kalerkantho


সাব্বিরকেই সব সময় প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতাম

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সাব্বিরকেই সব সময় প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতাম

ছবি : কালের কণ্ঠ

ফুটবলের সে এক সময় ছিল বটে, দলবদলের সময়টায় তারকা খেলোয়াড়কে ‘কিডন্যাপ’ করা কিংবা নিজেদের তাঁবুতে লুকিয়ে রাখা হতো। দেশীয় ফুটবলের রমরমা সে যুগের প্রতিনিধি মামুন জোয়ার্দার। আবাহনী তাঁকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে ঠিকই, তবে মোহামেডানের সঙ্গেও রয়েছে অন্য রকম সম্পর্ক! ক্লাব ফুটবলে সাফল্যের চ্যালেঞ্জ জিতে জায়গা করে নেন তিনি জাতীয় দলে। সাফল্য সর্বোচ্চস্তরেও আছে, তবু মাঠের ডান প্রান্ত মাতিয়ে রাখা এই ফুটবলারের ক্যারিয়ার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, সেটাও কম আলোচিত নয়। মাসুদ পারভেজ সেসবই তুলে ধরেছেন কালের কণ্ঠ’র পাঠকদের জন্য

 

 

প্রশ্ন : মোহামেডান সমর্থকদের কাছে আপনার ‘বেইমান’ বনে যাওয়ার গল্প দিয়েই এই সাক্ষাৎকারে ঢুকতে চাই।

মামুন জোয়ার্দার : হা হা হা! এ জন্য মোহামেডান সমর্থকদের কী পরিমাণ গালিগালাজ যে আমাকে হজম করতে হয়েছে! কারণ ওরা জানত যে আমি মোহামেডানের সঙ্গে বেইমানি করে আবাহনীতে গিয়েছি। কিন্তু ওরা এটি জানত না যে আমি নিজের ক্যারিয়ার বাঁচাতেই আবাহনীতে গিয়েছিলাম।

প্রশ্ন : কিন্তু এটাও তো ঠিক যে আবাহনীর কাছ থেকে প্রস্তাব পাওয়ার মতো অবস্থান আপনার তৈরি হয়েছিল মোহামেডানে মাত্র কিছুদিন খেলেই?

মামুন : হ্যাঁ, সেটিও অস্বীকার করার উপায় নেই। দর্শকরা কিন্তু মোহামেডানের হয়ে ভালো খেলার মাধ্যমেই আমাকে প্রথম চিনেছিল। তাও আবার ওদের হয়ে ‘খেপ’ খেলেই আমার নামডাক হওয়ার শুরু। পরিষ্কার মনে আছে, এরশাদ সরকারের পতনের আগে-পরে দেশের অস্থির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক বছর লিগই হয়নি। ওই সময়টায়ই আমি মোহামেডানের হয়ে প্রচুর টুর্নামেন্ট খেলেছি এবং দুর্দান্ত খেলে সুনামও কুড়াই বেশ। সবার পক্ষে ধরে নেওয়াই স্বাভাবিক ছিল যে পরবর্তী দলবদলে আমি মোহামেডানেই সই করব। কিন্তু শেষের দিকে এসে সব কিছু কেমন যেন ওলটপালট হয়ে গেল। দলে নিজের জায়গা নিয়ে ‘ইনসিকিউরিটি’ তৈরি হয়ে গেল আমার মধ্যে। তাই খেলার নিশ্চয়তা পেয়ে চলে যাই আবাহনীতে।

প্রশ্ন : এই অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার গল্পও শুনব। তার আগে শুনে নিতে চাই আপনার মোহামেডানের হয়ে খেলার সুযোগ পাওয়ার গল্পটা।

মামুন : ঢাকা লিগে আমি প্রথম খেলি আজাদ স্পোর্টিংয়ের হয়ে। এরপর এক বছর করে চলন্তিকা আর ওয়ারীতে খেলে যোগ দিই ভিক্টোরিয়ায়। সেখানে পার করি দুই মৌসুম। এর মধ্যে শেষ মৌসুমে ভিক্টোরিয়ার হয়েও আমি দুর্দান্ত ফুটবল খেলি। ওখানে ভালো খেলার ফলেই ডাক আসে পাশের ক্লাব মোহামেডান থেকে। কোনো এক মাধ্যমে ভাড়ার খেলোয়াড় হিসেবে তাঁদের হয়ে খেলার প্রস্তাব পাঠান মোহামেডানের তখনকার ম্যানেজার সালাম ভাই (সালাম মুর্শেদী)।

প্রশ্ন : নিজের নামটা বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ারও শুরু মোহামেডানের অতিথি খেলোয়াড় হিসেবেই।

মামুন : একদম তাই। মোহামেডানের হয়ে খেলি মা-মণি গোল্ড কাপ, বিটিসি কাপ, স্বাধীনতা কাপ, সৌদি আরবে এশিয়ান কাপ উইনার্স কাপ থেকে শুরু করে ঢাকায় হওয়া এশিয়ান ক্লাব কাপেও। ভালো খেলেছি প্রতিটি টুর্নামেন্টেই। ঢাকার মাঠে এশিয়ান ক্লাব কাপে মালদ্বীপের দল এবং ভারতের সালগাওকারের বিপক্ষে গোল করে মাঠও মাতাই। সে জন্য ক্রীড়া লেখক সমিতির রায়ে ওই আসরের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও পাই আমি। মোহামেডানের হয়ে খেলার সময় আমি ক্যারিয়ার গঠনের চিন্তা থেকেই নিজের সেরাটা উজাড় করে দিয়েছি। লক্ষ্য ছিল জাতীয় দলে সুযোগ করে নেওয়ার। জানতাম যে ভালো খেলতে থাকলে জাতীয় দলে গিয়ে কখনো বসে থাকতে হবে না।

প্রশ্ন : সাফল্যের সঙ্গে খেলার পরেও মোহামেডানে নিজের জায়গা নিয়ে কেন অনিশ্চয়তা জাপ্টে ধরল আপনাকে?

মামুন : এখানে একটা সত্যি কথা আগে বলে রাখি। আমি নিজেও কিন্তু মোহামেডানের পাঁড় সমর্থক ছিলাম। কাজেই বুঝতে পারছেন, এই দল ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা আমার পক্ষে খুব সহজ ছিল না। তবু এক-দুই দিনের সিদ্ধান্তেই আমি আবাহনীতে যাই। মোহামেডানের তখনকার কোচ ইরানের নাসের হেজাজি। তাঁর কারণেই আমি মোহামেডান ছাড়ি। সেই সময় সাব্বিরের (সৈয়দ রুম্মন বিন ওয়ালী সাব্বির) পাশাপাশি মামুন জোয়ার্দারও কিন্তু কম লাইমলাইটে ছিল না। হেজাজি অবশ্য দুজনের মধ্যে সাব্বিরকেই বেশি পছন্দ করতেন। দলে নিয়মিত জায়গা পাওয়ার আত্মবিশ্বাসটা নড়ে যায় এখান থেকেই। তাই আবাহনীতে চলে যাই। তবে কোনো লোভনীয় অফারে নয়। অনেক কম টাকা নিয়েই আমি আবাহনীতে খেলেছি।

প্রশ্ন : বলছেন কী!

মামুন : অবিশ্বাস্য হলেও সত্য। তাও আবার সেটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা দলবদল। ২০ লাখ টাকায় মুন্না ভাই (মোনেম মুন্না) আবাহনীতে থেকে গেলেন। রীতিমতো টাকার ঝনঝনানি তখন। ওই সময়েই মোহামেডানের প্রস্তাবের চেয়ে কম টাকায় আবাহনীতে যাই।

প্রশ্ন : মোহামেডান আটকানোর চেষ্টা করেনি আপনাকে?

মামুন : সালাম ভাই অনেক বুঝিয়েছেন আমাকে। আমিও তাঁকে পাল্টা বোঝাই যে আমার ক্যারিয়ার নষ্ট করতে চাই না। যদিও এর আগেই তাঁর সঙ্গে আমার মোহামেডানে খেলার কথা পাকাপাকি ছিল। এমনকি কী পাব না পাব, চূড়ান্ত ছিল সেটিও। ১২ লাখ টাকা চেয়েছিলাম। সালাম ভাইও এক কথায় রাজি। একপর্যায়ে মনে হয়েছিল টাকা না নিয়ে একটা ফ্ল্যাট নিই। সালাম ভাই তাতেও ‘না’ করেননি। কিন্তু হঠাৎ করেই হেজাজির কারণে মত বদলে ফেলি আমি। সালাম ভাইয়ের ডাকেই আমি মোহামেডানে খেলেছিলাম। দলও ছেড়েছি তাঁকে জানিয়েই। সমর্থকদের তো আর এসব জানা ছিল না। তাই ওদের চোখে বেইমান হয়ে যাই আমি।

প্রশ্ন : বলছিলেন যে মোহামেডানের চেয়ে কম টাকায় আবাহনীতে গিয়েছিলেন। তা আর্থিক প্যাকেজটা কী ছিল?

মামুন : প্যাকেজ বলতে আবাহনীর হয়ে নিয়মিত খেলতে হবে, এটাই ছিল চিন্তা। আবাহনী ক্লাবে তখন আমার পজিশনের খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ারের শেষ সময়। আমি সম্ভবত আনোয়ার ভাইয়ের (কাজী আনোয়ার) জায়গায় গিয়েছিলাম। টাকার চেয়ে রাইট উইংয়ে জায়গা করে নেওয়াটাই আমার কাছে তখন বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল। তাই আবাহনীর সঙ্গে চুক্তি হয়ে যায় ১১ লাখ টাকাতেই। এর মধ্যে ৯ লাখ পাই অগ্রিম। সেই টাকা আনতে গিয়েও মজার এক অভিজ্ঞতা হয়।

প্রশ্ন : কী সেটি?

মামুন : ক্লাবে যেতেই বড় একটা কাগজের খাম ধরিয়ে দেওয়া হয় আমাকে। দেখে বোঝা যায় যে ভেতরে অনেক টাকা। যদিও তখনই গুণে নেওয়ার সুযোগ ছিল না। টাকাভর্তি খাম রিকশার সিটের নিচে গুঁজে রেখে আমি বাসায় ফিরি (হাসি...)।

প্রশ্ন : আবার একটু হেজাজি প্রসঙ্গে ফিরতে চাই। বলছিলেন যে এক-দুই দিনের সিদ্ধান্তে আপনি মোহামেডান ছাড়েন। কী এমন হয়েছিল যে এত দ্রুত সিদ্ধান্তে যেতে হয় আপনাকে?

মামুন : একটা কিছু তো হয়েছিল অবশ্যই। টুর্নামেন্টের নামটা এই মুহূর্তে আমার মনে আসছে না। পুরো টুর্নামেন্টে আমি খেললাম। কিন্তু ফাইনালে হেজাজি আমাকে খেলালেন না। ওই যে একটা মানসিক ধাক্কা খেলাম, হেজাজি আমার কাছে রীতিমতো এক আতঙ্কের প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছিলেন। বুঝতে পারছিলাম যে সামনের লিগেও হয়তো উনি আমাকে নিয়মিত খেলাবেন না।

প্রশ্ন : সালাম মুর্শেদীকে বলে গেলেও ওই সময়ের দলবদলের যে চিত্র ছিল, তাতে মোহামেডান ছেড়ে যাওয়ার ব্যাপারটিও নিশ্চয়ই সহজ ছিল না।

মামুন : একদম ঠিক বলেছেন। তখনকার দলবদলে হাঙ্গামা বেধেই থাকত। যে মামুন জোয়ার্দার মোহামেডানের হয়ে একের পর এক টুর্নামেন্ট খেলেছে, সে কিনা খেলবে আবাহনীতে! এটা অনেকের কাছেই মেনে নেওয়ার মতো ছিল না। এ জন্যই আমাদের কয়েকজনকে ঘিরে দারুণ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েছিল আবাহনীকে। ক্লাবের আশপাশেই কোনো এক বাড়ির একটি কক্ষে আমরা পাঁচজন খেলোয়াড় তিন-চার দিন পালিয়ে ছিলাম—আলমগীর, মুন্না ভাই, রেহান, রুমি এবং আমি। পালিয়ে থাকার কয়েকটি দিন শুধু খাওয়ার ওপরেই ছিলাম (হাসি...)।

প্রশ্ন : হেজাজির ওপর রাগ করেই মোহামেডান ছাড়া আপনার। পরে সেই মোহামেডানের বিপক্ষেই দুই গোল করে আপনি আবাহনীকে লিগ চ্যাম্পিয়ন করান। ওই পারফরম্যান্সের মাধ্যমে পুরনো রাগ-ক্ষোভ উগরে দেওয়ার কোনো ব্যাপার কি ছিল?

মামুন : হ্যাঁ, ১৯৯১-৯২ লিগের ম্যাচ ছিল সেটি। চ্যাম্পিয়ন হতে হলে আবাহনীর ড্র করলেই হতো। আর মোহামেডানের সামনে জয়ের কোনো বিকল্প ছিল না। আমরা ১-০ গোলে পিছিয়েও ছিলাম। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নেমে আমার করা দুই গোলে জিতেই চ্যাম্পিয়ন হয় আবাহনী। বলতে পারেন কিছু একটা করে দেখিয়ে দেওয়ার প্রচণ্ড জেদ ছিল আমার। হেজাজি আমাকে ওই ফাইনালে না খেলানোর ফলে জেদটা আমার মধ্যে ভর করেছিল। সেই জেদ যদি কাজ না করত, তাহলে বোধ হয় আমি আজ মামুন জোয়ার্দার হতে পারতাম না। মামুন জোয়ার্দার এক দিনে হইনি। অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে এই জায়গায় আসতে। আমি চিন্তা করতাম, মোহামেডান থেকে রাগ করে যেহেতু আবাহনীতে এসেছি, আমাকে সাব্বিরের চেয়ে ভালো খেলতে হবে। সে জন্য আমি কতটা বাড়তি পরিশ্রম করেছি, তারও কিছু উদাহরণ দিতে চাই।

প্রশ্ন : বলুন, বলুন।

মামুন : আমার সব থেকে বেশি উপকার করেছেন আসলে আবাহনীতে খেলা ঝুকভ নামের এক রাশিয়ান খেলোয়াড়। ওর সঙ্গে আমার দারুণ বোঝাপড়া তৈরি হয়ে গিয়েছিল। একসঙ্গে অনুশীলন করতাম আমরা। ও রাশিয়ান ভাষায় কথা বলত। আর বাঙালি দোভাষী আমাকে তা অনুবাদ করে দিতেন। প্রচণ্ড গতিসম্পন্ন ফুটবলার ছিল সে। অনুশীলনে প্রচণ্ড গতিতে দৌড়ে গিয়ে ও ঠিক একটা ফাঁকা জায়গা বের করে নিত। আমাকে বলত ওই ফাঁকা জায়গায় বলটা ঠেলতে। ওই ফাঁকটা আমার এখনো মুখস্থ আছে।

প্রশ্ন : বাড়তি পরিশ্রমের কিছু উদাহরণ দেবেন বলছিলেন।

মামুন : ও হ্যাঁ, হ্যাঁ। নিজেকে নিখুঁত করার জন্য আমি অনেক অনুশীলন করেছি। সবাই অনুশীলন করে চলে যাওয়ার পর আমি আরো আধঘণ্টা বেশি করতাম। এই বাড়তি শ্রম দেওয়ার পরামর্শ মুন্না ভাইও দিতেন। শুটিং অনুশীলন করতাম। সাব্বির কিভাবে বলটা মারে, কিভাবে ক্রস করে—এসব নিজেও আয়ত্ত করার চেষ্টা করতাম। সবার অনুশীলন শেষ হওয়ার পরে আমি অন্তত ৫০টি করে ক্রস করতাম। জানি না, এখনকার খেলোয়াড়রা এ রকম বাড়তি কিছু করে কি না। সাব্বির মাঠে দারুণভাবে কোনো বল ঘোরালে আমার মনে হতো, ও পারলে আমি কেন পারব না? আমি কিন্তু সব সময়ই সাব্বিরকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতাম।

প্রশ্ন : মন থেকে তাহলে সাব্বিরের সঙ্গে একটি লড়াই-ই তৈরি করে নিয়েছিলেন আপনি?

মামুন : লড়াই তো তৈরি করতেই হবে। ও জাতীয় দলে ডাক পায়। আমার কথা হলো, আমিও পাব। ও জাতীয় দলের প্রথম একাদশে খেলে। আমার কথা হলো, আমিও প্রথম একাদশেই খেলব। নিজে থেকেই নিজেকে এ রকম একটি লড়াইয়ের মধ্যে ঠেলে দিয়েছি বলেই না আমি নিজ যোগ্যতায় জাতীয় দলে খেলতে পেরেছি। জাতীয় দলে কিন্তু আমি কোনো দিন বেঞ্চে বসে থাকিনি।

প্রশ্ন : সাব্বিরকে সব সময়ই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবেছেন। খেলোয়াড়ি দক্ষতায় কখনো তাঁকে ছাড়িয়ে যেতে পেরেছিলেন বলে মনে করেন কি?

মামুন : না, এটা সত্যি যে সাব্বির এক কোয়ালিটির খেলোয়াড়, আমি আরেক কোয়ালিটির। আমার গতি একটু বেশি ছিল ঠিক। তবে গতি সাব্বিরেরও ছিল। সাব্বিরের জায়গায় আমি আসতে পারব না কোনো দিনই। এটা আমি বলে দিলাম। বাংলাদেশে যদি উইঙ্গার হিসেবে সেরা খেলোয়াড়ের কথা বলেন, চুন্নু ভাইয়ের (আশরাফউদ্দিন চুন্নু) পরেই সাব্বিরের নাম আসবে। তিনজনের মধ্যে ওয়াসিম ভাইও থাকবেন। সাব্বিরের যে পায়ের একটা মাপ ছিল, ওটা আমি এখনো বলতে পারব না যে কী করে মানুষ এত নিখুঁত হয়! ও যেখানেই চাইত, সেখানেই বলটা পাঠাতে পারত। ওর মধ্যে অনেক কিছু ছিল, যা বাংলাদেশের একজন খেলোয়াড়ের পক্ষে বিরলই। ও কিন্তু মেসি স্টাইলে খেলত। কেটে বেরিয়ে যেত। ড্রিবলিং আর লব ছিল এককথায় অসাধারণ!

প্রশ্ন : এবার ১৯৯১-৯২ সালের শিরোপা নির্ধারণী লিগ ম্যাচটিতে আবার ফিরতে চাই। সেই ম্যাচে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে দ্বিতীয়ার্ধে নামেন আপনি। অথচ দলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে শুরু থেকেই খেলার কথা আপনার। আপনাকে পরে নামানোর ব্যাপারটিও সেসময় আলোচিত ছিল খুব।

মামুন : (হাসি...) ঠিকই বলেছেন। তখন একটি গুজব রটে যায় যে আবাহনীর কেউ মোহামেডানের বিপক্ষে পাতানো খেলতে পারে। এবং সমর্থকদের ছড়ানো সেই গুজবে সন্দেহের তীরটা তাক করা হয়ে যায় আমার দিকেই। ছড়িয়ে দেওয়া হয় যে ম্যাচের আগের দিন মোহামেডানের কায়সার হামিদের সঙ্গে আমাকে গোপন শলাপরামর্শ করতে দেখা গেছে। অথচ আগের দিন কায়সার ভাইয়ের সঙ্গে আমার দেখাই হয়নি। আবাহনীর কোচ তখন সালাউদ্দিন ভাই (এখন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন)। গুজবে তিনিও প্রভাবিত হন অনেকটা। তাই ম্যাচের প্রথম একাদশে তিনি আমাকে রাখেনইনি। আমি যে পজিশনে খেলি, সেই রাইট উইংয়ে নামান রুশ খেলোয়াড় আনাতোলিকে। অথচ সে ওই পজিশনের খেলোয়াড়ই নয়। ওর জায়গা মিডফিল্ড। ওদিকে আবার রহিমভের গোলে আবাহনী পিছিয়েও পড়েছে। এই অবস্থায় বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের যে অংশটা আবাহনীর গ্যালারি বলে পরিচিত, সেখান থেকে সমর্থকরা আমাকে নামানোর জন্য চিৎকার শুরু করে। তাতে কাজও হয়। হুট করেই সালাউদ্দিন ভাই এসে ওয়ার্ম আপ করতে বলেন। দ্বিতীয়ার্ধে তিনি আমাকে নামান।

প্রশ্ন : এবং নেমেই সব সন্দেহ মুছে দেওয়া বীরোচিত পারফরম্যান্স।

মামুন : ঠিক তাই। খেলার ৩৫ মিনিট বাকি থাকতে আমি নামি। নামার পর প্রথম ৪ মিনিট আমার পায়ে বলই আসেনি। এর পরই আসে সমতাসূচক গোলের সেই মুহূর্তটি। বাঁ-দিক থেকে রুমির কর্নারে উড়ে আসা বলে একই সঙ্গে হেড করতে লাফিয়ে ওঠেন মোহামেডানের কায়সার ভাই এবং আমাদের আসলাম ভাই (শেখ মোহাম্মদ আসলাম)। কেউই হেড ঠিকঠাক করতে পারেননি। বল আসলাম ভাইয়ের মাথা ছুঁয়ে একটা ড্রপ খেয়ে পড়ে আমার সামনে। আমার পেছনে মোহামেডানের জনি ভাই (ইমতিয়াজ সুলতান জনি)। এখনো প্রতিটা মুহূর্ত চোখের সামনে ভাসছে। মুহূর্তেই আমি বাঁ পায়ে কোনাকুনি ভলি মারি। কানন ভাই (ছাইদ হাছান কানন) ডাইভ মারলেও শেষরক্ষা হয়নি। বল জালে জড়িয়ে হয়ে যায় ১-১।

প্রশ্ন : এর কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনার করা জয়সূচক গোলটিই সেই সময়ের ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে বেশি গেঁথে আছে বলে জানি।

মামুন : তাই হওয়ার কথা। একেই ছিল জয়সূচক গোল, তার ওপর সেটি কয়েকজনকে ডজ দিয়েও করা। সমতাসূচক গোলের ৫ মিনিটের মধ্যেই ঝুকভের বাড়ানো বল আসে আমার পায়ে। আমি মাত্র দুটো ডজ দিই। প্রথমে জনি ভাইকে। এরপর আমাকে ফাইনাল চার্জ করতে আসা কায়সার ভাইকে। আমি কাট করে বেরিয়ে যাই, কায়সার ভাই পড়ে যান। তখন দেখি প্রথম পোস্ট ফাঁকা। ওদিক দিয়েই করা শটে কানন ভাইও পরাস্ত হন।

প্রশ্ন : যাঁকে দুইবার পরাস্ত করে শিরোপা ছিনিয়ে এনেছিলেন আপনি, সেই কাননের সঙ্গে আপনার জীবনের দুঃসহ একটি অধ্যায়ও জড়িয়ে। কয়েক বছর পর তাঁর সঙ্গে সংঘর্ষেই হাত ভাঙে আপনার। আপনিও সব সময়ই বলে এসেছেন যে কাণ্ডটি কানন ইচ্ছাকৃতভাবেই ঘটিয়েছিলেন।

মামুন : হ্যাঁ, আমি সব সময় তাই মনে করে এসেছি। আমি আর কায়সার ভাই একসঙ্গেই হেড করতে লাফিয়ে উঠেছিলাম। একই সময়ে কাননও পাঞ্চ করতে লাফিয়ে ওঠে। কিন্তু পাঞ্চটা এসে লাগে আমার চোয়ালে। আমি পড়ে যাই। আর কানন ভাইও লাফিয়ে তাঁর বিশাল শরীরটা নিয়ে পড়েন আমার হাতের ওপর। ভাঙা হাত নিয়ে আমাকে মাঠ থেকে যেতে হয় হাসাপাতালে। কানন ভাই যদিও সব সময়ই বলে এসেছেন যে ইচ্ছাকৃতভাবে ওটা করেননি। কিন্তু আমারও সব সময়ই মনে হয়েছে যে ইচ্ছাকৃতভাবেই উনি কাজটি করেছেন। উনি কিছুদিন আগে কানাডাতেও গিয়েছিলেন। সেখানেও কানন ভাই আমাকে বলেছেন, ‘মামু, তুমি কিন্তু দুই গোল মেরে আমার ক্যারিয়ার শেষ করে দিয়েছিলে। তোমাকে দেখলে আমি ভয় পেতাম।’ ওখানকার সিবিসি চ্যানেলেও উনি বলেছেন যে মামুনকে দেখলেই তাঁর ভয় লাগত। কখন গোল করে দেয়, এই ভয়ে উনি নার্ভাস থাকতেন। এটা আমি জানি যে ইচ্ছাকৃতই ছিল। আমার হাতে অনেক দিন তাঁর স্পাইকের দাগও ছিল। হাত ভাঙার পরেই আমার ক্যারিয়ারটা একটা ধাক্কা খায়। অবশ্য আরো পরে হাঁটুর মিনিসকাসের অস্ত্রোপচারটিও আমার ক্যারিয়ার সংক্ষিপ্ত করে দেওয়ায় কম ভূমিকা রাখেনি।

প্রশ্ন : কাননের প্রতি সেই ক্ষোভ কি এখনো আছে?

মামুন : না মাফ, সব কিছু মাফ। ক্যারিয়ার যেমন পেছনে ফেলে এসেছি, তেমনি ওই ঘটনাও। কানন ভাই কিছুদিন আগে কানাডায় গিয়েছিলেন, গিয়েছিলেন আমার বাসায়ও। এখন দেখা হলে ফুটবল খেলোয়াড় ও বড় ভাই হিসেবেই দেখি তাঁকে। চেষ্টা করি ওই ঘটনাটি ভুলে থাকার।

প্রশ্ন : আচ্ছা, কথায় কথায় অনেক দূর চলে এলেও ছোটবেলায় ফুটবলে আপনার হাতেখড়ির গল্পটা এখনো শোনাই হলো না। সংক্ষেপে সে কথাও বলুন একটু।

মামুন : বলতে পারেন ফুটবলটা আমার রক্তে। আমার বাবা আলফাজ উদ্দিন জোয়ার্দার ব্রিটিশ আমলের ফুটবলার ছিলেন। ফুটবল খেলেছেন আমার ভাইয়েরাও। এঁদের মধ্যে আব্দুল কাদির জোয়ার্দার ১৯৭৮ সালে আগা খান গোল্ডকাপেও খেলেছেন। বাবা এবং ভাইয়েরা খুব উৎসাহ দিতেন আমাকে। বাবা তো দূর গ্রামে ভ্যানে চড়ে আমার খেলাও দেখতে চলে যেতেন। চুয়াডাঙ্গায় অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলার বাছাইয়ের নানা ধাপ পেরিয়ে খুলনা বিভাগের হয়ে বিভাগীয় চূড়ান্ত পর্বের খেলায় অংশ নিতে ঢাকায় এসেই আমার শুরু। অনূর্ধ্ব-১৬ জাতীয় দলের অনুশীলন শিবিরেও ডাক পেয়েছিলাম। তখন জায়গা না পেলেও অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় দলের হয়ে ঠিকই আমি মাঠ মাতিয়ে দিই। এর আগেই আনজাম ভাই নামের একজন আজাদ স্পোর্টিংয়ের হয়ে ঢাকা লিগে এক মৌসুমের শেষ দুটি ম্যাচ খেলার সুযোগ করে দেন আমাকে। এই তো, সংক্ষেপে বললে ঢাকার ফুটবল দৃশ্যপটে আমার আবির্ভাবের গল্পের শুরু এটাই।

প্রশ্ন : একটু আগেই সাব্বিরের কথা বলছিলেন যে উনি ছিলেন মেসি স্টাইলের ফুটবলার। আপনিও খেলোয়াড়ি জীবনে খুব স্পিডি ও অব দ্য বল কুইক ছিলেন। শুটিং পাওয়ারও প্রচণ্ড ছিল আপনার। তা নিজের সম্পর্কে আপনার মূল্যায়নটাও এই সুযোগে একটু শুনে নিতে চাই।

মামুন : এখানে বাংলাদেশ দলের সাবেক কোচ অটো ফিস্টারকেও একটু নিয়ে আসতে চাই। আমি বলব বাংলাদেশের সেরা কোচ ছিলেন তিনি। উনি আমাকেও ভীষণ পছন্দ করতেন। কারণ আমি রাইট ব্যাক, রাইট আউট ও রাইট উইঙ্গার খেলি তখন। আমি রবার্তো কার্লোসের মতো ওভারল্যাপিং করে খেলতাম। স্টাইলের কথা যেহেতু এলোই, তাই ওই ব্রাজিলিয়ানকে টেনে আনা।

প্রশ্ন : জাতীয় দল ও ক্লাব ফুটবল মিলিয়ে আপনার জীবনের সেরা গোল কোনটি?

মামুন : একাধিক গোলের কথাই বলতে হবে। জাতীয় দলের হয়ে আমি খুব সম্ভবত ৯টি গোল করেছিলাম। এর মধ্যে সেরা ১৯৯৫ সালের মাদ্রাজ সাফ গেমসে নেপালের বিপক্ষে করা গোলটি। অনেক দূর থেকে করা যে গোলটি দীর্ঘদিন বিটিভিতে রাত ৮টার বাংলা সংবাদের আগে দেখাত। মোহামেডানের হয়ে বিটিসি ক্লাব কাপে ব্রাদার্সের বিপক্ষেও একটি গোল করেছিলাম একেবারে মাঝমাঠ থেকে। আর ১৯৯১-৯২ সালের লিগে মোহামেডানের বিপক্ষে করা দ্বিতীয় গোলটিও আমার জীবনের সেরা গোলগুলোর একটি।

প্রশ্ন : সাফ গেমসের প্রসঙ্গও এসে গেল যেহেতু, জানতে চাই আপনাদের সময়ে গেমস ফুটবলের শিরোপা জিততে না পারা আপনাকে কতটা পীড়া দেয়।

মামুন : প্রথমেই আসি ১৯৯৩ সালের ঢাকা সাফ গেমস ফুটবলে। আমাদের মাঠে এসে নেপাল চ্যাম্পিয়ন হয়ে যায়। আমার ফুটবল ক্যারিয়ারের চরম ব্যর্থতা ওটা। যদিও সুইজারল্যান্ডের কোচ ওল্ডরিখ সোয়াব খুব ভালো অনুশীলন করিয়েছিলেন আমাদের। এখানে কিছু কথা না বললেই নয়। সোয়াবও বলে গিয়েছিলেন যে রাজনীতি থেকে বেরোতে না পারলে আমাদের ফুটবল এগোবে না। ওই সাফ গেমসের দল ঘোষণা করা যাচ্ছিল না, কারণ ফুটবল ফেডারেশন অধিনায়কের নাম জানাচ্ছিল না। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম মুন্না ভাই কিংবা রুমির (রিজভী করিম রুমি) মধ্যে কেউ একজন অধিনায়ক হবে। কিন্তু একদিন রাত ১১টায় অধিনায়ক হিসেবে ঘোষণা করা হলো মুনের নাম। ভাববেন না মাঠের ব্যর্থতা ঢাকতে চাইছি। বলতে চাইছি মাঠের বাইরেও অনেক কিছু ঘটেছিল, যা দলের মনোবলে চোট লাগিয়েছিল। নানা সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক কিছুই হয়েছিল। যেমন হয়েছিল ১৯৯৩ সালে জাপানে বিশ্বকাপ ফুটবলের বাছাই পর্ব খেলতে গিয়েও।

প্রশ্ন : সে কথাও বলুন।

মামুন : এত দিন পরে এসব খুব বলতেও চাই না। এটা অবশ্য বলতেই হবে যে রাজনীতি আমাদের ফুটবলে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে। বিশ্বকাপ বাছাইয়ের কথাই ধরুন। তখন বিএনপির শাসনামল। তখনকার বাণিজ্যসচিব মোফাজ্জল করিম ফুটবল ফেডারেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট। তাঁর কথা হলো জাপানের বিপক্ষে কাননকে খেলাতেই হবে। তিনি বিএনপি করেন বলেই হয়তো। তা কানন ভাই খেললেনও এবং জাপানের কাছে আমাদের ৮-০ গোলের ভরাডুবির পর বোধোদয়ও হলো। যে জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে নামানো হয় মহসিন ভাইকে। ওই ম্যাচটি মূলত আমিরাত বনাম মহসিন ভাইয়েরই ছিল। তিনি একটি পেনাল্টিও ঠেকিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত আমিরাতের পেনাল্টি থেকে করা গোলেই আমরা হারি। তবে ১৯৯৫ সালের মাদ্রাজ সাফ গেমসের ফাইনালে বাইচুং ভুটিয়ার গোলে ভারতের কাছে আমাদের হারের কারণ অবশ্য অন্য। আমাদের সেবার চক্রান্ত করেই হারানো হয়েছিল। না হলে আমরাই সোনা জিততাম।

প্রশ্ন : কী চক্রান্ত?

মামুন : আমি বলব জোর করে সেই ফাইনালে হারানো হয়েছিল আমাদের। আমাদের ডিফেন্সই ছিল না কোনো। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সেমিফাইনালে জুয়েল রানা আর মাসুদ রানাকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখিয়ে ফাইনালে খেলার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ফাইনালের দিন হোটেল থেকে মাঠের ২০ মিনিটের পথ দুই ঘণ্টা ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তাও আবার মাঠ থেকে তিন কিলোমিটার দূরে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয় আমাদের। এতটা পথ হেঁটে মাঠে গিয়ে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি ম্যাচের আগেই। যা আতঙ্কও তৈরি করে দেয় আমাদের মধ্যে।

প্রশ্ন : ক্যারিয়ার শেষ করার আগে সাফ গেমস না জেতার অতৃপ্তিও তাহলে আছে আপনার?

মামুন : অতৃপ্তি অবশ্যই আছে। এত ভালো দল হওয়ার পরও দেশের জন্য কিছু দিতে পারিনি। খালি একটা জিনিসই দিতে পেরেছি, ১৯৯৫ সালে মিয়ানমারে চার জাতি আসরের শিরোপা। প্রথমে মিয়ানমারের কাছে ৪-০ গোলে হেরে আমরা টুর্নামেন্ট শুরু করি। (গ্রুপ পর্যায়ে পরের ম্যাচে সিঙ্গাপুরকে ১-০ এবং শ্রীলঙ্কাকে ১-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে যায় বাংলাদেশ)। এরপর ফাইনালে সেই মিয়ানমারকে হারিয়েই চ্যাম্পিয়ন হই আমরা। আমরা যদিও পিছিয়ে ছিলাম। নকীবের (ইমতিয়াজ আহমেদ নকীব) ফ্লিকে আমি ভলিতে গোল করেছিলাম ফাইনালে। আর নকীবের গোলটি ছিল হেডে। আমি হয়েছিলাম টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় আর নকীব ফাইনালের সেরা। ওই ফাইনালের আগে কোচ অটো ফিস্টারের অনুপ্রেরণাদায়ী কথাগুলো এখনো কানে ভাসে।

প্রশ্ন : মোহামেডান ছেড়ে আবাহনীতে গিয়েও থাকেননি বেশি দিন। কারণ কী?

মামুন : ওই যে পুল করে খেলোয়াড়দের হাতে-পায়ে শিকল পরানো হয়েছিল। এর প্রতিবাদেই ১৯৯৪ সালে চলে যাই মুক্তিযোদ্ধায়। জাতীয় দলের ১১ জন আমরা একসঙ্গে দলটিতে যাই। যেটি গঠিত হয়েছিল মঞ্জুর কাদেরের উদ্যোগে। তাদের যে টাকার অভাব নেই, সেটি বোঝানোর জন্য আমাদের সোনালী ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় নিয়ে ভল্ট খুলে দেখানো পর্যন্ত হয়। মুক্তিযোদ্ধা কারো টাকা মারেওনি। যদিও সেখানেও দুই মৌসুমের বেশি থাকা হয়নি। আবার ফিরি আবাহনীতে। এরপর আবার মুক্তিযোদ্ধায় ফিরে গিয়ে ২০০০ সালে ক্যারিয়ারের ইতি টানি। মজার ব্যাপার হলো, ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটিও খেলেছি মোহামেডানের বিপক্ষেই (হাসি...)।

প্রশ্ন : ফুটবল ক্যারিয়ার নিয়ে কোনো অতৃপ্তি?

মামুন : নাহ্, নেই। ফুটবলার না হলে আমি মামুন জোয়ার্দার হতাম না। আজ আপনি আমার বাসায়ও আসতেন না। ক্যারিয়ারটা লম্বা করলে করা যেত। আমি খেললে আরো পাঁচ বছর খেলতে পারতাম। কিন্তু দেখলাম যে মান পড়ে যাচ্ছে, তাই আর বাড়াইনি।

প্রশ্ন : সবশেষে আপনার পরিবার ও বর্তমান জীবন নিয়ে একটু ধারণা চাই।

মামুন : ২০০০ সালে কানাডায় চলে যাই। এখনো সেখানেই আছি, টরন্টো শহরের একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করি। স্ত্রী, দুই মেয়ে আর এক ছেলেকে নিয়ে আমার সুখের সংসার। আমার মতো সাবেক ফুটবলারদের আরো অনেকেই সেখানে থাকে। তাঁদের সংস্পর্শে কাজের বাইরের সময়টাও তাই সেখানে খুব উপভোগ করি।



মন্তব্য