kalerkantho


ফার্স্ট বয়ই এখন ব্যাকবেঞ্চার!

সামীউর রহমান, কলম্বো থেকে   

৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ধরা যাক, একটা স্কুলের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে অনেক বছর পর তিন সহপাঠীর দেখা। ক্লাসে তাদের রোল নম্বরের যে ক্রম, বহু বছরের ব্যবধানে পেশাগত জীবন আর সামাজিক সম্মানের মাপকাঠিতে সেটা একদমই উল্টে গেছে! ফার্স্ট বয় হয়ে গেছে লাস্ট, আর লাস্ট বয় হয়ে গেছে ফার্স্ট। এমনটাই হয়তো হয়, জীবনের লম্বা দৌড়ে কেউ পিছিয়ে পড়ে, কেউ এগিয়ে যায়। ঠিক যেমনটা হয়েছে কোর্টনি ওয়ালশ, রবি শাস্ত্রী আর চন্দিকা হাতুরাসিংহের জীবনে।

খেলোয়াড়ি জীবনের খ্যাতি, সাফল্য, অর্জন—সব কিছুতেই বাকি দুজনের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন ক্যারিবিয়ান ফাস্ট বোলার ওয়ালশ। রবি শাস্ত্রী ভারতীয় দলে লম্বা সময় খেলেছেন, তারকাখ্যাতিও ছিল, কিন্তু ঠিক মধ্যমণি হয়ে উঠতে পারেননি কখনোই। আর হাতুরাসিংহে? তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনটা চোখে না পড়ার মতোই। অথচ এই মুহূর্তে নিদাহাস ট্রফির তিন দলের কোচদের ভেতর অবস্থানগত দিক দিয়ে সবার আগের নামটি হাতুরাসিংহেরই। আর ওয়ালশ? ফার্স্ট বয় থেকে এখন তিনি ব্যাকবেঞ্চার! কোচ হিসেবে যেমন, তেমনি অর্থের অঙ্কেও।

২০১৫ বিশ্বকাপ ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সাফল্যের অন্যতম প্রভাবক ছিল পেস বোলিং বিভাগের লক্ষণীয় উন্নতি। অথচ এই সময়ে এসে বাংলাদেশের অন্যতম মাথাব্যথার নাম পেস বোলিং। এই বিভাগই দেখভালের দায়িত্বে থাকা ওয়ালশের সঙ্গে ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ অবধি চুক্তি বিসিবির। বছরে ২০০ দিন কাজ করবেন এই ক্যারিবিয়ান বোলিং কিংবদন্তি, পাচ্ছেন দিনপ্রতি ৫০০ ইউএস ডলার করে! অথচ খেলোয়াড়ি জীবনে তাঁর চেয়ে খ্যাতি, সাফল্য, অর্জনে অনেক পিছিয়ে থাকারাও এখন বিভিন্ন জায়গায় কোচ হিসেবে গুচ্ছের ডলার কামাচ্ছেন। অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হিসেবে বাংলাদেশ দলের সঙ্গে শ্রীলঙ্কায় এসেছেন ওয়ালশ। তাও আবার যে দলের কোচ হিসেবে, সেই দলটিও তো অংশগ্রহণকারী তিন দলের ভেতর সবচেয়ে খারাপ অবস্থায়।

অন্য দুই দলের কোচ খেলোয়াড়ি জীবনের অর্জনে ওয়ালশের চেয়ে যোজন যোজন পিছিয়ে। শাস্ত্রী তাও ১৯৮৩-র বিশ্বকাপ জয়ী দলে ছিলেন, সুনীল গাভাস্কারদের আলোয় ঢাকা পড়েও জাতীয় দলে খেলেছেন লম্বা সময়। যদিও তাঁর ব্যাটিং এবং বাঁহাতি স্পিন, কোনোটাই খুব আকর্ষণীয় ছিল না। তবে ব্যক্তিত্বের প্রখরতার সঙ্গে খেলোয়াড়ি জীবনের পর ধারাভাষ্যকার হিসেবেও পরিচিত কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা শাস্ত্রী দ্বিতীয় মেয়াদে ভারতের কোচ হয়েছেন, অনিল কুম্বলেকে সরিয়ে। ঠিক কী প্রক্রিয়ায় হয়েছেন, সেটা যদিও প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ কুম্বলে তাঁর কড়া শাসন ও শৃঙ্খলার জন্য খেলোয়াড়দের অপছন্দের পাত্র বনে গিয়েছিলেন। সহজ কথায় বললে, বিরাট কোহলি চেয়েছেন বলেই রবি শাস্ত্রী ফিরেছেন ভারতের কোচের পদে। বছরে বেতন ১.১৭ মিলিয়ন ডলার! বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বেতনের ক্রিকেট কোচের চাকরিটা করছেন শাস্ত্রী।

খেলোয়াড় চন্দিকা হাতুরাসিংহে ১৯৯৬-র বিশ্বকাপ জয়ী দলের অংশ ছিলেন বটে, তবে একাদশে ছিলেন না একটি ম্যাচেও। ১৯৯৯-র বিশ্বকাপে দলে জায়গা না পাওয়ার মধ্য দিয়েই একরকম ইতি ঘটে যায় হাতুরাসিংহের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের। শ্রীলঙ্কার ঘরোয়া ক্রিকেটের অভিজাত এবং সফল কোনো দলেও খেলেননি। খেলেছেন তামিল ইউনিয়ন আর মুরস ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে। এমনকি সেইন্ট থমাস বা রয়্যাল কলেজের মতো কোনো অভিজাত স্কুলেও পড়েননি। অথচ এই হাতুরাসিংহেই এখন শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। কোচ ও নির্বাচক, তাঁকে দ্বৈত ভূমিকা দেওয়ার জন্য রীতিমতো আইন পরিবর্তন করেছে বোর্ড। বাংলাদেশে মাসে প্রায় ২৮ হাজার ডলার বেতন পেতেন, এর চেয়ে বেশি পারিশ্রমিকে নিশ্চয়ই তাঁকে জাতীয় দলের কোচ করেছে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট (এসএলসি)।

জীবনের দৌড়ে শুরুর ল্যাপগুলোতে ওয়ালশই ছিলেন এগিয়ে। শাস্ত্রী সবার সামনে না থাকলেও একেবারে পেছনে ছিলেন না কখনো। আর হাতুরাসিংহে ছিলেন এঁদের মধ্যে সবার পেছনে। অথচ খেলা ছাড়ার কয়েক দশকের মধ্যেই হাতুরাসিংহে চলে এসেছেন সবার আগে। ব্যাংক অ্যাকাউন্টের স্ফীতিতে হয়তো শাস্ত্রীই এগিয়ে, কিন্তু কোচ হিসেবে হাতুরাসিংহের প্রোফাইল অনেক উঁচু হয়েছে বাংলাদেশকে বদলে দিয়ে। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে ক্ষমতা। শাস্ত্রী নিজেও জানেন, শেষ কথাটা কোহলির তবে শ্রীলঙ্কা দলে হাতুরাসিংহের কথাই আইন। আর ওয়ালশ? তাঁর দলের মতো তিনি নিজেও এখানে ব্যাকবেঞ্চার!



মন্তব্য