kalerkantho



কলম্বো ডায়েরি

জরুরি অবস্থায়ও থেমে নেই কলম্বো

সামীউর রহমান, কলম্বো থেকে   

৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



‘জরুরি অবস্থা’ এই শব্দ দুটির মধ্যেই কেমন যেন একটা দম বন্ধ করা ব্যাপার আছে। শুনলেই মনে হবে চারদিক সুনসান, রাস্তায় উর্দিধারী সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মীর পাহারা আর একটি ঝড়ের আগের অবস্থার মতো থমথমে গুমোট ভাব। ঢাকা থেকে কলম্বোর পথে উড়াল দেওয়ার বার্তাটা ফেসবুকে জানিয়েছিলাম; মুম্বাই হয়ে কলম্বোয় পা রাখার আগেই দেখি তাতে শুভানুধ্যায়ীদের সতর্কবার্তা। অথচ বিমানবন্দর থেকে হোটেল, প্রায় কুড়ি-পঁচিশ কিলোমিটার রাস্তায় ‘জরুরি অবস্থা’সুলভ কিছুই তো চোখে পড়ল না! বরং রাত সাড়ে ১১টার দিকে ম্যাকডোনাল্ডসে ফোন করে অর্ডার দিয়ে খাবার ডেলিভারি আনাবার পর সন্দেহটা আরো বাড়ল। চক্ষু-কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন হয়েছে পরদিন খবরের কাগজ দেখার পর। সেই সঙ্গে ইন্টারনেটের ধীরগতি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা— এসব উপসর্গে পাওয়া যাচ্ছে জরুরি অবস্থার আঁচ।

মঙ্গলবার কলম্বোর বন্দরনায়েকে বিমানবন্দরে পা রাখতে রাখতে এখানে জরুরি অবস্থার এলান করে দিয়েছেন শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি মাইত্রিপালা সিরিসেনা। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার আন্দাজে ভেবেছিলাম, সাংবাদিক বলে বিমানবন্দরে হয়তো অনেক প্রশ্নেরই উত্তর দিতে হবে। কিন্তু আগমনী ভিসা সংগ্রহ, ইমিগ্রেশন ইত্যাদি প্রক্রিয়া এত সহজে হলো, সেটা বিস্ময়কর। বিমানবন্দরের এক জায়গায় টিভিতে শ্রীলঙ্কা-ভারত ম্যাচ দেখছেন অনেকে। বিদেশি মুদ্রা বিনিময়ের ব্যাংকের বুথেও চলছে টিভি, বেশির ভাগেরই নজর ওদিকে। শিখর ধাওয়ান তাঁদের বেশ স্নায়ুর চাপে ভোগাচ্ছেন। জরুরি অবস্থা চললে কি এমনটা হতো?

হোটেলের পথে ট্যাক্সি ড্রাইভারের কাছে জানা গেল, জরুরি অবস্থার মতো কিছু একটা হয়েছে। তবে ঠিক কী সেটা তাঁর জানা নেই। প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামের সামনের রাস্তা ধরেই চলছে গাড়ি, ভেতরে তখন বোধ হয় কুশল পেরেরাই ব্যাট করছিলেন। হোটেলে পৌঁছতে পৌঁছতে রাত ১০টা, চেক ইন কাউন্টারেই জানা গেল দুঃসংবাদটা। উনুন নিভে গেছে রেস্তোরাঁর, রাঁধুনি গেছে বাড়ি। দিন দুই আগেই শ্রীলঙ্কা পৌঁছানো আরেক সহকর্মীর কথায় ফোনে ফুড ডেলিভারির অর্ডার। মুঠোফোনে নম্বর ডায়াল করার সময়ও খানিকটা দ্বিধা, একে তো জরুরি অবস্থা তার ওপর বেশ রাত। উপোস করেই না কাটাতে হয় বিমানযাত্রার ধকল পোহানো দিন শেষের রাতটা। ঈশ্বর অতটা নির্দয় হননি। মোটরবাইকে চেপে ঠিকই হাজির হয়েছে খাবার, তার গা থেকে ভাপ বের হওয়া তখনো বন্ধ হয়নি।

রাত পোহানোর পর হোটেলের লবিতে গিয়ে ঘাঁটলাম গোটা চারেক ইংরেজি দৈনিক। যার মধ্যে এই জানুয়ারিতেই ১০০ বছরে পা রাখা ‘ডেইলি নিউজ’ও আছে। প্রথম পাতাতেই বড় করে খবর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আশঙ্কায় শ্রীলঙ্কায় জরুরি অবস্থা জারি। গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতির অবসানের পর এবারই প্রথম জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে দ্বীপদেশটিতে। ক্যান্ডিতে বেশ কিছু ঘটনার জের ধরে বৌদ্ধ ও মুসলিমদের ভেতর সংঘর্ষের পর সাম্প্রদায়িক সহিংসতা রুখতেই রাষ্ট্রপতির এই আদেশ জারি। ক্যান্ডিতে কারফিউ চলছে, সহিংসতা রুখতে মোতায়েন করা হয়েছে বিশেষায়িত বাহিনী। সেইসঙ্গে নজরদারি আরোপ করা হয়েছে ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগ মাধ্যম ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইমোতেও। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে আপাতত বন্ধই রয়েছে এই অ্যাপগুলো, ঢোকা যাচ্ছে না ফেসবুকেও।

এত কিছুর মধ্যেও জীবন থমকে নেই কলম্বোতে। ঐতিহ্যবাহী দুটি স্কুল—রয়্যাল কলেজ কলম্বো ও সেইন্ট থমাস কলেজের ভেতর বার্ষিক ক্রিকেট ম্যাচ কাল থেকে। এই নিয়ে ১৩৯তম বারের মতো মুখোমুখি হচ্ছে এই দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সুপ্রাচীন এই দ্বৈরথে নিজ নিজ স্কুলের হয়ে মাঠে নামা ক্রিকেটারদের তালিকায় আছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী থেকে টেস্ট ক্রিকেটারসহ অনেকেই। প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে আসার পথে সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাবমুখী এই দুই স্কুলের সমর্থকদের যে বহর দেখলাম, সেটাকে একমাত্র তুলনা করা যায় ইউরোপের ফুটবল লিগের সমর্থক গোষ্ঠীর উন্মাদনার সঙ্গেই।

জরুরি অবস্থা চলছে, তবু থেমে নেই জীবন। ক্রিকেট হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও খোলা। ক্যান্ডির আঁচ গায়ে লাগেনি কলম্বোর। নাকি এসবকে আমলে নেয় না কলম্বোর বাসিন্দারা। ২৬ বছরের গৃহযুদ্ধের আগুন এদের এতটাই পুড়িয়েছে যে জরুরি অবস্থার উত্তাপ আর তারা গায়েই মাখে না!

 



মন্তব্য