kalerkantho


ক্রিকেটার তৈরির দুই একাডেমি

ফুটবলে বিপ্লবই ঘটিয়েছে কলসিন্দুরের মেয়েরা। জাতীয় বয়সভিত্তিক দলে কলসিন্দুরের মেয়েদেরই জয়জয়কার। এমন আরো অনেক প্রতিষ্ঠান বা একাডেমি রয়েছে দেশজুড়ে। বাধার পাহাড় ঠেলে নিজেদের উদ্যোগে খেলোয়াড় গড়ে তারা সাফল্যও পাচ্ছে জাতীয় প্রতিযোগিতায়। আর খেলোয়াড় উপহার দিচ্ছে জাতীয় পর্যায়ে। অথচ প্রচারের আলো নেই তাদের ঘিরে। এ ধরনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে কালের কণ্ঠ’র এই ধারাবাহিক। আজ থাকছে রাজশাহীর ‘যুব ক্রিকেট স্কুল’ ও ‘বাংলা ট্র্যাক ক্রিকেট একাডেমি’। লিখেছেন রাহেনুর ইসলাম

২৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



ক্রিকেটার তৈরির দুই একাডেমি

যুব ক্রিকেট স্কুল (বামে) বাংলা ট্র্যাক ক্রিকেট একাডেমি (ডানে) - ছবি : সালাহ উদ্দিন

ইমরুল কায়েসের বাড়ি মেহেরপুর। অথচ তিনি রাজশাহী যুব ক্রিকেট স্কুলের ছাত্র। শত কিলোমিটারের দূরত্বটা মিটল কিভাবে? হাসতে হাসতে যুব ক্রিকেট স্কুলের কোচ জামিলুর রহমান সাদ বলছিলেন, ‘কুষ্টিয়ায় আল্লার দরগায় প্রীতি ম্যাচ খেলতে গিয়েছিল আমাদের একাডেমি। তখন অনেক বয়স আমার। ছেলেদের সঙ্গে খেলতে নেমে করেছিলাম ৮৯। বিপক্ষ দলের ইমরুল করেছিল ৬৩। আমার বুড়ো বয়সের ব্যাটিং দেখে ইমরুলের বাবা ওকে পাঠায় রাজশাহীতে আমার একাডেমিতে।’

১৯৯২ সালে দরগা পাড়ায় গড়ে ওঠা এই একাডেমির সবচেয়ে বড় সাফল্যের নামও ইমরুল কায়েস। ক্লাস নাইন থেকে চাচার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করেছেন রাজশাহীতেই। বিকেল হলেই ছুটে যেতেন জামিলুর রহমান সাদের একাডেমিতে। সেখানে পাঠ নিয়ে ২০০৮ সালে জাতীয় দলে সুযোগ পান এই ওপেনার। ইমরুলের পথ ধরে এই প্রতিষ্ঠানেরই সাকলাইন সজীব টি-টোয়েন্টি খেলেছেন বাংলাদেশের জার্সি গায়ে। আর ফরহাদ হোসেন ছিলেন ‘এ’ দলে। কোনো পৃষ্ঠপোষক ছাড়া ২৬ বছর রাজশাহী কলেজ মাঠে এই একাডেমি চালাচ্ছেন লেভেল টু করা কোচ জামিলুর রহমান সাদ। ঢাকা প্রথম বিভাগের দল ইয়াং পেগাসাসের প্রায় সব ক্রিকেটার তাঁর একাডেমির। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে গত মৌসুমে খেলেছেন ১১ জন। রাজশাহী বিভাগীয় ও জেলা দলেও ছয়জন করে ক্রিকেটার এই একাডেমির। ১৫০ জনের বেশি ছাত্র সপ্তাহজুড়ে রাজশাহী কলেজ মাঠে অনুশীলন করাতেই এমন সাফল্য।

ছাত্রদের ব্যাট, বল, গ্লাভস এসব ঢাকা থেকে পাঠান ইমরুল কায়েস, সাকলাইন সজীব, ফরহাদ হোসেনের মতো সাবেক ক্রিকেটাররা। ৩০০ টাকা মাসিক বেতন হলেও বেশির ভাগ ছাত্র দেয় না সেটা। এ নিয়ে আক্ষেপ নেই জামিলুর রহমান সাদের, ‘আমাদের দরগা পাড়ার ছেলেদের ক্রীড়ামুখী করতে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি। বেতন একটা টোকেন মাত্র। কেউ না দিলে জোরাজুরি নেই। এখান থেকে জাতীয় দলের খেলোয়াড় তৈরি হবে ভাবিইনি কোনো দিন। আশা করছি আরো অনেককে শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে দিতে পারব আমি। তবে রাজশাহীতে জুনিয়রদের বি ডিভিশন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সমস্যায় পড়েছি আমরা। ম্যাচ খেলার সুযোগ কমে গেছে অনেক।’

পদ্মাপারের রাজশাহীতে গড়ে উঠেছে ক্রিকেটার তৈরির আরেক ‘কারখানা’। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়িয়ে ৫০ বিঘা জমির ওপরে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানের নাম ‘বাংলা ট্র্যাক ক্রিকেট একাডেমি’। অনেকে ‘দ্বিতীয় বিকেএসপি’ বলা শুরু করেছেন একে। কারণ বিকেএসপি ছাড়া এত বিশাল আয়তনের জায়গা নেই বাংলাদেশের আর কোনো ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানের। আরেকটি কারণ, ক্রিকেটারদের জন্য এখানে রয়েছে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা। খোলা মাঠের পাশাপাশি আছে ইনডোর, ব্যায়ামাগার, ফিজিওথেরাপি রুম আর ছাত্রাবাস। ইনডোরের নেট তিনটি। সঙ্গে বোলিং মেশিন থাকায় বৃষ্টিতেও বন্ধ থাকে না অনুশীলন। এ জন্যই ২০০৮ সালে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানে ক্রিকেট শিখছে ৮০০ জনের বেশি ছাত্র! বিকেএসপি ছাড়া এত বেশি খেলোয়াড় আছে আর কোন প্রতিষ্ঠানের?

সপ্তাহে তিন দিন বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক, ঢাকা ডায়নামাইটস ও আবাহনীর কোচ খালেদ মাহমুদ সুজন অনুশীলন করাতে আসেন বাংলা ট্র্যাকে। তাঁর সঙ্গে আছেন জাতীয় দলের হয়ে একটি ওয়ানডে খেলা সাবেক পেসার আমিনুল ইসলাম ও স্থানীয় কয়েকজন কোচ। তাইজুল ইসলাম এখানে ক্রিকেট শিখে এখন জাতীয় দলে। এ ছাড়া যুব বিশ্বকাপ খেলা নিহাদুজ্জামান, বিপিএলে রাজশাহী কিংসে খেলা নাঈম ইসলাম জুনিয়রের ক্রিকেটে হাতেখড়ি বাংলা ট্র্যাক একাডেমিতে। ঢাকার ক্রিকেটেও খেলোয়াড় জোগান দেওয়ার মাধ্যম হয়ে উঠেছে এই একাডেমি। প্রিমিয়ার লিগের পরের স্তরের টুর্নামেন্টগুলোয় বাংলা ট্র্যাকের জয়জয়কার। গত বছর ঢাকা প্রথম বিভাগ চ্যাম্পিয়ন শাইনপুকুর, দ্বিতীয় বিভাগের চ্যাম্পিয়ন এক্সিওম ক্রিকেটার্স, তৃতীয় বিভাগের রানার্স-আপ মোহাম্মদপুর ক্রিকেট একাডেমির বেশির ভাগ ছাত্র রাজশাহী বাংলা ট্র্যাকের। এ জন্য প্রতিষ্ঠানের গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান আব্দুল মোক্তাদিরের সন্তুষ্টি, ‘তরুণরা সব সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে আমাদের একাডেমিতে। এভাবে চললে সত্যিকার অর্থেই ক্রিকেটার তৈরির কারখানা হতে পারব আমরা।’



মন্তব্য