kalerkantho



বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডের টপ স্কোরার

রাহেনুর ইসলাম, চট্টগ্রাম থেকে ফিরে    

১৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডের টপ স্কোরার

৩১ মার্চ ১৯৮৬। বাংলাদেশ প্রথম আন্তর্জাতিক ওয়ানডে খেলে এদিনই। এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে মাত্র ৯৪ রানে গুটিয়ে গিয়েছিল গাজী আশরাফের দল। মিনহাজুল আবেদিন নান্নু, গাজী আশরাফ লিপু, রকিবুল হাসানের মতো তারকাদের পেছনে ফেলে সেই ম্যাচে সবচেয়ে বেশি ৩৭ রানের ইনিংস শহিদুর রহমানের। একই টুর্নামেন্টে পরের ম্যাচেও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানের ইনিংস শহিদুরের। মোহামেডানের মতো দলের মিডল অর্ডারে আস্থার নাম হয়ে ওঠা সেই তিনি অবসর নিয়েছেন মাত্র দুটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে।

চাইলে কি আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারটা বাড়াতে পারতেন না আরো? এমন প্রশ্নে এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে নিজের প্রতিষ্ঠান ‘রয়েল হাটে’ বসে হাসতে হাসতে শহিদুর বলছিলেন, ‘আমাদের সময়ে ক্রিকেটে টাকা ছিল না। আমিও টাকার পেছনে দৌড়াইনি। কিন্তু জীবন তো কাটাতে হবে। আমার বাবা মারা যাওয়ার পর ধাক্কা খাই। এত দিন সব কিছু দেখভাল করতেন আমার বাবা। তিনি মারা যাওয়ার পর সংসার চালানোর একটা ব্যাপার চলে আসে। তাই পরিবার আর সংসারের জন্য খেলা ছাড়তে বাধ্য হই আমি। শুরু করি গার্মেন্টের ব্যবসা।’

শ্রীলঙ্কার মরোতুয়ায় প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচেই পড়েছিলেন ইমরান খান, ওয়াসিম আকরাম, আব্দুল কাদিরদের সামনে। তবু আতঙ্কে কুঁকড়ে যাননি শহিদুর রহমান, ‘৩৭ রান এমন কিছু নয়, তবু দেশের প্রথম ম্যাচে সর্বোচ্চ রানের ইনিংস তো। প্রতিটা শট, প্রতিটা রান হয়তো মনে নেই। তবে ম্যাচ খেলতে নামার আগে যে উত্তেজনা সেটা অনুভব করি এখনো। পাকিস্তানিরা স্লেজিং করছিল শুরু থেকে। ইমরান, আকরামরা গালি দিতে পারে, কল্পনাও করিনি কোনো দিন।’

ম্যাচের আগের দিন প্রবল বৃষ্টি ছিল। ভেজা মাঠে শহিদুরের অনেক শট বাউন্ডারি লাইনের আগে থেমে গিয়েছিল সেদিন। নইলে স্কোরটা আরো বেশি হতে পারত বলে মনে করেন তিনি, ‘আমার ইনিংসটা আসলে ৬০-৭০ রানের ছিল। নিশ্চিত কয়েকটা বাউন্ডারি থেমেছে লাইনের আগে।’ সর্বোচ্চ রানের ইনিংসের জন্য তখনকার বোর্ড সভাপতি কে জেড ইসলাম ৩০০ ডলার দিয়েছিলেন শহিদুর রহমানকে। টাকাটা সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিয়েছিলেন তিনি, ‘পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলে ম্যাচ ফি পাইনি আমরা। বোর্ডে তখন টাকার অভাব। এশিয়া কাপে অংশ নেওয়ায় অ্যাপিয়ারেন্স মানি দেওয়া হয়েছিল ৫০ হাজার ডলার। সেই টাকার প্রায় পুরোটাই নিজেদের কোষাগারে জমা করে বোর্ড। আমাকে দেওয়া ৩০০ ডলার ভাগাভাগি করেছি সবার সঙ্গে।’

১৯৯১ সাল পর্যন্ত ঢাকার প্রথম বিভাগ ক্রিকেটে খেলেছেন শহিদুর রহমান। ঢাকার বড় ক্লাবে ১৯৮৫ সালে প্রথম যোগ দেন আবাহনীতে। পরের মৌমুমে চলে যান মোহামেডানে। এখানে জিতেছেন দুটি প্রথম বিভাগ লিগ। অবসর নেন কলাবাগানে ১৯৯১ সালে খেলে। পাঁচ বছরের ক্যারিয়ারে আবাহনী, মোহামেডান, কলাবাগানের মতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবে খেলার সুযোগ পাওয়াটা গর্বের তাঁর কাছে। তাঁর শুরুটা অবশ্য বাংলাদেশ রেলওয়ের হয়ে। সেই স্মৃতি হাতড়ে জানালেন, ‘ঢাকার ক্রিকেটে চট্টগ্রামের ক্রিকেটারদের সেতু ছিল রেলওয়ে। বড় ভাই মজিবুর রহমান রাজি করান বাবাকে। তিনিও আন্তর্জাতিক ম্যাচ না হলেও জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন হায়দরাবাদ ব্লুজের বিপক্ষে। একই ম্যাচে আমিও খেলেছি। চট্টগ্রামে নান্নু-নোবেল ভাইদের কথা জানে সবাই। শহিদুর-মজিবুর ভাইদের ব্যাপারে কিন্তু সিনিয়ররা ছাড়া জানে না কেউ।’

চট্টগ্রামের নান্নু, নোবেল, মাসুমের মতো ব্যাটসম্যানরা ঢাকা প্রথম বিভাগ ক্রিকেট বদলে দিয়েছেন বলে দাবি করলেন শহিদুর, ‘একটা ব্যাপার ঘটেছিল তখন। আমরা চট্টগ্রামের ছেলেরা ঢাকার ক্রিকেটে আসার পর বদলে যায় লিগের চেহারা। চট্টগ্রামের সবাই ডট বল কম খেলতাম আমরা। তখন ১৬০-১৮০ রান অনেক বড় স্কোর। আমাদের ব্যাটিংয়ে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ২০০-২২০ কিংবা কখনো কখনো ২৫০ রানে। এই কৃতিত্বটা চট্টগ্রামকে দিতেই হবে।’



মন্তব্য