kalerkantho


কাবাডির গ্রাম সৈয়দপুর

২২ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



কাবাডির গ্রাম সৈয়দপুর

ফুটবলে বিপ্লবই করেছে কলসিন্দুরের মেয়েরা। জাতীয় বয়সভিত্তিক দলে কলসিন্দুরের মেয়েদেরই জয়জয়কার। এমন আরো অনেক প্রতিষ্ঠান বা একাডেমি রয়েছে দেশজুড়ে। বাধার পাহাড় ঠেলে নিজেদের উদ্যোগে খেলোয়াড় গড়ে তারা সাফল্যও পাচ্ছে জাতীয় প্রতিযোগিতায়। আর খেলোয়াড় উপহার দিচ্ছে জাতীয় পর্যায়ে। অথচ প্রচারের আলো নেই তাদের ঘিরে। এ ধরনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে কালের কণ্ঠ’র নতুন ধারাবাহিক। আজ থাকছে জামালপুরের ‘বছির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়’। লিখেছেন রাহেনুর ইসলাম

একদিকে বাজছে বিয়ের সানাই, আরেক দিকে কান্নার রোল। নিজেদের প্রিয় অধিনায়ক বাসনা আক্তারের এত অল্প বয়সে বিয়ে মানতে পারছিল না বছির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের মেয়েরা। ২০১৫ সালে বাসনার নেতৃত্বে জাতীয় স্কুল কাবাডি চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার কামরাবাদ ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম সৈয়দপুরের স্কুলটি। সবাইকে চমকে ২০১৬ আর ২০১৭ সালেও চ্যাম্পিয়ন তারা। পরের দুইবার সহ-অধিনায়ক ছিলেন সৈয়দপুর বাজারের জিলাপি বিক্রেতার মেয়ে বাসনা। গত মাসে দশম শ্রেণির ছাত্রী বাসনার বিয়ের রাতে তাই অঝোরে কাঁদছিল স্কুলের অন্য ছাত্রীরা।

বিয়েটা মানতে পারছিলেন না বছির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের কাবাডি কোচ রজব আলীও। কষ্ট নিয়ে বলছিলেন, ‘কত কষ্ট করে গড়ে তুলেছি মেয়েদের। ওদের এত অল্প বয়সে বিয়ে কিভাবে মানব! বাসনার পর বিয়ে হয়ে গেছে আমার নির্ভরযোগ্য আরেক খেলোয়াড় সাদিয়া আক্তারের। ১২ জনের দলের দুজনই আর খেলতে পারবে না বিয়ের জন্য।’ কষ্ট পাওয়ার যথেষ্ট কারণও আছে রজব আলীর। জামালপুর সদর থেকে ১৭-১৮ কিলোমিটার দূরের উপজেলা সরিষাবাড়ী। পাকা সড়ক থেকে নেমে স্কুল পর্যন্ত কাঁচা রাস্তা প্রায় এক কিলোমিটার। বন্যায় রাস্তার কয়েক জায়গা ভেঙে পড়ায় রিকশা, ভ্যান, মোটরসাইকেলে যাওয়ারও উপায় নেই। ‘দুর্গম’ পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যাওয়ার পর খাবার কোনো হোটেলও নেই! এই কষ্ট মেনেই ২০১৫ সাল থেকে এই স্কুলের ছাত্রীদের কাবাডি শেখাচ্ছেন রজব আলী। স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমান, তাঁর স্ত্রী শারমিন রহমান, শরীরচর্চা শিক্ষক সাজ্জাদ হোসেনরাও অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন তখন থেকে। তারই ফসল প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই গ্রামের মেয়েদের টানা তিনবার জাতীয় স্কুল কাবাডি চ্যাম্পিয়ন হওয়া।

২০১৫ সালে অনুশীলন শুরু করে প্রথমবারই কাবাডির স্কুল চ্যাম্পিয়ন বছির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের মেয়েরা। ৪৪তম জাতীয় গ্রীষ্মকালীন খেলার কাবাডিতে দিনাজপুরে প্রতিপক্ষ স্কুলগুলোকে তারা হারিয়েছে দ্বিগুণ পয়েন্টের ব্যবধানে। ফাইনালে যশোরের আদর্শ বহুমুখী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় হেরেছিল ৩৮-২২ পয়েন্টে। ২০১৬ সালে কুমিল্লায় হওয়া ফাইনালে খাগড়াছড়ির মহালছড়ি মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়কে হারায় ৪২-২৫ পয়েন্টে। গত বছর যশোরে হওয়া ফাইনালে ৩৬-১৬ পয়েন্টে হারায় কুমিল্লার গৌরীপুর বিলকিস মোশাররফ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়কে। এ বছর যুব গেমস কাবাডিতে ময়মনসিংহের হয়ে খেলে চ্যাম্পিয়ন তারা। অধিনায়ক সুমাইয়া আক্তার গর্বিত এ জন্য, ‘আমরা দিনে সাত-আট ঘণ্টা অনুশীলন করেছি। শুরুতে খারাপ কথা বলত অনেকে। তবে টানা সাফল্য পাওয়ায় সবাই স্নেহ করছে এখন।’

সুমাইয়ারা এখন চান জাতীয় দলে খেলতে। তাদের দেখে গ্রামের অন্য কিশোরীরাও উদ্বুদ্ধ হচ্ছে কাবাডিতে নাম লেখাতে। কিন্তু নিষ্ঠুর বাস্তবতা হচ্ছে, চ্যাম্পিয়ন দলের এই মেয়েদের অনেকের চুলোয় হাঁড়ি জ্বলে না। সোনিয়া, লিমা, বীথি কিংবা তানজিলা প্রায় সবারই অবস্থা এক। সাদিয়া আক্তারের আবার থাকার ঘরও ছিল না। থাকত চাচার বাড়ি। মা অন্ধ, বাবা রিকশা চালান ঢাকায়। সংসার চালাতে ঢাকায় একটি গার্মেন্টে কাজ নিয়েছিল সাদিয়া। স্কুলের শিক্ষকরা বুঝিয়ে গ্রামে নিয়ে আসেন আবারও। অভাবের তাড়নায় সেই সাদিয়ারও বিয়ে হয়ে গেছে কদিন আগে। এত প্রতিবন্ধকতার মাঝেও টানা চতুর্থ শিরোপা জয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বছির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমান। কাবাডির প্রতি ভালোবাসা থেকেই প্রত্যন্ত অঞ্চলে খেলাটার প্রসারে কাজ করছেন তিনি, ‘এক দশক আগে স্কুলটা করেছি বাবার নামে। একসময় নিজেও শরীরচর্চা শিক্ষক ছিলাম। কাবাডি পছন্দ করি ছোটবেলা থেকে। ২০১৫ সালে ১১ জানুয়ারি ক্লাস শুরুর আগে সমাবেশে ছাত্রীদের প্রস্তাব দিই কাবাডি খেলার। প্রথমে খুব বেশিজন রাজি না হলেও ওদের উদ্বুদ্ধ করায় পেয়ে যাই ৪০ জন। শুরুটা এভাবেই। জাতীয় প্রতিযোগিতার আগে স্কুলের একটা কক্ষে ওদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করি। কখনো কখনো টানা তিন মাস স্কুলে থেকে অনুশীলন করেছে ওরা। এর খরচ পুরোটাই দিই আমি।’ এ ধরনের আতাউর রহমানরা আছেন বলেই সৈয়দপুরের পরিচিতি এখন ‘কাবাডি গ্রাম’।



মন্তব্য