kalerkantho


বিশেষ আয়োজন

না খেয়ে খেয়ে খিদেটাও কমে গেছে

৪৬তম বিজয় দিবস পালন করছে দেশ। এই দেশ তৈরিতে রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের মতোই মাঠে যুদ্ধ করেছিলেন একদল ফুটবলার। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রাপ্য সেই মর্যাদাটা তাঁরা পেয়েছেন? আমরা এই ধারাবাহিক আয়োজনে পুনর্পাঠ করতে চেয়েছি ইতিহাসের। বিস্তারিত অনুসন্ধানে বের করার চেষ্টা হয়েছে আমাদের সামনের প্রকাশিত সত্যের পেছনে লুকানো আরো সত্য আছে কি না! দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জীবিত প্রায় সবার সঙ্গে কথা বলে তৈরি এই ধারাবাহিক আয়োজনে আজ থেকে থাকছে সেই যোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার। প্রথম দিনে শুনুন দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা তসলিম উদ্দিনের গল্প। অনুসন্ধানী এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন নোমান মোহাম্মদ

১৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



না খেয়ে খেয়ে খিদেটাও কমে গেছে

এই বাড়ির বয়স ৫০ বছরের বেশি। রাতে বড় বড় গাড়ি যখন যায় রাস্তা দিয়ে, কেঁপে ওঠে তা। কিন্তু সংস্কার করানোর টাকা নেই। কোনো দিন হয়তো রাতে ঘুমাতে গিয়ে আর ঘুম ভাঙবে না। বাড়ি ভেঙে চাপা পড়ে মরে থাকব।

দূর থেকেই দেখা যায় তাঁকে। রেললাইনের ওপারে দাঁড়িয়ে আছেন ক্লান্ত ভঙ্গিতে। হেমন্তের বিকেলের সোনাঝরা রোদ তেরচা হয়ে পড়ছে তাঁর ওপর। মুখের রেখায় তবু বিবর্ণতার আঁকিবুঁকি। সত্তর পেরোনো শরীরে জড়িয়ে রাখা ব্লেজারের বুকপকেটের লোগোটাই যা একটু ঘোষণা করে তাঁর অস্তিত্বের; তাঁর একদার বীরত্বের। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ওই পরিচয়টুকুনই যে সম্বল এখন মোহাম্মদ শেখ তসলিম উদ্দিনের!

ঢাকা থেকে বাসে করে নাটোরের বনপাড়া। তেরাস্তার মোড় থেকে রিকশায় বাজারের বাঁকে। সেখান থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় ঘণ্টাখানেক মুড়িভর্তা হয়ে গোপালপুর। এটাই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ফরোয়ার্ড তসলিমের ঠিকানা। রেললাইনের এপারে নেমে ওপারে দেখা মেলে তাঁর। দুই শ কদম হাঁটলেই বসতি; কিন্তু ওই পথচলাতেই কী ক্লান্তি! ‘পাইলসের কারণে খুব যন্ত্রণা পাচ্ছি। অপারেশন করাতে বলছেন ডাক্তার, তবে সাহস পাচ্ছি না। ৭২ বছরের শরীরটা এই ধকল কি সামলাতে পারবে?’—অনিশ্চয়তার হাহাকার তাঁর কণ্ঠে।

এই অনিশ্চয়তা তসলিমের প্রাত্যহিকতাতেও। সে আর্তনাদ তাঁর কণ্ঠে ঝরে ঠিকই; তবে তা পরে। আগে স্বাধীন বাংলা দলে অংশ নেওয়ার গর্বের ঝিলিক, ‘জলঙ্গি সীমান্তে পৌঁছে অপেক্ষায় ছিলাম সাত নম্বর সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য। ওখানেই একদিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের খবরে শুনি স্বাধীন বাংলা দল গঠনের খবর। ভারতের ওই সীমান্ত এলাকার বিডি মেম্বার আমাকে পাঁচ শ টাকা দেন আর তা নিয়ে কলকাতায় গিয়ে যোগ দিই দলে।’ ২৫ জুলাই থেকে শুরু বাংলার ফুটবলযোদ্ধাদের এক অগ্রসৈনিক তসলিম। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ১৬টি ম্যাচ মিলিয়ে যাঁর গোলসংখ্যা কাজী সালাউদ্দিনের ঠিক পরই। এর মধ্যে এখনো আলাদা করে মনে করতে পারেন একটি গোল, ‘‘খেলা হচ্ছিল প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে। আমি ছিলাম না প্রথম একাদশে। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার একটু আগে নামি নওশেরের জায়গায়। নেমেই হেডে এক গোল করি। তবে দ্বিতীয় গোলটি স্মরণীয়। প্রতাপদার ক্রসে জোড়া পায়ে লাফিয়ে উঠে করি ভলি। গুলির মতো বল চলে যায় জালে। এই গোলটি নিয়ে ৭টার স্থানীয় খবরে রেডিওতে শুনি চুনী গোস্বামী বলছেন, ‘আমি বহু রকম গোল দেখেছি জীবনে। কিন্তু আজ স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের লেফট আউট তসলিমের দ্বিতীয় যে গোল দেখলাম, এমনটা বিশ্বকাপেও দেখিনি।’ শুনে কতটা গর্ব হচ্ছিল, বুঝতেই পারেন!’’

ওই গর্ব এখন সোনালি অতীতের সম্বল শুধু। ধূসর বর্তমানে প্রাত্যহিকতার অনটনটাই যে হয়ে উঠেছে প্রবল! সেন্ট্রাল স্টেশনারি প্রেস ক্লাবে শুরুর পর দাপটের সঙ্গে তসলিম ঢাকায় খেলেছেন ওয়ান্ডারার্স, ফায়ার সার্ভিস, দিলকুশার মতো ক্লাবে। যুদ্ধ শেষে ব্যস্ত হয়ে গেছেন সংসার সামলানোয়। কিন্তু জীবন সেখানে তাঁর প্রতি সুবিচার করেনি। সুগার মিলের ফ্রি সেলের চিনি বাজারে বিক্রি করে কিংবা কন্ট্রাক্টরের সঙ্গে থেকে সহায়তা করলে ক’টাকাই বা জোটে! বাড়িতে স্ত্রীর পালা দুটি গাভির দুধ বিক্রি করা তাই হয়ে ওঠে বড় অবলম্বন। পরে ১৯৯৫ সালের দিকে বিকেএসপিতে কোচ হিসেবে ঢোকার পর অভাব ঘুচেছে কিছুটা। বছর সাতেক আগে অবসর নেন সেখান থেকেও। এখন মুক্তিযোদ্ধা ভাতা হিসেবে পাওয়া ১০ হাজার টাকাই অবলম্বন তসলিমের।

কিন্তু তাতে সংসারের চাকা কি আর ঘোরে! ছেলে-মেয়েরাও দেখাশোনা করে না সেভাবে। অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার পেছনে এন্তার খরচ। ‘একরকম চেয়েচিন্তেই জীবন কাটাতে হয়। দুবেলা ঠিকঠাক ভাতও জোটে না অনেক দিন। তরকারি বলতে ডাল-শাক, করল্লা ভাজি। সপ্তাহে এক দিন হয়তো মাছ কিনতে পারি; তাও তেলাপিয়া মাছ। কারণ এর দামই সবচেয়ে কম। আর কোরবানির ঈদ ছাড়া সারা বছর মাংস খাবার কথা চিন্তাও করতে পারি না। অবশ্য দিন তো চলে যাচ্ছে। না খেয়ে খেয়ে খিদেটাও এখন কমে গেছে’—বলতে বলতে ঝাপসা হয়ে আসে তসলিমের চোখজোড়া। পলেস্তারা খসা দেয়ালের ঘর দেখিয়ে আবার বলেন তিনি, ‘এই বাড়ির বয়স ৫০ বছরের বেশি। রাতে বড় বড় গাড়ি যখন যায় রাস্তা দিয়ে, কেঁপে ওঠে তা। কিন্তু সংস্কার করানোর টাকা নেই। কোনো দিন হয়তো রাতে ঘুমাতে গিয়ে আর ঘুম ভাঙবে না। বাড়ি ভেঙে চাপা পড়ে মরে থাকব।’

মহাকাল থমকে দাঁড়ায় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের এই বীরের কথা শুনে। স্তব্ধতার ফিসফিসানি ওড়ে ঘরে-বারান্দায়; যেখানে কোথাও নীলের ছোপ, কোথাও গোলাপি অথবা হলুদ। হয়তো কিছু টাকা এসেছে, রং করিয়ে ফেলেছেন একেক সময়। সে সময়টাও দূর অতীতে। ওপরে দাঁত বের করে আছে খসে পড়া পলেস্তারা। ‘তবু তো প্যাটেল ভাই, তান্না ভাইরা খুব সাহায্য করেন। সালাউদ্দিনও মেয়ের বিয়ের সময় কিছু টাকা দিয়েছেন। এসব নিয়েই টিকে আছি’—একটু যেন স্বস্তি তসলিমের গলায়। কিন্তু পরক্ষণেই সেখানে ভয়ের তিরতিরে কাঁপন, ‘আমার বাড়িটার অবস্থা তো দেখলেনই। এখন সরকার যদি তা একটু ঠিকঠাক করে দেয়, তাহলে শেষ কটা দিন নির্ভয়ে থাকতে পারি। না খেতে খেতে ক্ষুধা কমে গেছে বলে সে কষ্ট না হয় সহ্য করা যায়। কিন্তু প্রতিরাতে মৃত্যুভয় নিয়ে ঘুমাতে যাওয়া খুব ভয়ের।’

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের এক বীরের এই অবস্থায় তোমার গায়ে কি কাঁটা দেয় না বাংলাদেশ?



মন্তব্য