kalerkantho


আবুল স্যারের পাঠশালা

ফুটবলে বিপ্লবই ঘটিয়েছে কলসিন্দুরের মেয়েরা। জাতীয় বয়সভিত্তিক দলে কলসিন্দুরের মেয়েদেরই জয়জয়কার। এমন আরো অনেক প্রতিষ্ঠান বা একাডেমি রয়েছে দেশজুড়ে। বাধার পাহাড় ঠেলে নিজেদের উদ্যোগে খেলোয়াড় গড়ে তারা সাফল্যও পাচ্ছে জাতীয় প্রতিযোগিতায়। আর খেলোয়াড় উপহার দিচ্ছে জাতীয় পর্যায়ে। অথচ প্রচারের আলো নেই তাদের ঘিরে। এ ধরনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে কালের কণ্ঠ’র এই ধারাবাহিক। আজ থাকছে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার ‘কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজ’। লিখেছেন রাহেনুর ইসলাম

২৫ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



আবুল স্যারের পাঠশালা

ছবি : লুত্ফর রহমান, পঞ্চগড়

‘আমার বাবা মারা যান সড়ক দুর্ঘটনায়। পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। চুলায় হাঁড়ি জ্বলবে কী করে সেই চিন্তা। তখন কেউ হ্যান্ডবল খেলার কথা বললে কেমন লাগবে? নাছোড়বান্দা আবুল স্যার আমার পিছু ছাড়েননি। শেষ পর্যন্ত সবাইকে রাজি করিয়ে আমাকে এনেছেন খেলাটায়। এরপর বদলে যায় আমার ও পরিবারের জীবন। হ্যান্ডবল খেলার সুবাদে চাকরি পেয়েছি আনসারে। করেছি বিদেশ সফর। এখন হ্যান্ডবল ছেড়ে কাবাডি জাতীয় দলের অধিনায়ক আমি। বাবার চেয়েও আমার জন্য বেশি কিছু করেছেন আবুল স্যার’—এক নিঃশ্বাসে বলছিলেন নারী জাতীয় কাবাডি দলের অধিনায়ক শাহনাজ পারভিন মালেকা।

মালেকার মতো আরো অনেকে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার খেলাপাগল আবুল হোসেনের হাত ধরে এখন প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড়। মেয়েদের জাতীয় হ্যান্ডবল, কাবাডি দলের অসংখ্য খেলোয়াড় তাঁর হাতে গড়া। তেঁতুলিয়ার অন্তত ৬০ জন নারী খেলোয়াড় আনসার, বিজেএমসি, বাংলাদেশ পুলিশে চাকরি করে স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়েছেন সংসারে। বর্গাচাষি, দিনমজুর কিংবা ফেরিওয়ালার এই মেয়েরা গ্রামে পাকা বাড়ি তুলেছেন সবাই। এর কারিগর আবুল হোসেন ১৯৮৩ সালে তেঁতুলিয়ার কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজে যোগ দিয়েছিলেন শরীরচর্চা শিক্ষক হিসেবে। ওই সময় একই এলাকার আবুল কালাম আজাদ ও হায়দার আলী হ্যান্ডবল খেলতেন বিডিআরে (বর্তমান বিজিবি)। তাঁরা গ্রামে এলে হ্যান্ডবলের কৌশল শিখে স্কুলের মেয়েদের খেলাটায় আনেন আবুল হোসেন। শুরুতে ডিঙাতে হয়েছে বাধার পাহাড়। হাফপ্যান্ট পরে মেয়েদের হ্যান্ডবল খেলা মানতে চায়নি অনেকে। তবে পঞ্চগড়ের বিখ্যাত কাজী বাড়ির লোকজন, স্কুলের শিক্ষক আর এলাকাবাসীর সহযোগিতায় দল গড়ার কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন আবুল হোসেন।

স্কুল ছুটির পর এক ঘণ্টা বিরতি শেষে আমবাগান মাঠে চলে আসত মেয়েরা। এমন কঠোর অনুশীলন করেও সাফল্য পেতে পেতে সেই ১৯৯৬ সাল। জাতীয় আন্ত স্কুল হ্যান্ডবলে সেবার বাংলাদেশে রানার্স-আপ হয় তেঁতুলিয়ার কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা স্কুল। এরপর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি আর। মেয়েদের আন্ত স্কুল হ্যান্ডবলে তারা আটবারের চ্যাম্পিয়ন আর চারবারের রানার্স-আপ। ভলিবলে শিরোপা জিতেছে দুইবার। ২০০৮ সালে সাফ নারী হ্যান্ডবল টুর্নামেন্ট লখনউয়ে রানার্স-আপ হয়েছিল বাংলাদেশ। দলের সাতজনই আবুল স্যারের গড়া! সেই দলের রওশন আক্তার বুলু জানালেন, ‘আমরা বাংলাদেশ জাতীয় দল নাকি তেঁতুলিয়া জেলা দলের হয়ে খেলছি বুঝতেই পারিনি সেভাবে। সবাই একে অন্যকে চিনতাম ছোট থেকে। আবুল স্যার বাড়ি থেকে ধরে এনে অনুশীলন না করালে দেশের হয়ে খেলতে পারতাম না কখনো।’

বাংলাদেশ পুলিশ নারী হ্যান্ডবল দলের বর্তমান অধিনায়ক রুবিনা আক্তার, বিজেএমসির অধিনায়ক শিরিনা আক্তার আর আনসারের অধিনায়ক নিশি আক্তারও আবুল স্যারের হাতে গড়া সেই কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা স্কুলের খেলোয়াড়। শিরিনা বাংলাদেশ জাতীয় হ্যান্ডবল দলের অধিনায়কও। স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় দৌড়ে প্রথম হয়েছিলেন তিনি। এই দৌড় দেখে তাঁকে নিজেদের শাহাবুদ্দিন স্কুলে জোরাজুরি করে ভর্তি করান আবুল হাসানই। তাঁর ছোঁয়ায় শিরিনা হয়ে ওঠেন হ্যান্ডবল খেলোয়াড় আর জাতীয় দলের অধিনায়ক।

এ ছাড়া হ্যান্ডবলে ক্যারিয়ার শুরু করা তেঁতুলিয়ার ফারজানা আক্তার রুমি খেলা বদলে আবুল স্যারের পরামর্শে নাম লেখান তায়কোয়ান্দোয়। সেই ফারজানা সাফে সোনা এনে দিয়েছেন বাংলাদেশকে। জহুরির চোখে খেলোয়াড় চেনার এই ক্ষমতা অনন্য করেছে আবুল হোসেনকে। তবে জাতীয় পর্যায়ে এত খেলোয়াড় উপহার দিয়েও কোনো অহংকার নেই তাঁর, ‘আমি খেলার মানুষ। ছোটবেলায় ফুটবল, ভলিবল, হ্যান্ডবল সবই খেলতাম। চাকরিও পেয়েছি নিজের পছন্দের। শরীরচর্চা শিক্ষক হিসেবে স্কুলের মেয়েদের খেলা শেখানো আমার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।’

আবুল হোসেন নিজে বেড়ে উঠেছেন আর্থিক অনটনে। ১৯৭৭ সালে গণিত নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন অনার্সে। পরিবারের অভাবের কারণে পড়াশোনা শেষ করা হয়নি। তেঁতুলিয়ার গরিব মেয়েগুলোর দিকে তাকিয়ে নিজের কথা মনে পড়ে যায় তাঁর। এ জন্যই খেলার মাধ্যমে চেষ্টা করেছেন গরিব ঘরের মেয়েদের স্বাবলম্বী করতে। আর্থিক অনটনে স্কুলে আসা বন্ধ করে দেওয়া মেয়েদের পরিবারকে বোঝান তিনি। কখনো কখনো নিজের সামান্য আয় থেকেই সাহায্য করেন তাদের। আবুল স্যার এসব লিখতে নিষেধ করলেও আমরা দিলাম ছেপে!



মন্তব্য