kalerkantho


বাকীদের ফাঁকি

১৯ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



বাকীদের ফাঁকি

‘মুখ দেখানোর আর জো থাকছে না।’

কাঠমাণ্ডুর সেই বিকেলে বক্তার সঙ্গে দ্বিমতের কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের সাঁতারুরা নেমে পানিতে প্রায় তলিয়ে যাচ্ছে, বক্সার-কুস্তিগীররা নিরন্তর মার খেয়ে চলছে। তায়কোয়ান্দো নামে একটা খেলার নাম সেই সাফ গেমসের আগেই প্রথম ব্যাপকভাবে শোনা গেল। আরো শোনা গেল সেখানে নাকি কয়েকটি সোনা অবধারিত। সেই ঢোল শুনে অনেক দূরের ভেন্যুতে দেখতে গেলাম একদিন। তায়কোয়ান্দো সম্পর্কে তখন খুব পরিষ্কার ধারণা ছিল না কারোই, গিয়ে দেখলাম খেলাটা মূলত লাথিভিত্তিক। আর নেপালি প্রতিযোগীর কাছে বাংলাদেশের জন এমন ভয়ংকর কিছু লাথি খেলেন যে ভয় হলো, হাসপাতাল-টাতালে নিতে হবে না তো! সেই প্রেক্ষিতে লজ্জায় মুখ লুকিয়ে রাখার আর্তনাদের সঙ্গে তাল মেলাতেই হয়। মেলালাম। কিন্তু ভদ্রলোক খুশি হলেন না। বললেন, ‘আমি যা বলতে চাইছি আপনি সেটা ধরতে পারেননি।’

‘পারিনি?’

‘না। কারণ আমি খেলোয়াড়দের ব্যর্থতার কথা বলছি না। খেলোয়াড়রা ব্যর্থ হতেই পারে, মাঠের খেলাটায় আমরা পিছিয়ে আছি। আমি লজ্জিত আমাদের কর্তাদের কাণ্ড নিয়ে।’

‘তাই নাকি? কী ঘটনা?’

‘আমাদের বড় একজন কর্তাকে কাল নেপালের মার্কেটে দেখা গেছে জুতা হাতে।’

‘খেলা বাদ দিয়ে জুতা কিনতে গিয়েছিলেন নাকি? খুবই খারাপ কথা!’

‘আরে না! উনি আরেকজনের জুতা হাতে নিয়ে বয়ে বেড়াচ্ছিলেন।’

‘তাই নাকি? কার জুতা? কেন?’

বিস্তারিত জানা গেল। দলের সঙ্গে থাকা একজন রাজনৈতিক প্রভাবশালী নারীর জুতা ছিঁড়ে গিয়েছিল, সেটা ঠিক করাতে দলের বড় এক কর্তা জুতা হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। সেই ছবি আবার তুলে ফেলেছে নেপালের এক ফটোগ্রাফার। পত্রিকায় ছাপেনি। তবে কর্তামহলে প্রচারিত হয়ে বাংলাদেশ হাসাহাসির বিষয়।

পুরনো এই গল্পটা আগেও দু-একবার বলে থাকতে পারি। তবু আবার বললাম কারণ এই ২০ বছর পরও বিদেশে যাওয়া কর্তাদের চরিত্র খুব বদলায়নি। এখনো বিদেশে গিয়ে দায়িত্ব ভুলে যান। টেকনিক্যাল কমিটির মিটিংয়ে কর্মকর্তা হাজির থাকতে পারেন না বলে এত দূর গিয়ে, এত পরিশ্রম করে শেষ পর্যন্ত বক্সারদের মাঠে নামা হয় না। এসব লজ্জার ঘটনার পর আরেকটা কমিক অংশও থাকে সাধারণত। এখানেও আছে। দলের কর্তার জন্য বক্সারদের স্বপ্নভঙ্গ হলো অথচ দ্বিতীয় আরেকটা শাস্তিও পেতে হলো ওদের। অবিলম্বে দেশে ফেরার টিকিট ধরিয়ে দিয়ে। অথচ উচিত ছিল ওদের মানসিক চোট সামলানোর জন্য হলেও প্রতিযোগিতার পুরো সময়টা ওদের গোল্ড কোস্টে রাখা। অন্য দেশের প্রতিযোগীদের মান, ওসব আয়োজনে কিভাবে খেলতে হয়—এসব থেকে কিছু শেখার তো ছিল। কিন্তু খেলোয়াড়দের শেখা বা তাঁদের দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়টা বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে চিরকালই দ্বিতীয় বিষয় হয়ে থেকেছে। মাঝেমধ্যে মনে হয়, যদি এসব খেলার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা না থাকত, মানে ভূ-বিশ্ব ঘোরার সুযোগ না থাকলে হয়তো খেলাগুলো বিলুপ্তই ঘোষণা করা হতো। বাকী-শাকিলরা আসলে কর্তাদের বিদেশে যাওয়ার সেতু। ওদের ভালো পারফরম্যান্স তাঁদের ভবিষ্যৎ ভ্রমণের বীমা। এবং একভাবে দেখলে আসলে শুধুই তা-ই। বাকীদের এই কীর্তিগুলোর ফাঁকিতেই চলছে দেশের ক্রীড়াঙ্গন। এর বাইরে ওদের আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ কিংবা সাফল্যগুলোর সেই অর্থে প্রভাব নেই। আসলে প্রভাবটা আমরাই তৈরি করতে পারি না।

প্রথম সমস্যা আন্তর্জাতিক সাফল্যের জন্য অতিরিক্ত হাহাকার। আর সাফল্যগুলোকে আমরা ধরে নিই দালানের শেষ উচ্চতা, অথচ আসলে ব্যবহার করা উচিত একে ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে। ওদের কীর্তির ফুল দিয়ে তৈরি করতে হবে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য মঞ্চ। প্রথমত, এই আন্তর্জাতিক সাফল্যধারীদের আর্থিক বা সুবিধাগত প্রণোদনা নিয়ে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া যেন তার মতো হওয়াটা একটা লোভনীয় ব্যাপার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সমস্যা হলো সবাই তার মতো হবে না, হতে পারবে না, এই সংশয়টাও আবার কিশোরদের পেছন থেকে টেনে রাখে। আর তাই ব্যবস্থাটা হতে হবে এমন যে এই খেলাগুলোতে একটা পর্যায় পর্যন্ত গেলেই জীবনের একটা নিশ্চয়তা হয়। ধরা যাক, যুব পর্যায়ে যারা চ্যাম্পিয়ন হবে তারা সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে জীবন চালিয়ে নেওয়ার মতো একটা কাজ পাবে। খালি চোখে কঠিন মনে হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশেও এই প্রক্রিয়ায় নৌবাহিনী-আনসাররা যে কিছু চাকরি দিচ্ছে না এমন নয়। দরকার ক্ষেত্রটা বিস্তৃত করা। সমন্বিত করা। তা হলে একটা খেলা অনেকে খেলবে এবং একটা খেলা নিয়ে সাধারণ কিশোর মহলে উৎসাহ তৈরি হলে সব সহজ। তখন তাদের সেরারা তারকাখ্যাতি পাবেন স্বাভাবিকভাবেই। লড়াইয়ের তীব্রতার কারণে মান বাড়বে। আবার অনেক মানুষ খেললে স্পন্সররাও লাইন দেবে। প্রক্রিয়াটা চালু হয়ে গেলে তখন বাকিটুকু হবে স্বয়ংক্রিয় মেশিনের মতো। এমনকি আন্তর্জাতিক সাফল্যও। তবে মাথায় রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক সাফল্য অবশ্যই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়, লক্ষ্য খেলাটাতে মানুষের সম্পৃক্তি এবং তার মধ্যে উপভোগ্যতা তৈরি। আমরা খুব সম্ভব ব্যাপারটাকে উল্টো করে দেখছি বলেই সব কিছু গুলিয়ে যাচ্ছে। এবং এর ফলে এই খেলাগুলো হারাচ্ছে, প্রজন্মও খেলা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। দূরে সরে যাচ্ছে! কোথায়! সারা দেশ তো ক্রিকেটের সময় স্ট্যাটাস দিয়ে ফেসবুক ভরে ফেলে! উত্তর আছে।

মাস কয়েক আগে খেলা নিয়ে একটা আলোচনায় এক ভদ্রলোক বক্তব্যটা শেষ করলেন এভাবে, ‘একটা দেশে এককেন্দ্রিক কোনো কিছুই ভালো না। একটা দল, একটা তন্ত্র, একটা খেলা—মঙ্গল বয়ে আনে না।’ রাজনৈতিক খোঁচা ছিল বলে প্রচুর হাততালি পড়ল, কিন্তু খেয়াল করে দেখলাম তিনি ‘একটা খেলা’র যে কথা বলেছেন সেটাও তাত্পর্যময়। সাফল্য আর টাকা আছে বলে সবাই ক্রিকেট খেলতে চায়। ভালো কথা। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয়, সবার তো ক্রিকেট প্রতিভা নেই। দেখা গেল, চেষ্টা করে ক্রিকেটে হচ্ছে না দেখে সে খেলার লাইন থেকেই সরে গেল। কিন্তু এমনও হতে পারে যার ক্রিকেটে কোনো প্রতিভা নেই সে-ই হয়তো সাঁতারে হতে পারে দেশসেরা কিংবা সর্বোচ্চ মানের অ্যাথলেট হওয়ার রসদ হয়তো তার মধ্যে। কিন্তু সেই খেলাগুলো রুগ্ণ খেলা হয়ে যাওয়ার কারণে সেদিকে আর মন যায় না কারো। তাতে করে খেলামুখিতাই কমে যাচ্ছে সমাজে। এবং যদি বলি, সেই শূন্যস্থান দিয়েই ঢুকে পড়ছে মাদক, জঙ্গিত্ব, উগ্রতা তাহলে বোধ হয় খুব ভুলের কিছু হচ্ছে না। আর ওদিকে আন্তর্জাতিক সাফল্য-সাফল্য করতে করতে খেলার যে মূল উদ্দেশ্য—কিশোর-যুবকদের শারীরিক বিকাশ, মানসিক শক্তির সঞ্চার, জীবনের বাধা-বিপত্তিকে স্পোর্টিং স্পিরিট দিয়ে মোকাবেলার শিক্ষা, সেসব থেকে কত যে দূরে সরে যাচ্ছি আমরা। আর তাই সাদা চোখে দেখা যায় খেলার সম্প্রসারণ, কিন্তু আসলে ঘটছে সংকোচন।

প্রায় সব খেলাকে বাদ দিয়ে গড়ে উঠেছে যে খেলার জগৎ তার হয়তো একটা শরীর আছে, কিন্তু হৃদয় নেই। জবরজং অলংকার গায়ে তবু যেন কঙ্কালটা দেখা যায়।



মন্তব্য