kalerkantho


ফুটবলের জন্য এখনো ঘর ছেড়েই আছি

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ফুটবলের জন্য এখনো ঘর ছেড়েই আছি

ছবি : মীর ফরিদ

ফুটবলে খর্বকায়দের বেশি কদর মাঝমাঠ নয়তো আক্রমণভাগে। রক্ষণভাগে বাতাসে বলের লড়াই জেতার দায়বদ্ধতার কারণেই ডিফেন্ডাররা দীর্ঘদেহী হন। তবে রজনী কান্ত বর্মণের বেলায় সাধারণ এই যুক্তি ধোপে টেকে না। দীর্ঘদেহী না হয়েও এই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার খেলোয়াড়ি জীবনে উঠেছেন সামর্থ্য আর সাফল্যের শীর্ষে। বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক এই অধিনায়কের মুকুটে আছে প্রথম সাফ গেমস ও সাফ ফুটবল শিরোপার পালকও। তবে স্মরণীয় এই জোড়া সাফল্য আবার কাঁদিয়েছেও রজনীকে। পুরোটা জানুন মাসুদ পারভেজকে দেওয়া তাঁর সাক্ষাৎকারে

 

প্রশ্ন : আপনার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় থেকেই শুরু করতে চাই। সেটি নিশ্চয়ই ২০০৩ সালে অধিনায়ক হিসেবে সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ জেতা?

রজনী কান্ত বর্মণ : তা তো অবশ্যই। তবে আমি সেটিকে শুধুই স্মরণীয় অধ্যায় বলব না, বলব দুঃখের অধ্যায়ও। ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনালে আইএম বিজয়নকে ফাউল করে টুর্নামেন্টে নিজের দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখলাম। যে জন্য ফাইনালই খেলা হলো না আর। আসলে আমার ফুটবলজীবনের দুঃখ ওই একটিই নয়, দুটি।

প্রশ্ন : আরেকটি দুঃখ কী নিয়ে?

রজনী : একই রকম দুঃখজনক ঘটনা আমার জীবনে ঘটেছে দুইবার। ১৯৯৯ সালে নেপালের কাঠমাণ্ডুতে আমরা সাফ গেমস ফুটবলে প্রথমবারের মতো সোনা জিতলাম। সোনাজয়ী দলের গর্বিত সদস্য আমি। অথচ সেবারও ফাইনালে খেলা হয়নি আমার। কারণ একই। সেমিফাইনালে যে টুর্নামেন্টে নিজের দ্বিতীয় হলুদ কার্ডটি দেখে ফেলেছিলাম! কষ্ট সেটাই যে দুইবার চ্যাম্পিয়ন হলাম, কিন্তু ফাইনাল খেলতে পারলাম না। আমার জীবনটাই এমন। আসল সময়ে গিয়ে আর মাঠে নামা হতো না আমার।

প্রশ্ন : এত বছর পরও এতটা দুঃখিত দেখাচ্ছে আপনাকে! তার মানে তাৎক্ষণিক দুঃখটা এর চেয়ে বহুগুণ বেশি ছিল।

রজনী : হ্যাঁ, অনেক বেশিই ছিল। মনে আছে, সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনালে মতিউর মুন্নার গোল্ডেন গোলে জিতে আমরা ফাইনালে গেলাম (বাংলাদেশ ভারতকে হারায় ২-১ গোলে)। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের গ্যালারিও উল্লাসে ফেটে পড়ছে। খেলোয়াড়রা যখন দৌড়ে গিয়ে দর্শক অভিনন্দনের জবাব দিতে ব্যস্ত, আমি তখন মাঠে শুয়ে পড়ে কাঁদছি। দেশের মাটিতে দেশের দর্শকদের সামনে ফাইনালটাই খেলা হবে না, এই ভেবে কিছুতেই নিজেকে আর সামলে রাখতে পারছিলাম না।

প্রশ্ন : ফাইনালের আগে তখনকার কোচ জর্জ কোটান পুরো দলের উদ্দেশে একটা আবেগী বক্তব্য দিয়েছিলেন। যা দলকে শিরোপা জেতার লক্ষ্যে চাঙ্গাও করেছিল ভীষণ। শুনেছি, সেই বক্তব্যে কোটান আপনার কথাও বলেছিলেন। 

রজনী : ঠিকই শুনেছেন। খুবই আবেগঘন ছিল তাঁর কথাগুলো। আমি এখনো পরিষ্কার মনে করতে পারি। বাংলাদেশ দল ছিল শেরাটন হোটেলে। সেখানে ফাইনালের দিন দুপুরে লাঞ্চের আগে টিম মিটিং করলেন উনি। শেষে দিলেন অনুপ্রেরণাদায়ী সেই বক্তব্য। বলছিলেন, ‘মনে করো, তোমরা তোমাদের এক বন্ধুকে হারিয়েছ। ওকে হারানোর আবেগটা খেলায় ঢেলে দাও। ওর জন্য খেলো। ওকে কিছু দেওয়ার চেষ্টা করো। তাতে দেশকেও কিছু দেওয়া হবে।’ সবাই সেদিন দেশকে কিছু দেওয়ার জন্য খেলেছে এবং শেষ পর্যন্ত ট্রফিটা দিতেও পেরেছে (নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ১-১ গোলে ড্র থাকার পর টাইব্রেকারে মালদ্বীপকে ৫-৩ গোলে হারায় বাংলাদেশ)।

প্রশ্ন : সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতলেন কোটানের কোচিংয়ে। আর ১৯৯৯ সালে সাফ গেমস ফুটবলের সোনা আসে কোচ সামির শাকিরের অধীনে। দুজনের মধ্যে একটা তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে বললে কিভাবে করবেন?

রজনী : সামির শাকিরও খুব ভালো কোচ ছিলেন। তবে দুজন দুই রকমের কোচ ছিলেন। কোটান খেলোয়াড়দের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করতেন। কখনো রাগ করে কিছু বলেছেন বলে মনে পড়ে না। অন্যদিকে সামির শাকির ছিলেন প্রচণ্ড বদমেজাজি। দুর্ব্যবহার করতেন খুব। একটা ক্ষেত্রে অবশ্য কোটানের সঙ্গে তাঁর মিলও ছিল। দুজনেই দলকে তাতিয়ে দিতে পারতেন খুব। কোটানের সেই বক্তব্যের সুফল তো শুনলেনই। সাফ গেমস ফুটবলেও সামির শাকির এমন কিছু কথা বলেছিলেন যে খেলোয়াড়দের রক্তে আগুন ধরে গিয়েছিল!

প্রশ্ন : সেই আগুনে কথাগুলোও শুনতে চাই।

রজনী : উনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের (ইরাক) মানুষ বলেই কিনা কথায় কথায় যুদ্ধ ব্যাপারটি টেনে আনতেন। এমনভাবে কথা বলতেন যেন আমরা প্রতিটা খেলাকে যুদ্ধ মনে করে নামি। আপনাদের মনে আছে কি না জানি না, সাফ গেমস ফুটবলে আমাদের শুরুটা কিন্তু ভালো ছিল না (প্রথম ম্যাচেই মালদ্বীপের কাছে হেরে যায় ২-১ গোলে)। সেখান থেকে সোনা জেতার স্বপ্নে আমাদের জেদ আরো বাড়িয়ে দিয়েছিলেন কোচই। ওনার কথাগুলো এখনো কানে বাজে, ‘তোমাদের দেশ শুনেছি অনেক রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে। তোমাদের তো আর রক্ত দিতে হচ্ছে না, তোমরা শুধু শ্রম আর ঘাম দাও। তোমরা শুধু মন থেকে চেষ্টা করো আর আত্মবিশ্বাস রাখো যে পারবে।’ আমরা পারলামও (ফাইনালে নেপালকে ১-০ গোলে হারায় বাংলাদেশ)। সেবার সোনা জেতার জন্য অন্য আরেক চাপও ছিল। যেটি আমরা খেলোয়াড়রাও ভেতর থেকে অনুভব করেছি।

প্রশ্ন : কী সেই চাপ, বলা যায়?

রজনী : অবশ্যই যায়। (হাসি...) সেটি ছিল ক্রিকেটের চাপ। ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর থেকে তত দিনে জনপ্রিয়তায় ক্রিকেট জাঁকিয়ে বসতে শুরু করেছে। এবং দিন দিন জনপ্রিয়তা আরো বাড়ছে। ব্যাপারটি আমাদের জন্যও ‘প্রেস্টিজ ইস্যু’ হয়ে গেল। আমাদের মান-ইজ্জতের প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। আমরা ভাবলাম একটি সাফল্য দিয়ে যদি ফুটবলটা আবার জাগানো যায়। আমরা সাফ গেমসে যাওয়ার আগেই বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারিয়ে ক্রিকেট আরো জেগে উঠেছে। ওই অবস্থায় ফুটবলারদের কাছে কর্মকর্তাদের দাবিও একই, ‘কিছু একটা কর তোরা। চেষ্টা কর মন থেকে। ক্রিকেটের সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে।’ তখন মাঠ নিয়েও ঝামেলা। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম ভাগাভাগি করে ফুটবল-ক্রিকেট হয়। কর্মকর্তারা বোঝালেন, সাফ গেমস ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলে ফুটবলের কাছ থেকে এই মাঠ কেড়ে নেওয়া হবে। তবে চ্যাম্পিয়ন হলে সরকারের কাছে মুখও দেখানো যাবে, মাঠও চাওয়া যাবে।

প্রশ্ন : জেগে ওঠার বদলে ফুটবলের ঘুমিয়ে পড়ার প্রসঙ্গে পরে আসছি। আবার ২০০৩ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে ফিরতে চাই। যেটিতে আপনি সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে কোচ কোটানের আস্থার প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছিলেন।

রজনী : ঠিকই বলেছেন। আমার পজিশন কাভার করার মতো তেমন কেউ তখন ছিল না। ওনারও আমার ওপর বিশ্বাস ছিল খুব। ওনারও এ রকম ধারণা ছিল যে আমি ছাড়া বোধ হয় আর কেউ ওই জায়গাটা কাভার করতে পারবে না। তখন সহ-অধিনায়ক হাসান আল মামুন রাইট ব্যাক থেকে আমার জায়গায় উঠে এসে ফাইনাল খেলল। বললাম না, অন্য রকম জেদ কাজ করছিল তখন সবার মধ্যে। মামুনও আমার জায়গাটা ভরানোর জন্য জান বাজি রেখে খেলেছিল সেদিন।

প্রশ্ন : কোটানের নির্ভরতা হয়ে উঠেছিলেন কিভাবে?

রজনী : অনুশীলনে গিয়ে তাঁকে তাক লাগিয়ে দিতে পেরেছিলাম। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ সামনে রেখে জাতীয় দলের ক্যাম্পে আমি কিন্তু ১৫ দিন পর যোগ দিয়েছিলাম। তত দিনে সবার কন্ডিশনিং শেষ হয়ে আরো হার্ড ট্রেনিং শুরু হয়ে গেছে। আমি যাওয়ার পর উনি সন্দিহান যে আমি আদৌ তাল মেলাতে পারব কি না। আমি চ্যালেঞ্জটি নিয়ে বললাম, দেখি না চেষ্টা করে। সেদিনের ট্রেনিংটা এ রকম ছিল যে বিকেএসপির অ্যাথলেটিকস ট্র্যাকে ২২ মিনিটের মধ্যে অনেকবার চক্কর দিয়ে আসতে হবে। সেই ট্রেনিংয়ে আমি অনেকের চেয়ে ভালো করে কোটানের গুডবুকে উঠে গেলাম। না হলে হয়তো আমাকে সাসপেন্ডই হয়ে যেতে হতো।

প্রশ্ন : সাসপেন্ড হয়ে যেতেন মানে?

কোটান : বললাম না আমি ১৫ দিন পর ক্যাম্পে যোগ দিয়েছি। দেরি করার জন্য ফুটবল ফেডারেশন যখন আমাকে সাসপেন্ড করে করে অবস্থা, তখনই গিয়ে আমি যোগ দিই। যোগ দিয়ে ট্রেনিংয়ে ভালো করার পর কোটান খুশি হয়ে বাফুফেকে বলেছিলেন যে আমাকে তাঁর লাগবে। সে যাত্রায় উনি না চাইলে হয়তো আমি সাসপেন্ডই হয়ে যেতাম।

প্রশ্ন : আপনার সময়মতো অনুশীলনে যোগ না দেওয়ার বাতিক ছিল বলে শুনেছি। সে বিষয়ে আপনার বক্তব্যটাও এই সুযোগে শুনে নিতে চাই।

রজনী : (হাসি...) জাতীয় দল বা ক্লাব দল থেকে ডাকলে আমি কেন জানি একটু দেরি করতাম। তা নিয়ে আমার বিরুদ্ধে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখিও হতো। এরপর দেখা যেত তিন-চার দিন বা এক সপ্তাহ পর যোগ দিতাম। এটাকে আমার বদভ্যাসই বলতে পারেন। বেখেয়ালও বলতে পারেন। আমার মতো আমি চলতাম। নিজের নিয়মে চলতাম। দেরিতে যাওয়ার অবশ্য একটা সুবিধাও ছিল। এতে করে ভালো খেলার জেদটা কেন জানি আরো বেশি চেপে বসত। আমি তো পরে এসেছি, কাজেই দেখিয়ে দেই যে আমি ভালো পারি। ওই জেদ থেকে প্রমাণ করে দিতাম যে আমি খেলতে পারি। কোটানও এর প্রমাণ পেয়েছিলেন বলেই হয়তো আমাকে পছন্দ করতেন।

প্রশ্ন : সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আগে তো আপনি অনেক পরিণত ও সিনিয়র একজন ফুটবলার। ওই সময়ে ওরকম ছেলেমানুষির কারণ আসলে কী ছিল?

রজনী : (হাসি...) সত্যি কথা বললে আমার মনে তখন এ রকম একটা চিন্তার উদয় হয়েছিল যে ওই বছর আর জাতীয় দলে খেলব না। হঠাৎ মনে হয়েছিল সম্মান ছাড়া তো জাতীয় দলে খেলে আর কিছু পাওয়া যায় না। টাকা নেই, বেতন নেই, কিছু নেই—এত কষ্ট করে কী করব? হয়তো শেষ পর্যন্ত ক্যাম্পে যেতামই না। কিন্তু আমার জায়গাটা কাভার দেওয়ার মতো কেউ তখন ছিল না বলে ওপরের পর্যায় থেকে ক্যাম্পে যোগ দেওয়ার চাপ ছিল বলেই গিয়েছিলাম। 

প্রশ্ন : সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পর নিশ্চয়ই নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছিলেন?

রজনী : বুঝতে তখন বাধ্য। কারণ ওই টুর্নামেন্টে আমি ভালোই খেলিনি শুধু, হয়েছিলাম ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্টও। প্রতিটি ম্যাচেই নিজের সেরাটা দিয়েছি। এ জন্যই হয়তো মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার হই। পুরস্কার ছিল এমিরেটসের সৌজন্যে পরিবারসহ দুবাই ভ্রমণের বিমান টিকিট। পরে নানা কারণেই আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি।

প্রশ্ন : দেরি করে ক্যাম্পে যোগ দেওয়া খেলোয়াড়টি পরে অধিনায়কও হয়ে গেল। এটিও নিশ্চয়ই আপনার জন্য কম বিস্ময়ের ছিল না?

রজনী : তা তো বটেই। আমি তো জানিই না যে অধিনায়ক হব। তখন জয় (বর্তমানে ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান), হাসান আল মামুন ও আরমান ভাইরা ছিলেন। জুনিয়রদের মধ্যে আমিনুল হকও দাবিদার ছিল। তো ক্যাম্পে অধিনায়কত্ব নিয়েও কম আলোচনা হতো না। কে পেতে পারে, নিজে পেতে পারে কি না, কারো কারো মধ্যে এমন আলোচনাও শুনেছি। আমি সেসব আলোচনায় অংশও নিতাম না। কারণ আমি জানতাম যে বিবেচনাতেই নেই। এর মধ্যেই ভুটান যাওয়ার আগে অধিনায়ক ঘোষণা করে দেওয়া হলো আমাকে। বলতে পারেন ঘটনাচক্রেই আমি অধিনায়ক হয়ে গেছি। বাফুফে হয়তো ভেবেছে অনেকেরই হওয়ার ইচ্ছা, কাজেই এঁদের মধ্যে কাউকে অধিনায়ক বানিয়ে অন্যদের মন খারাপ করতে চায়নি মনে হয়। তবে বলতে দ্বিধা নেই, আমার নেতৃত্ব পাওয়াকেও কেউ খারাপ চোখে দেখেনি।

প্রশ্ন : দেশের ফুটবল দৃশ্যপটে আপনার আবির্ভাবের গল্পটিও শুনতে চাই।

রজনী : বড় দলে যোগ দেওয়ার গল্প তো? আগেই বলে রাখি আমি কিন্তু শুরু থেকেই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার ছিলাম না। স্কুলজীবনে গোলকিপিংও করেছি। যখন যে পজিশনে সুবিধা, খেলতাম। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৬ দলের হয়ে সৌদি আরব খেলতে যাওয়ার আগে মোহামেডানের বাদলদার নজরে পড়ি আমি। মোহামেডানের সঙ্গে মিরপুরে ওই দলটির একটি প্রস্তুতি ম্যাচ ছিল। ওই ম্যাচে খুব ভালো খেলি। আমরা ২-১ গোলে জিতি এবং আমি একটি গোলও করি। মোহামেডানে যোগ দেওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয় তখনই। যদিও ব্যাপারটি সহজ ছিল না মোটেও।

প্রশ্ন : কেন?

রজনী : ঢাকার লিগে আমি অগ্রণী ব্যাংকে খেলি দুই বছর। আসলে দুই বছর খেলতেই হতো। কারণ তখন নিয়ম ছিল জুনিয়র খেলোয়াড় কোনো দলে যোগ দিলে সেখানে দুই বছর খেলতেই হবে। ১৯৯৪ ও ১৯৯৫ কাটাই অগ্রণী ব্যাংকেই। যোগ দেওয়ার আগে অন্য দল থেকেও অফার থাকায় প্রথমবার পেলাম ৪০ হাজার টাকা। পরেরবার তাও নয়, কেবল বোনের বিয়ে উপলক্ষে পাই হাজার বিশেক টাকা। অগ্রণী ব্যাংকে দুই বছর পার করার পরও আটকে যেতে পারতাম। কারণ তখন ন্যাশনাল পুলের পাশাপাশি আরেকটি পুলও ছিল। যেটিতে ক্লাবগুলো তাদের আগের বছরের দলের পাঁচ খেলোয়াড়কে ধরে রাখতে পারত। মানে ওটাও ছিল খেলোয়াড়দের পায়ে শিকল পরিয়ে পেটে-ভাতে খেলানোর ব্যবস্থা। আমি যেহেতু জুনিয়র খেলোয়াড় এবং আমার তেমন ভালো কোনো অফার নেই ভেবে অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তারা শেষ পর্যন্ত আমাকে ওই পুলে রাখলেন না। এই সুযোগেই মোহামেডান আমাকে উঠিয়ে নিয়েই গেল না শুধু, একটি রুমে নিয়ে আটকেও রাখল।

প্রশ্ন : আটকে রাখল কেন? আপনার কি মোহামেডানের যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না?

রজনী : সত্যি কথা বললে মন থেকে সায় পাচ্ছিলাম না। বাদলদাকে সে কথা বলেওছিলাম। কারণ কায়সার (হামিদ) ভাই ও জুয়েল (রানা) ভাইদের মতো বড় ফুটবলারদের কারণে আমি তো ম্যাচই পাব না। মনে হলো অগ্রণী ব্যাংকে থাকলেই ভালো, নিয়মিত ম্যাচ পাব। তখন মিরপুরের ক্রীড়াপল্লীতে থাকতাম। সেখান থেকে একদিন অগ্রণী ব্যাংকের হেড অফিসে টাকা নিতে এলাম। দেড় লাখ টাকা দেওয়ার কথা। আসার আগে রুমমেটকে বিষয়টি বলেই ভুল করে এসেছিলাম। কারণ মোহামেডানের বাদলদারা ওখানে গিয়ে না পেলেও খোঁজটা পেয়ে যান যে আমি কোথায়। অগ্রণী ব্যাংকের হেড অফিস থেকেও মোহামেডান ক্লাব কাছেই। হঠাৎ দেখি দুজন অপরিচিত লোক এসে বলছেন, ‘নিচে বাদলদা আছেন। আপনার সঙ্গে কী যেন কথা আছে।’ আমিও নেমে গেলাম এবং একরকম ঠেলা-ধাক্কা দিয়ে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে আমাকে মোহামেডান ক্লাবে নিয়ে যাওয়া হয়। ওখানে গিয়ে দেখি বাদলদা-লোকমান ভাইরা বসে আছেন।

প্রশ্ন : তখনকার দলবদল মানেই তো ক্লাবপাড়া সরগরম।

রজনী : তা আর বলতে! (হাসি...) কাকে কে ঠেক দিয়ে নিয়ে যায়, বলা যায় না। তখনকার দিনে তো দলবদলের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজের মাস্তানদের নিয়ে আসা হতো। তারা মুখে কিছু বলত না, কেবল টি-শার্ট উঁচু করে কোমরে গুঁজে রাখা পিস্তলটা দেখাত!

প্রশ্ন : এরপর কোথায় আটকে রাখা হলো আপনাকে?

রজনী : (হাসি...) অফিস রুমে বিরিয়ানি খেতে দিয়ে বাইরে দিয়ে আটকে দেওয়া হলো। যদিও বলা হলো ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু ভয় যা ধরার, ততক্ষণে ধরেই গেছে। ওই ভয়েই মোহামেডানের হয়ে ১৯৯৬ সালের লিগ খেলার জন্য সাইন করে দিলাম। বলা হলো আড়াই লাখ টাকার চুক্তি, অগ্রিম দেওয়া হবে দেড় লাখ। তখন জানতাম না যে বাকি এক লাখের কোনো হদিস মিলবে না! তার পরও আমার জন্য দেড় লাখ অবিশ্বাস্য অঙ্ক। জীবনে ওই প্রথম লাখ টাকা গুনে নিলাম।

প্রশ্ন : টাকা গুনলেন কিন্তু খেলার নিশ্চয়তা তো ছিল না।

রজনী : আমিও তাই ভেবেছিলাম। সেবার মোহামেডান কোরিয়া থেকে ম্যান ইয়ং ক্যাংকে কোচ করে আনল। আমি তরুণ, অনুশীলনে দারুণ রানিং করি। উনি রানিং দেখলে খুব খুশিও হতেন। তাই বলে খেলার আশা করিনি। জার্সি পেলেই খুশি। ব্রাদার্সের বিপক্ষে লিগের তৃতীয় ম্যাচের আগে স্টার্টিং ইলেভেন ঘোষণার সময় তো আমি ভূত দেখার মতো করে চমকে উঠি। দেখি কায়সার ভাই নেই, তাঁর জায়গায় আমি জুয়েল ভাইয়ের সঙ্গে। আমি তখন কাঁপতে শুরু করে দিয়েছি। কায়সার ভাইসহ সবাই অবশ্য আমাকে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করলেন। মাঠে যখন নামলাম, দর্শকে গোটা স্টেডিয়াম মৌমাছির মতো গমগম করছে। নেমে এত ভালো খেললাম যে মোহামেডানের সমর্থকরা প্রথমে মনে করল ক্যাং বোধ হয় আমাকে কোরিয়া থেকে নিয়ে এসেছেন! মনে করার কারণও ছিল। তখনো আমার দাড়ি-গোঁফ ওঠেনি সেভাবে। চেহারাও কোরিয়ানদের মতোই। ওই ম্যাচের পর আর আমাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

খেলোয়াড়ি জীবনে

প্রশ্ন : ওই ম্যাচ দিয়েই কায়সার হামিদের মতো কিংবদন্তিতুল্য ডিফেন্ডারের শেষের শুরু।

রজনী : তা বলা যেতে পারে। এরপর পুরো মৌসুমই খেললাম। মোহামেডানও সেবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে আবাহনীর হ্যাটট্রিক শিরোপা ঠেকায়। তখন কায়সার ভাইয়েরও প্রায় শেষ সময়। আমি একাদশে ঢোকার পরে তিনি আর আসতে পারেননি। বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নামতেন। মজার ব্যাপার কী জানেন? কিংবদন্তির এই ডিফেন্ডার তাঁর ক্যারিয়ার শেষ করেছেন স্ট্রাইকার হিসেবে। লম্বা মানুষ ও ভালো হেড করতে পারতেন বলে ম্যাচের শেষ দিকে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে তাঁকে নামানো হতো স্ট্রাইকিং পজিশনে।

প্রশ্ন : আপনার চেহারা দেখে মোহামেডান সমর্থকদের শুরুতে কোরিয়ান মনে করার কথা বলছিলেন। ধারণা করা হয় যে আপনার পূর্বপুরুষ আদিবাসী ছিল। আপনার ফিটনেসের রহস্য হিসেবেও সেটিকেই ধরা হয়।

রজনী : (হাসি...) আমার হাতে আদিবাসী ফাইটারের উল্কি দেখেই হয়তো আপনার এমনটি মনে হয়ে থাকতে পারে। হ্যাঁ, পূর্বপুরুষ আদিবাসীই ছিল। ভারতে গেলেই যেমন মনে করে আমরা হয়তো আসাম থেকে গিয়েছি। আমাদের পরিবারের সবার চেহারার মধ্যেই ব্যাপারটি আছে। আদি পুরুষ আমাদের আসামেই ছিল। তবে আমার জন্ম বাংলাদেশেই, গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানার ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নে। আর ফিটনেস? সে জন্য আমি সব সময়ই বাড়তি পরিশ্রম করতাম। এখনো নিজে নিজে ওয়েট ট্রেনিং করি।

প্রশ্ন : এই সুযোগে আপনার ছোটবেলার গল্পও শুনে নিতে চাই। বিশেষ করে ফুটবলার হওয়ার গল্পটা।

রজনী : আমি অনেক কষ্ট করে ফুটবলার হয়েছি ভাই। বাবা রাধা কান্ত বর্মণ শিক্ষিত ছিলেন। ব্রিটিশ আমলের ম্যাট্রিক পাস। তাই চাইতেন আমিও শিক্ষিত হই। কিন্তু আমার তো খেলার প্রতি ঝোঁক। তাই প্রাইমারিতে থাকতেই আমি ঘর ছাড়ি। প্রথমে এক খালার বাসায়। সেখান থেকে আরেক খালার বাসায়। ভালো খেলতাম বলে মৌচাক স্কাউটস হাই স্কুলে (যেখানে স্কাউট জাম্বুরি হয়) ক্লাস সিক্স থেকে টেন পর্যন্ত আমি পড়েছি বিনা বেতনে। স্কুলকে টানা চার বছর আন্ত স্কুল টুর্নামেন্টে গাজীপুর জেলাকে চ্যাম্পিয়নও করেছি। কিন্তু বিনা বেতনে না হয় পড়লাম, থাকার জায়গাও তো লাগবে। বেশ কয়েকটি বাসায় লজিং থেকেছি। ভালো ছাত্র ছিলাম না বলে পড়াতেও তো পারতাম না। তাই অন্যভাবে পুষিয়ে দিতে হতো আমাকে। যেসব বাসায় থাকতাম, তাদের অনেক কাজকর্মও করে দিতে হতো। এভাবেই ম্যাট্রিক পাস করে ভর্তি হই কালিয়াকৈর ডিগ্রি কলেজে। যদিও ফুটবল খেলার চাপে ইন্টারমিডিয়েট পাস করা হয়ে ওঠেনি আর। আয়-রোজগারের শুরু অবশ্য আরো আগে স্কুলজীবন থেকেই।

প্রশ্ন : কিভাবে?

রজনী : তখন প্রচুর খেপ খেলা হতো। আমারও চাহিদা ছিল বেশ। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও খেলতে যেতাম। খেললেই মিলত ৫০০ বা এক হাজার টাকা। আমি সেই সময়ের কথা বলছি যখন ৫ পয়সা, ১০ পয়সা ও চার আনার চল ছিল। ৫ পয়সায় তখন চকোলেট পাওয়া যেত। ৭০ টাকায় পাওয়া যেত বুট। খেপের মাঠেই নাম করলাম আমি। একবার উপজেলা চেয়ারম্যান লতিফ সাহেব আমাকে খুশি হয়ে টাকার মালাও উপহার দিলেন। ওই যে নেশা ঢুকল, লেখাপড়া আর এগোল না। খেপের আয় দিয়েই নিজের খরচ চালাতাম, আবার পরিবারকেও সহযোগিতা করতাম। জেদ করে ঘর না ছাড়লে হয়তো আমি খেলোয়াড়ই হতে পারতাম না।

প্রশ্ন : ঢাকার ক্লাব ফুটবলে ক্যারিয়ার শুরুর সময় ডিফেন্ডার হিসেবে কাকে আদর্শ মানতেন?

রজনী : আমার সময়ে জুয়েল ভাইকে গাইড হিসেবে পেয়েছি। মুন্না ভাই, কায়সার ভাইয়ের নাম শুনতাম। অগ্রণী ব্যাংকে খেলার সময় মুন্না ভাইকে প্রতিপক্ষে পেয়েছিও। তবে জুয়েল ভাইয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন মোহামেডান ও মুক্তিযোদ্ধায় খেলেছি। ওনাকেই আমি অনুসরণ করতাম। ওনার মধ্যে অভিভাবকসুলভ একটা ব্যাপার ছিল। উনি কমান্ড করে খেলাতেন। খেলোয়াড়ি জীবনে এসে জুয়েল ভাইকেই ফলো করেছি বেশি। ডিফেন্ডিং দারুণ। বলে বলে খেলাতেন। এই এদিকে আয় বা ওদিকে যা। আমার জন্য ভালো ছিল। অ্যালার্ট করতেন। জুয়েল ভাই নিজেও খেলতেন, অন্যকে দিয়েও খেলাতেন।

প্রশ্ন : এক বছর মোহামেডানে খেলেই তাঁর সঙ্গে দল ছেড়ে গেলেন মুক্তিযোদ্ধায়?

রজনী : হ্যাঁ, তখন আবাহনী-মোহামেডান জোট বেঁধেছিল যে এক দলের খেলোয়াড় আরেক দলে নেবে না। আবার কাউকে চার লাখ টাকার বেশি পেমেন্টও দেবে না। তখন জুয়েল ভাইয়ের নেতৃত্বে সিনিয়র খেলোয়াড়রাও জোট বাঁধল এবং মুক্তিযোদ্ধায় সদলবলে গেল। গেলাম আমিও। পেলাম সাড়ে চার লাখ টাকা। ওই বছরই ফেডারেশন কাপ, লিগ ও জাতীয় লিগ—সবগুলোতেই আমরা চ্যাম্পিয়ন হই।

প্রশ্ন : মুক্তিযোদ্ধায় পার করে দেন ক্যারিয়ারের লম্বা একটি সময়ও।

রজনী : ঠিক তাই। মুক্তিযোদ্ধায় একটানা সাত বছর খেলি। ২০০০ সালে যে বছর আমি মুক্তিযোদ্ধার অধিনায়ক হলাম, সেই বছরও লিগ জিতি। মাঝখানে বের হয়ে ব্রাদার্সে যাই ২০০৪ সালে। ওই বছর নঈমুদ্দিনের কোচিংয়ে সবগুলো আসরেই চ্যাম্পিয়ন হই। ব্রাদার্স থেকে আবার মুক্তিযোদ্ধায়। মুক্তিযোদ্ধা থেকে আবার গেলাম মোহামেডানে। এরপর আবাহনী। এই দলটির হয়েও লিগ জিতেছি। আবাহনী থেকে আবার মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা থেকে মোহামেডান। মোহামেডানে দুই বছর খেলে শেখ রাসেলে। ২০১৩ সালে সেখানে থাকতেই রাগ করে খেলা ছেড়ে দিই। সবাই বলত বয়স হয়ে গেছে। খেলা কবে ছাড়বে, এসব বলাবলি করতে শুনতাম।

প্রশ্ন : একটি ব্যাপার এখনো জিজ্ঞেসই করা হলো না। ২০০৩ সালের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আগে ভুটানে টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়ে আপনারা খেলোয়াড়রা বিদ্রোহ করেছিলেন। একটু খুলে বলবেন ঘটনাটি?

রজনী : এই সেদিনও পুরনো কিছু সতীর্থের সঙ্গে থার্টি ফার্স্ট উদ্‌যাপনের সময় আমরা বলাবলি করছিলাম, এই সেই থার্টি ফার্স্ট নাইট (২০০২ সালের)। কোটান ইউরোপের মানুষ। থার্টি ফার্স্ট নাইট পালন ওনাদের ঐতিহ্য। এই দিনে পরিবার থেকে দূরে বলে তাঁর ছিল মন খারাপ। রাতে খাওয়াদাওয়ার পর তিনি হঠাৎ করে এসে সবাইকে বাসে তুললেন। আমরা সবাই ক্যাজুয়াল ড্রেসে, উনিও তাই। নিয়ে গেলেন ডিসকোতে। ওখানে আমাদের সন্মানও করা হলো। এন্ট্রি ফি অনেক কমিয়ে পুরো দলের জন্য করা হলো মাত্র ২০০ ইউএস ডলার। আমরা কেউই মানিব্যাগ নিয়ে যাইনি। কোচও ভেবেছিলেন ম্যানেজার তো আছে। কিন্তু ম্যানেজার কানন ভাই (সাবেক গোলরক্ষক ছাইদ হাসান) কিছুতেই ডলার দেবেন না। কোটান বললেনও, ‘এই ডলার আমার বেতন থেকে কেটে নিও, তবু দাও।’ কানন ভাই দিলেন না তো দিলেনই না। আমাদের তাই একরকম বেইজ্জত হয়ে ওই ডিসকো থেকে বেরিয়ে আসতে হয়। ওই কারণেই আমরা সব খেলোয়াড়রা একটি কাগজে সই করে বাফুফেকে ফ্যাক্স করি যে উনি ম্যানেজার থাকলে আমরা কেউই সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে খেলব না। এই হলো বিদ্রোহের গল্প। পরে তাঁকে রেখেই আমিরুল ইসলাম বাবুকে সহকারী ম্যানেজার করে বাফুফে আমাদের সান্ত্বনা দিয়েছিল।

প্রশ্ন : এবার বলুন, জেগে ওঠার বদলে ফুটবলের ঘুমিয়ে পড়ার দায় কার?

রজনী : দায় ফুটবলারদেরও আছে। এখনকার ফুটবলারদের খেলা দেখলে বিরক্তিতে মাঝেমধ্যেই মনে হয় আমি নেমে পড়লেও বোধ হয় এদের চেয়ে ভালো খেলব। আমার নিজের দলের (শেখ রাসেল) খেলোয়াড়দেরও এ কথা প্রায়ই বলি। মূল সমস্যা গ্রামেগঞ্জে ফুটবল নেই। আর ফুটবলার কিন্তু বেরোয় গরিব আর কৃষকের ঘর থেকেই। এই যে এখন মেয়েদের নিয়ে হইচই চলছে। এরা কিন্তু কোনো সিস্টেমের ফল নয়। কোনো পরিকল্পনা থেকে এরা উঠে আসেনি। এসেছে নিজেদের ইচ্ছায়, চেষ্টায়। কাজেই ফুটবলকে ঢাকাকেন্দ্রিক রাখলে চলবে না। ক্রিকেটার মুস্তাফিজ তো গ্রাম থেকেই এসেছে। কারণ ক্রিকেট এখন গ্রামেগঞ্জে আছে।

প্রশ্ন : আপনার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের ইতিহাস সেরা ডিফেন্ডার কে? 

রজনী : সব সময় মিলিয়ে (মোনেম) মুন্না ভাইয়ের কথাই বলব। ওনার ডিফেন্ডিং, অ্যাটাকিং, চ্যালেঞ্জ নেওয়ার ক্ষমতা, জেদ— সব কিছু মিলিয়ে উনি ছিলেন কমপ্লিট ফুটবলার। গোল করায়ও যেমন পারদর্শী ছিলেন, তেমনি ডিফেন্স করার দক্ষতাও ছিল প্রশ্নাতীত। পাওয়ার ছিল, ওনার সামনে কেউ যেতে চাইত না ভয়ে।

প্রশ্ন : আপনার পরিবার নিয়েও ধারণা চাই।

রজনী : মা-বাবা গাজীপুরেই থাকেন। স্ত্রী মৌসুমী বর্মণ দুই মেয়েকে নিয়ে ওপার বাংলার হুগলিতে থাকে। বড় মেয়ে ঋত্বিকা পড়ে ক্লাস নাইনে, আর ছোট মেয়ে মহিমা সেভেনে। ২০১৩ সালে খেলা ছেড়ে ওখানেই থিতু হয়েছিলাম। পরে মানিক ভাইয়ের (শেখ রাসেলের কোচ শফিকুল ইসলাম) কারণেই কোচিং পেশায় এসেছি। ২০১৬ থেকে শেখ রাসেলের ট্রেনার। সি লাইসেন্স করেছি। কষ্ট করে ভালো খেলোয়াড় হয়েছিলাম, এখন হতে চাই ভালো কোচ। সে জন্যই পরিবার ছেড়ে দূরে আছি। ফুটবলার হওয়ার জন্য ঘর ছেড়েছিলাম, এখনো ছেড়েই আছি (হাসি...)।

প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। আপনার ফুটবলজীবন নিয়ে তৃপ্ত?

রজনী : অবশ্যই তৃপ্ত। জাতীয় দলে খেলেছি, অধিনায়কত্ব করেছি। ট্রফিও জিতেছি। ক্লাব পর্যায়ে যখন যে দলে খেলেছি, প্রতিটি দলের হয়েই শিরোপা জিতেছি। এর চেয়ে বড় কিছু তো আর চাওয়ার নেই। খারাপ লাগে শুধু এখন স্টেডিয়ামে ঢুকলে। আগে মৌমাছির মতো গমগম শব্দ হতো। এখন ফাঁকা গ্যালারি।



মন্তব্য