kalerkantho



দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অব্যর্থ বটিকা

মাসুদ পারভেজ   

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অব্যর্থ বটিকা

আর সব কিছুর মতো ক্রিকেটেও ভালো সময়ের শেষ থাকে। নিয়মিত বিরতি দিয়ে সেই শেষটা দেখে আসছে বাংলাদেশের ক্রিকেটও। সুসময়ের রাঙা প্রভাতের পর দুঃসময়ের ফেরেও পড়ছে, যা ফেলছে দুর্যোগের মুখেও। তবে দুর্যোগ যখন আসে, তখন নিজেদের মতো করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ছকও কষে তারা। সময় বদলালেও সেই ছকটা কিন্তু রয়ে গেছে একই। চেনা ছকেই কক্ষপথে ফেরা গেলে নতুন কিছুর দরকারটাই বা কী!

তাই নতুন বছরের শুরুতেও সেই পুরনো ফর্মুলা মেনেই এগোনোর চিন্তা বাংলাদেশ শিবিরের। আপাতত শুরুটাও আশাব্যঞ্জক। ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দাপুটে জয়কে সাকিব আল হাসানও ছন্দে ফেরার পথে প্রথম পদক্ষেপ বলে ধরছেন, ‘নতুন বছরের শুরুটা ভালো হলো, সেদিক থেকে এই জয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু একটা তিন জাতির সিরিজ খেলছি, সেহেতু গুরুত্বপূর্ণ ছন্দ ধরাটাও। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আরো কঠিন চ্যালেঞ্জে নামার আগে এই জয়টি আমাদের আত্মবিশ্বাসও দেবে।’

অতীত বলছে সম্ভাব্য কঠিন কোনো চ্যালেঞ্জের আগে হেসেখেলে হারানোর মতো একটি দলকে বাংলাদেশের লাগেই। ছন্দ হারিয়ে ফেলা দলের ছন্দে ফেরার অব্যর্থ ‘বটিকা’ হিসেবে তুলনায় কম জোরের প্রতিপক্ষ বেছে নেওয়ার রেওয়াজ এক যুগ আগেও যেমন ছিল, তেমনি চালু আছে এখনো। কারণ সাফল্যের রাজপথে তুলে দেওয়ার উপায় তো দেখাতে পারছে ছোট দলকে হারিয়ে গড়ে ওঠা জয়ের অভ্যাস। তাও আবার সেটি কখন? যখন কোনো না কোনো দুর্যোগ সামনে এসে টুঁটি চেপে ধরার অপেক্ষায় থাকছে। যখন সামনে কোনো বড় আসরের আগে সবগুলো পাঁপড়ি মেলা ফুল হওয়ার আকুলতা বাংলাদেশের। ২০১৫ বিশ্বকাপের পর থেকে বাংলাদেশ দল বেশ অনেকটা সময় সাফল্যের সোনালি ডানায় ভর দিয়ে ভেসে বেড়িয়েছে। কিন্তু এক দক্ষিণ আফ্রিকা সফরই যেন সেই ডানা ছেঁটে দিয়ে কঠিন এক সময়ের সন্ধিক্ষণে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যে সফরের মাঝামাঝি হেড কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহের পদত্যাগও সংকট বাড়িয়েছে আরো। এ লঙ্কানের এবার শ্রীলঙ্কা দলের কোচ হয়ে ঢাকায় আসা বাংলাদেশ শিবিরকে দেখিয়ে দেওয়ার তাড়নাও বাড়িয়েছে নিশ্চিতভাবেই।

শ্রীলঙ্কার মুখোমুখি হওয়ার আগে তাই আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে নেওয়ার সেই পুরনো ‘টনিক’ হিসেবে ত্রিদেশীয় সিরিজে ঢুকে পড়ল জিম্বাবুয়ে। যারা প্রায় এক যুগ আগে থেকেই বাংলাদেশকে ছন্দে ফেরানোর হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন আরেকটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করে দিয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সফল দুটো বিশ্বকাপ ২০০৭ এবং ২০১৫। ওই দুটো বিশ্বকাপের আগেই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বিস্তর ম্যাচ খেলে জিততে ভুলে যাওয়া বাংলাদেশ জয়ের অভ্যাস গড়ে তুলেছে। ২০১৯ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে যখন চলতি বছরজুড়ে দেশের বাইরে খেলার একেকটি চ্যালেঞ্জ সামনে এবং পেছনে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের দুঃস্মৃতি, তখনো বছরের শুরুতে সামনে দাঁড়ানো জিম্বাবুয়ে স্বাগতিকদের দোর্দণ্ড প্রতাপে লণ্ডভণ্ড।

সেই সূত্রে এটাও এখন প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব যে ছন্দে ফিরতে হলে ‘ছোট দলকে এনে দাঁড় করিয়ে দাও’। ২০০৭ বিশ্বকাপের আগেই দাঁড় করানো হয়েছিল বেশি। জিম্বাবুয়েই শুধু নয়, বাংলাদেশ তখন ম্যাচ খেলেছে কেনিয়া, স্কটল্যান্ড, কানাডা ও বারমুডার বিপক্ষেও। যদিও ওই সময় এমন প্রশ্নও কম ওঠেনি যে এ ধরনের ছোট দলের বিপক্ষে খেলে লাভটা কী! বড় বড় দলের সঙ্গে খেলে জমাট প্রস্তুতির বদলে কম জোরের দল বেছে নেওয়ার জন্য ক্রিকেট প্রশাসকদের দক্ষতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল ওই সময়। তবু কাজের কাজ ঠিকই হয়েছিল। তখন ক্রমাগত ছোট দলকে হারিয়ে জিততে না জানা দলটি পেয়েছিল জেতার বিশ্বাস।

২০০৭ বিশ্বকাপের আগে অবশ্য জিম্বাবুয়ে এখনকার মতো একটা নখদন্তহীনও ছিল না। তখন দুই ঘা খেলে পাল্টা এক ঘা দেওয়ার সক্ষমতাও ছিল তাদের। তাই ২০০৬ এর আগস্টে হারারেতে পাঁচ ম্যাচের সিরিজ খেলতে গিয়ে বাংলাদেশ ৩-২-এ হেরে এসেছিল। তবে নভেম্বর-ডিসেম্বরের ফিরতি সফরে জিম্বাবুয়েকে ৫-০-তে হোয়াইটওয়াশ করে সেই জ্বালা জুড়িয়ে নিতেও সময় নেয়নি বাংলাদেশ। ২০০৭ বিশ্বকাপের মাসখানেক আগে আবার হারারেতে জিম্বাবুয়ের মুখোমুখি বাংলাদেশ চার ম্যাচের সিরিজ জিতেছিল ৩-১-এ। কেনিয়ার বিপক্ষে জিতেছিল হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে দুটো সিরিজই। ঘরের মাঠে স্কটল্যান্ডকেও দুই ম্যাচের সিরিজে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজে বিশ্বকাপ শুরুর আগে ত্রিদেশীয় সিরিজে কানাডা ও বারমুডাকে হারিয়েও জেতার অভ্যাসটা পাকাপোক্ত করেছিল আরো।

এরই ফল প্রথম ম্যাচেই বিশ্বকে কাঁপিয়ে ভারতের বিদায় ঘণ্টা প্রায় বাজিয়ে দেওয়া পোর্ট অব স্পেনের সেই ঐতিহাসিক জয়। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্বকাপের সুপার এইটে খেলা বাংলাদেশ নিজেদের ছাপটা রেখে আসতে পেরেছিল। র‍্যাংকিংয়ে তখনকার ১ নম্বর দল দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে স্মরণীয় সেই সাফল্যকেও ছাপিয়ে যায় ২০১৫-র বিশ্বকাপে। অথচ অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে সেই বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার আগে বাংলাদেশ ক্রিকেটের কী দুঃসময়টাই না যাচ্ছিল ২০১৪ জুড়ে! একের পর এক হারে ব্যতিব্যস্ত বাংলাদেশ সেই বছরের নভেম্বরে উড়িয়ে নিয়ে এলো জিম্বাবুয়েকে। জিততে ভুলে যাওয়া দলটি ওই সিরিজে ৫-০-তে প্রতিপক্ষকে বিধ্বস্ত করে ক্রান্তিকালে দেখতে শুরু করে আলোর রেখাও। ক্রান্তিকালই, কারণ এর কয়েক মাস আগেই বাংলাদেশ ব্যর্থতা থেকে বেরোতে নতুন হেড কোচ করে নিয়ে এসেছে হাতুরাসিংহেকে। সেই জিম্বাবুয়ে সিরিজ দিয়ে হারিয়ে ফেলা পথ খুঁজে পাওয়া প্রথমবারের মতো খেলে বিশ্বকাপের শেষ আটে।

এবার হাতুরাসিংহে-পরবর্তী প্রথম সিরিজ, যেখানে হেড কোচ বলে কেউ নেই। আসবেন হয়তো, তার আগে ২০১৯ বিশ্বকাপ সামনে রেখে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের ব্যর্থতা ভুলে নতুন করে শুরুর প্রতিজ্ঞা বাংলাদেশের। এমন সময়েই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আবার সেই জিম্বাবুয়ে। ইতিহাস বলে এই সময় জিম্বাবুয়েকে সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে বাংলাদেশের!



মন্তব্য