kalerkantho


জাতীয় পর্যায়ে ১০ খেলোয়াড় উপহার দিয়েছে বৈকালি

ফুটবলে বিপ্লবই করেছে কলসিন্দুরের মেয়েরা। জাতীয় বয়সভিত্তিক দলে কলসিন্দুরের মেয়েদেরই জয়জয়কার। এমন আরো অনেক প্রতিষ্ঠান বা একাডেমি রয়েছে দেশজুড়ে। বাধার পাহাড় ঠেলে নিজেদের উদ্যোগে খেলোয়াড় গড়ে তারা সাফল্যও পাচ্ছে জাতীয় প্রতিযোগিতায়। আর খেলোয়াড় উপহার দিচ্ছে জাতীয় পর্যায়ে। অথচ প্রচারের আলো নেই তাদের ঘিরে। এ ধরনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে কালের কণ্ঠ’র এই ধারাবাহিক। আজ থাকছে রাজশাহীর ‘বৈকালি সংঘ’। লিখেছেন রাহেনুর ইসলাম

২৩ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



জাতীয় পর্যায়ে ১০ খেলোয়াড় উপহার দিয়েছে বৈকালি

সত্তরের দশকে ফুটবল উন্মাদনায় মাতোয়ারা পুরো দেশ। হকিও কম জনপ্রিয় নয় তখন। হকি অন্তপ্রাণ মির্জা আব্দুর রশিদ ১৯৭৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর বৈকালি সংঘ গড়ে রাজশাহীতে প্রাণ আনেন খেলাটায়। সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় উদ্যমী তরুণরা। হকি পথ হারিয়েছে, কিন্তু বৈকালি সংঘ এখনো আছে খেলাটা আঁকড়ে। জাতীয় দলে ৯ জন খেলোয়াড় উপহার দিয়েছে তারা। পাশাপাশি ক্রিকেট জাতীয় দলেও খেলছেন বৈকালির জহুরুল ইসলাম অমি।

সব মিলিয়ে জাতীয় ১০ খেলায়াড় উপহার দেওয়ায় গর্বিত বৈকালি সংঘের দুই দশকের সাধারণ সম্পাদক রইসউদ্দিন বাবু, ‘৪০ বছরের বেশি সময় ধরে হকি নিয়ে আছি আমরা। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে খেলোয়াড় নিয়ে এসে জাতীয় দল পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়াটা তৃপ্তির। আমাদের ৯ জন হকিতে আর একজন খেলেছে ক্রিকেট জাতীয় দলে। নানা সমস্যার মধ্যেও এমন সাফল্য উৎসাহিত করে বৈকালি সংঘকে।’

বৈকালি সংঘ থেকে জাতীয় হকি দলে খেলেছেন রবিউদ্দিন আহমেদ, শামীম রেজা, আশরাফুল ইসলাম, সাব্বির রানা, রিমন কুমার, হোসনে মোবারক সুমন, কৃষ্ণ কুমার, ফজলে হোসেন রাব্বি ও মোহাম্মদ মিলন। প্রয়াত রবিউদ্দিন আহমেদ পেয়েছেন জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারও। এতজন জাতীয় খেলায়াড় উপহার দেওয়া বৈকালির জয়জয়কার রাজশাহী হকি লিগেও। ২১ বার লিগে অংশ নিয়ে ১৭ বার চ্যাম্পিয়ন তারা। রানার্স-আপ তিনবার। হকির পাশাপাশি রাজশাহী প্রিমিয়ার ক্রিকেটেও শিরোপা আছে বৈকালি সংঘের। সংগঠনটি নিজেরা চালায় মহানগর কাপ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। জহুরুল ইসলাম অমি এখানে খেলেই পৌঁছেছেন জাতীয় দল পর্যন্ত। এ ছাড়া সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনীতেও ২৯ জন চাকরি পেয়েছেন বৈকালি সংঘে হকি শিখে। ঢাকার হকি ও ক্রিকেট প্রিমিয়ার লিগেও এই ক্লাবের কয়েকজন খেলেন নিয়মিত।

সংগঠকদের পাশাপাশি হকিতে বৈকালির সাফল্যের অনেকটা দাবিদার এ ওয়াই এম মনিরুজ্জামান সানা। ক্লাব সভাপতির দায়িত্বে থাকা সানা প্রধান প্রশিক্ষকও হকি খেলোয়াড়দের। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে একটা সময় হকি খেলা সানা আরো এগিয়ে নিতে চান নিজের প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠানকে, ‘১৫০ জন তরুণকে হকি প্রশিক্ষণ দিই আমরা। ক্রিকেটেও সংখ্যাটা কম নয়। প্রতিবছর তিন থেকে চার লাখ টাকা খরচ হয় এ জন্য। আমরা বন্ধুরা মিলে জোগাড় করি টাকাটা। কয়েকজন ডোনারও আছেন। শিক্ষার্থীরা টাকা দিলেও অঙ্কটা না বলার মতো। এর পরও যত দিন আমরা আছি, চেষ্টা করে যাব ক্লাবকে এগিয়ে নিতে। আমরা শুধু ক্লাব না, সামাজিক সংগঠনও বটে।’

ক্লাব প্রতিষ্ঠার পর ঝরে পড়া অসংখ্য শিক্ষার্থীকে আবারও স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ করে দিয়েছে বৈকালি সংঘ। এলাকার কেউ অসুস্থ হলে বা গরিব কোনো পরিবারের বিয়েতে সাধ্য অনুযায়ী সাহায্যও করে তারা। এ জন্য নিজেদের ৪২ বছরের ইতিহাসে চাঁদা তোলেনি বৈকালি সংঘের কেউ। অর্থ দিয়ে তাঁদের সাহায্য করে আসছেন সাবেক সভাপতি মোজাহিদ হোসেন। প্রাইম ব্যাংকে চাকরির সুবাদে এখন ব্যাংককে থাকলেও ক্লাবের জন্য নিয়মিত মোটা একটা অঙ্ক পাঠান তিনি। সাহায্যকারীদের মধ্যে অন্যতম আলমগীর আর রাজুও। সবার আন্তরিক সহযোগিতায় খুশি ক্লাব সভাপতি  মনিরুজ্জামান সানা, ‘দেশের বিভিন্ন বাহিনীতে আমাদের ২৯ খেলোয়াড়ের চাকরি পাওয়াটা অন্যতম সামাজিক অর্জন। মোজাহিদ, আলমগীর, রাজুর মতো আরো কয়েকজন নিয়মিত অনুদান দেন বলে টাকা নিয়ে চিন্তা না করে খেলার পেছনেই সময় ব্যয় করি আমরা। বাকি জীবনটাও কাটাতে চাই সামাজিক দায়িত্ব আর খেলোয়াড়দের পেছনে কাটিয়ে।’

১৯৭৬ সালে বৈকালি সংঘের শুরুটা রাজশাহী জেলখানার মাঠে। এরপর দখল হয়ে যায় মাঠটা। মাঠ রক্ষার আন্দোলনে নেমে জেলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল ক্লাবের একাধিক কর্মকর্তার। শেষ পর্যন্ত তখনকার রাজশাহী জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান আখক্ষেত কেটে কালেক্টরেট মাঠ তৈরি করতে বলেন কর্তাদের। সবার প্রাণান্ত প্রচেষ্টায় তৈরি হয় কালেক্টরেট মাঠ। বৈকালি সংঘের অনুশীলনের পাশাপাশি রাজশাহী ক্রীড়াঙ্গনের প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে এটা। তবে বাণিজ্য মেলা কিংবা বৈশাখী মেলার নামে বছরের কয়েকটা মাস মাঠ দখল থাকায় ক্ষুব্ধ বৈকালি সংঘের খেলোয়াড় ও কর্তারা। তাঁদের দাবি কালেক্টরেট মাঠ খেলার জন্য ছেড়ে দিয়ে আউটার স্টেডিয়ামে হোক মেলা কিংবা সমাবেশ। এই দাবি পৌঁছবে কি কর্মকর্তাদের কানে?

 



মন্তব্য