kalerkantho


ডাউন দ্য উইকেট

বিপিএল সমাচার

সাইদুজ্জামান

১৭ মে, ২০১৮ ০০:০০



বিপিএল সমাচার

ক্রিকেট এখন আর নিছকই খেলা নয়, পণ্যও। টিভি সম্প্রচার স্বত্ব এখন সব দেশের বোর্ডেরই উপার্জনের সবচেয়ে বড় খাত। তবে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক ঘরোয়া আসরও এখন সবার ঘরের লক্ষ্মী! বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বেলায় বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগই (বিপিএল) সবচেয়ে অর্থকরী। ঘরের মাঠে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সম্প্রচারের ছয় বছরের ‘রাইট’ বিক্রি বাবদ বিসিবির পাওয়ার কথা দুই কোটি ডলার। সেখানে তিন বছরের জন্য বিপিএল সম্প্রচারের মূল্য আট কোটি ডলার! নিয়ম করে বিপিএল আয়োজনে বিসিবির আগ্রহের পেছনে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। টি-টোয়েন্টির এই ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট মৌসুম এলেই উপচে পড়ে খেলোয়াড় এবং ক্রিকেট কর্তাদের উচ্ছ্বাস।

কিন্তু পরের বিপিএল কি আদৌ পূর্বনির্ধারিত সময়ে হবে? বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের বক্তব্য, জাতীয় নির্বাচনের ডামাডোলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে পিছিয়ে নেওয়া হবে আসরটি। তবে বিপিএল ‘ইনসাইডার’ সূত্র বলছে, জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে আগে চড়া দামে দল গড়ার ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না একাধিক ফ্র্যাঞ্চাইজি। এ দেশীয় সংস্কৃতিতে যা অবাস্তবও নয়। জাতীয় নির্বাচন এলেই কেমন যেন হাত-পা গুটিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নিস্তরঙ্গ সময় কাটান ব্যবসায়ীরা। বিপিএলের সবগুলো ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকই এ দেশীয় ব্যবসায়ী সমাজের প্রতিনিধি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ তাঁদের বেলাতেও প্রযোজ্য।

যাহোক, কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজির পক্ষ থেকে সরকারিভাবে এ জাতীয় ঘোষণা আসেনি। তাই বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের ভাষ্যই শিরোধার্য! সরকারি নিরাপত্তা বাহিনী পর্যাপ্ত জনবল সরবরাহ দিতে না পারলে অক্টোবর থেকে পিছিয়ে বিপিএলের ষষ্ঠ আসর অনুষ্ঠিত হবে জানুয়ারিতে। গত দুই দিনে দেখছি, পরিবর্তিত সময়ের ওপরও প্রশ্নবোধক চিহ্ন ঝুলিয়ে দিয়েছে সংবাদমাধ্যম। যদিও এ নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করছে না বিসিবি কিংবা বিপিএল কমিটি।

বিপিএলের প্রাথমিক ব্যর্থতাটা এখানেই। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট শুধু বাংলাদেশেই হয় না, শুরু ভারতে। শ্রীলঙ্কা ধূমকেতুর মতো এসে হারিয়ে গেছে। তবে অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পাকিস্তানে বিষয়টি নিয়মিত হয়ে গেছে। এবং প্রতিটি দেশের বোর্ডই বছরের নির্দিষ্ট একটি সময়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট আয়োজন করে থাকে। ২০০৮ সালে শুরুর পর থেকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) চলে এপ্রিল-মে পর্যন্ত। অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে মাঠ কাঁপায়। ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ মাঠে গড়ায় আগস্টে। পাকিস্তানও পিএসএলের জন্য সময় বের করে নিয়েছে, ফেব্রুয়ারি-মার্চে। সেখানে প্রায় প্রতিবছরই বিপিএলের ভাগ্য নির্ভর করে বিবিধ পরিস্থিতির ওপর। নভেম্বর-ডিসেম্বরকে টার্গেট করলেও ফেব্রুয়ারিতেও টুর্নামেন্টটি আয়োজনের অতীত রয়েছে। এবারের অক্টোবরের আসর কবে বসে, তা নিয়ে সন্দেহের অন্যতম কারণ এটাই।

বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল, সর্বোপরি বিসিবির ওপর অনাস্থা আছে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোরও। বিপিএলই একমাত্র আসর, যেখানে শুধু অর্থ ঢেলেই যেতে হয় দলগুলোকে। এক কোটি টাকায় দল কেনার পর নামি ফ্র্যাঞ্চাইজিরা আরো ২০ কোটিতে দল ঢেলে সাজায়। এরপর দলীয় সদস্যদের হোটেল, ভ্রমণ ও দৈনিক ভাতা তো রয়েছেই। দলের সাফল্যে খেলোয়াড়দের বোনাসও দেয় কোনো কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি। সব মিলিয়ে শীর্ষ সারির একটি ফ্র্যাঞ্চাইজির এক মৌসুমে খরচ অন্যূন ২৫ কোটি। বিনিময়ে তারা কী পান? চ্যাম্পিয়ন দলের ভাগ্যে জোটে ছয় কোটি। ধাপে ধাপে কমে বাকি তিন সেমিফাইনালিস্ট দলের মাঝে বণ্টন হয় আরো প্রায় সাড়ে ছয় কোটি টাকা। তার মানে টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন দলেরও এক মৌসুমে ‘নিট লস’ ১৯ কোটি টাকা প্রায়। বাংলাদেশ তো বটেই, বিশ্বের আর কোথাও জেনেবুঝে নিশ্চিত আর্থিক ক্ষতির কথা জেনেও বিনিয়োগের এমন প্রবণতা নেই।

তাহলে কি নিছকই ক্রিকেটপ্রেমে গুচ্ছের অর্থ ব্যয়ে দল কিনছেন এ দেশীয় ব্যবসায়ীরা? আপাতদৃষ্টিতে তেমনটাই মনে হতে পারে। তবে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের কাছে অর্জিত আয়ের অংশ দাবি করে আসছে, যে দাবি মোটেও অযৌক্তিক নয়। আইপিএলে প্রতি মৌসুমের লভ্যাংশের ৬০ শতাংশ সমান হারে বণ্টন করা হয় ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোকে। সঙ্গে প্রাইজমানি তো রয়েছেই। শুধু আইপিএল কিংবা ক্রিকেট কেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষ ক্লাব ফুটবল, বাস্কেটবলসহ অন্য খেলাতেও একই চর্চা রয়েছে। যে দলগুলোকে দেখিয়ে তুমি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা উপার্জন করছ, তো তাদের লাভের অংশ দেবে না কেন? ওহ, বলা হয়নি। এ মৌসুমে আইপিএল থেকে ভারতীয় বোর্ডের সম্ভাব্য আয় নির্ধারিত হয়েছে দুই হাজার কোটি রুপি। এর ৬০ শতাংশ যাবে টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী আটটি দলের অ্যাকাউন্টে। অত না হোক, টিভি সম্প্রচার স্বত্ব থেকেই ফিবছর আড়াই কোটিরও বেশি ডলার আয় হওয়ার কথা বিসিবির। অবশ্য শেষমেশ কত আয় হয়েছে, গত আসরের সে হিসাব এখনো দেওয়াই হয়নি বিসিবির পক্ষ থেকে। এ দেশের ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা অত পরোয়া-টরোয়া করে না কাউকে, হয়তো!

আরো অব্যবস্থাপনা রয়েছে বিপিএলে। শুরুর দুই আসরে দেশি-বিদেশি ক্রিকেটারদের পাওনা নিয়ে বিশ্ব-ক্রিকেটে বিস্তর দুর্নাম হয়েছে বাংলাদেশের। আয়ের চেয়ে ব্যয়ের সংগতি কমাতে গিয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকের স্পট ফিক্সিংকে ‘প্রোমোট’ করার ঘটনাও ঘটেছে। বাইলজ নিয়েও কম কাণ্ড হয়নি। গতবার একটি ম্যাচের ঘটনাচক্রে মনে হচ্ছিল, টুর্নামেন্টের বাইলজ সম্পর্কে ফ্র্যাঞ্চাইজি, ম্যাচ অফিশিয়াল থেকে শুরু করে বিপিএল কমিটিও যথাযথ অবগত নয়! উপরন্তু বিদেশি খেলোয়াড়ের সংখ্যা প্রায় প্রতিবছরই অদলবদল হচ্ছে। কথিত আছে, শেষ মুহূর্তে এই কারসাজি হয় বিশেষ কোনো দলের স্বার্থে।

এবং এটাই বিপিএলের অগ্রযাত্রার পথে প্রধান বাধা। বিপিএলের দলগুলোর ওপর চোখ বোলালেই স্পষ্ট যে, এতে বিসিবির ‘এ’, ‘বি’ আর ‘সি’ টিম রয়েছে। তো, এদের দাপটে বাকিরা বাংলাদেশি অ্যাথলেটদের অলিম্পিক অভিজ্ঞতার মতো অংশগ্রহণ করতে পেরেই মুখ বুজে থাকেন। তাই খেলোয়াড়দের পাওনা পরিশোধ ও ব্যবস্থাপনায় যথেষ্ট উন্নতি হলেও বিদেশি ক্রিকেটাররা বিপিএলের চেয়ে অন্য কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে অংশগ্রহণে বেশি আগ্রহী। দেশের জাতীয় একটি দৈনিকে দেওয়া সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে সাকিব আল হাসানের মন্তব্যে তেমন ইঙ্গিত রয়েছেও। আইপিএলের আড্ডায় বিগ ব্যাশ, সিপিএল, পিএসএল উচ্চারিত হলেও বিপিএল একেবারেই অনুপস্থিত!

এবং এটাই বাস্তবতা। কর্তাব্যক্তিরা যতই বিপিএলের ‘টিআরপি’ নিয়ে হল্লাগোল্লা করুন না কেন, তাঁদের ফ্র্যাঞ্চাইজি আসরটির আবেদন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের মাঝে অতটা নেই।

নেই উপরোল্লিখিত প্রতিবন্ধকতার কারণে। যার সহজ সমাধানও রয়েছে।

১. অর্জিত আয়ের অংশ পেলে ফ্রাঞ্চাইজিগুলো উৎসাহিত হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির হাত থেকে মুক্তি পাবে।

২. আরো দীর্ঘ মেয়াদে ফ্র্যাঞ্চাইজি রাইট বিক্রি করলে ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বিনিয়োগে উৎসাহী হবে।

৩. বিদেশি খেলোয়াড়ের সংখ্যা, রিটেইনারশিপ জাতীয় ইস্যুগুলো দীর্ঘ মেয়াদে স্থির করুন।

এবং ৪. কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট থেকে বিপিএলকে মুক্তি দিন। ফ্র্যাঞ্চাইজি হাতবদল না করলেও অন্তত একটি স্বাধীন ব্যবস্থাপনা/বিপণন প্রতিষ্ঠানের হাতে বিপিএল ছেড়ে দিয়ে প্রেসিডেন্ট বক্সে বসে খেলা দেখুন। দেখবেন, ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের বাজারে বিপিএলও উঁচু দামে বিকোবে।

এটা বোধগম্য যে, এ দেশীয় সংস্কৃতিতে বিপিএলের ‘উষ্ণতা’ থেকে দূরে থাকাটা কর্তাব্যক্তিদের জন্য বেদনাদায়ক হবে। তাঁরা সম্ভবত এভাবেই চালিয়ে যাবেন আর গলা উঁচিয়ে দাবি করবেন, আইপিএলের পরই বিপিএল—যা মোটেও সত্য নয়। এটাই সত্যি!


মন্তব্য