kalerkantho


বিশেষ আয়োজন

ভিন্ন স্মৃতি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি

৪৬তম বিজয় দিবস পালন করেছে দেশ। এই দেশ তৈরিতে রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের মতোই মাঠে যুদ্ধ করেছিলেন একদল ফুটবলার। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রাপ্য সেই মর্যাদাটা তাঁরা পেয়েছেন? আমরা এই ধারাবাহিক আয়োজনে পুনর্পাঠ করতে চেয়েছি ইতিহাসের। বিস্তারিত অনুসন্ধানে বের করার চেষ্টা হয়েছে আমাদের সামনের প্রকাশিত সত্যের পেছনে লুকানো আরো সত্য আছে কি না! দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জীবিত প্রায় সবার সঙ্গে কথা বলে তৈরি এই ধারাবাহিক আয়োজনে আজ পড়ুন প্রতাপ শংকর হাজরার গল্প। অনুসন্ধানী এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন নোমান মোহাম্মদ

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ভিন্ন স্মৃতি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি

আমরা যখন দল গঠনের চেষ্টা করছি, তখন একটি ছেলে আসে আমার বাসায়। খবর দেয়, কালিয়াকৈরের এমপি শামসুল হক সাহেব ডেকেছেন। কারণ স্বাধীন বাংলা সরকার একটি ফুটবল দল গঠন করতে চায়। আমি বলি, খুব ভালো। তাহলে তো কথাই নেই; কারণ আমরাও ওই চেষ্টা করছিলাম।

—স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল নিয়ে একটি ধারাবাহিক আয়োজন করছি আমরা। এরই মধ্যে ওই দলের ১৪-১৫ জনের সঙ্গে কথা হয়েছে...

: তার মানে এই নয় যে, তাঁদের সঙ্গে আমার কথা মিলতে হবে।

কথা কেড়ে নিয়ে প্রতাপ শংকর হাজরার এ কথাটিই চমকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। শুরুতেই যেন ‘দায়মুক্তি’ নিয়ে নেন। আর তাঁর সঙ্গে ঘণ্টা দেড়েকের কথোপকথনের পরতে পরতে তা বারবার মনে হতে বাধ্য। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের বেশির ভাগ সদস্যের সঙ্গেই যে প্রতাপের কথা মেলে না! তাঁর বলা ইতিহাসটা একেবারে অন্য রকম!

ইতিহাসের ওপর পড়েছে সময়ের পুরু আস্তরণ। সে আস্তরণ সরিয়ে প্রতাপের দাবি, ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের কাজ শুরু হয়েছে আমার মাধ্যমে।’

—কিভাবে?

: দেশ থেকে পালিয়ে কলকাতা গিয়ে আমি ও নুরুন্নবী ছুটি থিয়েটার রোডে। উদ্দেশ্য একটি ফুটবল দল গঠন। সেখানে দেখা আলী ইমামের সঙ্গে। রাজনীতিবিদ বড় ভাইয়ের সূত্রে সে আইএফএর সঙ্গে যোগাযোগ করছিল। চেষ্টা করছিল শরণার্থী ফুটবলারদের নিয়ে একটা দল গঠনের এবং তা কিছু দূর এগিয়েও যায়। আমরা যোগ দেওয়াতে তা এগোয় আরো দ্রুত।

—এরপর?

: আমরা যখন দল গঠনের চেষ্টা করছি, তখন একটি ছেলে আসে আমার বাসায়। খবর দেয়, কালিয়াকৈরের এমপি শামসুল হক সাহেব ডেকেছেন। কারণ স্বাধীন বাংলা সরকার একটি ফুটবল দল গঠন করতে চায়। আমি বলি, খুব ভালো। তাহলে তো কথাই নেই; কারণ আমরাও ওই চেষ্টা করছিলাম।

—কে আপনাকে সে বার্তা দিয়েছিল?

: জনৈক পরিচিত ছেলে এসেছিল; কিন্তু আমি নাম বলব না। কারণ সে এর যোগ্য না।

ওই না বলা নামটিই সাইদুর রহমান প্যাটেলের। যাঁর নাম মুখে আনতে আপত্তি প্রতাপের, স্বাধীন বাংলা দলে তাঁর অবদানকে যে স্বীকার করবেন না, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ‘আমাকে ওই খবর দেওয়া ছাড়া ওর আর কোনো অবদান নেই’—কাটা কাটা শব্দে নিজের স্পষ্ট অবস্থান জানিয়ে দেন প্রতাপ; কিন্তু দলের বেশির ভাগ সদস্য যে এখন প্যাটেলকে প্রতিষ্ঠাতা বলছেন! প্রতাপ তবু অটল, ‘সে যদি সব করবে, তাহলে লুৎফর রহমান সেক্রেটারি কেন? নিজে সংগঠন দাঁড় করাবে আর অন্য কাউকে সেক্রেটারি বানিয়ে দেবে—এমন উদার বাঙালি আমার ৭৫ বছরের জীবনে দেখিনি। আপনি দেখেছেন?’ এই ক্রোধের জবাব থাকে কী করে!

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড় প্রতাপ। আর তা শুধু ফুটবলে নয়—হকি, ক্রিকেট, ভলিবল, টেবিল টেনিসসহ নানা খেলায়। রীতিমতো সব্যসাচী। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের খেলোয়াড় সংগ্রহে ভূমিকা রয়েছে তাঁর। বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতির কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়ে আগরতলায় যান তিনি। ওখানে খেলা বাংলাদেশের ফুটবলারদের ভারতীয় বিমানবাহিনীর ডেকোটা প্লেনে করে নিয়ে আসেন কলকাতায়। ২৫ জুলাই কৃষ্ণনগরে নদীয়া জেলা একাদশের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খেলতে নামে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। সহ-অধিনায়ক প্রতাপের কাছে যে অনুভূতি, ‘একটা হিন্দু ছেলে হিসেবে মায়ের পূজা করতে পারার মতো আনন্দ।’

কিন্তু সে আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। দলের মধ্যে শুরু হয়ে যায় কোন্দল। যার কদর্য বহিঃপ্রকাশ দ্বিতীয় ম্যাচ শেষে। গোষ্টপাল একাদশ নাম নিয়ে খেলা মোহনবাগানের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে কারনানি ম্যানশনে ফিরে যায় স্বাধীন বাংলা দল। দেখে, মেঝেতে থাকা লেপ-তোষক সব থই থই পানিতে ভাসছে। দায় দেওয়া হয় প্যাটেলের ওপর। তা এখনো বিশ্বাস করেন প্রতাপ, ‘ওর গ্রুপই এটি করেছে। এই সত্য অস্বীকার করি কিভাবে?’ কিন্তু তদন্তে যে বেরিয়ে আসে, পানি না থাকার সময় কল ছাড়া হয়েছিল এবং পরে সবাই বেরিয়ে যাওয়ার পর পানি এসে সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, সেটি? ‘এমন বলা হয় বিষয়টাকে ঢাকা দেওয়ার জন্য’—প্রতাপ নিঃসংশয়।

এই সূত্রে বড়সড় ঝামেলা হয় স্বাধীন বাংলা দলে। দল ছেড়ে চলে যান প্যাটেল। তৈরি হয় বিভাজন। প্রতাপ কিন্তু এটিকে বিভাজন বলতে রাজি নন, ‘আমি কখনো কোথাও বলিনি, আমাদের মধ্যে বিভাজন ছিল।’

—তাহলে তো ইতিহাসকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন...

: কোনো সন্দেহ নেই যে আমি ইতিহাসকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারি না; কিন্তু আমি তো ইতিহাস লিখতে বসিনি।

—কিন্তু আপনি যা বলবেন, তা তো ইতিহাসই।

: না, আমি যা বলব, সেটি ইতিহাস না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে দুই বছর পড়েছি। এ সম্পর্কে আমার খুব ভালো ধারণা আছে। ইতিহাস নিজেই নিজের রাস্তা তৈরি করে নেবে। আর সেখানে মিথ্যাবাদীদের কোনো স্থান হবে না। এ কারণেই শুরুতে বলেছি, আমার কথার সঙ্গে কারো কথা মিলবে না।

প্রতাপ শংকর হাজরা দুই-তিনজন সঙ্গীসহ সত্য বলছেন আর বাকি ১৮-২০ জন বলছেন মিথ্যা—তাই বা কতটা বিশ্বাসযোগ্য?

তাঁর এই উল্টোরথে চেপে বসায় পেছনে পড়ে যায় খেলোয়াড়ী কীর্তি। ফুটবলেই যেমন ভিক্টোরিয়ায় খেলা শুরু ১৯৬১ সালে। দুই বছর পর মোহামেডানের তাঁবুতে দলবদল। ১৯৭৭ পর্যন্ত সেখানে খেলে তুলে রাখেন বুটজোড়া। জনতা ব্যাংকে চাকরি করেন দীর্ঘদিন। এখন অবসর। মেয়ে দুটোরও বিয়ে দিয়েছেন। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এফ ব্লকের ৯ নম্বর বাড়ির চতুর্থ তলায় ভাড়া আছেন আড়াই বছর ধরে। ওখানে বসেই প্রতাপের স্মৃতির সঙ্গে খেলা।

যে স্মৃতির সঙ্গে সতীর্থদের বয়ানের বিস্তর ফারাক। অন্যদের সঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গিরও পার্থক্য থাকায় প্রতাপ বলতে পারেন, ‘একটা লোক জীবন বাজি রেখে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করছে, যেকোনো সময় গুলি লেগে মরে যাব। আর আমরা খেলছি মাঠে। আমরা কি কখনো ওদের পর্যায়ে যেতে পারব? আমি তা মনে করি না। তার পরও যে সরকার আমাদের পুরোপুরি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়েছে, তা চাওয়ার চেয়েও বেশি। এর চেয়ে বেশি রাষ্ট্র কী করবে?’ স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অনেক সদস্য যে পরবর্তী সময়ে অর্ধাহার-অনাহারে দিন কাটিয়েছেন-কাটাচ্ছেন, অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে পারেননি, পারছেন না—এ ক্ষেত্রে ওই ফুটবলারদের বেহিসাবি জীবনধারণকে দায় দেন তিনি। তাঁদের ব্যাপারে তাই রাষ্ট্রের কিছু করণীয় নেই বলে সহ-অধিনায়কের মন্তব্য।

প্রতাপের স্মৃতির সঙ্গে মিল নেই বেশির ভাগ সতীর্থের। দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিষ্কার পার্থক্য। এ বিষয়ে তিনি দায়মুক্তি তো নিয়েছেন প্রথম বাক্যেই। আর নিজেই যখন বলেন, ‘ইতিহাস নিজের রাস্তা তৈরি করে নেবে, সেখানে মিথ্যাবাদীদের কোনো স্থান হবে না’—তখন বিভ্রম জাগে আরো।

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ইতিহাস প্রতাপ শংকর হাজরাকে আসলে মনে রাখবে কিভাবে?


মন্তব্য