kalerkantho


বিশেষ আয়োজন

বিজয়ী বীরদের পরাজিত জীবন

৪৬তম বিজয় দিবস পালন করছে দেশ। এই দেশ তৈরিতে রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের মতোই মাঠে যুদ্ধ করেছিলেন একদল ফুটবলার। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রাপ্য সেই মর্যাদাটা তাঁরা পেয়েছেন? আমরা এই ধারাবাহিক আয়োজনে পুনর্পাঠ করতে চেয়েছি ইতিহাসের। বিস্তারিত অনুসন্ধানে বের করার চেষ্টা হয়েছে আমাদের সামনের প্রকাশিত সত্যের পেছনে লুকানো আরো সত্য আছে কি না! দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জীবিত প্রায় সবার সঙ্গে কথা বলে তৈরি এই ধারাবাহিক আয়োজনের আজ দ্বিতীয় পর্ব। অনুসন্ধানী এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন নোমান মোহাম্মদ

১৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বিজয়ী বীরদের পরাজিত জীবন

বসুন্ধরা গ্রুপে নিতান্তই সাধারণ এক চাকরি তাঁর—সিকিউরিটি অফিসারের। কিছু নিরাপত্তাকর্মীকে পরিচালনার সেই চাকরি নিয়েই ছিলেন সন্তুষ্ট। কর্তৃপক্ষকে শুধু একবার বলেছিলেন, ‘আমাকে ঢাকায় ডিউটি দিয়েন না। তাহলে হয়তো বসুন্ধরা সিটিতে দাঁড়াতে হবে। ওখানে প্রতিদিন হাজার হাজার লোক আসে। কেউ কেউ চিনে ফেলতে পারে আমাকে। সেটি লজ্জার ব্যাপার হবে না!’

লজ্জার ব্যাপার তো বটেই। ওই লোকটির নাম যে শেখ মোহাম্মদ আইনুল হক! ঢাকা মোহামেডানের এককালের দাপুটে ফুটবলার, তার চেয়েও বড় পরিচয় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অংশ। জাকারিয়া পিন্টুর অনুপস্থিতিতে তিনটি ম্যাচে অধিনায়কত্ব করেন যিনি। মাঠের খেলার সফল এই মানুষটি জীবন-খেলার হিসাব মেলাতে পারেন না পরবর্তী সময়ে। তাই তো পেট চালানোর জন্য নিতে হয় অমন সাধারণ চাকরি। ক্যান্সারের কাছে হেরে গত সেপ্টেম্বরে জীবন-নদীর ওপারে চলে গেছেন আইনুল। কিন্তু এ বছরের শুরুর দিকে তাঁর জিগাতলার বাসায় নেওয়া সাক্ষাৎকারের সেই শব্দগুলো এখনো ঘাই মারে হৃদয়ে। একদার ফুটবল-বীরের লজ্জা এড়ানোর সেই চেষ্টা পুরো বাংলাদেশের জন্যই কী লজ্জাজনক!

আইনুল চলে গেছেন। ধুঁকে ধুঁকে টিকে আছেন তাঁর অনেক সহচর! স্বাধীন বাংলা দলের সতীর্থদের কারো কারো নিশ্চয়তা নেই তিন বেলা খাবারের। অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে পারেন না কেউ কেউ। ভুল চিকিৎসায় কারো আশঙ্কা জাগে পচন ধরা পা কেটে ফেলার। কেউ বা ঘুমাতে যান দেয়ালচাপায় মৃত্যুর ভয় নিয়ে। ১৯৭১ সালের সেই অবাক সময়ে বল পায়ে অলৌকিক কীর্তিগাথা লেখা নায়কদের অনেকেই এখন জীবনযুদ্ধে পরাজিত সৈনিক।

শেখ তসলিম উদ্দিন যেমন। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে কাজী সালাউদ্দিনের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোল তাঁর। অথচ জীবনের মাঠে বারপোস্ট খুঁজে পান না কিছুতেই। নাটোরে গিয়ে তাই দেখা মেলে খোঁড়াতে থাকা এক প্রৌঢ়ের; যাঁর এককালের যোদ্ধা-স্পর্ধার জায়গা নিয়েছে অসহায়ত্ব, ‘দুবেলা ঠিকমতো ভাত খাবার অবস্থাও নেই। ঘরে চাল থাকলে শাক-ডাল দিয়েই চলে যায়। সপ্তাহে এক দিন হয়তো তেলাপিয়া মাছ কিনতে পারি, তা কমদামি বলে। আর মাংস তো কোরবানির ঈদের সময় ছাড়া খাওয়ার চিন্তাও করতে পারি না।’ মূল সড়কের ঠিক পাশেই তাঁর বহু পুরনো বাড়ি। তসলিমের মতোই যে বাড়িরও দমও বুঝি ফুরিয়ে আসার উপক্রম। ‘বাড়ির এখন এমন অবস্থা, যেকোনো সময় ধসে যাবে। হয়তো রাতে ঘুমিয়ে থাকব, সকালে আর ঘুম থেকে উঠতে পারব না। চাপা পড়ে থাকব। তবু কী করা! জান হাতে নিয়ে প্রতিরাতে ঘুমাতে যাই। সংস্কার করার টাকা তো নেই’—ভেজা কণ্ঠে বলে যান তসলিম। মুক্তিযোদ্ধা ভাতার বাইরে আর কোনো অবলম্বন নেই যাঁর।

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের স্টপার আবদুল খালেক থাকেন সাতক্ষীরায়। খেলা ছাড়ার পর সংসার চালাতে অনেক কিছু করেছেন তিনি। সাফল্য পাননি। ‘ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে মাছের ব্যবসা করে ধরা খাই। ব্যাংকের টাকা শোধ করতে পারি না বলে তো তিন দিন জেলে পর্যন্ত থাকতে হয়েছে আমাকে’—মাটির উঠানে দাঁড়িয়ে চিকচিকে চোখে বলে যান তিনি। সেই চোখের আবার এক জ্বালা। ছানি পড়েছিল, অপারেশন করাতে হয়েছে। ‘এক বছর তো টাকার অভাবে চিকিৎসা করাইনি। তখন ডান চোখে কিছুই দেখতাম না। ধার-দেনায় ১৭-১৮ হাজার টাকা খরচে অপারেশন করার পর অবস্থা কিছুটা ভালো’—বলছিলেন সপ্তাহ দুয়েক আগে। কিন্তু দিন দুয়েক আগে তো ফোনের ওপার থেকে হাউমাউ কান্নায় বলেন ভিন্ন কথা, ‘চোখের অপারেশনের প্রতিক্রিয়াতেই কিনা ইনফেকশন থেকে আমার ডান পায়ে পচন ধরেছে। গ্যাংগ্রিন হয়ে গেছে। ডাক্তাররা বলছে পা কেটে ফেলতে হবে। দেখি, এখন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করিয়ে লাভ হয় কি না।’ সেই ‘লাভের’ আশা যে খুব করছেন না, খালেকের দীর্ঘশ্বাসে বোঝা যায় তা।

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের গোলরক্ষক মোজাম্মেল হক। কোনো ম্যাচ খেলেননি, তবে ওই দলটির অংশ তো! জীবন তাঁর প্রতিও করেনি সুবিচার। ডালডা-সয়াবিনের ব্যবসায় মার খেয়েছেন। জমি কেনা-বেচার দালালিতেও ক্ষতি বিস্তর। আশায় ছিলেন, ছেলে-মেয়েরা বড় হলে দুঃখ ঘুচবে। ‘কিন্তু ২০১১ সালে এক ছেলে হেপাটাইটিস বি অসুখে পড়ে মরে গেল। অন্য ছেলেটাও বেকার। দুই মেয়ে বড় হয়ে গেছে; কিন্তু অর্থাভাবে বিয়ে দিতে পারছি না’—বাড্ডায় রাস্তার পাশের বড় বড় গাড়ির বিকট হর্নে মিলিয়ে যায় মোজাম্মেলের কথা। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে পাওয়া তিন হাজার টাকা ভাতা এবং এলাকার মুসলিম হাই স্কুলের শিশু-কিশোরদের ফুটবল কোচিং করিয়ে পাওয়া পাঁচ হাজার টাকায় কিভাবে সংসার চালাবেন, সে চিন্তার স্রোতে বরং বোধকরি হারিয়ে যান তিনি।

খুলনার বায়েতিপাড়ায় রংচটা, পলেস্তারা খসা বাড়িটিতে ৩৪ বছর ধরে ভাড়া আছেন বীরেন দাস বীরু। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের আরেক গোলরক্ষক। ওই বাড়ির ভাড়া সাড়ে চার হাজার; গ্যাস-ইলেকট্রিসিটি বিলে আরো হাজারখানেক। অথচ তাঁর সাকুল্যে মাসিক উপার্জন কত জানেন? প্লাটিনাম জুট মিলের অবসর ভাতা হিসেবে ছয় হাজার টাকা। তিন মাস পর পর ১৮ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। ‘আশা একটাই, ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেছে। মেয়ে খুলনা বিএল কলেজ থেকে মাস্টার্স করছে ম্যাথে। ওরা চাকরি-বাকরি পেলে যদি ভগবান মুখ তোলেন’—দেয়ালে ঝোলানো দেবতা শিবের ছবির দিকে তাকিয়ে ঝাপসা হয়ে আসে বীরুর চোখজোড়া।

লুৎফর রহমান অমন অবলম্বনও খুঁজে পান না। মেয়েটি এমএ পাস করার পর হঠাৎই হয়ে গেছে মানসিক রোগী। গার্মেন্টের ব্যবসা করা ছেলেকেও কাবু করেছে ডায়াবেটিস। যশোরের বারন্দিপাড়ায় বসতি গড়া স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের এই খেলোয়াড়ের যে ফার্মেসি ছিল, তা-ও গুটিয়ে ফেলেছেন ১০-১২ বছর আগে। নিজের ভাই-বোনদের সঙ্গে সম্পর্কটা কোনো রকমে টিকে থাকলেও হৃদ্যতা নেই। সংসার চালানোর জন্য তাকিয়ে থাকেন তাই শ্বশুরবাড়ির দিকে, ‘আমাদের বাঁচিয়ে রাখার মূলে আমার স্ত্রীর ছোটবোন ও তাঁর স্বামী। ওরা ঢাকায় থাকে। চোখ বন্ধ করে সব সময় সাহায্য করেছে। এখনো নিয়ম করে প্রতি মাসে টাকা পাঠায়। সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে শ্বশুরের দিক দিয়ে কিছু জমিজমা পেয়েছে আমার স্ত্রী। ওখান থেকে ধানটান পাই।’ এসব মিলিয়েই টেনেটুনে সংসারের চাকা ঘোরানো।

১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে খেলার সময় কি স্বাধীন দেশে এমন করুণ নিয়তির কথা ভাবতে পেরেছিলেন তাঁরা?

 

বিভাজনের কারণেই বিস্মৃত

২১ ফেব্রুয়ারির মতো...


মন্তব্য