kalerkantho


রাঙ্গাটুঙ্গি থেকে হংকং

২৬ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



রাঙ্গাটুঙ্গি থেকে হংকং

ফুটবলে বিপ্লবই ঘটিয়েছে কলসিন্দুরের মেয়েরা। জাতীয় বয়সভিত্তিক দলে কলসিন্দুরের মেয়েদেরই জয়জয়কার। এমন আরো অনেক প্রতিষ্ঠান বা একাডেমি রয়েছে দেশজুড়ে। বাধার পাহাড় ঠেলে নিজেদের উদ্যোগে খেলোয়াড় গড়ে তারা সাফল্যও পাচ্ছে জাতীয় প্রতিযোগিতায়। আর খেলোয়াড় উপহার দিচ্ছে জাতীয় পর্যায়ে। অথচ প্রচারের আলো নেই তাদের ঘিরে। এ ধরনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে কালের কণ্ঠ’র এই ধারাবাহিক। আজ থাকছে ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার ‘রাঙ্গাটুঙ্গি ইউনাইটেড ফুটবল একাডেমি’। লিখেছেন রাহেনুর ইসলাম

সোহাগী কিসকু জঙ্গলে শিকার করত একসময়। থাকতে হতো রান্নাঘর আর গোয়ালঘরে। মুন্নী আক্তার আদুরীকেও অনেক সময় দিতে হয় জমিতে। বাবাকে কৃষিকাজে সাহায্য করার পর মায়ের জন্যও আনতে হয় খড়কুটো কুড়িয়ে। ভূমিহীন এই পরিবার থাকে অন্যের জমিতে ঘর তুলে। ঠাকুরগাঁও জেলার রানীশংকৈল উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম রাঙ্গাটুঙ্গির এই দুই মেয়ে নিজেদের উপজেলাতেই গেছে বয়স ১২ পেরোনোর পর। সেই তারা মাতিয়ে এসেছে হংকং! এ বছর হংকংয়ে হওয়া ‘জকি ক্লাব কাপ ইয়ুথ চ্যাম্পিয়নশিপে’ বাংলাদেশ নারী দলে খেলে এসেছে সোহাগী কিসকু ও মুন্নী আক্তার আদুরী। এর আগে সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ী দলেও বাংলাদেশের সবুজ জার্সি পরেছে তারা।

তীর, ধনুক, বর্শা আছে সোহাগী কিসকুদের বাড়িতে। এখনো তার পরিবার নিয়মিত শিকারে যায়। অনূর্ধ্ব-১৫ সাফ টুর্নামেন্ট জয়ের পর হংকংয়ে জকি ক্লাব কাপ জিতে আসা সোহাগী হাসতে হাসতে বলল, ‘তীর, ধনুক, বর্শা—এগুলোই জীবিকা ধরে নিয়েছিলাম আমরা। নিজেদের উপজেলা রানীশংকৈলেও আগে সেভাবে যাইনি। এখন ফুটবল খেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে পারছি। সাফ জয়ের পর তিনি সংবর্ধনা দিয়েছেন আমাদের। বিমানে গিয়েছি হংকং। চ্যাম্পিয়নও হয়েছি সেখানে। মনে হয় স্বপ্নের ঘোরে আছি।’

প্রত্যন্ত গ্রাম রাঙ্গাটুঙ্গি থেকে তাদের হংকং মাতানো কিংবা সাফে বাজিমাত করার কারিগর রানীশংকৈল ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তাজুল ইসলাম। ভারতের হরিয়ানার বালালি গ্রামের মহাবীর সিং ফোগাটের কথা তাঁর জানা। ফোগাট সামাজিক রীতিনীতির সঙ্গে যুদ্ধ করে নিজের মেয়েদের মুষ্টিযোদ্ধা বানিয়েছেন (ফোগাটের ঘটনা নিয়ে ২০১৬ সালে বলিউডে দঙ্গল নামে ছবি হয়েছে)। তাজুল ইসলামও সোহাগী, সাগরিকা, আদুরীদের নিয়ে ২০১৪ সালে গড়ে তোলেন রাঙ্গাটুঙ্গি ইউনাইটেড ফুটবল একাডেমি। শুরুতে অভিভাবকরা রাজি হননি নিজেদের মেয়েদের ফুটবল খেলাতে। কারণ মেয়েরা হাফপ্যান্ট পরলে জাত যাবে যে তাঁদের! পরে বিয়ে দেওয়াও হবে কঠিন। তবে তাজুল স্যারের অনুরোধে কয়েকজন অভিভাবক রাজি হয়ে যান মেয়েদের মাঠে পাঠাতে।

রাঙ্গাটুঙ্গি গ্রামে তাজুল ইসলামের পরিবারের ৫০ বিঘার বিশাল মাঠে শুরু হয় অনুশীলন। শুরুতে কোচ ছিলেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের তালিকাভুক্ত রেফারি সেতাউর রহমান। পরে যোগ দেন বাফুফের আরেক রেফারি গোপাল মুর্মু সুগা ও জয়নুল আবেদিন। ২০১৬ সালে এসে দলটা দাঁড়ায়। রাঙ্গাটুঙ্গির মেয়েরা উপজেলা পার করে জেলা চ্যাম্পিয়ন হয়। ২০১৬ সালের জেএফএ অনূর্ধ্ব-১৪ টুর্নামেন্টে ঠাকুরগাঁও জেলা দল গড়া হয় রাঙ্গাটুঙ্গির মেয়েদের নিয়েই। সেমিফাইনালে উঠে গিয়েছিল মেয়েরা। শেষে ঢাকার কমলাপুর স্টেডিয়ামে ভালো খেলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে রংপুরের সঙ্গে হেরে যায়।

২০১৭ সালটা ছিল সাফল্যে ভরা। জেএফএ কাপের শুরুটা আরো দুর্দান্ত হয়েছিল ঠাকুরগাঁও জেলা দলের। গাইবান্ধায় হওয়া প্রথম দুই ম্যাচে লালমনিরহাটকে ১৬-০ আর দিনাজপুর জেলা দলকে হারায় ৮-০ গোলে। ফাইনালে গাইবান্ধা জেলা দলকে ৪-১ গোলে হারিয়ে ঢাকায় আসার টিকিট নিশ্চিত করে ফেলে তারা। মূল পর্বে ঢাকায় এসেও সফল রাঙ্গাটুঙ্গির মেয়েরা। গ্রুপে টানা তিন ম্যাচ জিতে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে পৌঁছে যায় সেমিফাইনালে। এরপর সেমিফাইনালের বাধা পেরিয়ে টিকিট পায় ফাইনালের। তবে শিরোপার লড়াইয়ে পেরে ওঠেনি কলসিন্দুরের মেয়েদের নিয়ে গড়া ময়মনসিংহ জেলা দলের সঙ্গে।

টুর্নামেন্টে রানার-আপ হওয়ায় ঠাকুরগাঁও জেলা ক্রীড়া সংস্থা, জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন সংবর্ধনা দিয়েছে দলের সবাইকে। শুধু তা-ই নয়, তারা পেয়েছে ‘জয়বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’ও। ২০১৭ সালে ১০টি সামাজিক সংগঠন পায় এই স্বীকৃতি। ফুটবল দিয়ে সামাজিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ ‘রাঙ্গাটুঙ্গি ইউনাইটেড মহিলা ফুটবল একাডেমি’ও পেয়েছে পুরস্কারটা। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় পুরস্কারটি তুলে দিয়েছিলেন একাডেমির অধিনায়ক হান্না হেমব্রমের হাতে।

রাঙ্গাটুঙ্গি ইউনাইটেড ফুটবল একাডেমি, মানে তাজুল স্যারের পাঠশালায় ছাত্রী ২৫ জনের মতো। পাশাপাশি আছে ছেলেদের একটি দলও। কিছুদিন আগে প্রতিভা অন্বেষণে এসে ঠাকুরগাঁও জেলা থেকে সাতজন মেয়ে নির্বাচিত করে বিকেএসপি। এর সাতজনই রাঙ্গাটুঙ্গির! রংপুর বিভাগীয় অনূর্ধ্ব-১২ দলের সাত খেলোয়াড় এই একাডেমির। তাদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ায় কলকাতা থেকে এসেছে প্রীতি ম্যাচ খেলার আমন্ত্রণ। ঈদুল ফিতরের পরে সেই আমন্ত্রণে খেলতে যাওয়া নিয়ে তাজুল ইসলাম জানালেন, ‘শুরুর কষ্টের দিনগুলো ভুলিয়ে দিয়েছে এই সাফল্য। নিজের খরচে একটা একাডেমি এত দূর নিয়ে এসেছি। এখন একটাই চাওয়া, ফুটবল খেলে এই মেয়েগুলো যেন স্বাবলম্বী হয়।’



মন্তব্য