kalerkantho


অথচ এই ম্যাচে খেলারই কথা ছিল না সাকিবের

১৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



অথচ এই ম্যাচে খেলারই কথা ছিল না সাকিবের

আবেগ খুব একটা স্পর্শ করে না তাঁকে, বেশির ভাগ সময়ই চোখে-মুখে খেলা করে নিস্পৃহ এক অভিব্যক্তি। কিন্তু কাল সাকিব আল হাসানকে একটা সময় দেখে মনে হয়েছিল, আগ্নেয়গিরির মানবমূর্তি!
শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ ম্যাচের শেষ ওভার চলছে। ইসুরু উদানার বলে লেগ আম্পায়ার নো বলের সংকেত দিলেন, কারণ বল গিয়েছিল ব্যাটসম্যান মুস্তাফিজুর রহমানের মাথার ওপর দিয়ে। কিন্তু পরে দুই আম্পায়ার মিলে আলাপ করে বাতিল করেন নো বলের সংকেত। এতেই রেগে আগুন সাকিব। মাহমুদ উল্লাহ ও মুস্তাফিজকে ইশারা করছিলেন মাঠ ছেড়ে চলে আসতে। পরে নিজেই ডাগআউট থেকে চলে যান ড্রেসিং রুমে। এরপর যা হয়েছে, তাতে রীতিমতো জার্সি খুলে উদ্যাপন করেছেন সাকিব। বিশ্বের মানচিত্রের নানা জায়গায় ছোটাছুটি করে, শেষ মুহূর্তে দলে এসে যোগ দিয়েছেন। তারপর দলকে এমন একটা অবস্থা থেকে জিততে দেখা, এমন দিনেই না আবেগের বাঁধ খুলে যায়!
সাকিব নিজেও একবার ভেবেছিলেন, একটু গা বাঁচিয়ে চলার, ‘পাপন ভাই (বোর্ড সভাপতি) বলেছিলেন, তুমি যদি বোলিংটাও করে দাও তাহলে দলের খুব উপকার হয়। আমি একবার ভাবলাম, গা বাঁচিয়ে থাকি। বলে দেই যে আমি ম্যাচ ফিট না। কিন্তু পর মুহূর্তেই মনে হলো, আমি চেষ্টা করে দেখি। জানি, ১০০ ভাগ উজাড় করে দিতে পারব না, কিন্তু দলের যতটুকু কাজে লাগব সেটাই করি।’ মাত্র এক দিন অনুশীলন করে মাঠে নেমে যাওয়া সাকিব কিন্তু চ্যালেঞ্জটা নিয়েছেন প্রথম মুহূর্ত থেকেই, ‘আমি কিন্তু প্রথম ওভারেই বোলিং করতে এসেছি। যদি চাইতাম পরেও আসতে পারতাম।’ বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে নিজে বা নাজমুল হোসেনকে কেন বোলিংয়ে আনেননি, সেই ব্যাখ্যায় বললেন, ‘অধিনায়ক হিসেবে আমি যতগুলো সিদ্ধান্ত নেব, সব হয়তো সঠিক হবে না। তবে আমি সে সময় একটা উইকেট তুলতে মরিয়া ছিলাম, তাই অন্য বোলারদের দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে গেছি। খেলাটার ধরনই এ রকম যে শেষ হয়ে যাওয়ার পর অনেক কিছুই বলা যায়। তবে আমি যে সিদ্ধান্তই নিয়েছি, দলকে জেতানোর জন্যই নিয়েছি। কিছু কাজে লাগবে, কিছু লাগবে না।’ শেষ ওভারে ১২ রান নিয়ে দলকে জেতানো মাহমুদ উল্লাহর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা সাকিবের, ‘রিয়াদ ভাই যেভাবে ব্যাটিং করলেন, অসাধারণ। আমাদের দলের মধ্যে, শেষ পাঁচ ওভারে এ রকম ক্লিন হিট করতে আমি কাউকে দেখিনি।’ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচটায় দলকে জিতিয়েছিল মুশফিকুর রহিমের ব্যাটিং, কাল সেই দায়িত্বটা পালন করেছেন মাহমুদ উল্লাহ। বেঙ্গালুরুতে ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টির বিশ্ব আসরের সেই ম্যাচে এই দুজনই হয়েছিলেন খলনায়ক। কলম্বো তাঁদের দুজনকেই হয়তো দিয়েছে দায়মুক্তি। সাকিব মনে করেন, সেই অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো শিখেছেন এই দুজন, ‘আসলে সব খারাপ ম্যাচ থেকেই আমরা কিছু না কিছু শিখেছি। উনারা (মুশফিক ও মাহমুদ উল্লাহ) ওই দিন ও রকম একটা পরিস্থিতিতে ছিলেন বলেই জানেন কী করে এই রকম ম্যাচ জিততে হয়। সেই অভিজ্ঞতাটাই তাঁরা কাজে লাগিয়েছেন।’
ব্যাটিংয়ে তামিম, মাহমুদ উল্লাহর প্রশংসা করলেও বোলারদের কথাটা ভুলে যাচ্ছেন না সাকিব, ‘আমরা কিন্তু খুব ভালো বোলিং করেছি, অন্তত প্রথম ১০টা ওভার। এটা ১৮০-১৯০ রানের উইকেট ছিল। আমরা দ্রুত কিছু উইকেট তুলে নেওয়াতেই পাওয়ার প্লেতে ওরা রান তুলতে পারেনি, তাই শেষ পর্যন্ত রানটা বড় হয়নি।’ সেই মাঝারি সংগ্রহ তাড়া করতে গিয়েও তো মাঝপথে হোঁচট খেয়েছিল বাংলাদেশ। মাহমুদ উল্লাহর ছক্কায় নিশ্চিত হওয়া জয় সাকিবকে ভুলিয়ে দিয়েছে গত পৌনে দুই মাসের সব দুঃখ, ‘গত পৌনে দুইটা মাসকে আসলে রোলার কোস্টার রাইডই বলতে পারেন। ব্যাংকক গেলাম, অস্ট্রেলিয়া গেলাম, কলম্বো এলাম, ঢাকা গেলাম, আবার কলম্বো এলাম। মাত্র এক দিন অনুশীলন করে মাঠে নামলাম। এ রকম আবেগের উত্তাপ জড়ানো একটা ম্যাচের পর বিজয়ী অধিনায়কের চেয়ারে বসে আছি, এটা অনেক বড় ব্যাপার।’
স্মৃতিকাতর বলে সুনাম নেই সাকিবের। তাই মনে করতে পারছেন না, এটাই তাঁর খেলা সবচেয়ে রোমাঞ্চকর টি-টোয়েন্টি ম্যাচ কি না। তবে জানালেন, দেশের জার্সিতে অবশ্যই সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও আবেগের উত্তাপমাখা ম্যাচই ছিল এটা। অথচ চাইলেই এই ম্যাচটা না খেলে দিব্যি দেশে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে পারতেন সাকিব। অংশ নিতে পারতেন বিজ্ঞাপনের শুটিংয়েও। সেটা না করে যে সাকিব উড়ে এলেন কলম্বোয়। ভাগ্যিস এসেছিলেন। ব্র্যান্ড বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডরকে ছাড়া যে ফাইনালটাই জমত না!

 



মন্তব্য