kalerkantho


সালাহ সম্মোহনে বিবশ রোমা

২৬ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



সালাহ সম্মোহনে বিবশ রোমা

কেউ তাঁকে বলছেন মিসরীয় সাম্রাজ্যের নতুন ফারাও, কেউ তাঁর হাতে দেখছেন ব্যালন ডি’অর। কারো চোখে তিনি লিওনেল মেসি আর ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর শ্রেষ্ঠত্বের বিতর্কে দ্বিধাবিভক্ত পৃথিবীতে নতুন এক অধ্যায়। সিরি ‘এ’তে খেলার সময় ইতালিয়ান মিডিয়া তাঁর নাম দিয়েছিল মিসরীয় মেসি। লিভারপুলে এই মৌসুমটা যেভাবে কাটছে মোহামেদ সালাহর, তাতে অন্যের নামে তাঁর পরিচিতি পাওয়ার দিন বুঝি ফুরাল। অ্যানফিল্ডে যেভাবে নিজে গোল করলেন এবং অন্যদের দিয়ে করালেন, তাতে উঠতি ফুটবলাররা যদি মেসি-রোনালদো না হয়ে সালাহ হতেও চান, তাতেও বিশেষ আপত্তি করবে না কেউ। সালাহ-ম্যাজিকে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালের প্রথম লেগে রোমাকে ৫-২ গোলে হারিয়েছে লিভারপুল। যদিও ৫-০ গোলে এগিয়ে থেকে সালাহকে ইয়ুর্গেন ক্লপ তুলে নেওয়ার পর দুটি গোল হজম করেছে অল রেডরা। প্রতিপক্ষের মাঠে দুটি গোল দিতে পারাতেই এখনো আশা ছাড়ছে না রোমা। কোয়ার্টার ফাইনালে বার্সেলোনার বিপক্ষে এই ৩ গোলের ব্যবধান ঘুচিয়েই তো তারা এসেছে সেমিফাইনালে!

সেমিফাইনালের ড্র হওয়ার আগেই রোমার ওয়েবসাইটে লিভারপুলের বিপক্ষে সেমিফাইনালের টিকিট বিক্রির ঘোষণা চলে আসার বিতর্ক চাপা পড়ে গেছে আগেই। অ্যানফিল্ডে ঢোকার পথে লিভারপুল সমর্থকদের ম্যানচেস্টার সিটির বাস ভাঙচুরের ঘটনার আঁচও কমে গিয়েছে। এবার উল্টো রোমার সমর্থকদের হাতে মার খেয়ে হাসপাতালে সংকটাপন্ন লিভারপুলের এক আইরিশ সমর্থক। হত্যাচেষ্টার অপরাধে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে দুই রোমা সমর্থককে, ক্লাবের পক্ষ থেকেও চাওয়া হয়েছে ক্ষমা। মাঠের বাইরে এমন যুদ্ধংদেহী রোমা অবশ্য ভেতরে ৮০ মিনিট ধরেই ছিল ভিজে বিড়াল হয়ে! সালাহর সঙ্গে সাদিও মানে আর রবার্তো ফিরমিনোর ত্রিফলা বারবার হানা দিয়েছে রোম সাম্রাজ্যের রক্ষণে। দিয়েছে ৫ গোল। যদিও সালাহকে তুলে নেওয়ার পর খানিকটা খেই হারানো লিভারপুলকে দুটি গোল দিয়েও এসেছে রোমা, তাতে করে অবশ্য সালাহর কৃতিত্ব কমে না একবিন্দুও। ম্যাচের ৩৫ মিনিটে, লিভারপুলের প্রথম গোলটায় সেই ত্রিফলার ধার। মাঝমাঠে আলগা বলটা প্রথমে ধরেন মানে, তাঁর কাছ থেকে বল ফিরমিনোর পায়ে। এগিয়ে যেতে যেতে আলতো করে পাঠিয়ে দিলেন সালাহর কাছে। নিখুঁত রিসিভের পর একটু জায়গা করে নিয়ে বাঁ পায়ে চিপ করলেন। বলটা গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে, ক্রসবার ছুঁয়ে পোস্ট ও ক্রসবারের সংযোগস্থলের নিখুঁত সমকোণটা দিয়ে ঢুকে পড়ল জালে! পরের গোলটা আরো নান্দনিক। তিনজনের জটলার মাঝে থ্রু বাড়িয়েছিলেন ফিরমিনো। ভিড়ের মাঝেও সেটা ধরে ফেললেন সালাহ, আগুয়ান গোলরক্ষকের শরীরের ওপর দিয়ে আলতো করে বলটা গড়িয়ে দিলেন। অলস বিড়ালের মতোই বলটা চলে গেল গোললাইনের ওপারে। এরপর মানে ও ফিরমিনোকে দিয়ে যে দুটি গোল করালেন, তার একটি অন্যটির কার্বন কপি! ডান দিকের ফাঁকা জমিন ধরে উঠে যাওয়া, বক্সের ভেতর ঢুকে গোলের ঠিকানা লেখা আড়াআড়ি পাসে বলটা গোলমুখের সামনে ঠেলে দেওয়া। তাতে একবার পা ছুঁইয়েছেন মানে, অন্যবার ফিরমিনো। এরপর কর্নার থেকে ফিরমিনো গোল করলে ম্যাচের ৬৮ মিনিটেই লিভারপুল ৫-০তে এগিয়ে। ২০১৪-র চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে, বায়ার্নের বিপক্ষে রিয়াল মাদ্রিদের ৪-০ গোলের জয়ের ম্যাচের পর এতটা একপেশে সেমিফাইনাল আর হয়নি। তার আগের বছর আবার বার্সেলোনাকে দুই লেগ মিলিয়ে ৭ গোল (৪+৩) দিয়েছিল বায়ার্ন, এদিকে লিভারপুল তো প্রথম লেগেই গোল দিয়েছে ৫ খানা!

৫ খানা গোল করে আনন্দে আটখানা হওয়াতেই বোধ হয় একটু ঢিল দিল অল রেডদের রক্ষণ। সেই সুযোগেই এডিন জেকো একটা গোল দিলেন ম্যাচের ৮১ মিনিটে। তাতেই ঝিমিয়ে পড়া রোমা যেন গা-ঝাড়া দিয়ে উঠল! টানা বেশ কিছু আক্রমণ চলল লিভারপুলের অর্ধে। নাইনগোলানের গোলমুখী শট বক্সের ভিতর মিলনারের হাতে লাগায় পেনাল্টি পেল রোমা, স্পটকিকে গোল করেন ডিয়েগো পেরোত্তি। পরের সময়টা সেই পেরোত্তির একটা শট গেছে গোলবার ঘেঁষে, জেকোর শট গেছে ওপর দিয়ে। অতিরিক্ত সময় দেওয়া হয়েছিল ৪ মিনিট, বলা যায় ৮১ মিনিটে জেকোর গোলের পর থেকে মিনিট পনেরো ছোটখাটো ঝড়ই বইয়ে দিয়েছিল রোমা। ৫ গোল হজমের দুঃখের সঙ্গে তাই প্রতিপক্ষের মাঠে দুটি গোল করার আনন্দও তাদের ফেরত যাত্রার সঙ্গী। স্তাদিও অলিম্পিকোতে ৯০ মিনিটে ৩ গোল করতে পারলেই ফাইনালের টিকিট রোমার, মে দিবসের রাতে এটাই রোমান সমীকরণ।

এগিয়ে থেকে শেষ সময়ে দুটি গোল হজম, একটু হতাশ হলেও ইয়ুর্গেন ক্লপ প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন শিষ্যদের, ‘৮০ মিনিটের মতো একেবারে নিখুঁত ফুটবল খেলেছি আমরা। একটা রক্ষণাত্মক ভুল করেছি, তাতেই অবস্থাটা এখন ৫-২। ৫-০ বা ৫-১ হলে আরো বেশি খুশি হতাম, তবে ৫-২ দারুণ ফল।’ রোমার কোচ ইউসেবিও দি ফ্রান্সেসকো বিশ্বাস হারাচ্ছেন না, ‘শুরুটা ভালোই হয়েছিল, এর পরই মাথা ঘুরে গেল আমাদের। দেরিতে হলেও ছেলেরা একটা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। আমরা যে এখান থেকেও ঘুরে দাঁড়াতে পারি সেই বিশ্বাসটা রাখতে হবে। পরের লেগটা বার্সেলোনার বিপক্ষে ম্যাচের মতো হবে না, আরো কঠিন হবে। তবে আমাদের বিশ্বাসটা রাখতে হবে।’

১৯৪৪ সালের ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালে, নির্ধারিত সময়ে ১-১ গোলে ড্র করার পর লিভারপুলের কাছেই টাইব্রেকারে হেরে গিয়েছিল রোমা। সেটাই এখন পর্যন্ত ইউরোপের সর্বোচ্চ আসরে রোমার সেরা কৃতিত্ব। অন্যদিকে ৯ বছর পর চ্যাম্পিয়নস লিগের গ্রুপ পর্বের বেড়া ডিঙানো লিভারপুলের ফাইনালে ওঠার পথে শেষ বাধাটায় স্রেফ ৩ গোল না খেলেই চলবে। উয়েফা, স্কাই



মন্তব্য