kalerkantho


উৎসব উদ্‌যাপনে আনন্দের এক দিন

সাইদুজ্জামান, চট্টগ্রাম থেকে   

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



উৎসব উদ্‌যাপনে আনন্দের এক দিন

ছবি : মীর ফরিদ, চট্টগ্রাম থেকে

মমিনুল হকের আবেগের এমন বিস্ফোরণ কেউ দেখেনি কখনো। তবু সেঞ্চুরির পর বাতাসে তাঁর অদৃশ্য ঘুষির লক্ষ্যবস্তু বিলক্ষণ বুঝতে পেরেছেন সবাই—স্বয়ং চন্দিকা হাতুরাসিংহেরও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কাকতালীয়ভাবে সদম্ভে প্রত্যাবর্তনকারী ‘মিনি’র সঙ্গে আজ আবার ব্যাট হাতে নামছেন মাহমুদ উল্লাহ, যে জুটিকে একযোগে শততম টেস্টের আগে সাময়িক নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন বাংলাদেশের তখনকার কোচ।

হাতুরাসিংহে চূড়ান্ত পেশাদার এবং নিখুঁত স্ট্র্যাটেজিস্ট। মাহমুদ উল্লাহকে টস করতে দেখা কিংবা মমিনুলের ক্ষণিকের বুনো উল্লাসে বিগড়ে যাওয়ার মানুষ নন তিনি। নতুন কোনো রণপরিকল্পনা নিয়ে আজ আবির্ভূত হবেন হাতুরার বর্তমান শিষ্যরা। মমিনুলের উল্লাস দেখে তৃপ্ত তামিম ইকবালও তাই সতর্ক, ‘আমরা ভালো অবস্থায় আছি ঠিকই। তবে এটাও জানি ঘুরে দাঁড়ানোর সামর্থ্য ওদের আছে।’ মমিনুলের সঙ্গী-সাথিদের ব্যাটে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানোর দিনেও কিন্তু ঘুরে দাঁড়ানোর নমুনা দেখিয়েছে শ্রীলঙ্কা। দ্বিতীয় নতুন বলে দারুণ ‘সেট আপ’ করে মুশফিকুর রহিমকে সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ৮ রান দূরে থামিয়েছেন সুরঙ্গা লাকমল। পরের বলটা ছেড়ে দিয়ে বোল্ড লিটন কুমার, এ নিয়ে সাম্প্রতিককালে তিনবার এভাবে আউট হলেন এই উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান। ২ উইকেটে ৩৫৬ থেকে চোখের পলকে ৪ উইকেটে ৩৫৬—সারা দিনে ওই একটা ওভারেই রক্তের গন্ধ পায় লঙ্কান বোলিং ইউনিট। কিন্তু সেই ক্ষতির আর বৃদ্ধি ঘটেনি মমিনুলের দৃঢ়তা আর মাহমুদের সতর্কতায়।

অবশ্য দিনের শুরু থেকেই ক্রিকেট পরিমণ্ডলে বিস্তর চমক নিয়ে হাজির চট্টগ্রাম টেস্টে বাংলাদেশ দলের স্ট্র্যাটেজি। ছয় স্পিনারে সয়লাব স্কোয়াড দেখে সর্বসাধারণের ধারণা হয়েছিল উইকেটে বল পড়েই বুঝি পইপই করে ঘুরবে, তার ওপর খেলা ফেলা হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টের সেই বাইশ গজে। কিন্তু কোথায় কী, জহুর আহমেদ চৌধুরীর তিন নম্বর উইকেট যেন চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের রানওয়ের চেয়েও মসৃণ! প্রথম সেশন থেকে পাঁচ থেকে সাড়ে চারের মধ্যে রান রেটে ছুটতে থাকা বাংলাদেশ দিন শেষ করেছে ওভারপিছু ৪.১৫ রান তুলে। একাদশ নির্বাচনেও চমক। প্রায় চার বছর পর টেস্ট স্কোয়াডে ফিরিয়ে আনা আব্দুর রাজ্জাককে দিয়ে অভিষিক্ত সাঞ্জামুল ইসলামকে টুপি পরিয়েই বসিয়ে রাখা হলো ড্রেসিংরুমে। স্বাগতিকদের গোপন পরিকল্পনায় ব্যাটিং উইকেট ছিল বলেই কিনা আপাতত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে নাঈম হাসানের টেস্ট অভিষেক। তাহলে কি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৫০০ উইকেটের ল্যান্ডমার্ক পেরোনোর ‘স্বীকৃতি’ হিসেবেই টেস্ট স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করা রাজ্জাককে? খোঁজ নিয়ে জানা গেছে সেরকমটাই—‘অতিথি খেলোয়াড়’ হিসেবে চট্টগ্রামে দলের সঙ্গে আছেন তিনি!

যাক, এ নিয়ে অনুসন্ধানের মাঝেই শ্রীলঙ্কার নামিদামি বোলারদের তুলাধোনা শুরু করে দিয়েছেন তামিম ইকবাল। প্রতিপক্ষের ওপর শুরুতেই চড়াও হওয়াটাই এখন রীতি। সহায়ক উইকেট পেলে তো কথাই নেই। দারুণ ফর্মে থাকা তামিম সে সুযোগ হাতছাড়া করবেন কেন? ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই শ্রীলঙ্কার পেসার লাহিরু কুমারার আত্মবিশ্বাস টানা তিন বাউন্ডারিতে টলিয়ে দিয়েছেন তামিম। শিকারের জন্য শেষ বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকা লাকমলকে সকালের সেশনে শাসন করেছেন বাঁহাতি এই ওপেনার। যাঁকে নিয়ে সবচেয়ে ভয় ছিল, সেই রঙ্গনা হেরাথ দিন শেষে উইকেটহীন; ওভারপিছু ৫ রান খরচ করে। শ্রীলঙ্কার বাঁহাতি এই স্পিনারকে অনায়াসে খেলে দেওয়ার ফর্মুলাও দেখিয়েছেন তামিম। শুধু অফ স্পিনার দিলরুয়ান পেরেরার বলটাই পুরো ডিফেন্স দিয়েও রুখতে পারেননি, ততক্ষণে ২৫তম টেস্ট ফিফটি লেখা হয়ে গেছে তাঁর নামের পাশে। ৪৬ বলে ফিফটির পর আরো বড় ইনিংসের জন্য নতুন মোডে ব্যাট ধরেছিলেন তামিম, কিন্তু ৫২-তেই থামতে হয়েছে তাঁকে। সেসময় দলীয় স্কোর ৭২, মাত্র ১৫.৫ ওভারে।

ইমরুল কায়েসের ব্যাটে ঠাসা বিস্ফোরক নেই, প্রতিষ্ঠিত সঙ্গীর ওরকম মেজাজ দেখার পর রান করার তাড়াও নেই। বরং তামিম বিদায় নেওয়ার সময় উইকেট পড়া হয়ে গেছে ইমরুলের। তিন নম্বরে নামা মমিনুলের স্ট্রোকের প্রদর্শনী আরো নির্ভার করে দিয়েছে বাঁহাতি এই ওপেনারকে। তাতে মনে হচ্ছিল তামিমের সেঞ্চুরি মিস করার মৃদু আক্ষেপটাই শুধু আলোচিত হবে মধ্যাহ্ন বিরতিতে। কিন্তু বিরতির মাত্র ২ বল আগে লক্ষণ সান্দাকানের বলে এলবিডাব্লিউ হয়েছেন ইমরুল, যদিও রিভিউ নিলে নিশ্চিতভাবেই আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত পাল্টাত। অপরপ্রান্তে থাকা মমিনুলের কাছ থেকেও ‘ডিআরএস’ সুবিধা নেওয়ার অনুমোদন পাননি তিনি।

পুরো দিনে ওই একটাই ভুল করেছেন মমিনুল। দ্বিতীয় সেশনে তাঁর এবং মুশফিকের ২৩৬ রানের জুটির ব্যাটিং সৌন্দর্যের মুগ্ধতায় যা বিস্মৃতপ্রায়। তামিমের রেখে যাওয়া কর্তৃত্বের সিংহাসনে মমিনুল যেন আরো দোর্দণ্ড প্রতাপশালী। হেরাথকে স্টেপ আউট করে অবলীলায় ছক্কা হাঁকিয়েছেন, যে শটে টেস্টে বাংলাদেশিদের মধ্যে দ্রুততম সময়ে দুই হাজার রানের ল্যান্ডমার্ক পেরিয়েছেন তিনি। গল টেস্টের দুই ইনিংসেই দিলরুয়ানের অফ স্পিনে ব্যাকফুটে খেলতে গিয়ে আউট হয়েছিলেন মমিনুল। চট্টগ্রামের এই উইকেটেই দুইবার তাঁকে ফিরিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার অফ স্পিনার নাথান লিয়ন। সেই মমিনুল দিলরুয়ানকে খেলেও ক্যারিয়ারের পঞ্চম সেঞ্চুরিকে প্রথম ডাবলে পরিণত করার অপেক্ষায়।

সমালোচনার শূলে তো ত্রিদেশীয় ফাইনালের পরও চড়তে হয়েছে মুশফিককে। ক্যারিয়ারজুড়ে বিস্তর রান করা পছন্দের সুইপ শট খেলতে গিয়েই যে সে রাতে উইকেট দিয়ে এসেছিলেন তিনি। সেই মুশফিক গতকাল অনায়াসে সুইপ খেলেছেন। আর ড্রাইভিং জোনে বল পেলে পাঠিয়েছেন সীমানার বাইরে। বিশ্বস্ত উইকেটে রান করার একটি সুযোগও হাতছাড়া করেননি তিনি কিংবা মমিনুল। বোলার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নানা ফন্দিফিকির করেছেন শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক দীনেশ চান্ডিমাল। কিন্তু দ্বিতীয় সেশন কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই শেষ করেছে বাংলাদেশ।

৮৪তম ওভারে লাকমলের হ্যাটট্রিক সম্ভাবনা জাগিয়ে তোলা দুটি বলই কাঁটা হয়ে বিঁধে আছে চট্টগ্রাম টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম দিনে। অবশ্য ইমরুলের রিভিউ না নেওয়ার আক্ষেপের মতো এই কাঁটার অস্বস্তিও মুছে দেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ আছে মমিনুলদের সামনে।

রানওয়ে সদৃশ চট্টগ্রামের উইকেটে যদি দ্বিতীয় দিনেও রানের ফোয়ারা ছোটাতে পারেন বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানরা। প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির সম্ভাবনায় নিশ্চিত ফুটছেন মমিনুল, মাহমুদের অধিনায়কত্বের প্রথম ইনিংসও একরাশ রোমাঞ্চও তো কম নয়। নতুন দিনে নতুন শুরুর ক্রিকেটীয় রহস্যটাও অজানা নয় তাঁদের। এই রহস্য ভেদ করতে পারলে রানপাহাড়ে চড়বেই বাংলাদেশ ।



মন্তব্য