kalerkantho


টি-টোয়েন্টির ‘ব্র্যান্ড বাংলাদেশ’

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



টি-টোয়েন্টির ‘ব্র্যান্ড বাংলাদেশ’

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের খ্যাতি বিশ্বব্যাপী। বিশ্বের বড় বড় সব ফ্যাশন হাউস থেকে কেনা শার্টের কলারের ভেতর পাওয়া যাবে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লেখা ট্যাগ। বাংলাদেশের পাটজাত পণ্য, নকশিকাঁথা, জামদানি—অনেক কিছুই তো সমাদৃত ভিনদেশিদের কাছে। এবার বাংলাদেশের ক্রিকেটেরও একটা ব্র্যান্ড ইমেজ দাঁড় করাতে চাইছেন দলের শীর্ষ ক্রিকেটাররা। নিজেদের পারফরম্যান্স আর খেলার ধরন দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ‘ব্র্যান্ড বাংলাদেশ’।

২০১৫ বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের কথায় একটা বিশেষণ খুব শোনা যেত। ‘ফিয়ারলেস ক্রিকেট’ বা ভয়ডরহীন ক্রিকেট, যে দর্শনে মাত্র একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেই বিশ্বকাপ স্বপ্নযাত্রায় সঙ্গী হয়েছিলেন সৌম্য সরকার। বাঁহাতি স্পিন-নির্ভরতা থেকে বাংলাদেশ বদলে গিয়েছিল পেস-নির্ভর বোলিং আক্রমণের দলে। ওয়ানডে ও ঘরের মাঠে টেস্টে সাফল্য এলেও টোয়েন্টি টোয়েন্টি ম্যাচে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স সব সময় ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু শ্রীলঙ্কার সঙ্গে টি-টোয়েন্টিতে ২১৪ রান তাড়া করে জেতার পর টি-টোয়েন্টিতেও ‘ব্র্যান্ড বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা করার দৃঢ় প্রত্যয় দলের সিনিয়র ক্রিকেটারদের কণ্ঠে। বাংলাদেশি ব্র্যান্ডের টি-টোয়েন্টি, শব্দটার প্রচলন তামিম ইকবালের কথা থেকে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২৯ বলে ৪৭ রানের ইনিংস খেলার পর সংবাদ সম্মেলনে আসা তামিম বলেছিলেন, ‘আমাদের কোনো ক্রিস গেইল নেই যে প্রথম থেকেই ছক্কা মারতে পারে, আমাদের কোনো মহেন্দ্র সিং ধোনিও নেই যে সাতে নেমে খেলা শেষ করে দিয়ে আসতে পারে। তবে আমাদের একদল চৌকস, বুদ্ধিদীপ্ত ক্রিকেটার আছে, যারা অন্য রকম। আমরা সেই বাংলাদেশি ব্র্যান্ডের ক্রিকেটটাই দেখাতে চাই। খেলাটা সব সময়ই শুধু চার-ছয় মারার নয়। মাঝের ওভারগুলোতে আমরা অনেক সিঙ্গেল নিয়েছি, বাউন্ডারি তো আসবেই। কোনো কিছুই শেষ হয়ে যায়নি, এ তো কেবল শুরু মাত্র।’

মহাকাব্যিক জয়ের মহানায়ক মুশফিকুর রহিমও শুনিয়েছেন ‘ব্র্যান্ড বাংলাদেশ’ নিয়ে তাঁর ধারণা, ‘প্রতিপক্ষ কী করছে সেটা নিয়ে না ভেবে নিজেদের কতটা সামর্থ্য আছে সেটা নিয়েই বেশি ভাবা উচিত। টি-টোয়েন্টিতে আমরা ততটা ভালো দল নই, তবে আমরা কিন্তু অত বেশি ম্যাচও খেলি না। একটা দলের পরিকল্পনা ও কৌশল তৈরি হতে অনেক সময় লাগে। এরপর ফল না এলে বিশ্বাস ধরে রাখা কঠিন। তামিম যেটা বলেছে সেটা সত্যি, আমাদের হয়তো টপ অর্ডারে তেমন কেউ নেই যে ১০-১৫ বলে ৪০-৫০ রান করে দেবে, তবে বেশ কজন স্মার্ট ক্রিকেটার আছে, যারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারলে টি-টোয়েন্টিতেও আমাদের ভালো সম্ভাবনা আছে।’

সবশেষে গতকাল এই ব্র্যান্ড বাংলাদেশ নিয়ে নিজের ভাবনার কথা জানিয়েছেন অধিনায়ক মাহমুদ উল্লাহও। তাঁর ভাবনাতেও টি-টোয়েন্টি মানে মারমার কাট কাট ব্যাটিং নয়, ১২০ বলে মাপজোক করে সুযোগ নেওয়া, ‘যখন আমরা এই সফরের জন্য প্রস্তুতি শুরু করি, তখনই ঠিক করেছিলাম যে এই খেলাটায় আমাদের মান বাড়াব, যেটা হবে বাংলাদেশি ঘরানার টি-টোয়েন্টি। আমাদের কোনো পাওয়ার হিটার নেই, তবে সেই ঘাটতিটা পূরণে আমাদের চৌকস ও বুদ্ধিদীপ্ত হতে হবে। এটা হতে পারে নির্দিষ্ট কোনো একটি বোলারের দুর্বলতা খুঁজে বের করা, সেটা অন্য সতীর্থকে বলা—এ রকম সব ব্যাপার। বুদ্ধিদীপ্ত ক্রিকেট খেলতে পারলেই মেপে ঝুঁকি নেওয়া সম্ভব। মানছি আমাদের কিছু জায়গায় ঘাটতি আছে, কিন্তু বুদ্ধি করে খেললে সেই জায়গাগুলো কমিয়ে আনাও সম্ভব।’

এখন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে প্রত্যেক দলেরই কোনো না কোনো নিজস্ব বৈশিষ্ট্য দাঁড়িয়ে গেছে। সেটা হতে পারে ক্যারিবিয়ান উন্মত্ততা, পাকিস্তানি অনিশ্চয়তা, নিউজিল্যান্ডের অলরাউন্ডার অ্যাপ্রোচ কিংবা অস্ট্রেলিয়ার হারার আগে হেরে না যাওয়ার অদম্য মানসিকতা। এই জায়গাটাতেই বাংলাদেশ যোগ করতে চায় নিজেদের ‘সিগনেচার স্টাইল’; বাংলাদেশের ক্রিকেট। যে ক্রিকেটে মিশে আছে পদ্মা-মেঘনা-সুরমার ঢেউ, সুন্দরবনের বাঘের গর্জন। মার্টিন গাপটিলের মতো মারমুখী হবেন লিটন দাশ, ডেভিড ওয়ার্নারের মতো ধ্বংসাত্মক হবেন সৌম্য সরকার, তামিম ইকবাল খেলবেন নিজস্ব মেজাজে, নীরব ঘাতক হবেন মাহমুদ উল্লাহ আর নির্ভরতার অন্য নাম হয়ে উঠবেন মুশফিক। তাদের মিলেই তো হবে ‘ব্র্যান্ড বাংলাদেশ’। অবশ্য বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর যে মানুষটি, সেই সাকিব আল হাসানই নেই এই আসরে। আঙুলের চোট তাঁকে বসিয়ে রেখেছে দলের বাইরে। সাকিব ফিরে এলে নিশ্চিতভাবেই সেই ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটি বেগবান হবে আরো।



মন্তব্য