তো বাস্তবতা বুঝি। জাতীয় দলকে নিয়ে না ভেবে তাই আগামী দিনের ক্রিকেটার তৈরির স্বপ্নই দেখি।

প্রশ্ন : আপনার ২০ বছরের খেলোয়াড়ি জীবনে যাঁদের সঙ্গে বা বিপক্ষে খেলেছেন, তাঁদের মধ্যে সেরা ব্যাটসম্যান, সেরা বোলার কে?

ইমরান : ব্যাটসম্যান হিসেবে নেহাল হাসনাইন সেরা। ইউসুফ বাবুও খুব ভালো। বোলারদের মধ্যে বাদশা ভাই, মাসুদ ভাই।

প্রশ্ন : আর কোচিং ক্যারিয়ারের সেরা ব্যাটসম্যান, সেরা বোলার?

ইমরান : ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের একজনের কথা খুব মনে আছে—সাজ্জাদ আহমেদ শিপন। জাতীয় দলে অল্প সময় খেলেছে কিন্তু টেকনিকের দিক দিয়ে ওকে মনে হয়েছে সেরা ব্যাটসম্যান। এরপর সুমন, নান্নু, আকরাম, দুর্জয়, রোকনরা দুর্দান্ত। এই প্রজন্মে লিটন দাশ, বিজয় (এনামুল হক), মমিনুল, তামিম, সাকিব, সৌম্য—অনেক নাম। আর বোলারদের মধ্যে অনেকেই তো বেরিয়েছে আমার হাত দিয়ে। শিপনের মতো শুরুর দিকের আরেক বোলারের কথা বলতে পারি—সজল চৌধুরী। এ প্রজন্মের মধ্যে রুবেল, মুস্তাফিজ, তাসকিন, সুহাস (শফিউল) অনেকেই ভালো।

প্রশ্ন : কোচিং ক্যারিয়ারে সবচেয়ে প্রতিভাবান ক্রিকেটার কাকে মনে হয়েছে?

ইমরান : বোলারদের মধ্যে সজল ও রুবেল। আর ব্যাটসম্যানদের মধ্যে শিপন, দুর্জয়।

প্রশ্ন : আর অপচিত প্রতিভা, যাঁর আরো অনেক কিছু করার সামর্থ্য ছিল কিন্তু পারেননি?

ইমরান : একটাই নাম মেহরাব হোসেন অপি। কী অবিশ্বাস্য ব্যাটসম্যান যে ও ছিল! শুধু খামখেয়ালির কারণে আরো বড় কিছু করতে পারেনি। আর ওকে সামলানোও কঠিন ছিল। কারণ খুব মিথ্যা কথা বলত।

প্রশ্ন : একটু ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে জানতে চাই। বিয়ে করেছেন কবে?

ইমরান : ১৯৯৬ সালে। স্ত্রীর নাম সৈয়দা আম্বারিন বেগম। সাড়ে ১০ বছর চাকরি করার পর বিকেএসপি ছেড়েছি ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে। ওখানকার ডিজির কর্মকাণ্ড পছন্দ হচ্ছিল না। এরপর বিসিবির অধীনে ছিলাম, জাতীয় দলেও। আর ক্লাব ক্রিকেটেও কোচিং করাচ্ছি। পাশাপাশি আমার স্পোর্টস গুডসের দোকান রয়েছে এলিফ্যান্ট রোড ও ধানমণ্ডিতে।

প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। ক্যারিয়ার নিয়ে, জীবন নিয়ে আপনার তৃপ্তি কতটা?

ইমরান : আমি মোটামুটি তৃপ্ত। বলতে পারেন, ১০০-র মধ্যে ৭০ ভাগ তৃপ্ত। একটাই আক্ষেপ—আমার কোনো মাঠ নেই। যদি নিজস্ব একটি মাঠের বন্দোবস্ত থাকত, তাহলে সেখানে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেদের কোচিং করিয়ে তৈরি করতে পারতাম! মাঠ না থাকার কষ্টটা আমার অনেক দিনের। এর বাইরে ক্যারিয়ার নিয়ে, জীবন নিয়ে আমি তৃপ্তই।



মন্তব্য