kalerkantho



বিশেষ আয়োজন

ইতিহাসের বিকৃতি আর চাই না, চাই স্বাধীনতা পুরস্কার

৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ইতিহাসের বিকৃতি আর চাই না, চাই স্বাধীনতা পুরস্কার

৪৬তম বিজয় দিবস পালন করেছে দেশ। এই দেশ তৈরিতে রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের মতোই মাঠে যুদ্ধ করেছিলেন একদল ফুটবলার। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রাপ্য সেই মর্যাদাটা তাঁরা পেয়েছেন? আমরা এই ধারাবাহিক আয়োজনে পুনর্পাঠ করতে চেয়েছি ইতিহাসের। বিস্তারিত অনুসন্ধানে বের করার চেষ্টা হয়েছে আমাদের সামনের প্রকাশিত সত্যের পেছনে লুকানো আরো সত্য আছে কি না! দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জীবিত প্রায় সবার সঙ্গে কথা বলে তৈরি এই ধারাবাহিক আয়োজনে আজ পড়ুন মোহাম্মদ সাইদুর রহমান প্যাটেলের গল্প। অনুসন্ধানী এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন নোমান মোহাম্মদ্।

মানুষটি স্বপ্ন দেখেছিলেন।

স্রোতের বিপরীতে স্পর্ধিত সে স্বপ্ন। গতানুগতিকতার বাইরে বেপরোয়া ওই আশা। পথে কত কাঁটা কিন্তু দমেননি! লক্ষ্যপূরণে কত বাধা তবু টলেননি! ভাবনার বারুদে বরং জ্বেলে দেন উদ্যোগের আগুন। দাউ দাউ জ্বলে ওঠে স্বপ্নমশাল। যার প্রদীপ্ত আলোকরশ্মিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পায় ভিন্ন এক মাত্রা।

১৯৭১-এর আচ্ছন্ন সময়ে মোহাম্মদ সাইদুর রহমান প্যাটেল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল প্রতিষ্ঠা করেন বলেই না পৃথিবী পায় নতুন ইতিহাস রচনার উপলক্ষ! কোনো দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে কোনো ক্রীড়া দলের এমন কীর্তিগাথার উদাহরণ আগে ছিল না যে!

আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গে প্যাটেল জড়িত আগে থেকেই। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে সঙ্গীদের নিয়ে সূত্রাপুর থানা লুট করে গড়ে তোলেন সশস্ত্র প্রতিরোধ। পরে পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযানের মুখে ভারতে পালিয়ে গেলেও সঙ্গে নিয়ে যান অস্ত্র হাতে যুদ্ধের অদম্য আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু তারুণ্যের স্বপ্ন তাঁকে তাড়িয়ে নেয় ভিন্ন বাঁকে। গুলশানের ৩২ নম্বর সড়কের চতুর্থ তলায় ভাড়া বাসার রুচিশীল ড্রয়িংরুমে বসে প্যাটেল বলছিলেন সে কথা, ‘যুদ্ধের আগের সময়টায় তো আমি প্রথম বিভাগের দল পিডাব্লিউডিতে ফুটবল খেলেছি। ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা মনের কোণে তাই ছিলই। কলকাতায় রাতে বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করতে করতে হঠাৎ মাথায় আসে ব্যাপারটা। মনে হয়, আমরা তো ফুটবল খেলেও যুদ্ধ করতে পারি। তাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত তৈরি হবে; পাশাপাশি ফান্ড তুলে দিতে পারি সরকারের তহবিলে।’

কিন্তু ওই ভাবনার আগুন উসকে দেওয়ার মতো উৎসাহ পান না শুরুতে। লেগে থাকেন তবু। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ অবশ্য ভীষণ প্রশংসা করেন প্যাটেলের, “আট নম্বর থিয়েটার রোডে গিয়ে সব খুলে বলার পর উনি আমাকে জড়িয়ে ধরেন। বলেন, ‘ইয়াং চ্যাপ প্যাটেল, তোমার মাথায় এত সুন্দর চিন্তা কিভাবে এলো!’ স্বাধীন বাংলা দল গঠনের প্রাথমিক ফান্ড হিসেবে তিনি আমার হাতে তাত্ক্ষণিক তুলে দেন ১৪ হাজার রুপি।”

স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর আশীর্বাদ পেয়েছেন, আর কী চাই! প্রবল কর্মোদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়েন প্যাটেল। দ্রুত গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি’। এর অধীনেই খেলে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। কিন্তু প্রতিষ্ঠাতা হয়েও দলের সঙ্গে দুই ম্যাচের বেশি থাকতে পারেননি প্যাটেল। দ্বিতীয় খেলা শেষে কারনানি ম্যানশনে ফিরে সবাই দেখেন মেঝেতে থাকা লেপ-তোশক সব গেছে ভিজে। দোষটা চাপানো হয় প্যাটেলের ঘাড়ে। এতে তাঁর বিস্ময় যায় না আজও, ‘আমি সবার সঙ্গে মাঠে গেলাম, সবার সঙ্গে ফিরে এলাম—তাহলে পানি দিলাম কখন?’

জলের এ ঘটনার জল গড়ায় বহু দূর। কল ছেড়ে পানিতে সব ভিজিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টুর ট্রানজিস্টার চুরির অভিযোগও দেওয়া হয় প্যাটেলের বিরুদ্ধে। তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হন তিনি। তবু দল ছেড়ে চলে যান প্যাটেল। কারণটা জানান এভাবে, ‘আমাকে নির্দোষ ঘোষণা করে ওদের কয়েকজনের বিপক্ষে শাস্তির সুপারিশ করা হয়। ভেবে দেখলাম, সেটি হলে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলই ভেঙে যাবে। কিন্তু যে ঘর আমি বানিয়েছি, তাতে তো আগুন দিতে পারি না। নিজেকে স্যাক্রিফাইস করে সিরু ও মঈন সিনহাকে নিয়ে দল ছেড়ে রণাঙ্গনের যুদ্ধে চলে যাই আমি।’ আর্মি ট্রেনিং নিয়ে দুই নম্বর সেক্টরের ধনপুর সাবসেক্টরে কমান্ডার ক্যাপ্টেন কবিরের অধীনে সশস্ত্র যুদ্ধ করেন প্যাটেল। পরে নির্ভয়পুর সাবসেক্টরে কমান্ডার ক্যাপ্টেন মাহবুবের অধীনে।

দেশ স্বাধীন হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনের কাজে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ঝাঁপিয়ে পড়েন প্যাটেল। ওদিকে মাঠের ফুটবলে শুরুতে দিলকুশায় নাম লেখান; পরে অধিনায়ক হন ইস্ট এন্ডের। ১৯৭৫ সালে বন্ধু শেখ কামাল যে তাঁকে বলেছিলেন, ‘তোদের স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের জন্য সুখবর আসছে শিগগিরই’—তাতে আপ্লুত হন ভীষণ। কিন্তু সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তো এলোমেলো হয়ে যায় সব! পুরো বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে বিকৃতির মতো স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল নিয়েও চলে যথেচ্ছ মিথ্যাচার। যে কারণে ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যান প্যাটেল। ছয় বছর জেল খেটে পরে প্রবাস জীবনে হারিয়ে যান বিস্মৃতিতে। কয়েক বছর হলো দেশে ফিরেছেন। এখন আবার সতীর্থরা সমস্বরে প্যাটেলকে দিচ্ছেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রতিষ্ঠাতার স্বীকৃতি।

কিন্তু অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু, সহ-অধিনায়ক প্রতাপ শংকর হাজরার মতো কয়েকজন এখনো মানতে চান না তা। এ ক্ষেত্রে প্যাটেলের ভরসা সতীর্থরাই, ‘আমি স্বাধীন বাংলা দল গঠনের মতো এত বড় কাজ করে ফেলছি, সেটি ওনারা মেনে নিতে পারেননি। হিংসা ও ঈর্ষা থেকে তাই লেগে যান আমার পেছনে। এখন সবাইকে জিজ্ঞেস করে জানুন সত্যটা কী?’ স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের বেঁচে থাকা, দেশে থাকাদের ২২ জনের মধ্যে দু-তিনজন বাদে বাকিরা নির্দ্বিধায় তাঁকে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে রায় দিয়েছেন জানানোর পর প্যাটেলের চোখে-মুখে কী উচ্ছ্বাস! ইতিহাসের ছাইচাপা সত্যে চকমকির আগুন জ্বলে ওঠায় সে কী আনন্দ!

পিন্টু-প্রতাপরা যে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতির সব কাজ প্যাটেল করলে কমিটিতে নেই কেন, এর উত্তরও আছে তাঁর কাছে, ‘আমাকে সব জায়গায় থাকতে হবে—এমন সংকীর্ণ মানসিকতা ছিল না। সে কারণেই লুত্ফর চাচাকে সেক্রেটারি করেছি। আর আমি তো প্রস্তাবক, সংগঠক, প্রতিষ্ঠাতাই। এর চেয়ে সেক্রেটারি পদ নিশ্চয়ই বড় না।’ এখন তাঁর চাওয়ার জায়গা একটিই, ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ইতিহাস যেন আর বিকৃত না হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় যেন সত্যটা।’ ব্যাকুল প্যাটেলের আরেকটি আকুল আবেদন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে, ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল এখনো পায়নি স্বাধীনতা পুরস্কার। ১৯৭১ সালের অবদানের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি আমাদের ওই পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করেন, তাহলে তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ থাকব আমরা। চিরকৃতজ্ঞ থাকবে ইতিহাসও।’

৪৬ বছর আগের তেজি তারুণ্যের প্যাটেল এখন সৌম্য প্রৌঢ়ত্বে। নিজ স্মৃতির সঙ্গে আড্ডায় দিন কাটে তাঁর। ছেলে-মেয়ে দুটো আমেরিকায়। নিজে আছেন সেই আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিয়েই। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর কত স্মৃতি! স্বাধীন বাংলাদেশে ঢাকা স্টেডিয়ামে প্রথম যে ম্যাচ হয় ‘বঙ্গবন্ধু একাদশ’ ও ‘প্রেসিডেন্ট আবু সাঈদ চৌধুরী একাদশ’-এর মধ্যে, সে খেলার স্মৃতিটা প্যাটেলকে দোলা দেয় সবচেয়ে বেশি, “খেলা শুরুর আগে খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছিলেন বঙ্গবন্ধু। আমার পেটে খোঁচা দিয়ে বলেন উনি, ‘তুই আবার ফুটবল খেলিস কবে থেকে?’ তখন লুত্ফর রহমান বলেন, ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল তো ও-ই করেছে।’ শুনে বঙ্গবন্ধু কী খুশি, ‘এই দল আমার সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল করেছে? তুই তো বিরাট কাজ করেছিস রে।’”

সত্যিই বিরাট কাজ করেছেন সাইদুর রহমান প্যাটেল। ইতিহাসের অন্ধকূপ থেকে সে সত্য আলোয় উদ্ভাসিত এখন। আর ওই স্বাধীন বাংলা দল গঠনের জন্য এই মানচিত্র, এই পতাকা, এই বাংলাদেশ ’৭১-এর স্বপ্নবাজ মানুষটির কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে অনন্তকাল।



মন্তব্য