kalerkantho


বিশেষ আয়োজন

ক্রুদ্ধ এক ফুটবলযোদ্ধা

৪৬তম বিজয় দিবস পালন করেছে দেশ। এই দেশ তৈরিতে রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের মতোই মাঠে যুদ্ধ করেছিলেন একদল ফুটবলার। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রাপ্য সেই মর্যাদাটা তাঁরা পেয়েছেন? আমরা এই ধারাবাহিক আয়োজনে পুনর্পাঠ করতে চেয়েছি ইতিহাসের। বিস্তারিত অনুসন্ধানে বের করার চেষ্টা হয়েছে আমাদের সামনের প্রকাশিত সত্যের পেছনে লুকানো আরো সত্য আছে কি না! দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জীবিত প্রায় সবার সঙ্গে কথা বলে তৈরি এই ধারাবাহিক আয়োজনে আজ পড়ুন সনজিৎ কুমার দের গল্প। অনুসন্ধানী এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন নোমান মোহাম্মদ

১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ক্রুদ্ধ এক ফুটবলযোদ্ধা

কলকাতা কাঁপছে সেদিন। উত্তেজনায়, রোমাঞ্চে। ফুটবলীয় দ্বৈরথে মুখোমুখি যে ইস্ট বেঙ্গল-মোহনবাগান! পুরো শহর তাই পিল পিল করে ছুটছে ময়দানের দিকে। সময়টা ১৯৭১।

সনজিৎ কুমার দে তখন শরণার্থী। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের আঁচে পালিয়ে যাওয়া কোটি মানুষের একজন। থাকা-খাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। জমাট অন্ধকার চারদিকে। তবু ফুটবলার তো, ইস্ট বেঙ্গল-মোহনবাগানের খেলার টান উপেক্ষা করেন কী করে! জনতার স্রোতে গা ভাসিয়ে তিনিও চললেন ময়দানের দিকে। সেখানে দেখা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া আরেক ফুটবলার শেখ আশরাফ আলীর সঙ্গে। তাঁর কাছেই শোনেন স্বাধীন বাংলা দল গঠনের খবর।

আর কী! কলকাতা-ডার্বি গৌণ হয়ে যায় সনজিতের কাছে। মাঠে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিন্তু তিনি তাকিয়ে আকাশের দিকে। কখন সূর্য ডুববে। কখন রাত পেরিয়ে ভোর হবে। কখন গিয়ে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সঙ্গে যোগ দেবেন তিনি।

গল্পটি সনজিতের কাছ থেকে শোনা। যদিও তাঁকে পাওয়ার কাজটি সহজ হয়নি মোটেও। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের কতজনের কাছে ফোন নম্বর চাই! কেউ দিতে পারেন না। অবশেষে মোহাম্মদ আবদুস সাত্তার দিলেন। সঙ্গে সতর্কবার্তা, ‘অভাবে অভাবে ও একটু অন্য রকম হয়ে গেছে। খারাপ ব্যবহার করলেও কিছু মনে করবেন না।’

ফোন করি বারবার। রিং বাজে ক্রমাগত। কিন্তু সনজিৎ তা ধরেন না। সপ্তাহখানেক পর ধরলেন যাও বা, কিন্তু কথাবার্তায় ভীষণ রুক্ষ, ‘কেন ফোন করেছেন?’

— স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল নিয়ে কালের কণ্ঠ একটি ধারাবাহিক আয়োজন করছে। সে কারণেই আপনাকে খুঁজছি।

: আমাকে কেন?

— আপনি তো ওই দলের গোলরক্ষক।

: তো কী হয়েছে? কারো কি তা মনে আছে?

— মনে করানোর জন্যই আপনার খোঁজ করছি। আপনি নারায়ণগঞ্জ থাকেন, তাই না? সেখানে এসে আপনার সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই।

: আমার সঙ্গে দেখা করার কিছু নেই। আর আমি নারায়ণগঞ্জ থাকি না। এখন চাঁদপুরে আছি।

— চাঁদপুরে আসি তাহলে?

: এখানে থাকব কি না, ঠিক-ঠিকানা নেই। একেক সময় একেক জায়গায় থাকি। আমাকে বাদ দিয়ে অন্যদের সঙ্গে কথা বলেন।

ফোন কেটে দেন সনজিৎ। কিছুক্ষণ পর বন্ধ। এরপর যতবার ফোন দিই, প্রথমবার রিং হওয়ার পর তা আবার বন্ধ করে দেন। বর্তমানের পরাজিত জীবনে হয়তো ’৭১-র সেই বিজয়ের গল্প আর মনে করতে চান না তিনি।

আশা যখন ছেড়ে দিয়েছি প্রায়, তখন সহায় সাইদুর রহমান প্যাটেল। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রতিষ্ঠাতা বুঝিয়ে-শুনিয়ে রাজি করান সনজিেক। তা ওই ফোনে কথা বলা পর্যন্তই; দেখা করবেন না কিছুতেই। তবু তাঁর গল্পটি তো জানা হবে!

সনজিৎ গোলরক্ষক। তখন খেলেন দ্বিতীয় বিভাগে। দেশে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হলে পালিয়ে যান অন্য অনেকের মতো। কী ভয়ংকর সে যাত্রা, ‘কুমিল্লার রামচন্দ্রপুর দিয়ে হাঁটতে হয় বহু পথ। পাকিস্তানি আর্মি রাস্তা দিয়ে যায় তো আমরা লুকিয়ে থাকি ধানক্ষেতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। গাইডের সিগন্যাল পেয়ে দৌড়ে দৌড়ে ব্রিজের তলা দিয়ে পৌঁছাই এক জায়গায়। এরপর ট্রাকে চড়ে ওপারে।’ ভারতে গিয়ে তো দিশাহারার মতো ঘোরাঘুরি। জাপ্টে ধরা অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করে। এরপর আশরাফের সঙ্গে দেখা হলে যেন প্রাণে পানি পান সনজিৎ। স্বাধীন বাংলা দলে যোগ দিলে থাকা-খাওয়ার নিশ্চয়তা যেমন রয়েছে, তেমনি দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধেও তো অবদান রাখা যাবে!

ওই দল গঠনে প্যাটেলের অবদানের কথা আজও ভোলেননি সনজিৎ, ‘স্বাধীন বাংলা দল তৈরি করেছেন প্যাটেল ভাই। শেখ সাহেবের ছেলের সঙ্গে তাঁর খাতির ছিল। নইলে ওই দল হতো না।’ সে দলে একটি ম্যাচ খেলাকে জীবনের পরম পাওয়া মানেন তিনি, ‘এটি অবশ্যই গর্ব করার মতো বিষয়। কিন্তু পরে যে জীবন কাটাচ্ছি, তাতে মনে হয়—এ জন্যই কি স্বাধীন বাংলা দলে খেলেছিলাম?’

স্বাধীনতার পর ঢাকার প্রথম বিভাগে সনজিৎ খেলেন আট বছর। ব্রাদার্স ইউনিয়ন, আজাদ স্পোর্টিং, বিজি প্রেস, ফায়ার সার্ভিসে। ফুটবলার হিসেবে ঢাকেশ্বরী মিলে চাকরিও করতেন। কিন্তু ১৯৮০ সালে ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার পর এলোমেলো হয়ে যায় সনজিতের জীবন, ‘চাকরিটা আর থাকল না। সুতার ব্যবসা শুরু করি। সেখানে লস খেয়েছি অনেক। এখন আমি বেকার। কোথায় থাকি, কী খাই—কোনো কিছুর ঠিক নাই।’ সে কারণেই কিনা গুটিয়ে রাখেন নিজেকে। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের কারো সঙ্গে যোগাযোগ নেই তেমন; কোনো অনুষ্ঠানে দেখা যায় না সেভাবে। বলতেই ফুঁসে ওঠেন সনজিৎ, ‘কী হবে প্রগ্রামে গিয়ে? আসা-যাওয়ার ভাড়াটাও তো দেয় না কেউ। পুরা লস। পিন্টু ভাই-প্রতাপদারা মাতবর; অনুষ্ঠানে গেলে তাঁদের লাভ আছে। আমাদের কী লাভ? এই যে এখন আমাকে নিয়ে আপনারা লিখছেন, তাতেও কোনো লাভ হবে না। আমি জানি।’

জীবনের অবিচারে সবার প্রতি ভীষণ রাগ সনজিতের। ভীষণ ক্ষোভ। দেখা তো করবেন না, বলে দিয়েছেন স্পষ্ট। তাঁর ছবি চাইতেও ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসে ঝাঁঝাল উত্তর, ‘ছবি-টবি নাই। আপনার সঙ্গে কথা তো হলোই; আর ফোন দিয়েন না। আমার একটাই মেয়ে, ক্লাস সেভেনে পড়ে। ও পরীক্ষায় ফেল মেরেছে বলে মন-মেজাজ খুব খারাপ।’

একাত্তরের ফুটবলযোদ্ধা নিজেও ফেল মেরেছেন জীবনের ময়দানে। কলকাতার ময়দানে শেখ আশরাফের সঙ্গে দেখা হওয়া, স্বাধীন বাংলা দলে যোগ দেওয়া, গ্লাভস হাতে একটি ম্যাচে বারপোস্ট সামলানো—এসব তাঁর কাছে তাই দূর অতীতের স্মৃতি। যে স্মৃতি সনজিৎ কুমার দেকে সান্ত্বনা দেয় না মোটেও।

বরং ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে নিজের কাছেই যেন প্রশ্নটি করেন আবার—‘এ জন্যই কি আমরা স্বাধীন বাংলা দলে খেলেছিলাম?’


মন্তব্য