kalerkantho


মেয়েদের খেলায় আনতে পুরো দেশ ঘুরেছি

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মেয়েদের খেলায় আনতে পুরো দেশ ঘুরেছি

ছবি : কালের কণ্ঠ

ষাটের দশকে মেয়েদের ঘরের বাইরে বের হওয়া বারণ ছিল একপ্রকার।  সেই সময়ে ভলিবল, কাবাডি আর হ্যান্ডবলের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়েছিলেন হোসনে আরা খান। খুলনায় নিজেদের বাড়িতে মাঠ বানিয়ে অনুশীলন করাতেন মেয়েদের। মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের হুমকিতে দল নিয়ে খেলেছেন পুলিশি পাহারায়। দমে না গিয়ে নিজের তিন মেয়েকে খেলিয়েছেন ভলিবল আর হ্যান্ডবল, তাঁরা একসঙ্গে খেলেছিলেন জাতীয় দলেও। অধিনায়ক হয়ে তিনি টানা তিনবার মেয়েদের কাবাডিতে চ্যাম্পিয়ন করিয়েছেন খুলনাকে। দেশের মেয়েদের ক্রীড়াঙ্গনে আগ্রহী করতে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের হয়ে চষে বেড়িয়েছেন পুরো বাংলাদেশ। পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কারও। তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় রাহেনুর ইসলাম তুলে এনেছেন ষাট থেকে আশির দশকে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে মেয়েদের সংগ্রামের একটি খণ্ডচিত্র।

 

প্রশ্ন : শুনেছি আপনি নাকি শাড়ি পরে কাবাডি খেলতেন! এটা দিয়েই শুরু করা যাক।

হোসনে আরা খান : ঠিকই শুনেছেন (হাসি)। আমি উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছি ১৯৬৪ সালে, সে সময়ের প্রেক্ষাপটটা বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই। আমাদের সময়ে খেলা বলতে ছিল ফুটবল। পত্রিকাগুলোয় খেলার খবর ছাপা হতো সামান্য। সেটাও ফুটবলের দখলে। তার পরও আমার শাড়ি পরে খেলা নিয়ে পত্রিকায় লেখালেখি হয়েছে। বেশির ভাগই পক্ষে ছিল আমার সিদ্ধান্তের।

প্রশ্ন : শাড়িতে কোনো সমস্যা হতো না?

হোসনে আরা : আমি তো বলব সমস্যার চেয়ে সুবিধা হয়েছে বেশি। তখনকার সময়ে মেয়েদের খেলার এত প্রসার হয়নি। অভিভাবকরা ভাবতে পারতেন না তাঁদের মেয়ে মাঠে খেলবে হাজার হাজার পুরুষের সামনে। প্রতিবেশী আর মুরুব্বিরা তাকাতেন কঠিন চোখে। সব চোখরাঙানি পেছনে ফেলে ভলিবল, হ্যান্ডবল, কাবাডি, অ্যাথলেটিকস— সব ধরনের খেলার সঙ্গে নিজেকে জড়াতে পারা বিপ্লব বললেও কম বলা হবে। শুরুটা না হয় শাড়ি পরেই হলো, ক্ষতি কী? শাড়িতে আমি বেশি স্বচ্ছন্দ ছিলাম। সালোয়ার-কামিজ পরার পর গায়ে জড়িয়ে নিতাম শাড়ি। সমস্যা হতো না মোটেও। প্রতিপক্ষ দলও আপত্তি তোলেনি।

প্রশ্ন : ষাটের দশকে তো মেয়েদের বাড়ির বাইরে বের হওয়া একপ্রকার বারণ ছিল। তখন আপনি ক্রীড়াঙ্গনে এলেন কিভাবে?

হোসনে আরা : এই কৃতিত্ব আমার স্বামী আয়াজ খানের। তিনি বিখ্যাত ভলিবল খেলোয়াড় ছিলেন। খেলেছেন জাতীয় দলে। খুলনার ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম পথিকৃৎও বলা যায়। গোপালগঞ্জ বীণাপাণি গার্লস স্কুলে পড়ার সময় আমি শটপুট, ডিসকাস আর জ্যাভলিন খেললেও ভেবেছিলাম বিয়ের পর বন্ধ হয়ে যাবে সব। জীবন কাটবে হেঁশেল ঠেলে। হলো উল্টো। আমার খেলাপাগল স্বামীই শেখালেন ভলিবল, হ্যান্ডবল ও কাবাডি। তাঁর স্বপ্ন ছিল এই খেলাগুলোতে মেয়েদের একটা দল গড়ার। তবে সে সময় ব্যাপারটা কঠিন ছিল অনেক।

প্রশ্ন : তাই শুরুটা ঘরের বউকে দিয়েই করলেন!

হোসনে আরা :  শুধু বউ না, খান সাহেব (স্বামীকে এই নামেই ডাকেন) সঙ্গে নিলেন নিজের মেয়েদেরও! আমার বড় মেয়ে হেলেনা খান আর আমাকে দিয়ে শুরু ভলিবল দল গড়া। মেয়ের কয়েকজন বান্ধবী যোগ দিল এরপর। এই নিয়ে শুরুটা হলো ভলিবল দিয়ে। কিভাবে এটা খেলতে হয় হাতে-কলমে শেখালেন তিনি। সমস্যা হচ্ছিল একসঙ্গে দশ-বারোজন মেয়ে জোগাড় করা। খান সাহেব রাস্তায় বের হতেন খেলোয়াড় খুঁজতে। তখন এমনিতে মেয়েদের হাঁটাচলা কম ছিল। এর মাঝেই লম্বা মেয়ে দেখলে যেচে এগিয়ে জানতে চাইতেন নাম, পরিচয়, ঠিকানা। এরপর তাদের বাড়িতে আমাকে সঙ্গে নিয়ে জোরাজুরি করতেন অভিভাবকদের।

প্রশ্ন : তখন অনুশীলন করতেন কোথায়? সে সময়ের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এতগুলো মেয়ের একসঙ্গে মাঠে যাওয়া কঠিন ছিল নিশ্চয়ই?

হোসনে আরা : আমার স্বামী সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে। সাতক্ষীরায় ওদের পারিবারিক খেলার মাঠ ছিল অনেক আগে থেকে। ধর্মপ্রাণ এই পরিবারের ছিল নিজস্ব মসজিদও। তাই সবাই নিশ্চিন্ত ছিলেন, আয়াজ খান খারাপ ভাবনা থেকে মেয়েদের ভলিবল দল গড়ছেন না। বিশেষ করে সেই দলে যখন তাঁর নিজের স্ত্রী আর মেয়ে আছে। তার পরও সাবধানের মার নেই। কোনো ঝুঁকি না নিয়ে তিনি অনুশীলন করাতেন খুলনায় আমাদের বাড়ির সীমানার মধ্যে। সেখানে ছোটখাটো একটা মাঠ তৈরি করেছিলেন। অনুশীলনে তাই বাধা আসেনি। কিন্তু আমরা প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলতে খুলনার বাইরে যাওয়ার পর রীতিমতো বিক্ষোভের মুখে পড়েছিলাম।

প্রশ্ন :  কি রকম?

হোসনে আরা : ১৯৭৯ সালে প্রথম চালু হয় মেয়েদের জাতীয় ভলিবল টুর্নামেন্ট। এ নিয়ে উৎসাহের কমতি ছিল না আমাদের। কারণ আগের বছরই প্রথমবার চালু হওয়া বাংলাদেশ গেমস ভলিবলের শিরোপা জিতেছিল আমাদের খুলনার মেয়েরা। খুলনার হয়ে নারী ভলিবল দল অংশ নেয় জাতীয় টুর্নামেন্টেও। আমার মেয়ে হেলেনা খান অধিনায়ক, স্বামী কোচ আর আমি ম্যানেজার। পারিবারিক দল আর কি! জাতীয় টুর্নামেন্টের খেলাগুলো ছিল রংপুরে। কিন্তু মেয়েরা হাফপ্যান্ট পরে খেলবে, মানতে পারছিল না উত্তরবঙ্গের মানুষ। মেয়েদের দলগুলোর হোটেলের সামনে বিভিন্ন মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকরা ব্যানার নিয়ে মানববন্ধন করেন। তাতে যোগ দিয়েছিল অসংখ্য সাধারণ মানুষ। আমরা ভয়ে কুঁকড়ে যাই। ধরেই নিয়েছিলাম জাতীয় ভলিবলে আর খেলা হবে না।

প্রশ্ন : কিন্তু প্রথম বাংলাদেশ গেমসের মতো জাতীয় ভলিবলেও চ্যাম্পিয়ন খুলনার মেয়েরা। এমন বিক্ষোভের মুখে খেলা হলো কিভাবে?

হোসনে আরা : আগেই বলে রাখি, আমি মূলত খেলতাম কাবাডি। খান সাহেব খুলনা ভলিবল দলের ম্যানেজার করেছিলেন আমাকে। মাদরাসার ছাত্রদের বিক্ষোভ আঁচ করতে পেরে হোটেলের বদলে আমরা উঠি রংপুর গার্লস স্কুলে। তখন ঢাকার মেয়েরা খেলত হাফপ্যান্ট পরে। কিন্তু আমরা খেলতাম সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে। রাজশাহীর মেয়েরাও আমাদের মতো একই  পোশাকে খেলত। এ জন্য টুর্নামেন্টের আয়োজকরা ঢাকার বদলে রাজশাহীর সঙ্গে উদ্বোধনী ম্যাচ খেলার আমন্ত্রণ জানায় আমাদের। তাদের ধারণা ছিল এ ধরনের শালীন পোশাকে খেললে হয়তো জ্বালাও পোড়াও হবে না।

প্রশ্ন : যত দূর জানি, শেষ পর্যন্ত কোনো ঝামেলা ছাড়া শেষ হয়েছিল আপনাদের টুর্নামেন্ট।

হোসনে আরা : ঠিকই বলেছেন। আমাদের সালোয়ার-কামিজ পরে ওড়না জড়িয়ে খেলতে দেখে বিক্ষোভ করা মানুষগুলো হয়ে যায় মুগ্ধ দর্শক। মেয়েরাও এভাবে খেলতে পারে ধারণা ছিল না ওদের। প্রথম ম্যাচ শুরুর মিনিট পাঁচেক পর থেকে তুমুল করতালিতে আমাদের উৎসাহিত করতে থাকেন তাঁরা। খেয়াল করেছিলাম দর্শক সারিতে মাদরাসার ছাত্রদের উপস্থিতি ছিল বেশি। স্বস্তি নিয়ে শেষ করি উদ্বোধনী ম্যাচ। আমার মেয়ে হেলেনা খুব ভালো স্ম্যাশ করতে পারত। ওর স্ম্যাশ দেখে সবাই সমর্থন করতে থাকে খুলনাকে। দর্শকের এমন ভালোবাসায় প্রথম জাতীয় ভলিবলের শিরোপা জেতে আমার দল।

প্রশ্ন : এ ধরনের বিক্ষোভের মুখে আর পড়তে হয়েছিল কখনো?

হোসনে আরা : অসংখ্যবার। সম্ভবত ১৯৮২ সাল তখন। আমাদের খেলা ছিল টাঙ্গাইলে। সে সময় আধুনিকতার ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছিল দেশজুড়ে। কিন্তু টাঙ্গাইলের মানুষ মানতে পারছিল না হাফপ্যান্ট পরে মেয়েদের খেলা। তাদের ভাষায় এতে নাকি টাঙ্গাইলের মাটি ‘কলঙ্কিত’ হবে। তরুণ ছেলেরা হুমকি-ধমকি দিচ্ছিল আমাদের। একটা হোটেলে খুলনার দল ছিল দোতলায়। নিচ থেকে ওরা যেভাবে বিক্ষোভ করছিল তাতে বেশ ভয় পেয়ে যায় সবাই।

প্রশ্ন : শেষ পর্যন্ত খেলতে পেরেছিলেন?

হোসনে আরা : খেলেছিলাম তবে বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয় সবার। তরুণ ছেলেদের হুমকি গুরুত্ব সহকারে নেয় স্থানীয় প্রশাসন। তারা পুলিশি পাহারায় হোটেল থেকে মাঠে নেওয়ার ব্যবস্থা করে আমাদের। সামনে-পেছনে পুলিশের গাড়ি আর মধ্যখানে আমরা। মন্ত্রীরা এ রকম নিরাপত্তা পায় সাধারণত! আমরা মাঠে যাচ্ছিলাম আতঙ্ক নিয়ে, আবার উপভোগও করছিলাম সব কিছু। মাঠের মধ্যেও ছিল পুলিশি পাহারা। পুলিশ দেখে আর বিক্ষোভ করার সাহস পায়নি ওরা। শেষ পর্যন্ত কোনো ঝামেলা ছাড়া শেষ হয় টাঙ্গাইল সফর।

প্রশ্ন : দলের ম্যানেজার হয়ে শুরুর দিনগুলোর সংগ্রামের কথা জানলাম। খেলোয়াড় হিসেবে এ ধরনের কোনো পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন?

হোসনে আরা : আগেই বলেছি আমি খেলতাম কাবাডি। ১৯৮৩, ১৯৮৪ আর ১৯৮৫ সালে টানা তিনবার জাতীয় কাবাডিতে চ্যাম্পিয়ন আমাদের খুলনা। প্রথমবার আমি খেলেছিলাম সালোয়ার-কামিজের ওপর শাড়ি পরে। এ নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছিল। একটি দৈনিকে লেখা হয় ‘বাংলার খেলায় বাঙালি পোশাকে খেলেছেন এক সাহসী নারী। ভারী পোশাক পরেও সবচেয়ে সাবলীল ছিলেন তিনি।’ আমি ছিলাম খুলনার অধিনায়ক। আর আমার স্বামী দলের কোচ, ম্যানেজার, কর্ণধার সব কিছু। ১৯৮৫ সালে আমাদের হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা মানতে পারছিল না ঢাকার মেয়েরা। ঝামেলা পাকায় সামান্য ছুঁতোয়। হঠাৎ কিল-ঘুষি মারতে থাকে আমাদের মেয়েদের। রক্তারক্তি কান্ড। ভাগ্যিস পুলিশের একটা গাড়ি পাশেই ছিল। উনারা এসে পরিস্থিতি না সামলালে খারাপ কিছু হতে পারত।

প্রশ্ন : মানে ফুটবল মাঠে যেমন হাতাহাতি ছিল তেমন কাবাডির কোর্টেও চুলোচুলি!

হোসনে আরা : এ ধরনের মারামারি একবারই হয়েছিল (হাসি)। আমরা আর মারতে পারলাম কোথায়, মার খেয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছিল কয়েকজনকে। খুলনায় ফেরার পর উল্টো ধমক শুনতে হয় তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুস্তাফিজুর রহমানের কাছ থেকে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তোমরা আমার এলাকার মেয়ে হয়ে মার খাও কিভাবে? কারা কারা মেরেছে নাম বলো, সবাইকে ধরে গরাদে পুড়ব। এখন থেকে ঝামেলার শঙ্কা থাকলে পুলিশি নিরাপত্তা চাইবে, আমি ব্যবস্থা করব।’ এর আর দরকার হয়নি, কারণ ১৯৮৫ সালের পর মেয়েদের জাতীয় কাবাডি বন্ধ হয়ে যায়। নইলে ভলিবলের মতো কাবাডিতে আরো অনেক শিরোপা জিততে পারতাম আমরা।

প্রশ্ন : যেখানে অনুশীলন করে খুলনার মেয়েদের এত সাফল্য, আপনাদের বাড়ির সেই মাঠটা তো নেই আর...

হোসনে আরা : ষাট বা সত্তরের দশকে মেয়ের সংখ্যা কম ছিল, এরপর বেড়েছে অনেক। আমাদের বাড়ির পাশেই একটা স্কুল আছে। সেখানকার মাঠ বেশ ভালো। মেয়েদের আগ্রহ বেড়ে যাওয়ার পর সংখ্যাও বাড়ে। তাই বাড়ির গণ্ডি থেকে বের হয়ে স্কুলমাঠে অনুশীলন করাতে থাকেন আমার স্বামী। তত দিনে দলের সাফল্যে সবাই উৎসাহ দেওয়া শুরু করেছিল। এ জন্য স্কুলে শুধু অনুশীলন দেখতে চলে আসত শত শত দর্শক। টুর্নামেন্টের সময় জায়গা দেওয়া যেত না দর্শকদের। আমাদের বাড়ির সেই মাঠে এখন দশতলা ভবন উঠে গেছে। সময়ের দাবির কারণেই হয়েছে এটা।

প্রশ্ন : টানা তিনবারের জাতীয় কাবাডি চ্যাম্পিয়ন দলের অধিনায়ক হয়েও জাতীয় দলে খেলতে না পারার আফসোস তাড়া করে নিশ্চয়ই...

হোসনে আরা : জীবনে অনেক পেয়েছি। যদি কখনো খেলাধুলা না করতাম তাহলেও স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে জীবন কাটিয়ে দিতাম। কিন্তু খেলাধুলা আমাকে পরিচিতি এনে দিয়েছে। খুলনার বাইরে অনেকে চেনে খেলার সুবাদে। জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পেলে পরিচিতিটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হতে পারত। আমার দুর্ভাগ্য এটা, অপূর্ণতাও। তবে খুলনার অধিনায়ক হিসেবে আমি একবার জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছিলাম। এশিয়ান কাবাডির প্রস্তুতিতে অনুশীলন ক্যাম্প হয়েছিল তখন। পরে টুর্নামেন্টটা আর হয়নি। আমারও খেলা হয়নি। অথচ জাতীয় দলে খেলার জন্য খুলনা জেলা দলে খেলেছি প্রায় ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত। তখন বলা হতো বাঙালি মেয়ে কুড়িতে বুড়ি, আর আমি কিনা খেলছি ৪০ বছর বয়সে! ভাবা যায়।

প্রশ্ন : আপনি তো ভালো অ্যাথলেটও ছিলেন।

হোসনে আরা : শটপুট, ডিসকাস, জ্যাভলিনে খারাপ ছিলাম না। জেলা দলের হয়ে পদক পেয়েছি অনেক। গিয়েছিলাম বিভাগীয় পর্যায় পর্যন্ত। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে ঢাকায় আর খেলা হয়নি। ঢাকায় খেলতে যে মানের অ্যাথলেট হতে হয়, সেই পর্যায়ের অ্যাথলেট ছিলাম না আমি।

প্রশ্ন : মেয়েদের খেলায় খুলনার সাফল্য দেখেই কি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে আপনাদের পাঠানো হয় বাংলাদেশ সফরে?

হোসনে আরা : এ ছাড়া আর কী? তখন মেয়েদের খেলার হাঁটি হাঁটি পা পা অবস্থা। ঘুরেফিরে ভলিবল, হ্যান্ডবল, কাবাডির ফাইনালে খেলছিল খুলনা, আনসার, বিজেএমসি, ঢাকার মেয়েরা। এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে মেয়েদের খেলার প্রসার হতো না কোনোভাবে। দেশের সব অঞ্চলের মেয়েদের ক্রীড়ামুখী করতে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ নেয় বিশেষ উদ্যোগ। আমাদের খুলনার ভলিবল আর কাবাডি দলকে ১৯৮৪ সালে পাঠানো হয় দেশের নানা প্রান্তে। পরের বছর পাঠানো হয় হ্যান্ডবল দল। তখন লঞ্চে করে যেমন ভোলা গিয়েছি, তেমনি পাহাড়ের কোলের বান্দরবান, খাগড়াছড়ি বা উত্তরের শহর পঞ্চগড়, দিনাজপুর সবখানেই গেছি আমরা।

প্রশ্ন : বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে মিশে বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছিল নিশ্চয়ই।

হোসনে আরা : তা তো বটেই। সবার আগে উপভোগ করেছি নিজের দেশটা। বাংলাদেশ এত সুন্দর এভাবে না ঘুরলে জানা হতো না। উত্তরের মানুষগুলো সাদাসিধে। পাহাড়িরা কর্মঠ। আমি নিজেই দক্ষিণের, এখানকার মানুষগুলো নিয়ে জানা আছে আগে থেকে। সব অঞ্চলেই অনেকের বাড়িতে গিয়ে অভিভাবকদের উৎসাহিত করেছিলাম। স্থানীয় মেয়েদের সঙ্গে ভলিবল, হ্যান্ডবল, কাবাডি ম্যাচ খেলেছি। ওদের উৎসাহিত করতে অনেক ম্যাচ হেরেছি ইচ্ছা করে। বাংলাদেশের নারী ক্রীড়াঙ্গনে তাতে নতুন জোয়ার হয়তো আসেনি, তবে আগ্রহী হয়েছিলেন অনেকে। কম পাওয়া নয় এটা।

প্রশ্ন : ভলিবল, হ্যান্ডবলের ম্যানেজার নাকি কাবাডি খেলোয়াড়—কোন পরিচয়টা বেশি উপভোগ করতেন?

হোসনে আরা : আমি আসলে খেলার মানুষ। ম্যানেজার হয়ে মেয়েদের আগলে রাখলাম নাকি কোর্টে খেলতে নামলাম, বড় করে দেখিনি কোনোটা। ভলিবলের ম্যানেজার হয়ে শুরুটা ১৯৭৮ সালের বাংলাদেশ গেমসে। তখন থেকে এই খেলায় ’৯২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ গেমস, বাংলাদেশ অলিম্পিক বা জাতীয় ভলিবলসহ প্রায় সব টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন খুলনার মেয়েরা। কাবাডিতে আমার নেতৃত্বে টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন খুলনা। হ্যান্ডবলেও খুব খারাপ করিনি। ফাইনালে উঠতাম বারবার কিন্তু শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে হারতাম আনসারের কাছে। সব মিলিয়ে আমি দারুণ খুশি। নিজে যেমন খেলতে পেরেছি তেমনি গড়ে তুলেছি তিন মেয়েকে।

প্রশ্ন : আপনার তিন মেয়েই তো জাতীয় ভলিবল দলে খেলেছেন...

হোসনে আরা : বাংলাদেশে অনেক ক্রীড়া পরিবার আছে। কিন্তু এক পরিবারের তিন মেয়ে একই সঙ্গে জাতীয় দলে খেলেছে বলে জানা নেই আমার। আমার বড় মেয়ে হেলেনা খান, মেজ মেয়ে সাবিনা খান আর ছোট মেয়ে সেলিনা খান। বাংলাদেশের ভলিবলে ইভা, নিভা, নিপা নামেও পরিচিতি ছিল তাদের। ওরা একে একে জাতীয় দলে আসে। এমনও হয়েছে একসঙ্গে তিনজন খেলেছে জাতীয় ভলিবল দলে। হেলেনা ৯ বার হয়েছে জাতীয় সেরা ভলিবল খেলোয়াড়। হ্যান্ডবলটাও খারাপ খেলত না হেলেনা। তিনবার দেশের সেরা হ্যান্ডবল খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছে ও। মেয়েদের এমন সাফল্যে গর্বে ভরে উঠত বুক। বেশি খুশি হতেন ওদের বাবা। হাজার হোক কোচ তো ছিলেন তিনিই। ওদের বাবার জন্য খারাপ লাগে। বেঁচে থাকতে প্রাপ্য সম্মানটুকু পানননি তিনি।

প্রশ্ন : একটু খুলে বলবেন?

হোসনে আরা : ২০০২ সালে আমি পেলাম জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার। এই পুরস্কারটার বেশি দাবিদার আমার স্বামী। ক্রীড়াঙ্গনে ওনার অবদান সাগর সমান হলে আমারটা পুকুর। তিনি নিজ হাতে কোচিং করিয়ে মেয়েদের শিখিয়েছেন ভলিবল, হ্যান্ডবল আর কাবাডি। সে সময় জেলা ক্রীড়া সংস্থা থেকে আমাদের বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার জন্য যাতায়াতের ভাতা দেওয়া হতো। কিন্তু মেয়েদের খাওয়া, ওষুধসহ অন্যান্য সব কিছুর খরচ দিতেন তিনি। সবচেয়ে বড় কথা তিনি সঙ্গে ছিলেন বলেই অভিভাবকরা নিশ্চিন্তে মেয়েদের খেলতে দিত আমাদের সঙ্গে। এর স্বীকৃতি দিল না বাংলাদেশ সরকার। আর সেরা সংগঠক হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পেয়ে গেলাম আমি। এটা যতটা সম্মানের তার চেয়ে বেশি বিব্রতকর। যে মানুষটার জন্য খেলাধুলা করতে পারলাম, খুলনার মতো একটা জেলা থেকে ভলিবল দল একের পর এক শিরোপা জিতল, তাঁকেই করা হলো না মূল্যায়ন। বাংলাদেশটা এমনই। যোগ্য মানুষের সম্মান নেই। আপনাদের বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতি ২০১৫ সালে অগ্রজ ক্রীড়া সংগঠক সম্মাননা পুরস্কার দিয়েছে আমাকে। এর কিছুদিন আগে মারা যান খান সাহেব। আমার বিশ্বাস বেঁচে থাকলে আপনারা তাঁকেই দিতেন এই সম্মান।

প্রশ্ন : আয়াজ খানকে ভালো ভলিবল খেলোয়াড়, সংগঠক আর কোচ হিসেবে চেনে সবাই। তিনি কি খুলনা জেলা ক্রীড়া সংস্থায় বড় পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন কখনো?

হোসনে আরা : সময় কোথায়? খান সাহেব সারা দিন থাকতেন খেলাধুলা নিয়ে। জাতীয় ভলিবল দলে খেললেও কলেজজীবনে ছিলেন ভালো অ্যাথলেট। সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের কেউ এখন পর্যন্ত তাঁর লং জাম্প, হাই জাম্পের রেকর্ড ভাঙতে পারেনি। তিনি এত লম্বা ছিলেন যে ভলিবল মাঠে নামলে আমার বয়সী মেয়েরা দেখতে আসত লুকিয়ে! খেলা ছাড়ার পর সেই তিনিই কিভাবে যেন জড়িয়ে গেলেন মেয়েদের দল গড়া নিয়ে। কিভাবে শক্তিশালী দল গড়তে হবে, অনুশীলন কিভাবে আরো ভালো করা যায়—এসব করে কাটাতেন দিন। পশ্চিমবঙ্গ হ্যান্ডবল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো ছিল। ১৯৮৩ সালে তাদের একটা হ্যান্ডবল দল নিজ খরচে নিয়ে এসেছিলেন খুলনায়। কুষ্টিয়া, যশোর, সাতক্ষীরা—দক্ষিণের এই জেলাগুলোতে খেলান পশ্চিমবঙ্গের সেই দলকে। তাতে সাড়া পড়ে দারুণ। আমাদের খুলনার হ্যান্ডবল দলও খেলে এসেছে কলকাতা গিয়ে। এমন একজন কোচ আর সংগঠককে খুলনা জেলা ক্রীড়া সংস্থা সম্মান দিয়ে রেখেছিল নির্বাহী সদস্য করে। পদের পেছনে ছুটলে সাধারণ সম্পাদক হয়েই থাকতে পারতেন তিনি।

প্রশ্ন : আপনি তো দীর্ঘদিন ছিলেন জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক।

হোসনে আরা : প্রায় তিন দশক ছিলাম জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক। মনে হয় ২৮ বছর হবে। বাংলাদেশের যেকোনো সংগঠনে শীর্ষ পদ নিয়ে রাজনীতি হয়। নোংরামিও কম হয় না। আমি ভাগ্যবতী, মহিলা ক্রীড়া সংস্থায় এমন কিছু হয়নি। আমি চাইলে আজীবন শীর্ষ পদটিতে থাকতে পারতাম।

প্রশ্ন : ছেড়ে দিলেন কেন?

হোসনে আরা : এখন আগের মতো সেই উদ্যম কোথায়। বয়সও হয়েছে। তা ছাড়া খান সাহেব জীবনের শেষ দিকে এসে জিমনেসিয়ামে পড়ে গিয়েছিলেন হঠাৎ করে। ব্যথা পান প্রচণ্ড, ছিঁড়ে যায় হাঁটুর লিগামেন্ট। ভারতে প্রথমে করাই অস্ত্রোপচার। সুস্থ না হওয়ায় এরপর যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে করা হয় আরেকটি অস্ত্রোপচার। খুব খারাপ লাগত ওনার কষ্ট দেখে। যেখানে পড়ে এত কষ্ট পেয়েছেন সেখানে যেতে মন টানত না। দুটো অস্ত্রোপচারের পর শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন তিনি। ২০১৫ সালের নভেম্বরে চলেও গেছেন সবাইকে ছেড়ে। খুলনার ক্রীড়াঙ্গনে এই শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। তবে স্বামী হারানোর শোকে সাধারণ সম্পাদকের পদ ছাড়িনি। আগের মতো সময় দিতে পারব না বলে ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিই নিজেকে। মহিলা ক্রীড়া সংস্থা অবশ্য ছাড়েনি আমাকে। রেখেছে সহসভাপতি করে। বিভাগীয় মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সহসভাপতিও আমি।

প্রশ্ন : খুলনায় মেয়েদের খেলার আগের সেই সুনাম নেই। এভাবে পিছিয়ে পড়ার কারণ কী?

হোসনে আরা : শুধু খুলনা কেন পুরো বাংলাদেশই তো দিনে দিনে পেছাচ্ছে। নিয়মিত খেলা না হওয়া এর একটা কারণ। জাতীয় পর্যায়ে যখন টুর্নামেন্ট অনিয়মিত হয়ে পড়ে তখন জেলার মেয়েরা খেলবে কী লক্ষ্য সামনে রেখে? আমার স্বামীর মতো খেলা পাগল সংগঠকও কমছে ধীরে ধীরে। তখন অনেক সংগঠককে দেখেছি, যাঁরা বউয়ের গয়না বন্ধক রেখে চালিয়েছেন নিজেদের দল। এখন তো খেলার বাজেট অনেক বেশি। পৃষ্ঠপোষক এগিয়ে না এলে খেলা চালানো কঠিন। অথচ আমি জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হওয়ার শুরুতে এনএসসি থেকে মাত্র ছয় হাজার টাকা পেয়েও নিয়মিত সব টুর্নামেন্ট করতে পেরেছি।

প্রশ্ন : এত কম টাকায় কিভাবে সম্ভব?

হোসনে আরা : পুরোটাই আমার স্বামীর কল্যাণে। ছয় হাজার টাকার মধ্যে পার্টটাইম চাকরি করা এক স্টাফের বেতন দিতাম পাঁচ শ টাকা। বাকি টাকায় মেয়েদের সব টুর্নামেন্ট করা অবশ্যই অসম্ভব। এক সচিব আমাদের আত্মীয় হওয়ায় চাইলে তাঁর কাছ থেকে সাহায্য নিতে পারতাম। কিন্তু বাধা দিতেন আমার স্বামী। প্রভাব খাটিয়ে অনুদান নেওয়ার বিপক্ষে ছিলেন তিনি। এর বদলে তিনিই কিভাবে যেন সব খরচ চালিয়ে নিতেন। এখন আরেকটা সমস্যা হচ্ছে ক্রীড়াঙ্গনে মেয়েদের আগের মতো আগ্রহী না হওয়া।

সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়েরাও গুটিয়ে নিচ্ছে নিজেদের।

প্রশ্ন : ক্রীড়াঙ্গনে আগের সোনালি দিন ফেরাতে কী করা উচিত এখন?

হোসনে আরা : খেলা মানেই ক্রিকেট নয়, বুঝতে হবে এটা। খুলনার ক্রিকেট অনেক সফল এখন, মানে আমরাও গা ভাসিয়েছি ক্রিকেটে। একটা সময় ক্রিকেট খেলত শুধু সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলেরা। খেলাটা সাধারণের মাঝে নিয়ে আসতে সময় লেগেছে। মেয়েদের ক্রীড়াঙ্গনেও বেশ উপস্থিতি ছিল সম্ভ্রান্ত পরিবারের খেলোয়াড়দের। আমার বাবা বড় পুলিশ অফিসার ছিলেন। স্বামী আয়াজ খানের পরিবারকে এক নামে চিনত সবাই। আমি নিজে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছি ষাটের দশকে। বড় মেয়ে বিকম, মেজ মেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক আর ছোট মেয়ে পাস করেছে বিএসসি। ওরা সবাই জাতীয় দলে খেলেছে। বিয়ের পর তিনজনই পরিবার নিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রে। আমার একমাত্র ছেলেকে ভলিবলে ভর্তি করিয়েছিলাম বিকেএসপিতে। বোনদের মতো সেও থাকে যুক্তরাষ্ট্রে। বছরের বড় একটা সময় ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে কাটাই আমি। তাই বড়লোকের ছেলে-মেয়েরা খেলাধুলায় নাম লেখালে ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে পড়বে ধারণাটা ভুল। তার পরও অভিভাবকরা আগের মতো মাঠে না পাঠিয়ে ছেলে-মেয়েদের দিচ্ছেন বাড়তি প্রাইভেট! আরে ভাই বাংলাদেশে বোর্ড স্ট্যান্ড করা ছাত্ররাও খেলেছে শীর্ষ পর্যায়ের ক্রিকেট। খোদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ছিলেন নামি অ্যাথলেট। অভিভাবকদের তাই ভ্রান্ত ধারণা থেকে বের হতে হবে। বড় খেলোয়াড় না হোক শরীর ঠিক রাখার জন্যও তো খেলাধুলা জরুরি। আমরা ষাটের দশকে খেলতে পারলে এখনকার আধুনিক যুগের ছেলে-মেয়েরা মোবাইল, কম্পিউটার নিয়ে পড়ে থাকবে কেন?



মন্তব্য