kalerkantho


চোর-চোর খেলতে খেলতে জুকভের সঙ্গে জুটি

২ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



চোর-চোর খেলতে খেলতে জুকভের সঙ্গে জুটি

ছবি : মীর ফরিদ

খ্যাতিমানদের বেড়ে ওঠার গল্পের সঙ্গে তাঁর বর্তমানকে মেলানো কঠিন। সময়ের কোনো এক বাঁকেই যে বদলে যায় তাঁদের জীবন। নব্বইয়ের দশকে ফুটবলের মাঝমাঠে কর্তৃত্ব করা জাকির হোসেনও ব্যতিক্রম নন। তিনি সেসময়কার মেগাস্টার ছিলেন না মোটেও, তবে ভক্ত ছিল অগুনতি। সেই তালিকায় আবার নামিদামিদের ভিড়। ভূমিকায় আটকে না থেকে চলুন নোমান মোহাম্মদের নেওয়া সাক্ষাৎকারে জাকিরের আদ্যোপান্ত জানি

প্রশ্ন : রাশিয়ান ফুটবলার জুকভের সঙ্গে আবাহনীর মাঝমাঠে আপনার জুটির কথাই সবার মনে পড়ে সবচেয়ে আগে। তাঁর সঙ্গে বোঝাপড়ার গল্প দিয়েই শুরু করতে চাই কথোপকথন।

জাকির হোসেন : আসলেই, এর আগে আমি ছিলাম আর দশজন ফুটবলারের মতো। জুকভের সঙ্গে জুটি হওয়ার পর হয়ে যাই স্পেশাল ফুটবলার। ভুল বুঝবেন না, নিজেকে নিয়ে আমি আলাদা অহংকার কখনো করি না। আবাহনীর ওই দলে আমার চেয়ে বাকি ১০ জন ছিলেন আরো ভালো ফুটবলার। আসলাম ভাই, রুমী ভাই, মুন্না ভাই, মামুন জোয়ার্দার, গাউস ভাই, জুকভ, আনাতোলি—সবাই টপ প্লেয়ার। যেটি বলতে চাইছি, জুকভের সঙ্গে মাঝমাঠে জুটি হওয়ার পর সবাই বুঝতে পারে, আমার মধ্যে বিশেষ কিছু রয়েছে।

প্রশ্ন : আপনিও কি সেটি প্রথমবারের মতো বুঝতে পারেন?

জাকির : তা বলতে পারেন। তখন তো আর এসব নিয়ে আলাদা করে ভাবিনি। তবে এখন পেছন ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, জুকভ আমার সেরাটা বের করে এনেছিলেন। আমার ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় অবদান জুকভের। ওর সঙ্গে না খেললে নিজের সামর্থ্য সম্পর্কেও হয়তো কোনো দিন জানতাম না।

প্রশ্ন : তা এত ভালো জুটিটা হলো কিভাবে?

জাকির : (হেসে) ‘চোর-চোর’ খেলার মাধ্যমে।

প্রশ্ন : মানে!

জাকির : ওয়ার্ম আপের শুরুতে আমরা ‘চোর-চোর’ খেলি না! মাঝখানে দুজন থাকেন; তাঁদের ঘিরে গোল হয়ে চার-পাঁচজন। এক টাচে নিজেদের মধ্যে বল আদান-প্রদান করতে হয়। ওখানে স্পেস অনেক কম; সিদ্ধান্ত নিতে হয় দ্রুত; ওদিকে এক টাচের বেশি নেওয়া যাবে না। এখানে ফার্স্ট টাচ দেখেই জুকভ হয়তো আমার সামর্থ্যটা বুঝতে পারে। অবশ্য ও যে কত বড় মাপের ফুটবলার; তা আমরা আগেই বুঝেছিলাম।

প্রশ্ন : চোর-চোর খেলা থেকেই তাহলে বাংলাদেশের ক্লাব ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই মিডফিল্ড জুটির শুরু?

জাকির : ঠিক তাই। এমনিতে একজন ভালো ফুটবলার আরেকজন ভালো ফুটবলারের সঙ্গে খেললে দুজন দুজনকে সহজেই বুঝতে পারেন। অন্য ধরনের যোগাযোগ তৈরি হয়ে যায়। চোর-চোর খেলার পর জুকভের সঙ্গে অনুশীলন করেছি একসঙ্গে; তাতে বোঝাপড়া বেড়েছে ক্রমশ। বাড়তে বাড়তে এমন অবস্থা যে, ম্যাচে আমি চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারতাম, জুকভ কোথায় আছে। বল ধরার সময়ই বুঝে যেতাম, ও কোনদিকে দৌড় দেবে। সেটি ও আমার পেছনে থাকলেও। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডাররা এসব একদমই বুঝতেন না। অনেক সময় তো আবাহনীর অনেক সতীর্থও তা বুঝত না (হাসি)। সত্যি বলতে কী, জুকভের সঙ্গে আমার ইথারের কানেকশন ছিল।

প্রশ্ন : তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছেন নিশ্চয়ই?

জাকির : অনেক। আমরা দুজন অনেক সময় দু-তিনবার পর্যন্ত ‘ওয়াল’ করতাম। ওর কাছ থেকে আরেকটি ব্যাপার শিখেছি—স্লাইডিং। ওভাবে ট্যাকল করেও যে ফাউল ছাড়া বল নেয়া যায়, ঢাকায় মাঠে তা আগে কেউ দেখাতে পারেননি। এই স্লাইডিং শিখেছি। ফাইনাল পাস দেওয়া শিখেছি। কিভাবে থ্রুটা বাড়াতে হয়, কতটা জোরে, কতটা আস্তে ছাড়তে হবে, কখন ভাসিয়ে, কখন গড়িয়ে দিতে হবে—এ সব কিছু শানিত হয়েছে জুকভের স্পর্শে। বললাম না, আমার জাকির হয়ে ওঠাতে সবচেয়ে বড় অবদান জুকভের।

প্রশ্ন : মাঠের বাইরে জুকভ কেমন ছিলেন?

জাকির : খুব মজার; খুব ফুর্তিবাজ ছেলে। আবাহনীতে খেলা রাশিয়ান ফুটবলাররা থাকতেন ধানমণ্ডির এক বাড়িতে। সেখানে আমি এবং আরো কয়েকজন নিয়মিত আড্ডা দিতে যেতাম। আমরা গেলেই ওরা রাশিয়ান খাবার রান্না করত। লেটুস পাতা দিয়ে, ক্রিম দিয়ে। জঘন্য স্বাদ; একটুও ঝোল নেই; ঝাল নেই। কিন্তু বেচারারা এত কষ্ট করে রেঁধেছে; একটু না খেলে কেমন দেখায়! আরেকটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে। গোলাম রব্বানী হেলাল ভাইয়ের গাড়ি নিয়ে একবার বেরিয়েছি। জুকভ ড্রাইভার। ও যে গাড়ি সেভাবে চালাতে পারে না, তা কেউ জানি না। রাতের বেলা গাড়ি চালাতে চালাতে সংসদ ভবনের সামনের রাস্তায় এক ভ্যানগাড়িতে দিল মেরে। জুকভ তখন ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। পুলিশ-টুলিশ আসবে ভেবে। গাড়িতে তখন ওর সঙ্গে আমি, আলমগীর ও আরেক রুশ ফুটবলার আনাতোলি। পাবলিক এসে আমাদের দেখে চিনে ফেলে। এরপর আর পুলিশ-টুলিশ ডাকবে কী, সম্মান করে গাড়িতে উঠিয়ে বিদায় করে দেয়।

প্রশ্ন : তখনকার পত্রপত্রিকা ঘেঁটে জানা যায়, আপনার খেলার খুব প্রশংসা করতেন জুকভ। এটি কেমন লাগত?

জাকির : অবশ্যই ভালো লাগত। গর্ব হতো। এ প্রসঙ্গে আরেকটি গল্প বলি। বাংলাদেশ থেকে জুকভ চলে যাওয়ার কয়েক বছর পরের ঘটনা। হঠাৎ জার্মানি থেকে আমার পরিচিত এক লোকের ফোন। ও আমাকে ফোন ধরিয়ে দিলে শুনি জুকভের কণ্ঠ। ব্যাপার কী? আমার পরিচিত সেই লোকের সঙ্গে জুকভের দেখা হয়েছে। ও তখন জার্মান লিগে ফুটবল খেলে...

প্রশ্ন : বুন্দেসলিগায়?

জাকির : না, পরের স্তরের কোনো এক বিভাগে। যখন শুনেছে, ওই ভদ্রলোক বাংলাদেশের, জুকভ প্রথমেই জিজ্ঞেস করেছে আমার কথা। ভাগ্য ভালো, সেই লোক আমার পরিচিত ছিল। ফোনে তাই জুকভের সঙ্গে কথা বলতে পারি। এই যে, বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার চার-পাঁচ বছর পরও জুকভ আমার কথা প্রথমে জিজ্ঞেস করে—এতে আমার ভালো লাগে খুব। আবারও বলি, আমি ওই সময়ের সেরা ফুটবলার না। আসলাম ভাই, মুন্না ভাই, রুমী ভাইরা কিংবদন্তি। মোহামেডানেও সাব্বির ভাই, কায়সার ভাই আরো কতজন! কিন্তু জুকভ প্রথমেই জানতে চায় আমার কথা। এই তো প্রাপ্তি।

প্রশ্ন : এই যে এত বিখ্যাত এক মিডফিল্ড জুটির অংশ আপনি, অথচ ঢাকার মাঠে ক্যারিয়ারের শুরুতে তো মিডফিল্ডার ছিলেন না!

জাকির : না। মোহামেডানে রাইট আউট হিসেবে শুরু করি। ওখানেই খেলতাম মূলত। কিছু কিছু ম্যাচে স্ট্রাইকার হিসেবেও। মনে আছে, এক টুর্নামেন্টে আমার জার্সি নম্বর ছিল ১০। স্ট্রাইকার বলে। পরে আবাহনীতে গিয়ে হই মিডফিল্ডার।

প্রশ্ন : এবার একটু শুরুর কথা শুনতে চাই। ফুটবলার যে হতেই হবে, ছোটবেলায় অমন কিছু ভেবেছিলেন?

জাকির : না। ফুটবল খেলতে ভালো লাগত, তাই খেলতাম। আমার ফুটবলার হয়ে ওঠায় ‘ডিগ বল’-এর বড় অবদান। নারায়ণগঞ্জে তখন এই বলের অনেক টুর্নামেন্ট হতো। ডিগ বল আকারে অনেক ছোট; সাধারণ বলের প্রায় অর্ধেক। ওতে পাম্প থাকে একটু কম। এই বল দখলে রাখা খুব সহজ না। আমরা তা রপ্ত করেছিলাম। তখন ‘নারায়ণগঞ্জের ফুটবলার’ শুনলেই ঢাকার কেউ বলে দিত, ‘ওর তাহলে পায়ের কাজ ভালো।’ এ সবই ওই ডিগ বলে খেলার কারণে।

প্রশ্ন : ফুটবল খেলার কারণে বাসা থেকে বকাবকি খেতেন না?

জাকির : সেভাবে না। কারণ পড়াশোনা একটু কম করলেও আমার ফল ভালো হতো। আমার জন্ম মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী থানার আড়িয়ল গ্রামে। আমার তিন-চার বছর বয়সেই পরিবার নারায়ণগঞ্জে চলে আসে। বাবা সোনামিয়া বেপারির কাপড়ের ব্যবসা। মা গৃহিণী। ছয় ভাই, দুই বোনের মধ্যে আমি সবার ছোট। বাড়তি আদর পেতাম তাই। সে কারণে বকাবকি সেভাবে খেতে হয়নি। আর আমার একেবারে বড় ভাই ভালো ফুটবল খেলতেন। বাবাও মনে মনে চাইতেন, তাঁর কোনো এক ছেলে ফুটবলার হোক। আমি তাই একটু প্রশ্রয়ই পেতাম। স্কুলে, মহল্লায় ফুটবল খেলতাম সারা দিন।

প্রশ্ন : কোনো কোচের অধীনে?

জাকির : না। তবে ফুটবলের ওই শুরুর সময়ের কয়েকজনের অবদানের কথা না বললেই নয়। যেমন আমাদের নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুলের গেম টিচার সুজিত সমাদ্দার সেন্টু স্যার। ইন্টার-ক্লাসে আমার খেলা দেখে স্কুলের মূল দলে নিয়ে নেন যখন আমি ক্লাস সিক্সে পড়ি। আলাউদ্দিন খান স্যারের কাছে অনুশীলন করেছি এক-দেড় মাস। সেটিই প্রথম বুট পরে। পরে বাসা থেকে দূর হওয়ায় ওখানে যাওয়া ছেড়ে দিই। বুট পরাও। খালি পায়ে অ্যাঙ্কলেট পরে ফুটবল খেলতাম তখন।

প্রশ্ন : প্রথম কখন সিরিয়াসলি মনে হয় যে, আমাকে ফুটবলার হতেই হবে?

জাকির : ১৯৮৭ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার পর। এলাকার বড় ভাই রঞ্জন ভাইয়ের কাছ থেকে তাঁর পুরনো বুট কিনি। তিন-চার শ টাকা দিয়ে সম্ভবত। বাবার কাপড়ের ব্যবসা, ভাইরা তা দেখাশোনা করেন—সংসার তাই চলছিল খুব ভালোভাবেই। সেজ ভাই মোশারফের কাছ থেকে বুট কেনার টাকা নিই। সে বুট আবার আমার দুই সাইজ বড়। ওই বুট পরে দুলু আফেন্দি স্যারের ইস্টার্ন স্পোর্টিং ক্লাবে গিয়ে শুরু করি সিরিয়াস অনুশীলন। এই স্যারের কাছেই ফুটবলের অনেক কিছু শিখেছি আমি।

প্রশ্ন : ঢাকার ফুটবলে নাম লেখান কিভাবে?

জাকির : বলছি। তার আগে আরেকজনের কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে নিই। আপনাদের মতোই সাংবাদিক তিনি, নাম কাশেম হুমায়ূন। আমরা একই মহল্লা ভূঁইয়ারবাগে থাকতাম। ওখানে ছোট একটা মাঠ ছিল। সেখানে একা একা ফুটবল নিয়ে অনুশীলন করতাম আমি, আর উনি আসতেন জগিং করতে। আমাকে দেখলেই বলতেন, ‘বল ওপরে মারো, সিরিভ করো।’ ভালো খেললে ঢাকায় খেলার সুযোগ আসবে বলেও অনুপ্রাণিত করতেন খুব।

প্রশ্ন : সে সুযোগটা এলো কিভাবে?

জাকির : এলাকার সামাদ ভাইয়ের মাধ্যমে। উনি একদিন খবর আনলেন, ঢাকা মোহামেডান ক্লাবে অনূর্ধ্ব-১৬ উন্মুক্ত ট্রায়াল হবে। এটি আমার ম্যাট্রিক পরীক্ষার পরের ঘটনা। গেলাম ট্রায়ালে, নাম লেখালাম। ট্রায়ালের সাত-আট শ ছেলের মধ্যে দুজনকে বেছে নেন কোচ নাসের হেজাজি। যার মধ্যে একজন আমি।

প্রশ্ন : আরেকজন?

জাকির : যশোরের তপন। পরে ইনজুরির কারণে ওর ক্যারিয়ার বেশি দূর এগোয়নি।

প্রশ্ন : অনূর্ধ্ব-১৬ ট্রায়ালে টিকে কি সরাসরি মোহামেডান দলে খেলার সুযোগ পেলেন?

জাকির : হ্যাঁ। এটি আসলে ইতিহাস। ১৯৮৮-৮৯ মৌসুমের ঘটনা। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়া একটি ছেলে মোহামেডানে ফুটবল খেলছে—এটি তো স্বপ্নের চেয়েও বেশি কিছু। পাইওনিয়ার, তৃতীয় বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ— কিচ্ছু খেলিনি। সরাসরি প্রথম বিভাগে; তা-ও মোহামেডানে। এর চেয়েও বড় ইতিহাস কী জানেন, ঢাকার মাঠে আমার প্রথম টাচেই গোল।

প্রশ্ন : বলেন কী!

জাকির : হ্যাঁ। প্রথম মাঠে নামি বিআরটিসির বিপক্ষে। খেলার বাকি পাঁচ মিনিটের মতো। মোহামেডান সম্ভবত ৩-০ গোলে এগিয়ে। লেফট আউট ছিলেন নারায়ণগঞ্জের সালাউদ্দিন। আমি তখন রাইট আউটে খেলি। সালাউদ্দিন ভাই বাঁ-দিক থেকে যখন দৌড় শুরু করেন, আমি ডান দিক থেকে কোনাকুনি দৌড়ে ঢুকে যাই ডি-বক্সে। ওনার উড়িয়ে দেওয়া বলটিতে শুধু পা ছোঁয়াই। গোল। ঢাকা স্টেডিয়ামের ৪০ হাজার দর্শকের উল্লাস দেখে তখন কী যে ভালো লাগে, বলার মতো না! বাবার কথা তখন মনে পড়ছিল খুব। উনার ছিল লম্বা দাড়ি, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। কিন্তু চাইতেন আমি যেন ফুটবলার হই। কখনো তা বলতেন না, কিন্তু আমি তা বুঝতাম। নারায়ণগঞ্জের অনেক টুর্নামেন্টে আমার খেলা বাবা দেখেছেন দর্শকসারিতে মিশে গিয়ে; পরে বন্ধুরা আমাকে তা বলেছে। আমি ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় বাবা মারা যান। তবে তাঁর ইচ্ছা পূরণ করে আমি ঢাকা লিগে খেলছি, মোহামেডানে খেলছি, প্রথম টাচে গোল দিয়েছি—তখন তাঁর কথা মনে পড়ে খুব।

প্রশ্ন : মোহামেডানের কোচ তখন নাসের হেজাজি। অনূর্ধ্ব-১৬ ট্রায়াল থেকে আপনাকে বেছেও নিয়েছেন তিনি। তাঁর সঙ্গে সম্পর্কটা নিয়ে একটু যদি বলেন।

জাকির : এ কথা সত্য যে, জুকভ না থাকলে আমি এই জাকির হতে পারতাম না। আরো বড় সত্য হচ্ছে, নাসের হেজাজি না থাকলে আমি হয়তো ঢাকায়ই আসতে পারতাম না। পড়ে থাকতাম নারায়ণগঞ্জে। হেজাজি আমাকে নিজের ছেলের মতো পছন্দ করতেন। ক্লাবের বাবুর্চিকে বলে দিতেন, সবাইকে এক টুকরো করে মুরগির মাংস দিলে জাকিরকে দুটি দেবে। এক টুকরো মুরগি বেশি খেয়ে আমি বেশি ভালো ফুটবলার হয়ে যাইনি; কিন্তু বুঝতে পারতাম আমাকে নিয়ে কোচ কত আশা করছেন! তাতে আরো ভালো খেললে অনুপ্রাণিত হতাম। অনেক অনেক অনেক কিছু শিখিয়েছেন তিনি। হাতে ধরে ধরে শিখিয়েছেন। হেজাজি ছাড়া সাব্বির সাব্বির হতো না, নকীব নকীব হতো না, জাকিরও জাকির হতো না।

প্রশ্ন : মোহামেডানে প্রথম মৌসুমে তো আপনি আর ইমতিয়াজ সুলতান নকীব বাউন্ডিংস ফুটবলার হিসেবে খেলেছেন?

জাকির : না না। প্রথমবার আমি ও তপনদা খেলেছি ওই অনূর্ধ্ব-১৬ ক্যাম্প থেকে এসে। পরের মৌসুমে বাউন্ডিংস প্রথা শুরু হলো। সেবার এর মধ্যে পড়ে যাই আমি আর নকীব। আমি তো আগে থেকেই মোহামেডানে ছিলাম; নকীবকে যেন কোন ক্লাব থেকে নিয়ে এসেছিল।

প্রশ্ন : পরের মৌসুমেই আপনি আবাহনীতে চলে যান। কেন?

জাকির : কিছু কারণ তো ছিলই। মোহামেডানের ঋণ আমি কখনো শোধ করতে পারব না। তারাই আমাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় এনেছে। ক্লাব কর্মকর্তারা অনেক আদর করতেন। কোচ হেজাজি তো নিজের ছেলের মতোই দেখতেন। কিন্তু মাঠে খুব বেশি খেলার সুযোগ পেতাম না। আবাহনীতেও যে সে সুযোগ পাব, ওই নিশ্চয়তা ছিল না। কিন্তু চ্যালেঞ্জটা নিলাম। আর আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু আলমগীর, ওই যে লম্বা থ্রো করত—ও বলল, ‘চল আবাহনীতে খেলি’। চলে এলাম। সিদ্ধান্তটি মনে হয় খারাপ হয়নি, কী বলেন?

প্রশ্ন : মোটেই না। একটা কথা জানতে ইচ্ছা করছে—আপনার আবাহনীতে যাওয়ার পেছনে মোনেম মুন্নার কোনো ভূমিকা কি ছিল? মানে উনিও তো আপনার মতো নারায়ণগঞ্জের...

জাকির : অবশ্যই ভূমিকা আছে। মুন্না ভাই আমাদের সবার হিরো। উনি কখনো ডেকে বলেননি, ‘আবাহনীতে আয়’। কিন্তু মুন্না ভাইয়ের সঙ্গে খেলার লোভও আবাহনীতে যাওয়ার বড় এক কারণ। কী অসাধারণ এক মানুষ যে ছিলেন! বিশেষত জুনিয়র ফুটবলারদের সঙ্গে। ওই সময়ের যে কাউকে জিজ্ঞেস করলে তা জানতে পারবেন। মুন্না ভাইয়ের ব্যক্তিত্বে চুম্বকের মতো আকর্ষণীয় একটা ব্যাপার ছিল। আমাকে ‘বান্টা’ বলে ডাকত। বান্টা মানে দুষ্ট। মুন্না ভাই এত বড় ডিফেন্ডার কিন্তু চোর-চোর খেলায় আমি থাকলে খেলতে চাইতেন না।

প্রশ্ন : কেন?

জাকির : কারণ তাঁর পায়ের ফাঁক দিয়ে বল নেওয়া খুব সোজা (হাসি)।

প্রশ্ন : কত টাকা পেয়েছিলেন আবাহনীর প্রথম মৌসুমে?

জাকির : চুক্তি সাড়ে চার লাখ টাকা। ক্যাশ দেয় চার লাখ টাকা। তখন তো আমার গাড়ি নেই। এতগুলো টাকা নিয়ে বাড়ি যাব কিভাবে? বেবিট্যাক্সি দিয়ে আসলে ছিনতাই হতে পারে। বাসে চড়ে তাই নারায়ণগঞ্জ আসি। এত টাকা সঙ্গে বলে আমাকে এগিয়ে দিতে আসে আলমগীর। বাস থেকে নামার পর পরই ছাদ থেকে এক বস্তা এসে পড়ে ওর মাথায়। এখনো তো আলমগীর বলে, ‘তোর টাকা এগিয়ে দিতে গিয়ে আমার মাথায় ব্যথা পেয়েছিলাম।’ বাসায় এসে পুরো টাকাটা মায়ের কাছে দিয়ে দিই। উনি গ্রামের সহজ-সরল মহিলা। কী যে খুশি হন তিনি! পরবর্তীতে খুলনায় শেরেবাংলা কাপ ফুটবল খেলতে গিয়ে শুনি ওনার মৃত্যুর খবর। আর বাবা তো ফুটবলার হয়েছি, তা দেখেই যেতে পারেননি। এমনিতে বাসার সবাই আমাকে খুব ভালোবাসেন। ভাই-ভাবি, ভাতিজা-ভাতিজি সবাই। আমার ডাকনাম শাহীন। সবাই ‘শাহীন’ বলতে পাগল। তাদের ভালোবাসার ঋণ শোধ করার মতো না।

প্রশ্ন : ক্যারিয়ারের সেরা ফুটবল খেলেছেন আবাহনীতে। এরপরই ফুটবলারদের বিদ্রোহে মুক্তিযোদ্ধা দল গঠন। আপনি সেখানে যাননি কেন?

জাকির : আপনার প্রথম কথার সঙ্গে আমি একমত না। ক্যারিয়ারের সেরা ফুটবল খেলেছি মুক্তিযোদ্ধায় দ্বিতীয় বছর। টিটু ভাই, রূপুদা ওনাদের জিজ্ঞেস করলে জানতে পারবেন। আমাকে তখন কেউ আটকে রাখতে পারত না। ওই সময়কার খেলাগুলোর ভিডিও থাকলে এখনকার প্রজন্ম দেখতে পারত কী ফুটবল খেলেছি তখন! আর প্রথমবার মুক্তিযোদ্ধায় যাইনি কেন? আমার সঙ্গে সেভাবে যোগাযোগই করেনি বলে হয়তো-বা।

প্রশ্ন : এক মৌসুম পর তাহলে মুক্তিযোদ্ধায় গেলেন কেন?

জাকির : তখন যোগাযোগ করেছে বলে।

প্রশ্ন : ক্লাব ক্যারিয়ারে সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পেয়েছেন কত?

জাকির : ১২ লাখ টাকা; মুক্তিযোদ্ধায় দুই মৌসুম খেলে আবাহনীতে ফিরি যখন। এটি ঢাকার ফুটবলের শেষ ছিনতাই!

প্রশ্ন : বলুন না ঘটনাটি...

জাকির : ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলো। আবাহনী ভালো দল গড়বে; অন্য ক্লাবের ফুটবলারদের টার্গেট করল। আমিও তার মধ্যে আছি।

টুটুল ভাই, মৃণালদারা আমাকে খুঁজছেন কিন্তু কোথাও পাচ্ছেন না। আমি তো মুক্তিযোদ্ধাতেই খেলব। গুলশানের এক গেস্ট হাউসে লুকিয়ে আছি। একদিন আমি ওখান থেকে বের হয়েছি নারায়ণগঞ্জ চলে যাব বলে। লালমাটিয়ায় লিটন ভাইয়ের বাসায় গিয়েছি একটা কাজে। খবর পেয়ে ওখানে আবাহনীর সব কর্মকর্তা চলে আসেন। আমি দৌড়ে ছাদে গিয়ে লুকিয়ে পড়ি। আমাকে না পেয়ে ওনারা চলে যান। এই লিটন ভাই গাড়ি রাখতেন আবাহনী ক্লাবে। ওনার গাড়ি করেই আমাকে নারায়ণগঞ্জে পৌঁছে দেবেন। রাত একটার পর উনি গাড়ি আনতে গেলেন ক্লাবে; আমাকে একটু দূরে দাঁড় করিয়ে রেখে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ছিলেন যে সোহেল তাজ, তাঁদের বাড়ির সামনের আমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আমি। একটু পর দেখি, লিটন ভাইয়ের গাড়িতে করে আবাহনী ক্লাবের কর্মকর্তা-সমর্থকরা সব এসে হাজির। আমাকে ধরে নিয়ে যান ক্লাবে। এরপর গাফফার ভাইয়ের বাসায় রাখেন আটকে। পরে সই করি ১২ লাখ টাকায়। ওই বছরে দেশের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক সেটি।

প্রশ্ন : পরে তো আবাহনীর অধিনায়কও হন?

জাকির : হ্যাঁ, আমার অধিনায়কত্বে শেষ ম্যাচ খেলেন মুন্না ভাই। একটা ছবিও আছে। আমি হাঁটছি, আমার পেছনে মুন্না ভাই। ১৯৯৭ সালে আমার অধীনে খেলেছেন মুন্না ভাই। আমার অধীনে বলা ঠিক না। তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ বছরে আমি আবাহনীর অধিনায়ক ছিলাম—এভাবে বলতে পারি।

প্রশ্ন : ক্যারিয়ারের কয়েকটি স্মরণীয় ম্যাচের কথা যদি বলেন?

জাকির : আবাহনী-মোহামেডানের সব ম্যাচ স্মরণীয়। ওই ম্যাচগুলোয় আমি একটু বেশিই ভালো খেলতাম। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে ফেডারেশন কাপ ফাইনালের এক গোলের কথা। ডনের সঙ্গে ওয়াল করে বক্সের অনেক বাইরে থেকে শট মেরে গোল করি।

প্রশ্ন : সমসাময়িক ফুটবলারদের মধ্যে সেরা বলবেন কাকে?

জাকির : একজনকে বলা তো কঠিন। সাব্বির ভাইয়ের কথা বলতে পারি। তাঁর মতো কেউ ছিলেন না, ওয়াসিম ভাইও না। এমিলি ভাই, জুয়েল রানারা দুর্দান্ত। সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে আমার ভোট কায়সার হামিদ ভাইকে।

প্রশ্ন : মোনেম মুন্না?

জাকির : আগেই বলেছি, মুন্না ভাই আবাহনীতে খেলার কারণে আমি আবাহনীতে গিয়েছি। তবু লাস্ট ডিফেন্ডার হিসেবে আমাকে যতবার একজনকে বেছে নিতে বলবেন, আমি কায়সার ভাইকে নেব। মুন্না ভাই দারুণ ডিফেন্ডার, দুর্দান্ত মিডফিল্ডার, অসাধারণ অধিনায়ক—সব দিক মিলিয়ে সেরা। কিন্তু শুধু সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে কায়সার ভাইকেই এগিয়ে রাখব।

প্রশ্ন : সেরা বিদেশি?

জাকির : জুকভ তো আছেই। এ ছাড়া নালজেগার, ভিজেন তাহিরি, এমেকা, রহিমভ। বুড়ো বয়সে আসা দজমারভ, কেনেডিরাও ভালো ফুটবলার। এমেকার একটি গল্প বলি। আমি তো অনূর্ধ্ব-১৬ ট্রায়াল থেকে মোহামেডানে নাম লেখাই। এর কিছু দিন পর ক্লাব যাবে ইরানে খেলতে, সম্ভবত পিরুজির বিপক্ষে ক্লাব কাপে। পিচ্চি আমি ওই দলে নেই। কিন্তু এমেকা গিয়ে কর্মকর্তাদের ধরেন আমাকে ইরান নিয়ে যাওয়ার জন্য। তাঁরা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য বলেন, ‘জাকিরের তো পাসপোর্ট নেই।’ এমেকা তখন নিজের পকেট থেকে ৫০ ডলার দিয়ে আমাকে বলেন, ‘দ্রুত পাসপোর্ট করাও।’ বুঝুন, ১৭-১৮ বছরের আমাকে কতটা পছন্দ করতেন এমেকা।

প্রশ্ন : যেসব কোচের অধীনে খেলেছেন, তাঁদের মধ্যে সেরা কে?

জাকির : দেশের মধ্যে সালাউদ্দিন ভাই। আর বিদেশিদের মধ্যে নাসের হেজাজি ও অটো ফিস্টার। এর মধ্যেও সেরা হেজাজি। তবে ফিস্টারের একটা ঘটনা বলি। উনি তো পরে সৌদি আরবের কোচ হয়ে যান। আমাদের জাতীয় দল কী এক টুর্নামেন্ট খেলতে গেলে দেখা হয়ে যায়। ঠিকই উনি দলের বাকিদের জিজ্ঞেস করেন, ‘জাকির কি এখনো খেলছে? ওর খবর কী?’ ওই যেমন দেশ ছাড়ার কয়েক বছর পর জার্মানিতে আমার কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন জুকভ।

প্রশ্ন : জুকভের সঙ্গে আপনার মিডফিল্ড জুটির অনেক গল্প করেছি শুরুতে। ফরোয়ার্ডদের মধ্যে কার সঙ্গে বোঝাপড়া সবচেয়ে ভালো ছিল?

জাকির : সবার সঙ্গেই ভালো ছিল। আসলাম মামাকে কিভাবে বল দিতে হবে, জানতাম। রুমী মামাকে কিভাবে বল দিতে হবে, জানতাম।

প্রশ্ন : মামা!

জাকির : (হেসে) আবাহনীতে খেলার সময় এ সম্পর্ক হয়ে যায়। গোল করার জন্য তখন ওই দুজনের তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। দুজনই আমাকে ভাইগ্না বলে ডাকে। সেই থেকে তাঁরা মামা। আসলাম মামা বলেন, ‘ভাইগ্না, তুমি তো আমারে বল দাও না।’ একই কথা বলেন রুমী মামাও। এই দুজনকে একইভাবে বল দিলে তো হবে না, একেজনের খেলার ধরন আলাদা। আবার নকীবের খেলার ধরন একরকম; আলফাজের আরেক রকম। আসলাম, রুমী, নকীব, আলফাজ—চারজন স্ট্রাইকার হলেও তাঁদের খেলার ধরন আলাদা। সবাইকে একভাবে বল দিলে হবে না। আমি সবার শক্তির জায়গা বুঝে সেভাবে বলের জোগান দিতাম। সে কারণেই সমঝোতা ছিল ভালো। আসলাম মামার কথা একটু আলাদা করে বলতে চাই। এক ম্যাচে গোল দিতে না পারলে পাগল হয়ে যেতেন। একা একা অনুশীলন করতেন চার-পাঁচ ঘণ্টা। পার্কে গিয়ে দৌড়াতেন। শ্যুটিং করতেন অন্তত ১০০টির বেশি। এখন এমন সিরিয়াস ফুটবলার কোথায়?

প্রশ্ন : আপনিও কিন্তু খুব সিরিয়াস ছিলেন না বলে অভিযোগ আছে?

জাকির : নাহ্, সিরিয়াস ছিলাম তো। অনুশীলনের সময় অনুশীলন করেছি। ঈদের দিনও নামাজ পড়ে এসে ট্রেনিং করেছি। তিন বেলা অনুশীলন করতাম। সাব্বির ভাই অবশ্য পারলে চার বেলা অনুশীলন করতেন।

প্রশ্ন : তবু ওই অভিযোগ সম্পর্কে...

জাকির : হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি। দেখুন, প্রতিভাবানরা একটু ‘দুষ্টু’ই হয়। এটি শুধু আমার ক্ষেত্রে না, বেশির ভাগের বেলাতেই। প্রতিভাবানরা একটু পাগলাটে হয়। আবাহনীতে সালাউদ্দিন ভাই আমার কোচ ছিলেন। উনি বলতেন, ‘জাকির যা-ই করুক, অসুবিধা নেই। আমাকে ম্যাচে একটি গোল বের করে দেবে ঠিকই। নিজে গোল করবে অথবা গোলের মতো পাস দেবে।’ ১৯৯০ সাল থেকে জাতীয় দলে খেলেছি। অনেক সময় ওই ডিসিপ্লিনের কারণে আমাকে দলে নেয়নি। কিন্তু বিদেশি কোচরা আমার খেলা দেখলেই একাদশে নিয়ে নিতেন।

প্রশ্ন : খেলা ছাড়ার এত বছর পর কী মনে হয়, ‘দুষ্টুমি’গুলো না করলে, অমন খেয়ালি না হলে আরো অনেক ভালো ফুটবলার হতে পারতেন?

জাকির : যাঁরা আমার সঙ্গে খেলেছেন, তাঁদের জিজ্ঞেস করুন। আসলাম মামাকে জিজ্ঞেস করুন, টিটু ভাইকে জিজ্ঞেস করুন। নিজেকে নিয়ে গর্ব করা ঠিক না। তবে আমি মনে করি, মনোযোগ দিয়ে ফুটবল খেললে আমার ধারেকাছে কেউ থাকত না।

প্রশ্ন : অবসর নেন কবে?

জাকির : ২০০১ সালে। আরো কয়েক বছর খেলতে পারতাম। কিন্তু ফাঁকা গ্যালারির সামনে খেলতে ভালো লাগে না। কিন্তু বিশ্বাস করুন, তখন আমি নিজের খেলাটা আরো ভালো করে বুঝতে পারছিলাম। খেললে আরো কয়েক বছর খুব ভালো খেলতে পারতাম।

প্রশ্ন : খেলা ছাড়ার পর কোচ-ম্যানেজার নানা ভূমিকায় তো অনেকে ফুটবলের সঙ্গে থাকেন...

জাকির : আমার চরিত্রের সঙ্গে আসলে ওসব কোচ-ম্যানেজার ঠিক মানায় না। তবু বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৬ দলের ম্যানেজার হয়ে একবার ফিলিপাইন যাই। আবাহনী খুব করে চেয়েছিল ওদের ম্যানেজার হই। কিন্তু ওই যে বললাম, আমার চরিত্রের সঙ্গে তা ঠিক যায় না। এত দায়িত্ব নিতে ভালো লাগে না।

প্রশ্ন : চুল ফেলে মাথা কামানোর এই স্টাইল তো ফুটবলার থাকতে থাকতে?

জাকির : হ্যাঁ। আমি খুব স্টাইলিশ। হিন্দি সিনেমা ‘আশিকি’ বের হওয়ার পর নায়ক রাহুলের মতো চুলের স্টাইল করেছি। চুলে স্পাইক করিয়েছি পরে। ক্যারিয়ারের শেষ দিকে একবার ইংল্যান্ডে যাই আবাহনীর সঙ্গে। দেখলাম ব্রাজিলের রোনালদো এবং বিশ্বের সেরা অনেক ফুটবলার চুল ফেলে টাক করে ফেলেছেন। আমিও টাক করে ফেললাম। আমার পরে টাক করেন এখনকার মন্ত্রী আরিফ খান জয়।

প্রশ্ন : বিয়ে করেন কবে?

জাকির : বিয়ে তো করতামই না। ফুটবল খেলার সময় মনে হয়েছে, ‘ধূর, বিয়ে করে কী হবে?’ পরে এই ২০১১ সালে বিয়ে করলাম। স্ত্রীর নাম নাদিয়া আফরিন নিশা। আমাদের দুই সন্তান। তিন বছরের ছেলেটির নাম সাফওয়ান নামির। আর মেয়ে আম্বিয়া শেহরিস উমাইজার বয়স মাত্র তিন মাস। আম্বিয়া আমার মায়ের নাম। উনি মারা যান ক্যান্সারে। মেয়ের জন্মের পর প্রথম দেখায় মনে হলো, আমার মা পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন। সে কারণেই মেয়ের নাম রাখি মায়ের নামে।

প্রশ্ন : এখন কি ফুটবলের সঙ্গে আছেন কোনোভাবে?

জাকির : নিজের ব্যবসাগুলো একটু গুছিয়ে সম্পৃক্ত হব আবার। আমার গার্মেন্টের নিটিংয়ের ব্যবসা; টি-শার্টের ফেব্রিক বানাই। পারিবারিক ব্যবসা আছে কাপড়ের। ইসলামপুরে দোকানে ভাতিজারা বসে। এ ছাড়া বসুন্ধরা সিমেন্টের নারায়ণগঞ্জের ডিলার আমি।

প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। ক্যারিয়ার নিয়ে, জীবন নিয়ে আপনার তৃপ্তি কতটা?

জাকির : দেখুন, ফুটবলের কারণেই আজকের আমি। ফুটবল খেলেছি বলেই লোকজন চেনেন; আপনিও আমার সাক্ষাৎকার নিতে এসেছেন। নইলে আমার মতো কত জাকির জন্মেছে! কত জাকির ঘুরে বেড়ায়। কে তাঁদের চেনেন! আরেকটি ব্যাপার হলো, আমি কিন্তু শুধু ফুটবল খেলিনি। ফুটবল খেলেছি, পাশাপাশি জীবনও উপভোগ করেছি। একটু অতৃপ্তি বলতে পারেন, খেলাটা আরেকটু পরে ছাড়তে পারতাম। ওই সময়টা আরো বেশি উপভোগ করতে পারতাম।


মন্তব্য