kalerkantho


বিবেচনায় থাকা নাঈমের পরীক্ষা

নোমান মোহাম্মদ    

১৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



বিবেচনায় থাকা নাঈমের পরীক্ষা

অধিনায়ক হিসেবে টস করতে নেমেছেন। প্রথম দুই দিন করেছেন ফিল্ডিংও। কিন্তু বিসিএলের সর্বশেষ রাউন্ডে বগুড়ার ম্যাচের দ্বিতীয় দিন চা-বিরতির সময় দেখলেন গায়ে গোটা গোটা কী যেন উঠছে! রাতের মধ্যেই তা সারা শরীর যায় ছেয়ে। চিকেন পক্স হয়েছে নাঈম ইসলামের!

বিদ্রূপ মেশানো আর্তনাদটি তাঁর কণ্ঠে বাজে তাই বড্ড করুণ সুরে, ‘সবার চিকেন পক্স হয় ছোটবেলায় আর আমার কিনা এই সময়ে! যখন জাতীয় দলে ফেরার একটা সুযোগ তৈরি হতে পারে। আমার সঙ্গেই কেন যে বারবার এমন হয়!’

নাঈমের এই হাহাকারে সমব্যথী না হয়ে উপায় নেই। তাঁর শেষ বাক্যে আলগোছে যেন শ্লেষ মিশে থাকে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে যতিচিহ্ন পড়ার ঘটনায়। বাংলাদেশের জার্সিতে সর্বশেষ টেস্ট সিরিজ খেলেছেন ২০১৩ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। সেই সিরিজের প্রথম টেস্টে ২৫৫ বলে ১০৮ রানের অনবদ্য ‘টেস্ট ইনিংস’ আসে নাঈমের ব্যাট থেকে। অথচ এরপর ব্রাত্য হয়ে গেলেন! সর্বশেষ যে ওয়ানডে সিরিজে সবগুলো ম্যাচ খেলেছেন, সেই ২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেও দুই দল মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১৬৩ রান তাঁর; তিন ম্যাচে দুই ফিফটিতে। টেস্ট-ওয়ানডের সর্বোচ্চ রানের ইনিংস দুটি এই দুটো সিরিজেই। এরপর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের এক ম্যাচে (৩২) এবং এশিয়া কাপে ভারত (১৪), আফগানিস্তানের (৩৫) বিপক্ষেও কী এমন খারাপ করেছেন! বিশেষত ওই বছরে বাংলাদেশের ভরাডুবির ইতিহাস মাথায় রাখলে।

তবু কেন যে উপেক্ষিত হয়ে পড়লেন নাঈম! এ কারণেই তো কাল তাঁর কণ্ঠে তিরতিরে আবেগের কাঁপন, ‘ভাগ্য-দুর্ভাগ্যের কথা আর কী বলব! আমার সঙ্গে বোধ হয় এমনই হওয়ার কথা ছিল।’

কিন্তু উপেক্ষার জবাব দেওয়ার একটি অস্ত্রও তো রয়েছে বাংলাদেশের জার্সিতে আট টেস্ট, ৫৯ ওয়ানডে ও ১০ টি-টোয়েন্টি খেলা এই ব্যাটসম্যানের। ব্যাট! ঘরোয়া ক্রিকেটে জবাবটি দিচ্ছেন প্রতিনিয়ত। এই যেমন কিছুদিন আগে শেষ হওয়া ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে (ডিপিএল) ১৬ ম্যাচে এক সেঞ্চুরি ও ছয় ফিফটিতে ৫৫.৩৮ গড়ে করেছেন ৭২০ রান। রান সংগ্রাহকের তালিকায় তিন নম্বরে লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জের এই ব্যাটসম্যান। আগের আসরে ১০ ম্যাচে দুটি করে সেঞ্চুরি-হাফ সেঞ্চুরিতে নাঈমের রান ৫২৭। গড় ৬৫.৮৭। বিসিএলের চলতি আসরটি ভালো যাচ্ছে না তেমন। তবে গত আসরেই ৬ ম্যাচের ৯ ইনিংসে ৮২.১৪ গড়ে করেছিলেন ৫৭৫ রান। সর্বোচ্চ রানের তালিকায় যা দ্বিতীয়তে। সর্বশেষ জাতীয় ক্রিকেট লিগে অবস্থান চার নম্বরে। ছয় ইনিংসে ৮৪.৪০ গড়ে ৪২২ রান নিয়ে।

নাঈম তাই হাল ছাড়েন না। বয়স ৩১ বছর পেরিয়ে গেলেও জাতীয় দলে ফেরার আশার মশাল জ্বলে ঠিকই। এবং তা টেস্ট-ওয়ানডে দুই ফরম্যাটেই, ‘সবার মধ্যে কেমন যেন ধারণা হয়ে গেছে আমি টেস্ট ব্যাটসম্যান। অথচ এবারের ঢাকা লিগ দেখুন। সেখানে আমার স্ট্রাইকরেট ৮৭ (৮৭.৩৭), বিজয়ের (এনামুল হক) ৮৯ (৮৯.৫৩)। অথচ সবার ধারণায় মনে হয়, আমার স্ট্রাইকরেট ৭০ আর বিজয়ের দেড় শ। ওর কথা বললাম উদাহরণ হিসেবে। আসলে আমাকে কেমন যেন ভুল বোঝা হয়।’ কিন্তু নিজের সামর্থ্য সম্পর্কে আস্থা থাকায় জাতীয় দলে দুই ফরম্যাটেই নিজের অবদান রাখার সুযোগ দেখেন নাঈম, “আমি মনে করি, বাংলাদেশের হয়ে আবার খেলার যোগ্যতা আমার রয়েছে। নির্বাচকরাও আমাকে একেবারে হিসাবের বাইরে রাখেননি। গত বছর ‘এ’ দলের হয়ে জিম্বাবুয়ে সফরে গিয়েছিলাম। কিন্তু ভালো করতে পারিনি। এবার সামনে তো ‘এ’ দলের বেশ কিছু সিরিজ। সেখানে সুযোগ পেলে ভালো করার আপ্রাণ চেষ্টা করব। কিন্তু এমন সময়ই চিকেন পক্সটা...”

নাঈমের কথা মিলিয়ে যায় হাওয়ায়। হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাসে।

হাবিবুল বাশারের কথা শুনলে অবশ্য আশ্বস্ত হতে পারেন তিনি। চিকেন পক্সের দুর্ভাগ্য প্রাপ্য সুযোগটা কেড়ে নেবে না বলেই ইঙ্গিত এই নির্বাচকের কথায়, “অবশ্যই বিসিএলের ম্যাচগুলো খেলতে পারলে ওর জন্য ভালো হতো। তবে তা না হওয়ায় ‘এ’ দলের বিবেচনার বেলায় নাঈমের সুযোগ কমে গেল, আমার সেটি মনে হয় না। গত কয়েক মৌসুমে অন্তত ‘এ’ দলে সুযোগ পাওয়ার মতো যথেষ্টই করেছে নাঈম।” এই ব্যাটসম্যানের দুর্ভাগ্য তিনি দেখেন অন্য জায়গায়, “নাঈম যদি ওপেনার বা তিন নম্বরে খেলে এত রান করত, তাহলে প্রায় নিশ্চিতভাবেই এত দিনে জাতীয় দলে ফিরত। কিন্তু ও খেলে মিডল অর্ডারে, যেখানে মুশফিক-সাকিব-রিয়াদরা (মাহমুদ উল্লাহ) রয়েছে। এটি আসলে ওর দুর্ভাগ্য। তবে ও আমাদের পরিকল্পনায় ভালোভাবেই রয়েছে। ‘এ’ দলের সিরিজ খেললে বোঝা যাবে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার কোন পর্যায়ে রয়েছে।”

জিম্বাবুয়ের ‘এ’ দলের বিপক্ষে আগের এমন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি নাঈম। তবে আসছে সিরিজে তারও কোনো প্রভাব থাকবে না বলে জানিয়েছেন নির্বাচক হাবিবুল, ‘হ্যাঁ, ওই সিরিজটি ভালো করলে ওর সম্ভাবনা বাড়ত। কিন্তু তাই বলে ও আমাদের হিসাব থেকে বাদ হয়ে যায়নি।’ জাতীয় দলের আরেক ব্রাত্য তুষার ইমরানের রানের ঝরনা শুধু দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে। নাঈমের বেলায় তা ৫০ ওভারের খেলায়ও। আর ধীরে খেলার ধারণার বিপক্ষে তো নিজের স্ট্রাইকরেটকেই দাঁড় করিয়েছেন বর্ম হিসেবে। হাবিবুল অবশ্য এই ব্যাটসম্যানের বিবেচনার নির্দিষ্ট কোনো ফরম্যাটের কথা বলেননি, ‘নাঈমকে নিয়ে আলাদা ফরম্যাটের জন্য আলাদা করে ভেবেছি, তা নয়। তবে এটি আবারো জোর দিয়ে বলতে পারি, ও আমাদের বিবেচনায় আছে।’

ওইটুকুনই শুধু চান নাঈম—বিবেচনায় থাকা। চান আরেকটি পরীক্ষা দিতে। জিম্বাবুয়ের ‘এ’ দলের বিপক্ষে পারেননি, তাই বলে শ্রীলঙ্কা ‘এ’ দলের বিপক্ষেও পারবেন না, এমন তো কথা নেই। পারলেও হয়তো জাতীয় দলের মিডল অর্ডারের রথী-মহারথীদের অবস্থান নাড়িয়ে দিতে পারবেন না। তবে নির্বাচকদের তো ‘মধুর সমস্যা’ উপহার দিতে পারবেন নাঈম!

যে ‘সমস্যা’য় পড়তে নিশ্চয়ই আপত্তি থাকার কথা নয় মিনহাজুল আবেদীন, হাবিবুল বাশারদেরও!



মন্তব্য

Nayon commented 3 days ago
I don't agree with Bashar.You can take him.No place is fixed.Give chance him 3/4 position?Nayeem and Tushar are the perfect and best Batsman in Bangladesh.