kalerkantho


বিশেষ আয়োজন

স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারই পায়নি স্বাধীন বাংলা দল!

১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারই পায়নি স্বাধীন বাংলা দল!

৪৬তম বিজয় দিবস পালন করছে দেশ। এই দেশ তৈরিতে রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের মতোই মাঠে যুদ্ধ করেছিলেন একদল ফুটবলার। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রাপ্য সেই মর্যাদাটা তাঁরা পেয়েছেন? আমরা এই ধারাবাহিক আয়োজনে পুনর্পাঠ করতে চেয়েছি ইতিহাসের। বিস্তারিত অনুসন্ধানে বের করার চেষ্টা হয়েছে আমাদের সামনের প্রকাশিত সত্যের পেছনে লুকানো আরো সত্য আছে কি না! দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জীবিত প্রায় সবার সঙ্গে কথা বলে তৈরি এই ধারাবাহিক আয়োজনের আজ তৃতীয় পর্ব। অনুসন্ধানী এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন নোমান মোহাম্মদ

 

‘সক্রেটিস এ দেশে জন্ম নিলে তাঁকে কোনো একাডেমির মহাপরিচালক পদের জন্য তদবির চালাতে হতো’—সেই কত কাল আগে লিখে গেছেন হুমায়ুন আজাদ! ঘুণে ধরা সমাজে সময়ের চাকা ঘুরছে যত, তাঁর সেই কথা সত্য হয়ে উঠছে আরো বেশি। তাইতো বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ‘স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার’ পায় না স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল; ওই তদবিরের অভাবে। আর সেটি করতে পারতেন যিনি, সেই অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু নিজেই যে এককভাবে বগলদাবা করেন পুরস্কারটি!

এটি নিয়ে তাঁর স্বাধীন বাংলা দলের সতীর্থদের ক্ষোভটা তাই অনুমেয়।

এমনিতে ফুটবলার হিসেবে পিন্টু ছিলেন বেশ উঁচুমানের। শুধু খেলোয়াড়ি দক্ষতাতেই স্বাধীনতা পুরস্কার হয়তো পেতে পারেন। কিন্তু ফুটবলারদের মধ্যে কেবল তিনি ও কাজী সালাউদ্দিন যখন এ পুরস্কার পান, তখন প্রশ্নটা ভিন্ন রকম। বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা দুই ফুটবলারের একজন তো পিন্টু নন, তাঁর স্বাধীনতা পুরস্কার প্রাপ্তিতে তাই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়কত্বের বড় ভূমিকা রয়েছে নিশ্চিতভাবে। তাহলে কি তিনি পুরো দলের জন্যই ওই পুরস্কারের ‘দাবি’ করতে পারতেন না? উত্তরে ইন্দিরা রোডে নিজের ফ্ল্যাটে বসে চমকে দেওয়া কথাই বলেন পিন্টু, ‘আমি যদি সেদিন পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করে বলতাম স্বাধীন বাংলা দলকে তা দিতে হবে— তাহলে আজ এখানে সাক্ষাৎকার নাও দিতে পারতাম। আমাকে হয়তো মেরে ফেলা হতো।’ সত্যিটা কি সত্যিই অমন? ১৯৯৫ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার পান পিন্টু। দেশে তখন বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার। ওই দলটির শাসনামলে রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি ছিলেন তিনি। হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক, সহসভাপতি পর্যন্ত। ১৯৯৬ সালে ‘জনতার মঞ্চ’ তৈরির সময়ও সরকারকে সমর্থন করে পিন্টু বিবৃতি দিয়েছেন পর্যন্ত। সেই তিনি ১৯৯৫ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার নিয়েছেন ‘বাধ্য’ হয়ে, ‘মৃত্যু’র ভয়ে—এটি বিশ্বাসযোগ্য নয় কিছুতেই।

তবে অধিনায়ক পিন্টু এটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অবশ্যই স্বাধীনতা পদক পাওয়া উচিত। যেমনটা দাবি দলের বাকিদেরও। কিন্তু তা দেওয়া হয়নি এখনো। ২০১৩ সালের নভেম্বরে স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য বাফুফের কাছে মনোনয়ন চায় সরকার। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে স্বাধীন বাংলা দলের নাম দিয়েছিল তারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরস্কার জোটেনি। ওই দলটির অধিনায়ক পিন্টু ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের বলেই কি স্বাধীনতার এই সূর্যসন্তানদের সম্মান জানাতে এত অনীহা সরকারের? নইলে ক্ষমতায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার থাকার পরও স্বীকৃতি আসছে না কেন?

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্যদের প্রশ্নটা এখানেই। আর অধিনায়ককে তখন কাঠগড়ায় দাঁড় করান বুকে ক্ষোভের আগ্নেয়গিরি নিয়ে।

স্বাধীন বাংলা দলের ডিফেন্ডার শেখ আশরাফ আলীর কণ্ঠে তাই মিশে থাকে ঝাঁজ, ‘অধিনায়ক হয়ে পিন্টু ভাই একা কিভাবে পুরস্কার নেন? উনি স্বার্থপর বলে তা নয় নিলেন! তাই বলে পুরো দলকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেবে না? পিন্টু ভাই, প্রতাপদা বিএনপি করে বলে আমরা কেন বঞ্চিত হব?’ একই প্রশ্ন আমিনুল ইসলাম সুরুজের, ‘পিন্টু ভাই-প্রতাপদারা বিএনপি সমর্থন করার মানে তো এই নয় যে, স্বাধীন বাংলা দলের সবাই তাই। কিন্তু আমাদের ওপর কিভাবে কিভাবে যেন ওই দাগ লেগে গেছে। ওই দুই-চারজনের জন্য বাকি ৩০-৩২ জনকে বঞ্চিত করবে কেন? বিশেষত রাষ্ট্রক্ষমতায় যখন স্বাধীনতার পক্ষের সরকার!’ শেখ তসলিম উদ্দিনের কথায়ও অভিমানের সুর, ‘বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে আমরা সর্বোচ্চ পুরস্কার অবশ্যই পেয়ে যেতাম। কিন্তু এখন ক্ষমতায় তো তাঁরই মেয়ে। কে উনার কান ভাঙানি দিয়েছেন, জানি না। শুনতে পাই অনেকে বলেন, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল বিএনপির। আরে, পিন্টু ভাইয়ের জন্য আমাদের সবাইকে ওই দলের বলে ফেলা কি ঠিক?’

স্বাধীন বাংলা দলের প্রতিষ্ঠাতা সাইদুর রহমান প্যাটেল জোর দাবি জানান স্বীকৃতির, ‘অবশ্যই রাষ্ট্রের উচিত আমাদের স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে যে ভূমিকা রেখেছি, তাতে এটি আমাদের প্রাপ্য।’ ফরোয়ার্ড এ কে এম নওশেরুজ্জামানেরও জোরালো কণ্ঠ, ‘‘আমরা পদকের জন্য খেলিনি। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোন দল সে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সম্পৃক্ত ছিল, বলুন তো? তবু আমরা এখনো স্বাধীনতা পুরস্কার পেলাম না—কী আশ্চর্য ব্যাপার! রাষ্ট্র তো আমাদের ‘বীর খেলোয়াড়’ হিসেবেও একটি পুরস্কার দিয়ে স্বীকৃতি জানাতে পারে!’’ লুৎফর রহমান অপেক্ষায় আছেন অমন দিনের, ‘আশায় আছি, সরকার আমাদের স্বীকৃতি দেবে। সবার প্রাপ্যের কথা পিন্টু ভাই বলেননি। কিন্তু কেউ না কেউ তো বলবেই। এই যেমন এখন আপনারা লিখছেন। দেখা যাক, সামনে কী হয়!’ একই আশায় বুক বাঁধেন মোহাম্মদ কায়কোবাদ, আবদুল হাকিম, বীরেন দাস বীরুরা। সুদূর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী স্বাধীন বাংলা দলের প্রথম ম্যাচের প্রথম গোলদাতা  শাহজাহান আলমও তাই, ‘আমি দূরে পড়ে আছি। তবু দেশ যদি স্বাধীনতা পদক দিয়ে আমাদের সম্মান জানায়, খুব ভালো লাগবে।’

আবার ফজলে সাদাইন মৃধার মতো স্বাধীন বাংলা ফুটবলদলের কারো কারো কণ্ঠে খেলে যায় বিষণ্নতার ঢেউ, ‘সরকার যদি মনে করে, আমাদের পুরস্কার দেবে—তাহলে দেবে। না দিলে তো কিছু করার নেই।’

ওই ‘কিছু করার নেই’ বলেই আটকে থাকে স্বাধীন বাংলা দলের স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্তি। বাফুফে থেকে তাদের মনোনয়ন করে পাঠানো হলেও তদবিরের অভাবে শেষ পর্যন্ত কাটা পড়ে তাঁদের নাম। অথচ সেই ১৯৮০ সালেই এই পুরস্কার পেয়ে যান ছারছীনার পীর রাজাকার মাওলানা আবু জাফর সালেহ। স্বাধীনতার মাত্র ৯ বছরের মধ্যে কুখ্যাত ওই রাজাকার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পুরস্কার পান, কিন্তু ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও ওই পুরস্কারের যোগ্য মনে হয় না স্বাধীন বাংলা ফুটবলদলকে। এ লজ্জায় দায় এড়াবে কে!

 

১৬ লাখ নাকি ৫ লাখ



মন্তব্য