kalerkantho


অযত্ন আর অবহেলাতেই বিদায় মনুর

২১ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



অযত্ন আর অবহেলাতেই বিদায় মনুর

ক্রীড়া প্রতিবেদক : বৈশাখে হবে কালবৈশাখী, উঠবে ঝড়, শহর ভিজবে বৃষ্টিতে—এই তো প্রকৃতির নিয়ম। কাল সন্ধ্যাটাও ছিল বাতাসের তুফানের; আকাশের কান্নার। কে জানে, এর পুরোটাই হয়তো আবহাওয়ার ব্যাপার-স্যাপার নয়। বরং আত্মাহীন এই পোড়ো শহরের হৃদয়হীন মানুষগুলোর প্রতি ক্রোধ আর কান্নার যুগলবন্দির প্রাকৃতিক প্রকাশ বোধকরি তাতে। এ দেশের এক ফুটবলবীরের যে মহাপ্রস্থান হলো কাল! প্রবল অযত্নে। নির্মম অবহেলায়।

মৃত্যুর ঠিকানায় পাড়ি জমালেন আশির দশকের আলোড়ন তোলা ফুটবলার মনির হোসেন মনু।

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) প্রেরিত শোকবার্তায় তাঁর নাম লেখা হয়েছে ‘মিজানুর রহমান মনু’। ঢাকা মহানগরী ফুটবল লিগ কমিটির শোক সংবাদে তিনি ‘মনোয়ার হোসেন মনু’। খেলার যে ভুবনে জীবনের উজ্জ্বলতম সময় কাটিয়েছেন, যে ফুটবলে উপহার দিয়েছেন হিরণ্ময় সব মুহূর্ত— সেখানে যে কতটা উপেক্ষিত মনু, তাঁর ভুল নাম প্রকাশেই বোঝা যায় তা। তাঁর স্মৃতিমাখা বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম বা মোহামেডান ক্লাবেও লাশটি একবার না নেওয়ায় আরো তীব্রভাবে। সন্ধ্যায় নিজ এলাকা মুগদা মদিনাবাগ জামে মসজিদে জানাজা কিংবা এরপর আজিমপুর কবরস্থানে তাঁর সমসাময়িক বিখ্যাত ফুটবলারদের অনুপস্থিতিও সেই অবহেলার সনদ যেন।

মনু এখন এসবের ঊর্ধ্বে। কিন্তু এর আগে কতই না ধুঁকলেন! লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে গত বছর একবার ভর্তি হয়েছিলেন হাসপাতালে। দীর্ঘদিন পর ফিরেছিলেন বাড়িও; কিন্তু নাছোড়বান্দা ডিফেন্ডারের মতো রোগ পিছু ছাড়েনি। আবার তাই শয্যা নিতে হয় পিজি হাসপাতালের বিছানায়। কাল দুপুর ১২টায় সেখানেই চিরঘুমে ‘চিতাবাঘ’।

হ্যাঁ, ঢাকার মাঠে সমর্থকদের আদুরে ‘চিতাবাঘ’ ছিলেন মনু; আর প্রতিপক্ষের ত্রাস। প্রতিপক্ষ বলতে তো আবাহনী। আশির দশকের ওই কয়েকটি মৌসুম মোহামেডানের সমর্থকদের শিহরণ হয়ে ছিলেন মনু আর আবাহনী সমর্থকদের জন্য টেনশনের সমার্থক হয়ে। ১৯৮৫ সালের লিগে চন্দ্রসিঁড়ির বিপক্ষে দুর্দান্ত গোল; পরের বছর ভাস্কর গাঙ্গুলিকে বোকা বানিয়ে। আবাহনীর কাজী সালাউদ্দিন তখন বলেছিলেন, ‘এটি শতাব্দীর সেরা গোল’। ভারতের বিখ্যাত গোলরক্ষক ভাস্কর গাঙ্গুলি তাঁর ক্যারিয়ারে হজম করা সেরা চার গোলের মধ্যেও রাখেন সেটিকে। প্রেসিডেন্ট গোল্ড কাপে চীনের এক দল এবং ইস্ট বেঙ্গলের বিপক্ষে আরো দুটি অবিস্মরণীয় গোল করেন মনু। পুরনো দিনের যেকোনা ফুটবল-আড্ডায় এই চারটি গোলের আলোচনা ঘুরেফিরে আসে এখনো।

অথচ এই মনুর শৈশব-কৈশোর কেটেছে কী কষ্টে! আরামবাগে জন্ম নেওয়া ছেলেটি ওখানকার ‘কাশেমের দোকান’ নামক হোটেলে কাজ করে পেটের ভাত জোগাতেন। সাধারণের একজন ছিলেন। ফুটবল মনুকে বানিয়ে দেয় অনন্যসাধারণ একজন। ১৯৮০ সালে চতুর্থ বিভাগের দল ইয়ংম্যান্স ফকিরাপুলে খেলা শুরু। তৃতীয়, দ্বিতীয় বিভাগ হয়ে প্রথম বিভাগে নাম লেখান বিআরটিসিতে। ১৯৮৩ সালে মোহামেডানে। মাত্র চার মৌসুম খেলেছেন সাদা-কালো জার্সিতে। তাতেই আবাহনীর বিপক্ষে কীর্তিতে মনু হয়ে গেলেন অমর। ইনজুরির কারণে ক্যারিয়ার দীর্ঘ হয়নি। ১৯৮৯ সালে ফকিরাপুলের অধিনায়ক হিসেবে শেষ করেন রিয়ার।

এর পর থেকেই ফুটবলাঙ্গনে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি মনুকে। কী এক অভিমানে দূরে সরে রইলেন বাকিটা জীবন। কিন্তু জীবনের ম্যাচ শেষেও কাল যে অমন অবহেলায় বিদায় নিতে হবে, তা হয়তো ভাবেননি। ফুটবল ভুলে গেছে তাঁকে, কিন্তু মহাকাল হয়তো ভোলেনি। সে কারণেই কিনা ঝড়ের ট্রাম্পেট আর বৃষ্টির কান্নাভেজা করতালিতে বিদায় হলো কাল মনির হোসেন মনুর।



মন্তব্য