kalerkantho



বিস্ফোরক...বিধ্বংসী

নিজের গড়া নতুন রাজ্যে গেইল

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



নিজের গড়া নতুন রাজ্যে গেইল

ছবি : মীর ফরিদ

ক্রীড়া প্রতিবেদক : তাঁর বেলায় দানবীয় বিশেষণটা অতি ব্যবহারে কেমন যেন খেলো মনে হয়। ক্রিস্টোফার হেনরি গেইলের জন্য ‘অতিদানবীয়’ বিশেষণ প্রচলনে বোধ হয় বাধা নেই আর, অন্তত বিপিএল পঞ্চম আসরের ফাইনালের দর্শকদের! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তুলে তুলে আকাশছোঁয়া ছক্কা মারার লোক এ কালে নেই। গতকাল প্রেসবক্সে বসে গেইল শো দেখা তামিম ইকবালের কৌতূহল, ‘আগেকার দিনে কেউ কি এত বড় বড় ছক্কা মারতে পারতেন!’

মারকাটারি ক্রিকেট যুগের প্রথম ছবিতে এ কালের স্মৃতিপটে ভেসে ওঠেন স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান। তিনি তো টেস্ট যুগের, তবে ৯৯.৯৪ ব্যাটিং গড়ের কারণে আধুনিক ক্রিকেটেও ব্যাটসম্যানশিপের বিস্ময় হয়ে আছেন। সেই স্মৃতি নির্ভর করেই সম্ভবত ক্রিকইনফোর এক অনুসারী রানিং কমেন্ট্রিতে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে লিখেছেন, ‘টেস্টে ব্র্যাডম্যান, টি-টোয়েন্টিতে গেইল (সর্বকালের সেরা)।’ পরিসংখ্যানের হিসাবে কোনো ভুল নেই। ব্র্যাডম্যানের ক্যারিয়ারে অবিশ্বাস্য ব্যাটিং গড় নামের একটা ঝকমকে পাথর তো গেইলের টি-টোয়েন্টি কফিনে গতকাল ঢুকেছে আরেকটি বিশ্বরেকর্ড, এক ম্যাচে সর্বাধিক ১৮টি ছক্কা আর যে কেউ কোনো দিন হাঁকাতে পারেননি। পুরনো রেকর্ডটি ১৭ ছক্কার। সেটিও গেইলেরই, আইপিএলে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর হয়ে ১৭৫ রানের সেই ইনিংসটিতে; যা এখনো ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ স্কোর। টি-টোয়েন্টিতে প্রথম ১০ হাজার রান করা এই ক্যারিবীয় গতকাল খুলেছেন ১১ হাজারিদের নতুন ক্লাব। বলার অপেক্ষা রাখে না, সেখানেও তিনি বড্ড একা। অনেক আগে গেইলের উদ্বোধন করা ৯ হাজারি ক্লাবেও তো এখনো কেউ নাম লেখাতে পারেননি! সবচেয়ে চার (৮২৮) এবং ছক্কা (৮০১) গেইলের। সর্বাধিক সেঞ্চুরি (২০) এবং ব্যাটিং গড়ও (৪০.৪০) তাঁর। খুঁজলে এই ফরম্যাটে ব্যাটিংয়ের আরো অনেক রেকর্ডেরই মালিকানায় দেখা যাবে গেইলকে।

তবে রেকর্ডটাই তো আর সব না। এই ৩৮ পেরিয়েই অবলীলায় ভীতি ছড়িয়ে দেন প্রতিপক্ষ বোলারসমেত পুরো দলে। গত রাতে রংপুর রাইডার্স ইনিংসের শেষ ওভারটির কথাই ভাবুন। আগের স্পেলে দুই ওভারে এক মেডেনে মাত্র ৭ রান দিয়ে ১ উইকেট তুলে নেওয়া ঢাকা ডায়নামাইটস অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের প্রথম বলে সিঙ্গেল নিয়ে গেইলকে স্ট্রাইক দেন ব্রেন্ডন ম্যাককালাম। পরের বলটায় অনায়াসে প্রান্ত বদল করতে পারতেন গেইল; কিন্তু নিলেন না। ভাবা যায়, ম্যাককালামকে টেল এন্ডারের মতো দাঁড় করিয়ে স্ট্রাইক ছাড়তে নারাজ ব্যাটসম্যান, তিনি গেইল বলেই সম্ভব। বিনিময়ে পরের দুই বলে বিশাল ছক্কা। পরের বল লং অনে ঠেলেও একই দৃশ্যের অবতারণা, গেইল অপেক্ষায় ইনিংসের শেষ বলটাও খেলার জন্য। সাকিব কি এই ঔদ্ধত্য দেখেই ঘাবড়ে গেলেন, বাংলাদেশের ‘মি. কুল’ ও রকম লেগস্টাম্পের ওপর ফুল টস দেন? গন্তব্য লেখা ওই বল গ্যালারিতে আছড়ে ফেলে নিজের বুকে ছোট করে দুইবার চাপড় মারলেন গেইল, ‘অতিদানব’রা বুঝি উল্লাস প্রকাশে এমনই সংযত হয়!

এক বল তুলে তুলে মারা ছাড়া মাঠে আর সব কাজেই সংযত তিনি। সীমিত ওভারে বৃত্তের ভেতরের ফিল্ডারদের খুব ক্ষীপ্র হতে হয়, সিঙ্গেল ঠেকানোর দায় থেকে। কাল ১২৮ রানই গেইল নিয়েছেন ছক্কার আর চারে। তাই রংপুর রাইডার্স ইনিংসের অনেকটা সময়ই কার্যত ‘টাইম আউট’ কাটিয়েছেন ঢাকা ডায়নামাইটসের বৃত্তের ভেতরের ফিল্ডাররা। তবে সীমানার দড়ির ওপর দণ্ডায়মানদেরও খুব বেশি খাটুনি যায়নি, বলবয় ভূমিকায় অবতীর্ণ ফিল্ডারদের ক্লান্তিতে নুয়ে পড়ার কোনো কারণ নেই। তবে হ্যাঁ, সঙ্গী বোলারদের ‘নির্মমতা’র শিকার হতে দেখে বৃত্তের ভেতরে-বাইরের সব ফিল্ডারকেই অবসাদগ্রস্ত হওয়া অসম্ভব নয়।

দ্বিতীয় কোয়ালিফাইয়ারের রাতে প্রেসবক্সে এসেছিলেন খুলনার হাবিবুল বাশার। এলিমিনেটরে গেইলের সেঞ্চুরিতে বিপর্যস্ত হওয়ার টাটকা ক্ষত মনেও মুখে হাসির রেখা বজায় রেখে বাংলাদেশের সাবেক এই অধিনায়ক বলছিলেন, ‘সবার জন্যই প্ল্যান করা হয়। আমরাও ম্যাচের আগে গেইলকে নিয়ে বসেছিলাম। একটা সফটওয়্যার আছে, ব্যাটসম্যান কোন দিকে বেশি স্ট্রং এক ক্লিকেই বের করা যায়; কিন্তু গেইলেরটা যদি দেখতেন। ওর ছক্কাগুলোর রেখাপাত দেখে মনে হবে পুরো মাঠ ছাতা দিয়ে ঢাকা, সব দিকে ওর মার আছে। এই ব্যাটসম্যানের বিরুদ্ধে আপনি কী প্ল্যান করবেন?’

গেইলকে নিয়ে একটাই বৈশ্বিক প্ল্যান আছে, ওকে দ্রুত ফেরাও। ওর ঢিমেতালে শুরু দেখেও ভুলেও পুলকিত বোধ কোরো না। উইকেট-বোলার বুঝে ফেলার এই ক্যারিবীয় ঠিকই রকেটে চড়িয়ে দেবে ইনিংসকে। ৩৩ বলের ফিফটিকে সেঞ্চুরিতে নিতে তাই মাত্র ২৪ বল লেগেছে কাল গেইলের। সেখান থেকে এক লাফে অপরাজিত ১৪৬। তার মানে শেষ ৪৬ রান করেছেন তিনি ১২ বলে, ছক্কাই যে তাতে সাতটি!

এটাকে অতিদানবীয় ছাড়া আর কী বলবেন আপনি?



মন্তব্য