kalerkantho


পুনর্মিলনীর আবহে প্রতিঘাতের সিরিজ!

সামীউর রহমান   

১৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পুনর্মিলনীর আবহে প্রতিঘাতের সিরিজ!

নতুন পরিচয়ে... : ‘লো প্রোফাইল’, কিন্তু ভালো কোচ—এই মানদণ্ডে বাংলাদেশে চাকরি হয়েছিল চন্দিকা হাতুরাসিংহের। তবে প্রায় সাড়ে তিন বছরের চাকরি শেষে আকস্মিক পদত্যাগের বেশ আগেই তারকা কোচের স্বীকৃতি জুটে যায় এই শ্রীলঙ্কানের। সেই তিনি, গতকাল ঢাকায় এসেছেন নিজ দেশের কোচ হয়ে। কাকতালীয়ভাবে আগামীকাল শুরু হতে যাওয়া ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশের আরেক প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ের কোচ হিথ স্ট্রিকও মাশরাফি বিন মর্তুজাদের সাবেক বোলিং গুরু। তবে হাতুরাসিংহের মতো কঠোর কোনো কালেই ছিলেন না এই জিম্বাবুইয়ান। বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়কের সঙ্গে স্ট্রিকের প্রথম সাক্ষাত্পর্বে সেই আবহটা পরিষ্কার। ছবি : মীর ফরিদ

শীতের সময়টা বাংলাদেশে অঘোষিত উৎসব ঋতু! কোথাও বিয়ে, কোথাও বনভোজন, কোথাও বা পুনর্মিলনী। বৃষ্টির উৎপাত নেই, নেই গরমের প্রখরতা। ছুটির দিনে রোদ পোহাতে পোহাতে পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠার উপলক্ষকে জোরালো করতে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এখন চলছে পুনর্মিলনী উৎসবের ধুম। যেখানে একটা সময় একই বেঞ্চে বসলেও জীবন-জীবিকার তাগিদে বিশ্বের নানা প্রান্তে ছিটকে যাওয়া বন্ধুরা এক হয় প্রাণের টানে। খুব অদ্ভুতভাবে, এই সময়ে ঢাকায় এক হয়েছেন এমন তিনজন, যাঁরা কিছুদিন আগে হরিহর আত্মা না হলেও ছিলেন একই দিশার পথিক। বাংলাদেশ দলের সাবেক কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহে এখন শ্রীলঙ্কার কোচ। সাবেক বোলিং কোচ হিথ স্ট্রিক এখন জিম্বাবুয়ের কোচ আর ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ সুজন ‘টেকনিক্যাল ডিরেক্টর’-এর ভূমিকায়, যা আসলে কোচেরই নামান্তর। ত্রিদেশীয় সিরিজের পোশাকি নামটা রকেট সিরিজ হলেও আসলে তো এটা ‘রি-ইউনিয়ন সিরিজ’ও!

স্কুলের বন্ধুদের পুনর্মিলনীতে এলে বর্তমান সামাজিক অবস্থা খুব একটা দেয়াল তুলে দাঁড়ায় না হৃদ্যতার মাঝে। তবে সাবেক সহকর্মীরা এক হলে বোধ হয় একটা হিসাব-নিকাশ আপনাতেই প্রত্যেকের মগজে চালু হয়ে যায়। বোলিং কোচ হিসেবে কোর্টনি ওয়ালশের চেয়ে হিথ স্ট্রিক ভালো ছিলেন, সাধারণ্যে এরকম একটা ধারণা চালু আছে। অবশ্য দলের অন্দরমহলে কান পাতলে উল্টো উত্তরই পাওয়া যাবে! তবু ২০১৫ বিশ্বকাপ এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের স্পিন-নির্ভর দল থেকে পেস বোলিং-নির্ভর দল হয়ে ওঠার সাফল্যে স্ট্রিককে তাঁর পাওনা দিতেই হবে। স্থানীয় ক্রিকেটে কোচ হিসেবে সফল খালেদ মাহমুদও নিশ্চয়ই চাইবেন নিজের ‘সিভি’টা আরো ভারী করতে। আর হাতুরাসিংহে? কাল বেলা ১১-৫৫ মিনিটে শ্রীলঙ্কান দল নিয়ে ঢাকায় পা রেখেছেন। প্রথম অ্যাসাইনমেন্টটাই সদ্য সাবেক দলের বিপক্ষে, যে দলের খেলোয়াড়দের ভেতর জনপ্রিয়তার ভোট হলে তাঁর ভরাডুবি নিশ্চিত। এটাও নিশ্চিত, ধুরন্ধর এই ট্যাকটিশিয়ান আস্তিনে গোপন কিছু তাস লুকিয়েই রেখেছেন। আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখগুলো খুলে যাওয়ার আগে মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে শান্তির বাতাবরণ। স্ট্রিক অনুশীলনে মাশরাফির সঙ্গে দুষ্টুমি করছেন, স্বাগতিক দলের ড্রেসিংরুমের সামনে মুশফিকুর রহিমকে নিজের বিশাল শরীরের আলিঙ্গনে ক্ষণিকের জন্য অদৃশ্য করে দিয়েছেন আর গাল ধরে আদর করেছেন প্রিয় ‘ফিজ’ মুস্তাফিজুর রহমানকে। অথচ হোটেলে ফিরেই হয়তো তাঁকে ছক কষতে হবে ফিজের অফ কাটারটা নিষ্ক্রিয় করার, মুশফিকের দুর্ভেদ্য রক্ষণে ভাঙন ধরানোর আর মাশরাফির চালের পাল্টা চাল দেওয়ার। ‘রি-ইউনিয়ন’টা কি তাহলে স্রেফ পোশাকি?

ফুটবলে ‘ক্লোজডোর প্র্যাকটিস’ এর প্রথা চালু আছে। অনুশীলন দেখে অন্য দল যেন কৌশল আঁচ না করে ফেলে। ত্রিদেশীয় সিরিজে অতিথি দুই দলের কোচই বাংলাদেশ দলে অল্প কিছুদিন আগেই কাজ করে যাওয়া দুজন হওয়াতে আড়াল করার মতো কিছুও তো অবশিষ্ট নেই! তবে স্ট্রিক বলছেন, এখন এত ক্রিকেট খেলা হচ্ছে যে কোনো রহস্যই গোপন নেই, ‘এই যুগে একটা দলের কোচিং স্টাফে অনেক রকম কোচই থাকেন এবং তাদের থেকে কেউ কেউ প্রতিপক্ষও হয়ে যান। চন্দিকা ও খালেদ মাহমুদের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ভালো ছিল। মনে হয় সবার জন্যই বেশ চ্যালেঞ্জিং একটা সিরিজ হবে। আমরা খেলোয়াড় ও কন্ডিশন সম্পর্কে জানি, সেটা হাতুরাও জানে। জিম্বাবুয়ে ও শ্রীলঙ্কার বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার বিপিএলে খেলে গেছে। তাই নতুন কোনো রহস্য আর বাকি নেই। এখন কাজটা হবে একটা ভালো পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে আসা এবং দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগানো।’

বাংলাদেশের বোলিং কোচ হিসেবে মেয়াদ শেষের পর ভারতের একটি প্রাদেশিক দলের বোলিং উপদেষ্টা, একটি আইপিএল দলের বোলিং কোচের দায়িত্বে ছিলেন স্ট্রিক। ২০১৬-র অক্টোবরে পেয়েছেন জাতীয় দলের দায়িত্ব। যে দেশের জার্সি গায়ে খেলেছেন, সেই দেশের হয়ে কোচের দায়িত্ব পালন করার গৌরবের খোঁজেই ঢাকা ছেড়ে কলম্বো পাড়ি জমিয়েছেন হাতুরাসিংহে, এমনটাই ধারণা স্ট্রিকের, ‘আমি এখানে ছিলাম না। তবে এটা বলতে পারি, চন্দিকা একজন শ্রীলঙ্কান আর নিজের দেশের জাতীয় দলের কোচ হতে পারাটা অনেক বড় ব্যাপার। আমি নিশ্চিত, কোনো বাংলাদেশি কোচও যদি অন্য কোনো দেশে কোচের দায়িত্বে থাকত আর তার কাছে বাংলাদেশের কোচ হওয়ার প্রস্তাব গেলে বেশির ভাগ লোকের বেলাতেই এমন প্রস্তাব কেউ ফেরাবে না। চন্দিকা বাংলাদেশে খুব ভালো কাজ দেখিয়েছে, লোকেদের উচিত তাঁর সময়ে পাওয়া সাফল্যটাকে ভুলে না যাওয়া।’

সেই কঠিন কাজের প্রথম অ্যাসাইনমেন্টে কাল ঢাকায় পা রেখে হাতুরাসিংহে বড্ড নিস্পৃহ, এখনকার আবহাওয়ার মতোই শীতল। বিমানবন্দরের বহির্গমন দরজা দিয়ে যেভাবে বের হলেন, তাতে মনে হতে পারে এই শহরে তিনি আগন্তুক। সামনে দাঁড়ানো ফটোসাংবাদিকদের অনেকেই তো তাঁর মুখচেনা, যাঁরা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের পিছু পিছু ছুটছেন মিরপুর থেকে মেলবোর্নেও। তাঁদের দিকে কোনো হাসি নেই, নেই হাতের কোনো ইশারাও। হোটেলেও লাগেজ নিয়ে হনহন করে হেঁটে চলে গেলেন লিফটের দিকে। বাংলাদেশ কম আনন্দের মূহূর্ত উপহার দেয়নি তাঁকে। বিদায়টা মধুর হয়নি বলে কি মিথ্যে হয়ে গেছে সবই? নাকি তাঁর কাছে এটাই চূড়ান্ত পেশাদারি, আবেগকে জানালা দিয়ে গলতে না দেওয়া।

সব মিলিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজের সুরে ‘রি-ইউনিয়ন’ থাকলেও দর্শনে বোধ হয় ‘রিরাইট’। দেখিয়ে দেওয়ার, করে দেখাবার। সবাই তো ইতিহাসটা লিখতে চান, নতুন করে!



মন্তব্য