kalerkantho


বিশেষ আয়োজন

‘আমার নখের সমান নাকি তোরা?’

৪৬তম বিজয় দিবস পালন করেছে দেশ। এই দেশ তৈরিতে রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের মতোই মাঠে যুদ্ধ করেছিলেন একদল ফুটবলার। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রাপ্য সেই মর্যাদাটা তাঁরা পেয়েছেন? আমরা এই ধারাবাহিক আয়োজনে পুনর্পাঠ করতে চেয়েছি ইতিহাসের। বিস্তারিত অনুসন্ধানে বের করার চেষ্টা হয়েছে আমাদের সামনের প্রকাশিত সত্যের পেছনে লুকানো আরো সত্য আছে কি না! দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জীবিত প্রায় সবার সঙ্গে কথা বলে তৈরি এই ধারাবাহিক আয়োজনে আজ পড়ুন দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টুর গল্প। অনুসন্ধানী এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন নোমান মোহাম্মদ

৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



‘আমার নখের সমান নাকি তোরা?’

ওরা যে আমার নামে বলে, ওরা কী মানের ফুটবলার? স্বাধীনতা পুরস্কার তো এমনিই পাব, জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার তো এমনিই পাব। আমার যা যোগ্যতা, তাতে ওদের কারো তুলনা হতে পারে না। আমার নখের সমান নাকি তোরা?

২৫ জুলাই ১৯৭১। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসে জ্বলজ্বলে এক তারিখ। ভারতের মাটিতে প্রথমবারের মতো ওড়ে লাল-সবুজের পতাকা। বাজে ‘আমার সোনার বাংলা’। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের বীরত্বগাথা ওই অর্জন অমরত্বের কালিতে লেখা হয়ে যায় চিরস্থায়ীভাবে।

সেই দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু যদি বিতর্কিত হয়ে পড়েন পরবর্তী সময়ে, কালিমার দাগ তো লাগে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রেও!

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল নিয়ে পরবর্তীকালে কেন এত টানাহেঁচড়া? অধিনায়ক হিসেবে জাকারিয়া পিন্টুর যখন সবার কাছে পূজনীয় হওয়ার কথা, সেই তিনি কেন প্রশ্নবিদ্ধ? তা-ও সতীর্থদের কাছ থেকে! ইতিহাসকে নিজের মতো ব্যাখ্যা করার জন্যই কি?

পিন্টু তখন ঢাকা মোহামেডানের প্রতিষ্ঠিত ফুটবলার। শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে নিজ যোগ্যতায় জায়গা করে নেন পাকিস্তান জাতীয় দলেও। যুদ্ধ শুরুর পর নওগাঁ থেকে বালুরঘাট চলে যান তিনি। ওদিকে স্বাধীন বাংলা দল গঠনের সব প্রক্রিয়া শেষে সিনিয়র ফুটবলার হিসেবে দলে যোগ দেওয়ার জন্য খবর পাঠানো হয় পিন্টুকে। যদিও তাঁর দাবি, ‘আমি ওই প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই ছিলাম।’

কিন্তু সত্যটা হচ্ছে, পিন্টু কলকাতা যেতে যেতে সরকারের কাছ থেকে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অনুমোদন হয়ে গেছে। কারনানি ম্যানশনের কোকাকোলা বিল্ডিংয়ে পুরো দলের থাকার ব্যবস্থাও। যেসব কাজটি প্রায় এককভাবে করেন সাইদুর রহমান প্যাটেল। কিন্তু তাঁর ভূমিকার কথা সহ-অধিনায়ক প্রতাপ শংকর হাজরার মতো মানেন না পিন্টুও, ‘এই দলটির স্বপ্নদ্রষ্টা আলী ইমাম। মূল লোক তিনি।’

: সাইদুর রহমান প্যাটেলের ভূমিকা কী ছিল?

—কোনো ভূমিকা ছিল না। এখন অনেকে বলেন, ‘এই করেছি, ওই করেছি’। প্যাটেল তো কোনো ম্যাচ খেলেনি।

: ম্যাচ খেলার ব্যাপার না, স্বাধীন বাংলা দল তৈরিতে তাঁর ভূমিকার কথা জানতে চাইছি। আপনাদের বেশির ভাগ সতীর্থই তাঁকে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বলেছেন। আপনারা কয়েকজন তা অস্বীকার করেন কেন?

—কারণ আমি ওকে কিছু করতে দেখিনি। যাঁরা দেখেছে, তাঁরা বলুক—আমার আপত্তি নেই। কিন্তু আমি দেখিনি।

: আলী ইমামকেও তো ওসব কাজ করতে দেখেননি। তবু তো তাঁকে স্বপ্নদ্রষ্টা বলছেন?

—কারণ সে-ই এগুলো করেছে।

: প্রস্তাবক হিসেবে তো প্যাটেলের নাম দেখি আমরা...

—প্রস্তাব তো যে কেউ করতে পারেন। প্রতাপ করতে পারেন। আলী ইমাম করতে পারেন। প্রস্তাব করার মানে তো এই না যে, প্যাটেল প্রতিষ্ঠাতা। আমি তা মানি না।

এভাবেই শুরু থেকে বিভাজন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে। যার জেরে জেদাজেদিতে দুই ম্যাচ পর দল ছেড়ে রণাঙ্গনের যুদ্ধে চলে যান প্যাটেল। ‘অবশ্যই দলবল নিয়ে সে-ই কলের পানি ছেড়ে দিয়ে আমাদের তোষক-লেপ সব ভিজিয়ে দেয়’—সহঅধিনায়ক প্রতাপ শংকর হাজরার মতো অধিনায়কেরও দাবি।

ফুটবলার পিন্টুর ক্যারিয়ার শুরু ১৯৫৮ সালে। ইস্ট এন্ড, ওয়ান্ডারার্সে খেলার পর ১৯৬১ সালে যোগ দেন মোহামেডানে। ১৯৭৫ পর্যন্ত সেখানে খেলে অবসর। তাঁর পরবর্তী ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সতীর্থদের। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক হন তিনি, ভাইস প্রেসিডেন্টও। ওই সময় দলের সদস্যদের সুবিধা আদায়ের চেয়ে নিজের স্বার্থকে বড় করে দেখেছেন বলে অভিযোগ অনেকের। তাঁর স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়া নিয়েও সতীর্থদের ক্ষোভ। এ নিয়ে কথাবার্তায় পিন্টুর চমকে দেওয়া উচ্চারণ, ‘হ্যাঁ, আমি ওই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করতে পারতাম। কিন্তু যদি প্রত্যাখ্যান করে বলতাম স্বাধীন বাংলা দলকে তা দিতে হবে—তাহলে আজ এখানে সাক্ষাৎকার নাও দিতে পারতাম। আমাকে হয়তো মেরে ফেলা হতো।’

তাই কি? ১৯৯৫ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার পান পিন্টু। দেশে তখন বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার। ওই দলটির শাসনামলে রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি ছিলেন তিনি। হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক, সহসভাপতি। ১৯৯৬ সালে ‘জনতার মঞ্চ’ তৈরির সময়ও সরকারকে সমর্থন করে পিন্টু বিবৃতি দিয়েছেন পর্যন্ত। সেই তিনি ১৯৯৫ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার নিয়েছেন ‘বাধ্য’ হয়ে, ‘মৃত্যু’র ভয়ে—এটি বিশ্বাসযোগ্য নয় কিছুতেই। সতীর্থদের প্রতি নিজের ক্ষোভটাও আড়াল করতে পারেন না পিন্টু, ‘ওরা যে আমার নামে বলে, ওরা কী মানের ফুটবলার? স্বাধীনতা পুরস্কার তো এমনিই পাব, জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার তো এমনিই পাব। আমার যা যোগ্যতা, তাতে ওদের কারো তুলনা হতে পারে না। আমার নখের সমান নাকি তোরা?’

ইন্দিরা রোডের নিজ ফ্ল্যাটে বসে কিছুক্ষণ পর শান্ত হয়ে আসেন পিন্টু। তখন জোর গলাতেই স্বাধীন বাংলা দলের জন্য দাবি জানান স্বাধীনতা পুরস্কারের। বিভাজনের কারণেই দলটি প্রাপ্য সম্মান কি পেল না, এমন প্রশ্নে রেগে যান আবার, “ধরে নিলাম ১৯৭১ সালে প্যাটেল স্বপ্ন দেখেছেন, সব করেছেন—কিন্তু এত দিন কোথায় ছিলেন? ৪৫ বছর পর এসে বলবেন ‘আমি প্রতিষ্ঠাতা, আমি প্রস্তাবক’—এটি তো হতে পারে না।”

—প্যাটেল ও আপনি পাশাপাশি বসে বেসরকারি টেলিভিশনের এক টক শো করেছেন। সেখানে কিন্তু স্বীকার করেছেন তাঁর ভূমিকার কথা...

: ভূমিকা থাকতে পারে। আপনারও তো ভূমিকা থাকতে পারে। সাঁতারু অরুণ নন্দী আমাদের পেছনে পেছনে ঘুরেছে। তাঁরও ভূমিকা আছে। প্যাটেল এত কিছু যদি করে থাকে, তাহলে দলের এখনো অনেকে না খেয়ে থাকে কেন?

—অধিনায়ক হিসেবে আপনার প্রতি সতীর্থদের প্রশ্ন তো সেটিই...

: আমি তা জিজ্ঞেস করছি প্যাটেলকে। এত কিছু করে থাকিস, তাহলে ওদের জন্য এখন কিছু কর। সরকারের কাছ থেকে জমি-টমি এনে দে। তাহলে না বুঝব!

—তাহলে তাঁকে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মেনে নেবেন?

: না। বাহবা দেব, কিন্তু প্রতিষ্ঠাতা বলে মানব না। আচ্ছা, প্যাটেল এখন বলছে সে স্বাধীন বাংলা দলের প্রতিষ্ঠাতা; আমিও বলছি আমি প্রতিষ্ঠাতা—মানুষ তাহলে কার কথা শুনবে? কে খেলোয়াড় হিসেবে বড়?

ওই ‘বড় খেলোয়াড়’-এর গণ্ডিতেই আটকে আছেন জাকারিয়া পিন্টু। স্বাধীনতার এই ৪৬ বছর পরও। যে কারণে ইতিহাস অস্বীকার করেন। সত্যকে পাশ কাটিয়ে ঘোষণা দেন, ‘স্বাধীন বাংলা দল গঠনের প্রক্রিয়ার শুরু থেকে আমি ছিলাম’; ‘প্যাটেলের ভূমিকা মানি না’; ‘স্বাধীনতা পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করলে আমাকে মেরে ফেলা হতো’। সতীর্থদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন ‘আমার নখের সমান নাকি তোরা?’ বলে।

যে কারণে শ্রদ্ধার আসনটি হারিয়েছেন তিনি। অন্তত স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সতীর্থদের কাছ থেকে প্রাপ্য সম্মানটা পাচ্ছেন না অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু।



মন্তব্য