kalerkantho


বিশেষ আয়োজন

শহীদ মুক্তিযোদ্ধার ভাইটি ফুটবলের যোদ্ধা

৪৬তম বিজয় দিবস পালন করেছে দেশ। এই দেশ তৈরিতে রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের মতোই মাঠে যুদ্ধ করেছিলেন একদল ফুটবলার। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রাপ্য সেই মর্যাদাটা তাঁরা পেয়েছেন? আমরা এই ধারাবাহিক আয়োজনে পুনর্পাঠ করতে চেয়েছি ইতিহাসের। বিস্তারিত অনুসন্ধানে বের করার চেষ্টা হয়েছে আমাদের সামনের প্রকাশিত সত্যের পেছনে লুকানো আরো সত্য আছে কি না! দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জীবিত প্রায় সবার সঙ্গে কথা বলে তৈরি এই ধারাবাহিক আয়োজনে আজ পড়ুন মোহাম্মদ মজিবর রহমানের গল্প। অনুসন্ধানী এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন নোমান মোহাম্মদ

২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



শহীদ মুক্তিযোদ্ধার ভাইটি ফুটবলের যোদ্ধা

মজিবরের মেজ ভাই মফিজুর রহমান বাদল। যশোর ইউনাইটেড ব্যাংকে চাকরি করতেন। ২৫ মার্চ ঢাকায় ক্র্যাকডাউনের পর জনতার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ৯ দিন অবরুদ্ধ করে রাখেন যশোর সেনানিবাস। এরপর ঢাকা থেকে পাকিস্তান এয়ারফোর্সের জঙ্গি বিমান গিয়ে হামলা করায় ছত্রভঙ্গ সবাই। পালিয়ে যাওয়ার পথে খুলনার বকচরে পাকিস্তানি আর্মির সঙ্গে গোলাগুলিতে শহীদ হন বাদল। ‘যে রাস্তা দিয়ে এই বাসায় ঢুকলেন, সে রাস্তা আমার বাদল ভাইয়ের নামে’—বলতে বলতে বিষণ্নতা ও গর্বের যুগলবন্দি মজিবরের কণ্ঠে।

শিয়ালদা স্টেশনে নেমেছে যে তরুণ, তাঁর পরনে লুঙ্গি-গেঞ্জি। হাতে ছোট্ট এক পুঁটলি। পথে খাবার জন্য বড় বোনের তৈরি করে দেওয়া ছাতু তাতে। জনে জনে জিজ্ঞাসা করে ছেলেটি, ‘আট নম্বর থিয়েটার রোড যাব কিভাবে?’ কথার ধরন আর বেশভুষায় সবাই বুঝে যায় আগন্তুকের পূর্ব-ঠিকানা। তবু প্রশ্ন, ‘আপনি কি জয় বাংলা থেকে এসেছেন?’ মাথা নাড়তেই কী সহানুভূতি! সবাই কেমন করেই না বুঝিয়ে দেয় ট্রামে চড়ে থিয়েটার রোড যাওয়ার রাস্তা!

সেদিনের সেই তরুণ এখন প্রৌঢ়ত্ব পেরিয়ে বার্ধক্যের দোরগোড়ায়। বয়স এসে ঠেকেছে মধ্য ষাটে। কিন্তু মোহাম্মদ মজিবর রহমান ৪৬ বছর আগের শিয়ালদার সেই দুপুরটি মনে করতে পারেন পরিষ্কার। স্টেশনের সেই মাছি থিকথিকে ভিড়; সেই সহানুভূতির মিছিল। এর মধ্যে একজনের কথা মনে পড়ে আলাদাভাবে। যিনি থিয়েটার রোডের পথ বাতলে প্রশ্ন করেন, ‘দাদা, আপনার কাছে ভারতীয় পয়সা আছে?’

—না, সব পাকিস্তানি টাকা।

: এখন আবার তা কোথায় ভাঙাবেন! এই আমার কাছ থেকে খুচরা পয়সাগুলো নিয়ে নিন।

—না না, সেটি কেন! আমরা এসেছি যুদ্ধ করতে; ভিক্ষা করতে না।

: ছি দাদা, ওভাবে বলবেন না। আমার আদি বাড়ি বাংলাদেশে। এখন চাকরি করে ভারতে স্থায়ী হয়েছি ঠিক। তবে নাড়ির টানটা বুঝি। দেশের স্বাধীনতার জন্য আপনারা এত কষ্ট করছেন। আমি আপনাকে পয়সা দিয়ে সামান্য কিছু করার তৃপ্তি না হয় পেলাম!

স্মৃতিচারণে কণ্ঠ বুজে আসে মজিবরের। স্বাধীন বাংলা দলে যোগ দেওয়ার জন্য কলকাতা নেমেই যে ঘটনার মুখোমুখি হন, তা তো ভোলার নয়। এত বছর পর মাদারীপুরে নিজ বাড়িতে গল্পটি বলতে বলতে তাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।

মজিববের অবশ্য স্বাধীন বাংলা দলে যোগ দেওয়ার কথা ছিল না। অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করলেই বরং মানানসই হতো বেশি। এমনিতে ফুটবলার ছিলেন। ফরিদপুর লিগে ১৯৬৯ থেকে খেলাও শুরু। কিন্তু ফুটবলের চেয়ে রাজনীতিতে তাঁর মনোযোগ ছিল বেশি। যুদ্ধ শুরুর পর ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নেন। খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল হায়দারের কাছ থেকে নির্দেশনা নিয়ে আবার দেশের ভেতরে ঢোকেন মজিবর। গোসাইর হাটে বোনের বাসায় থেকে ছেলেদের সংগঠিত করছিলেন আক্রমণের জন্য। এমন সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ফুটবল দল গঠনের ঘোষণা বদলে দিল সব।

যে বদলের সূচনা আসলে আরো বেশ আগে। ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল।

মজিবরের মেজ ভাই মফিজুর রহমান বাদল। যশোর ইউনাইটেড ব্যাংকে চাকরি করতেন। চাকরি আর কী, রাজনীতিতেই সময় কাটাতেন বেশি। ২৫ মার্চ ঢাকায় ক্র্যাকডাউনের পর জনতার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ৯ দিন অবরুদ্ধ করে রাখেন যশোর সেনানিবাস। এরপর ঢাকা থেকে পাকিস্তান এয়ারফোর্সের জঙ্গি বিমান গিয়ে হামলা করায় ছত্রভঙ্গ সবাই। পালিয়ে যাওয়ার পথে খুলনার বকচরে পাকিস্তানি আর্মির সঙ্গে গোলাগুলিতে শহীদ হন বাদল। ‘যে রাস্তা দিয়ে এই বাসায় ঢুকলেন, সে রাস্তা আমার বাদল ভাইয়ের নামে’—বলতে বলতে বিষণ্নতা ও গর্বের যুগলবন্দি মজিবরের কণ্ঠে।

ওই যে ভাই শহীদ হন, সে কারণে আত্মীয়-স্বজন তাঁকে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে যেতে করেন নিরুৎসাহ। মজিবর তাই কলকাতা যান স্বাধীন বাংলা দলে খেলার উদ্দেশ্যে। তত দিনে স্বাধীন বাংলা দল প্রথম ম্যাচ খেলে ফেলেছে। এরপর ওই দলের সঙ্গেই কাটে মজিবরের দিন-রাত্রি। বেশ কয়েকটি ম্যাচও খেলেন এই রাইট ইন। আর নিজে শুরু থেকে না থাকলেও স্বাধীন বাংলা দল সংগঠনে সাইদুর রহমান প্যাটেলের ভূমিকা জানেন তিনি, ‘আমি শুনেছি দল তৈরিতে মূল ভূমিকা প্যাটেল ভাইয়ের। উনি নিজেও সেটি বলেন। আমার কাছে তা সত্য মনে হয়। কারণ প্যাটেল ভাই যেভাবে এ দাবি করে, অন্য কেউ সেভাবে করতে পারে না।’

আবার অন্য অনেকের মতো মজিবর কাঠগড়ায় দাঁড় করান অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টুকে। সেটি তাঁর ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনের কারণে, নিজস্ব সুবিধা আদায় করার জন্যও, ‘পিন্টু ভাইয়ের মতো লোকের বিএনপি করা উচিত হয়নি। এটি আমাদের স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা। আর তিনি নিজে তো জিয়াউর রহমানের সঙ্গে লাইন করে অনেক সুবিধা নিয়েছেন। পরের বিএনপি সরকারের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা ছিল। নিজে স্বাধীনতা পুরস্কার নিয়েছেন, যেটি আসলে পুরো দলের পাওয়া উচিত ছিল।’

স্বাধীনতার পর মজিবরের সামনে সুযোগ আসে ঢাকার ক্লাব ফুটবল খেলার। কিন্তু তত দিনে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন আরো আষ্টেপৃষ্ঠে। মাদারীপুর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত। ঢাকায় তাই খেলা হয়নি। ফরিদপুরের লিগের ক্যারিয়ারও এগোয়নি ’৭৫-এর পর। তাঁর ছয় বছরের ফুটবলার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়ে আছে তাই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে খেলাটাই।

রাজনীতি নিয়ে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছেন মজিবর। বর্তমানে আওয়ামী লীগের মাদারীপুর জেলা কমিটির মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্বে। পিডাব্লিউডির ঠিকাদারি ব্যবসা করেছেন। আর্থিক অসচ্ছলতা তাই ছিল না কখনো। পৈতৃক জায়গায় ২০-২২ বছর আগে করেন এই বাড়ি  ‘শিশির ভিলা’। মাদারীপুর শহরের পুরনো বাসস্ট্যান্ডের উল্টো দিকে বাগেরপাড়ের শহীদ বাদল সড়কের দোতলা ভবন। একমাত্র ছেলে থাকে অস্ট্রেলিয়ায়। মাঝেমধ্যেই বেড়াতে যান ছেলের কাছে। সব মিলিয়ে জীবনটা মন্দ কাটেনি মজিবরের।

যে জীবনের স্মৃতির সঞ্চয়ে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে খেলাটাই সবচেয়ে মূল্যবান। সবচেয়ে জ্বলজ্বলে।



মন্তব্য