kalerkantho


দেনা-পাওনার হিসাব মিলল না সাইফের

সনৎ বাবলা   

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



দেনা-পাওনার হিসাব মিলল না সাইফের

সির্বশেষ এএফসি কাপের প্লে-অফেও তাদের ভাগ্য বদলায়নি। অনেক বড় স্বপ্ন নিয়ে প্রিমিয়ারে ওঠা সাইফ স্পোর্টিং মৌসুম শেষে পেয়েছে শুধুই স্বপ্নভঙ্গের বেদনা।

দেশের ফুটবল মৌসুম এখনো শেষ হয়নি। শেষ টুর্নামেন্ট স্বাধীনতা কাপ চললেও সাইফ স্পোর্টিংয়ের ছুটি হয়ে গেছে গ্রুপ পর্ব থেকে। শেষ টুর্নামেন্ট কেন, মৌসুমের সেই প্রথম টুর্নামেন্ট থেকেই তো নবাগত দলটির ছন্নছাড়া চেহারা। যে রকম হাঁকডাক তার ষাট-সত্তর ভাগও দিতে পারেনি মাঠের খেলায়। কোনো ম্যাচ না জিতেই আবাহনীর সঙ্গে ড্র করে এবং মুক্তিযোদ্ধার কাছে হেরে ফেডারেশন কাপের প্রথম রাউন্ড থেকেই ছুটি হয়ে যায় তাদের। ওয়ার্ম-আপ টুর্নামেন্ট বলে না হয় ছাড়, কিন্তু প্রিমিয়ার লিগেও যে চেহারা ফেরেনি। পয়েন্ট হারানোর মিছিলে কখনো তারা শিরোপা-সম্ভাবনার আলোচনায় থাকেনি সেভাবে। সর্বশেষ ভরাডুবি এএফসি কাপে, ধারে অন্যান্য ক্লাব থেকে অনেক খেলোয়াড়ের সম্মিলন ঘটিয়েও পারেনি আন্তর্জাতিক অভিষেকটাকে স্মরণীয় করে রাখতে। ঘরে-বাইরে দুই জায়গাতে হেরে ভেস্তে গেছে সাইফের সফল আন্তর্জাতিক দল হয়ে ওঠার স্বপ্ন।

কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ থেকে শীর্ষ লিগে উন্নীত হওয়ার পর ক্লাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরীর চোখে-মুখে অনেক বড় স্বপ্নের ঝিলিক ছিল। মাথায় ছিল ফুটবল পেশাদারির আধুনিক ভাবনা। জায়ান্ট হয়ে আবির্ভূত হবে সাইফ স্পোর্টিং, অঙ্গে সর্বজয়ীর রূপ ফুটিয়ে শিরোপার পানে এগিয়ে যাবে। দলের সাফল্য আর আধুনিক চিন্তার মেলবন্ধনে এটি হয়ে উঠবে ফুটবলের মডেল ক্লাব। কিন্তু মাঠের ব্যর্থতায় এই পরিকল্পনা ধাক্কা খেয়েছে প্রথম বছরেই। এ বড় গরমিলের হিসাব। ক্লাব কর্মকর্তাদের সাদা চোখে বিনিয়োগ আর প্রাপ্তির হিসাবে আকাশ-পাতাল ফারাক ধরা পড়ছে। সাড়ে সাত কোটি টাকায় শক্তিশালী দল গড়ে বিদেশি কোচিং স্টাফে প্রশিক্ষিত করে প্রাপ্তির খাতায় যোগ হবে শুধু লিগের চতুর্থ স্থান! এ পাওয়া বেমানান, শিরোপার স্বপ্ন চতুর্থ স্থানে গিয়ে ঠেকলে সাফল্য হিসেবে কী ধরা যায়!

স্বপ্নের ডানা ভেঙে এভাবে লুটিয়ে পড়ার সত্যানুসন্ধানও যে খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। এই তদন্তে খুঁত ধরা পড়ছে সেই দল গঠনেই। চ্যাম্পিয়ন আবাহনী থেকে চড়া দামে নেওয়া সেই পাঁচ ফুটবলারের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে দলের ভেতরে। সবচেয়ে দামি ফুটবলার ডিফেন্ডার তপু বর্মন ও আরিফুলের পারফরম্যান্স প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ। ফুলব্যাক শাকিল আর হেমন্তকে দলে নেওয়া তো একটি ভুল। আগের মৌসুমে এ দুজন বেশির ভাগ সময় আবাহনীর সেরা একাদশের বাইরে ছিলেন। তাদেরকে টানায় চ্যাম্পিয়নদের যেমন ক্ষতি হয়নি তেমনি লাভ হয়নি সাইফেরও। শুধু শক্তিবৃদ্ধি হয়েছে জুয়েল রানার সংযোজনে, লিগে ৬ গোল করেছেন এই উইঙ্গার। দেশিদের পাশাপাশি বিদেশি নির্বাচনও ছিল ভুলে ভরা। বিশেষ করে কলম্বিয়ান স্ট্রাইকার ভ্যালেন্সিয়ার মিস মহড়ায় কেটেছে তাদের প্রথম লিগ। দুর্ভাগ্য তাদের, ওয়োডসন পড়তি ফর্ম নিয়ে কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় ফিরেছিলেন। স্ট্রাইকার চার্লস শেরিংহামের বেলায় নিজের গুণের চেয়ে পিতৃনামটাই যেন বড় ভূমিকা রেখেছে সাইফে নাম লোখানোয়। ইংলিশ ফরোয়ার্ড শেরিংহামের ১০ ম্যাচে যখন ৬ গোল তখন প্রথম লেগ শেষে শুরু করা নাইজেরিয়ান সানডে চিজোবা ১০ ম্যাচে ৯ গোল করে তৃতীয় স্থনে থাকা (প্রথম লেগে) আবাহনীকে দিয়েছে শিরোপার সুরভি। এখানেই তো ব্যবধানটা স্পষ্ট হয়ে যায়।

তবে লিগের শুরুতে কিন্তু সাইফের অবস্থা খারাপ ছিল না। আবাহনীর কাছে ৩-২ গোলে হেরে শুরু করলেও এরপর জিতেছে টানা পাঁচ ম্যাচ। খেলার গতি আর আক্রমণের ধারে মাঠের ফুটবলক এত সুন্দর রাঙিয়েছিল, তাতে শিরোপার রং-ও ধরা পড়ছিল বইকি। এরপর যে কী হলো, টানা চার ড্রয়ে সেই রং তো হারিয়ে গেলই, পাশাপাশি গুলিয়ে গেল মাঠের খেলাটাও। প্রথম লেগে ১১ পয়েন্ট হারানোর পর দ্বিতীয় লেগে জারি থাকল সেই দুর্দশা। এখানে অবশ্যই ইংলিশ কোচ রায়ান নর্থমোরকে কাঠগড়ায় তোলা যায়। ছন্দে থাকা একটি দলের হঠাৎ ছন্দহীন হয়ে পড়ার দায় তো কোচকে নিতেই হবে। বিদেশি কোচকে সবজান্তা ভেবে বসার কোনো কারণ নেই। এসব গেল টেকনিক্যাল খুঁত, তার সঙ্গে যে আরেকটি বড় ক্ষত তৈরি করে রেখেছে সাইফ স্পোর্টিং নিজেই। সেটা হলো, অর্থের প্রাবল্য। কারণে-অকারণে বোনাসসহ খেলোয়াড়দের নানা সুযোগ-সুবিধায় ভরিয়ে দিয়েছে তারা। অথচ বাজে পারফরম্যান্সের কোনা জবাবদিহি নেই।

দেনা-পাওনা মিলিয়ে নেওয়াই পেশাদারত্ব। টাকা আছে বলেই আকাতরে বিলিয়ে সেরাটা আদায় করা যায় না। অনেক সময় নিয়মের পরাকাষ্ঠা দিয়েই আদায় করতে হয়। মিলিয়ে নিতে হয় নিজের প্রাপ্য। প্রথম বছর সাইফ স্পোর্টিং সেটা মেলাতে না পারলেও একটা অভিজ্ঞতা তো হয়েছে। তাই এটা হোক তাদের কর্মকর্তাদের শুদ্ধিকরণের বছর।



মন্তব্য