kalerkantho


মাঠ সংস্কার

পারিশ্রমিকের সঙ্গে পারফরম্যান্সে ব্যাপক গরমিল

সনৎ বাবলা   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পারিশ্রমিকের সঙ্গে পারফরম্যান্সে ব্যাপক গরমিল

এএফসি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামকে খেলার অনুপযোগী উল্লেখ করেছে সম্প্রতি। আগামী ৭ মার্চের আগে মাঠ উপযুক্ত করা না হলে অনিশ্চিত হয়ে পড়বে আবাহনী-নিউ রেডিয়ান্টের ম্যাচ। বাফুফে মাঠের মানোন্নয়নে মনোযোগী হয়েছে তাই। পানি দিয়ে নরম করার পর ঘাস বুনে সবুজ করার চেষ্টা চলছে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের মাঠ। ছবি : মীর ফরিদ

বাংলাদেশের শেয়ার মার্কেটের ভূত আবার ভর করেছে ফুটবলের দলবদলে। বড় অদ্ভুত এ দেশের শেয়ার মার্কেট। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। দেখা যায়, কম্পানির সব আর্থিক সূচক খারাপ হওয়ার পরও তরতর করে বাড়ে তার শেয়ার মূল্য। একই রহস্যময় চরিত্র ফুটবলারদের বাজারেও। পায়ে-মাথায় ফুটবলের তেমন শ্রী নেই অথচ তাঁকে নিয়ে টানাটানি হচ্ছে বিস্তর। চার লাখ টাকার ফুটবলার হাঁকছে ৪০ লাখ টাকা! যাঁদের খেলায় জনতার ফুটবল-মোহ কেটে গেছে, নেই গৌরবের ছিটেফোঁটাও সেই ফুটবলারদের পেতে মরিয়া হয়ে উঠছে ক্লাবগুলো।

তা-ও আবার দলবদলের ছয়-সাত মাস আগেই এমন দাপাদাপি! শুধু একটি মৌসুম শেষ হয়েছে, নতুন মৌসুমের দিন-ক্ষণও ঠিক হয়নি তার আগেই দলবদলের বাদ্যি বাজিয়ে দিয়েছে বড় ক্লাবগুলো। বাদ্যি শুনে ফুটবলারদের মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। বাতাসে টাকা উড়ছে। মাঠের পারফরম্যান্স বড় কথা নয়, আগে টাকা ধরতে হবে। অথচ গেল মৌসুমের সর্বশেষ টুর্নামেন্ট স্বাধীনতা কাপে প্রমাণ হয়ে গেছে দেশি খেলোয়াড়দের মানে আকাশ-পাতাল ফারাক নেই। থাকলে বড় ছয় দলের কোনো একটি চ্যাম্পিয়ন হতো। হয়েছে অখ্যাত ফুটবলারে গড়া আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ। বেশির ভাগ খেলোয়াড়ই নিচের লিগ থেকে আসা আর তাঁদের সঙ্গেই পেরেও ওঠেনি ঢাকার কোনো নামি-দামি ক্লাব দল। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সাইফ স্পোর্টিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী স্বীকার করে নিচ্ছেন, ‘দেশি ফুটবলারদের মানে তেমন হেরফের নেই। কয়েকজন একটু ভালো খেলে বটে। তবে তাদের মধ্যে তারকা ফুটবলারের মানসিকতা নেই। ব্যক্তিগত স্কিলের কারণে তাদের একটু আলাদা করা যাবে, কিন্তু তাদের এই সামর্থ্যের প্রকাশটুকু পাঁচ-ছয় ম্যাচের বেশি দেখা যাবে না। মনোযোগী হয়ে খেলে নিজেদের ওই ভালো গুণটা ২০-২৫ ম্যাচ পর্যন্ত টেনে নিতে পারে না।’

গতবারের প্রিমিয়ারে পা রেখে শক্তিশালী দল গড়ে চমকে দিয়েছিল সাইফ স্পোর্টিং ক্লাব। আগেরবারের চ্যাম্পিয়ন ঢাকা আবাহনীর সঙ্গে রীতিমতো লড়াই করে অনেক দাম দিয়ে কিনেছিল পাঁচ ফুটবলারকে। তপু, জুয়েল, হেমন্ত, আরিফুল ও শাকিলকে নিয়েছিল প্রায় আড়াই কোটি টাকায়। প্রথম চারজন মৌসুমের সেরা চার পারিশ্রমিক পাওয়া ফুটবলার। ক্লাব হয়তো সরলীকরণ করেছিল, যত গুড় তত মিষ্টি হবে। বেশি টাকায় খুলবে তাদের পারফরম্যান্স। সেটা হয়নি। দুটি টুর্নামেন্টে (ফেডারেশন কাপ ও স্বাধীনতা কাপ) গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়া সাইফ লিগ শেষ করেছে চতুর্থ হয়ে। এই তিক্ত অভিজ্ঞতার পরই হয়তো দেশি বড় ফুটবলারের মোহ কেটে গেছে নাসির উদ্দিন চৌধুরীর।

এই নির্জলা সত্যটা এক বছর আগেই মেনে নিয়েছিলেন শেখ জামালের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান মনজুর কাদের। বড় বড় নামগুলোকে বিদায় করে এই সংগঠক একটা তরুণ দল গড়ে গত মৌসুমে। সেই কম বাজেটের দলটি শেষ পর্যন্ত শিরোপার লড়াইয়ে থেকে হয়েছে রানার্স-আপ। সুতরাং তরুণদের সঙ্গে কথিত বড় ফুটবলারদের মানের ফারাক উনিশ-বিশ। এটা মানেন আগামী মৌসুমে প্রিমিয়ারের নবাগত বসুন্ধরা কিংসের চেয়ারম্যান ইমরুল হাসানও, ‘আমাদের ফুটবলে এখন কোনো তারকা নেই। আগে যেমন সালাউদ্দিন-আসলামের মতো অনেক তারকার খেলা দেখতে মাঠে যেত এখন সেরকম কিছু নেই। তার পরও দল গড়তে হলে কিছু মোটামুটি মানের খেলোয়াড় তো লাগবে। খেলোয়াড় সংকটের কারণে এখন অনেকের দাম অযৌক্তিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।’ অভিষেকে তারাও চমকে দিতে চায়, তাই দলবদলের বাজারে হাজির আগেভাগেই।

ক্লাবগুলোর এই উৎসাহের সুযোগটা যেন ভালোভাবে নিচ্ছে ফুটবলাররা। কিন্তু উয়েফা এ লাইসেন্সধারী কোচ মারুফুল হকের বিশ্লেষণে ফুটবলাররা অতিমূল্যায়িত হয়েই নিজেদের সর্বনাশ ডেকে আনছে, ‘ওপরের দিকে খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিকের সঙ্গে পারফরম্যান্স একেবারেই মানানসই নয়। তারা অতিমূল্যায়িত হচ্ছে বলে তাদের খেলাটাও নষ্ট হচ্ছে। যে আগের মৌসুমে পাঁচ লাখ টাকা পেয়েছে তার দাম হুট করে ৪০ লাখে পৌঁছে গেলে সে নিজের সম্পর্কে উচ্চাশা পোষণ করতে পারে। নিজের মনে হতে পারে, সে ওরকম ভালো খেলে। সেখানেই শেষ হয়ে যায় তার পারফরম্যান্স ডেভেলপমেন্ট। টাকার কারণে খেলোয়াড়দের উন্নতিটা আর হয় না।’ অর্থাৎ অর্থই হয়ে দাঁড়াচ্ছে অনর্থের মূল কারণ। নিজের সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হচ্ছে ফুটবলারের, নষ্ট হচ্ছে তার শেখার আগ্রহ। একটা হাওয়াই ফুটবলের জগতে ঢুকে যাচ্ছে তারা, কিছু না খেলে কিছু অর্জন না করেই তারা সেই জগতের রাজাধিরাজ। আরামবাগের ওই কোচ খেলোয়াড়দের অর্থ প্রাপ্তির বিপক্ষে নন, তাঁর চাওয়া পারফরম্যান্সের নিরিখে দাম আরো বাড়ুক, ‘আমি চাই খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিকের অঙ্ক আরো বড় হোক। সঙ্গে পারফরম্যান্সেরও উন্নতি হোক। ক্যারিয়ারটা দীর্ঘ করে সে পারফরম্যান্স দিয়ে ভালো আয় করলে তো কারো কিছু বলার থাকে না। তখন তাকে দেখতে মাঠে ছুটে আসবে দর্শক।’ 

কিন্তু এখানে হচ্ছে হাওয়াই ব্যাপার-স্যাপার। অযৌক্তিকভাবে উচ্চমূল্যের কারণে ফুটবলারের খেলা এবং ক্যারিয়ার দুটিই পড়ে ঝুঁকির মুখে। আবার হাসিরও খোরাক হয় বই কি। এত দামি ফুটবলারের দেশে-বিদেশে কোথাও পারফরম্যান্স নেই। আলাদা করার উপায় নেই।



মন্তব্য