kalerkantho


সফল আসর কিন্তু ভবিষ্যৎ চিন্তার জোগান নেই

১৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



সফল আসর কিন্তু ভবিষ্যৎ চিন্তার জোগান নেই

ক্রীড়া প্রতিবেদক : ঘরোয়া ক্রিকেটে দীর্ঘদিনের চেনা মুখও বিপিএলের পারফরম্যান্স দিয়ে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে ‘নতুন মুখ’ বনে যান। এর আগের আসরে যেমন চ্যাম্পিয়ন ঢাকা ডায়নামাইটসের হয়ে ব্যাট হাতে ঝড় তুলে নতুন প্রতিভা হিসেবে চিহ্নিত হতে বসেছিলেন মেহেদি মারুফ! সদ্য সমাপ্ত আসরে দুর্দান্ত নৈপুণ্যে খুলনা টাইটানসের আরিফুল হকও মানুষের মুখে মুখে ফেরা নাম। অথচ এঁদের দুজনই অনেক দিন থেকে ঘরোয়া ক্রিকেটের পরীক্ষিত পারফরমার।

সরাসরি সম্প্রচারের সুবাদে সাধারণ্যে পরিচিত হওয়ার দৌড়ে এই পোড় খাওয়া ক্রিকেটারদের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড়িয়েই শুরু করেন একেবারে তরুণ খেলোয়াড়রাও। প্রচারের আলো নিজের দিকে টেনে নেওয়ার লড়াইটাও তাঁদের শুরু হয় একই সমান্তরাল থেকে। সেখান থেকেই ক্রিকেট ক্যারিয়ারের মাঝ বয়স পেরিয়ে আসা মারুফ-আরিফুলরা নিজেদের নতুন করে চেনান যখন, তখন কলি থেকে পাপড়ি মেলা ফুল হওয়ার অপেক্ষায় থাকা কোনো তরুণের তাক লাগানো পারফরম্যান্সের দিকেও নজর থাকে সবার। আর প্রতিবার বিপিএল শুরুর সময় টুর্নামেন্টের লক্ষ্য কিংবা উদ্দেশ্য নিয়ে বলতে গিয়ে কর্তারাও নতুনের সম্ভাব্য আবাহনের স্বপ্নও দেখিয়ে থাকেন।

সেই স্বপ্ন আর বাস্তবতার মেলবন্ধন সদ্য সমাপ্ত বিপিএলে হলো কতটা? এই প্রশ্ন রেখে পাওয়া বিশেষজ্ঞদের উত্তরে অন্তত এবার উৎসাহিত হওয়ার মতো কিছু নেই। বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক ও প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ নিজেও উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত ছিলেন একটি ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে। সিলেট সিক্সার্সের এ উপদেষ্টা তাই আরো গভীর মনোযোগে দেখতে পেরেছেন এবারের বিপিএল। আর খুলনা টাইটানসের উপদেষ্টা হাবিবুল বাশার তো বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচক।

নিজেদের দেখা থেকে তাঁরা দুজনই পৌঁছেছেন একটি উপসংহারে। যা খুব আলাদা কিছুও নয়। ফারুকের ভাষ্য, ‘বেশ কিছু তরুণ খেলোয়াড়কে এবার দেখা গেছে। যদিও খুব আশাব্যঞ্জক কোনো পারফরম্যান্স করেনি।’ হাবিবুলও দেখেননি তাঁর হৃদয়ে ঠাঁই করে নেওয়ার মতো কোনো পারফরম্যান্স, ‘তরুণ খেলোয়াড় বের হয়ে আসার দিক বিবেচনা করলে এবারের বিপিএল দেখে আমি হতাশই হয়েছি। আমার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি কেউই।’

যদিও জমজমাট প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সদ্য সমাপ্ত আসরটি হাবিবুলের প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে পুরোপুরিই, ‘টুর্নামেন্ট হিসেবে এবারের বিপিএল খুব ভালো হয়েছে। প্রচুর দুর্দান্ত পারফরম্যান্স আমরা দেখেছি। দেখেছি হাড্ডাহাড্ডি লড়াইও।’ ক্রিস গেইলের মতো ব্যাটসম্যান একা হাতে রংপুর রাইডার্সের শিরোপা-ভাগ্য নির্ধারণ করে দেওয়ার পথে এমন কিছু ইনিংস খেলেছেন, টি-টোয়েন্টির দর্শকরা এগুলোরই পূজারি। এর বাইরেও প্রতিটি দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি আয়োজনের পেছনে কিছু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে।

এবারের বিপিএল শেষে সেগুলোর হিসাব মেলাতে বসে অবশ্য সব দিক থেকে সন্তুষ্ট হওয়ার উপায় নেই তেমন। ফারুকের ভাষায়, ‘সব মিলিয়েই বিপিএলটা দেখতে হবে। খেলোয়াড় বের করে আনার ব্যাপার আছে। আবার বিনোদনের ব্যাপারও আছে। খেলা জনপ্রিয় করার ব্যাপারও আছে। তবে এর মধ্যেও অন্যতম কারণ হলো খেলোয়াড় বের করা।’ ফারুকের কথার শেষ বাক্যটিই বেশি তাত্পর্যপূর্ণ। সেই উদ্দেশ্য কতখানি সাধিত হলো? ‘সব দিক বিবেচনা করলে আমার দৃষ্টিতে এবার সুযোগ একটু কম ছিল। কারণ প্রায় প্রতিটি দলই পাঁচজন করে বিদেশি খেলিয়েছে।’

হাবিবুল অবশ্য এই পাঁচ বিদেশি খেলানোর নিয়মকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানোর বিপক্ষে। তাঁর মতে, ‘সুযোগ পেয়েও তা কাজে লাগাতে না পারা খেলোয়াড়ের সংখ্যাও কম নয়। সুযোগ যে পায়নি তা নয়। সুযোগ অনেকেই পেয়েছে, কিন্তু দুহাত ভরে নিতে পারেনি কেউই। পাঁচজন বিদেশি খেলানোর নিয়মকে কেউ কেউ অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাতে পারে। আমি সেটা মানতে রাজি নই। সব দলই কমবেশি কিন্তু সুযোগ দিয়েছে তরুণদের।’ সেই সঙ্গে এই সাবেক অধিনায়ক আরো যোগ করলেন, ‘গত আসরটি বরং ভালো ছিল। গত বছর তাও কয়েকজন নজর কেড়েছিল। এ বছরটায় তরুণরা হতাশ করেছে। হ্যাঁ, দু-একজনকে চোখে পড়েছে। কিন্তু আরো ভালো আশা করেছিলাম।’ 

উদাহরণ হিসেবে এলেন নিউজিল্যান্ডে বিশ্বকাপগামী বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সহ-অধিনায়ক আফিফ হোসেনও। বিপিএলের গত আসরে তাঁর অভিষেক। রাজশাহী কিংসের হয়ে চিটাগং ভাইকিংসের বিপক্ষে অভিষেকেই করেছিলেন বাজিমাত। এই অফ স্পিনারের পাঁচ শিকারের একটি ছিলেন ক্রিস গেইলও। আফিফ ছিলেন এই আসরেও, তবে গতবারের মতো উজ্জ্বলতা নিয়ে নয়। তাঁর মতো এবার সুযোগ পেয়েছেন যাঁরা, তাঁরাও পারেননি তাক লাগানো পারফরম্যান্স দিয়ে নজর কাড়তে।

তাই এবার তরুণদের নিয়ে বিশেষজ্ঞদের ভবিষ্যৎ ভাবনার চৌহদ্দিও খুব সীমিত হয়ে গেছে। ফারুকই বলছিলেন, ‘তরুণ যারা এবার সুযোগ পেয়েছে, ওরা নিশ্চয়ই শীর্ষ খেলোয়াড়দের সঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতা থেকে শিখবে অনেক কিছু। এক্সপোজারও পেয়েছে ওরা। তবে খুব নজরকাড়া কেউ ছিল না। তার পরও কয়েকজন যারা ছিল, ওরা ঘরোয়া ৫০ ওভারের টুর্নামেন্ট খেললে ভালো করতে পারে।’

টুর্নামেন্ট দারুণ সফল হলেও বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ চিন্তার জোগান এই আসর দিতে পেরেছে সামান্যই!



মন্তব্য