kalerkantho


বিবর্ণ পেসারদের জীর্ণ ছবি

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বিবর্ণ পেসারদের জীর্ণ ছবি

ক্রীড়া প্রতিবেদক : আবুল হাসানের বয়স ২৫ বছর। জাতীয় দলে অভিষেক হয়েছে পাঁচ বছর আগে। এ সময়ে ওয়ানডে খেলেছেন মোটে সাতটি। সাকল্যে বোলিং ৩৬ ওভার। ৬.৭৭ ইকোনমিতে দিয়েছেন ২৪৪ রান। উইকেট শিকার? শূন্য! ভুল পড়েননি, ওয়ানডেতে এখনো কোনো উইকেট পাননি এই পেসার।

ওদিকে মাশরাফি বিন মর্তুজার বয়স ৩৪ বছর। জাতীয় দলে অভিষেক ১৬ বছর আগে, সেই ২০০১ সালে। বাংলাদেশের জার্সিতে সর্বোচ্চ ১৮৫ ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ ২৩৭ উইকেট শিকারের পরিসংখ্যানটা না হয় একপাশে সরিয়ে রাখুন। ২০১২ সালের ৩০ নভেম্বর আবুল হাসানের অভিষেকের পরের সময়টা ধরা যাক। এখানেও সর্বোচ্চ উইকেট সেই মাশরাফির। ৬৩ ওয়ানডেতে ৮১ উইকেট। সাকিব আল হাসানের চেয়েও যা ছয়টি বেশি!

বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের পতাকাটা এখনো যে মাশরাফির হাতে, তা বুঝতে আবুল হাসানের সঙ্গে এই তুলনাটাই যথেষ্ট। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে এই সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করে ওয়ানডে অধিনায়ককে টি-টোয়েন্টিতে ফেরানোর চেষ্টায় তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই।

পেসার আসেন, পেসার যান—মাশরাফির সিংহাসন কেড়ে নিতে পারেন না কেউ। অবশ্যই সেটি তাঁর কৃতিত্ব। দুই হাঁটুতে সাত অস্ত্রোপচার হওয়ার পর আত্মনিবেদনের বড় প্রমাণ। আবার একই সঙ্গে বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ে বিবর্ণতার ছবিও কি নয় তা!

আবুল হাসানের ব্যাপারটি না হয় ব্যতিক্রম— সাত ওয়ানডে খেলেও কোনো উইকেট না পাওয়া। কিন্তু তাঁর সময় থেকে ধরে সর্বশেষ পাঁচ বছরে জাতীয় দলে নাম লেখানো অন্য পেসারদের অবস্থাও খুব একটা সুবিধার নয়। এক মুস্তাফিজুর রহমানকে ব্যতিক্রম ধরলে বাকিরা বড্ড বিবর্ণ। প্রতিশ্রুতির ফাঁপা বেলুন ফেটে গেছে বেশির ভাগের।

আবুল হাসানের ওয়ানডে রেকর্ড তো জানলেনই। তিন টেস্টে তিন এবং চার টি-টোয়েন্টিতে দুই শিকারেও সামর্থ্যের অমন আহামরি কোনো ঘোষণা নেই। সবচেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতি ছিল তাসকিন আহমেদের বোলিংয়ে। ‘ছিল’ই বলতে হচ্ছে; কারণ মাঠের বোলিংয়ের চেয়ে বাইরের কাণ্ডকীর্তির জন্য ইদানীং তিনি সংবাদ শিরোনাম হন বেশি। অথচ ২০১৪ সালে ওয়ানডে অভিষেকে ভারতের বিপক্ষে পাঁচ উইকেট নেন তাসকিন। সেই বিস্ফোরণ তাঁর মধ্যে এরপর দেখা গেছে কখনো সখনো। তবে গত কিছুদিনে ভিজে যাওয়া বারুদের অকার্যকারিতাই বেশি। বাদও পড়েছেন জাতীয় দল থেকে। তবু বয়স যখন মাত্র ২২ বছর, তখন পাঁচ টেস্টে সাত, ৩২ ওয়ানডেতে ৪৫, ১৭ টি-টোয়েন্টিতে ১০ উইকেট শিকার বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছেই। আর মাশরাফির সিংহাসনের উত্তরাধিকার? এ ক্ষেত্রে তাসকিনের পক্ষে বাজি ধরতে হলে সাহসী হতে হবে খুব।

আল আমিন হোসেনের শুরুটা মন্দ হয়নি। তবে বোলিং অ্যাকশন নিয়ে প্রশ্ন এবং শৃঙ্খলা নিয়ে আরো বড় প্রশ্নে এলোমেলো হয়ে গেছে তাঁর ক্যারিয়ার। ছয় টেস্টে ছয়, ১৪ ওয়ানডেতে ২১ এবং ২৫ টি-টোয়েন্টিতে ৩৯ উইকেটের রেকর্ডটা আরো অনেক দূর টেনে নেবেন এই পেসার—এমন বিশ্বাসের লোক বাংলাদেশ ক্রিকেটাঙ্গনে খুব বেশি নেই।

মোহাম্মদ শহীদের আবির্ভাব টেস্ট স্পেশালিস্ট হিসেবে। অথচ পাঁচ টেস্টে নিয়েছেন মোটে পাঁচ উইকেট; পাশাপাশি খেলা একমাত্র টি-টোয়েন্টিতে আরো এক শিকার। ইনজুরি সমস্যায় জেবরার এখন শহীদ। ব্যক্তিগত জীবনের ঝামেলাও পিছু ছাড়ছে না। তাঁকে তাই আর ভাবা যাচ্ছে না লম্বা রেসের ঘোড়া হিসেবে।

কামরুল ইসলামের অভিষেক ২০১৬ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে। এখন পর্যন্ত কেবল এক ফরম্যাটেই সুযোগ পেয়েছেন। তাতে পাঁচ ম্যাচে সাত উইকেট। নিউজিল্যান্ডে দুই ম্যাচে ছয় উইকেট নিয়ে আশার ঝলক দেখান যথেষ্ট। কিন্তু এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলেন কই! অবশ্য সুযোগও কামরুল পাননি সেভাবে। নিউজিল্যান্ড সফরের পর কেবল ভারতের বিপক্ষে হায়দরাবাদ টেস্টেই ছিলেন একাদশে।

আরেক পেসার শুভাশীষ রায়ের বোলিংয়েও দেখা গেছে অল্পস্বল্প প্রতিশ্রুতি। চার টেস্টে তাঁর ৯ শিকার; এক ওয়ানডে একটি। খারাপ নয়, কিন্তু বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের ভার অনেক দিন টানতে পারবেন—এমন ঝলক সেভাবে দেখালেন পারেননি।

২০১৫ বিপিএলে দারুণ খেলে জাতীয় দলে জায়গা করে নেন আবু হায়দার। পাঁচ টি-টোয়েন্টিতে ৯.২৭ ইকোনমিতে তিন উইকেট নেওয়ায় ছিটকে পড়েন আবার। মুক্তার আলী এক টি-টোয়েন্টি খেলে কোনো উইকেট পাননি। মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনের ওপর নির্বাচকদের আশা অনেক। তবে এখন পর্যন্ত সে আশার প্রতিদান দিতে পারেননি সেভাবে। তিন ওয়ানডেতে এক এবং ছয় টি-টোয়েন্টিতে চার উইকেট তাঁর। তার চেয়ে বড় কথা, বোলিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসে বেধড়ক পিটুনি খাওয়াটা যে প্রায় অভ্যাস বানিয়ে ফেলছেন এই তরুণ! আবু জায়েদ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে খেলা একমাত্র টি-টোয়েন্টিতে নেন এক উইকেট।

পেস-ভুবনের এই অন্ধকারে মশালের আলো জ্বেলে রেখেছেন কেবল মুস্তাফিজুর রহমান। ভারতের বিপক্ষে প্রথম দুই ম্যাচের পাঁচ উইকেট, ছয় উইকেটের কীর্তির পুনরাবৃত্তি তো প্রতি ম্যাচে সম্ভব না। অস্ত্রোপচারের কারণে মাঝে অনেক দিন খেলার বাইরে থাকায় পথচলা কঠিন হয়ে গেছে আরো। তবু এখনো তিনি বাংলাদেশের তুরুপের তাস। ১০ টেস্টে ২৬, ২৭ ওয়ানডেতে ৫১ এবং ১৯ টি-টোয়েন্টিতে ২৮ উইকেট নেওয়া এই মুস্তাফিজেই বড় ভরসা।

আবুল হাসান থেকে ধরলে গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের জার্সিতে অভিষেক ১১ পেসারের। পুরনোদের মধ্যে রবিউল ইসলাম ২০১৩ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য এক সিরিজ খেলে হারিয়ে গেছেন। হারারের দুই টেস্টে ১৫ উইকেট বাংলাদেশের পেস বোলিং ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রদর্শনী। ওই সিরিজেই প্রত্যাবর্তন হওয়া আরেক পেসার সাজেদুল ইসলামও এখন নেই সম্ভাবনার কোনো হিসাবে।

অগত্যা? ভরসা সেই মাশরাফিই! অধিনায়ক হিসেবে নয়, মেন্টরের ‘হাওয়াই’ ভূমিকাতেও নয়—জাতীয় দলে খেলছেন তিনি বাংলাদেশের সেরা পেসার হিসেবেই। তাতে বাকি পেসারদের জীর্ণতার কী করুণ ছবিই না স্পষ্ট হয়!



মন্তব্য

Tapu commented 20 days ago
Rubel Hossen........?