kalerkantho


এবারও আড়ালেই বলে গেলেন হাতুরাসিংহে

১১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



এবারও আড়ালেই বলে গেলেন হাতুরাসিংহে

ক্রীড়া প্রতিবেদক : গত বছর নিউজিল্যান্ড সফরের পর কয়েকজন সিনিয়র ক্রিকেটারের আকুতি ছিল, ‘আমরা তো বলে বলেও পারছি না। আপনারা (মিডিয়া) দেখেন না, যদি প্রেসিডেন্টকে (নাজমুল হাসান) সামনে রেখে কোচের সঙ্গে আমাদের কথা বলার একটা উপায় করা যায়!’ তাঁদের অভিযোগ, আড়ালে বানিয়ে বানিয়ে বোর্ড সভাপতির কান ভারী করেন কোচ।

সে আর হয়নি, বাংলাদেশ থেকে বরাবরের মতো বিদায় নেওয়ার দিনও বোর্ড সভাপতির সঙ্গে আড়ালেই যা বলার বলেছেন চন্দিকা হাতুরাসিংহে। তাঁর সেসব ‘কথা’ সত্য হলে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অন্ধকার!

বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের শরীরী ভাষা, মানসিকতা আর দেশপ্রেম নিয়ে অভিযোগ দল হারলেই ওঠে। জিতলে আবার সেই ক্রিকেটাররাই দেশের শীর্ষ দেশপ্রেমীর মর্যাদা পেয়ে যান! তো, এক দিনের সফরে বাংলাদেশে এসে যাওয়ার আগে সে রকমই ভয়াবহ একটি অভিযোগ করে গেছেন হাতুরাসিংহে। গত পরশু বিদায়ী কোচের সঙ্গে একান্তে আলাপ শেষে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসানের বয়ানে জানা গেছে যে ব্যক্তিগত রেষারেষির কারণে নাকি কোনো কোনো ক্রিকেটার ইচ্ছাকৃতভাবে খারাপ খেলেন। সব শেষ দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে সে রকম কিছু ঘটনা চোখে পড়েছে হাতুরাসিংহের। এমন অভিযোগের তীরটা বোধগম্য কারণেই দলের সিনিয়র ক্রিকেটারদের ঘিরে। কাল্পনিক উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, টি-টোয়েন্টির অধিনায়ক সাকিব আল হাসানকে ডোবাতে তামিম ইকবাল ইচ্ছাকৃতভাবে খারাপ খেললেন অথবা ওয়ানডেতে মাশরাফি বিন মর্তুজার ইমেজ সংকট ঘটাতে বাজে ব্যাটিং-বোলিং করলেন সাকিব!

পুরোটাই কল্পদৃশ্য। তবে চন্দিকা হাতুরাসিংহের ভাবনার বাঁকবদলটা বাস্তব ঘটনা। দলীয় সাফল্য আর বোর্ডের প্রশ্রয়ে দ্রুতই জাতীয় দলসংক্রান্ত যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অঘোষিতভাবে ‘সর্বসময়’ ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার পর এই শ্রীলঙ্কান সন্দেহ করতে শুরু করেন যে তাঁর ব্যর্থতা প্রমাণ করতেই দলের কোনো কোনো সিনিয়র ক্রিকেটার ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের সবটা উজাড় করে দিচ্ছেন না! সেই কানাঘুষা দলের ক্রিকেটারদের কানেও গেছে। স্বভাবতই কেউ-ই এতে প্রসন্ন বোধ করেননি। বোর্ডের কড়াকড়ির কারণে হাতুরাসিংহের সব শেষ অভিযোগের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়াও তাঁরা নীরবেই দিচ্ছেন। প্রত্যাশিতভাবেই সেই নীরবতা চাপা ক্ষোভে ঢাকা।

সাবেক কোচের এমনতর অভিযোগ কিংবা অনুযোগ জাতীয় দলের সংসারে কতটা শান্তি বয়ে আনবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। দলে সিনিয়র ক্রিকেটারের সংজ্ঞা তো পরিষ্কার—মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিকুর রহিম আর মাহমুদ উল্লাহ। এখন হাতুরাসিংহের অভিমতের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা যদি নিজেদের মধ্যেই ‘শত্রু’ খোঁজায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন? অন্তত বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল অসম্ভব নয়। আর সে রকম কিছু না হলেও আমজনতার নজরদারি কিন্তু আর থামানোর উপায় নেই। ম্যাচ হারলেই ওই ফরম্যাটের অধিনায়কের সম্ভাব্য শত্রু খুঁজে নেবে জনতা।

কোনো সন্দেহ নেই যে চন্দিকা হাতুরাসিংহের আমলে বাংলাদেশ দলের নৈপুণ্যের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখীই ছিল। আবার এটাও কি অস্বীকার করার উপায় আছে যে সে সাফল্য এনেছেন এমন একঝাঁক ক্রিকেটার, যাঁদের কাছে নৈপুণ্য ছিল সময়েরই দাবি। নতুন কোচ ভালো কিংবা মন্দ হলেও দলের আরো উন্নতি সময়ের দাবি হয়েই থাকবে।

হাতুরাসিংহে অবশ্য ভদ্রতাও করেছেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বোর্ড যেন কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়, সেই অনুরোধ তিনি করেছেন বোর্ড সভাপতিকে। একই ‘ভদ্রতা’ বোর্ডের পক্ষ থেকেও বজায় রাখা হলে অন্তত সন্দেহের বিষ এভাবে ছড়িয়ে পড়ত না। কিন্তু নিতান্তই একান্ত আলাপের সারবস্তু এখন সবাই জানেন বোর্ড সভাপতির সরলোক্তিতে। সিনিয়র ক্রিকেটারদের ‘ইগো’র লড়াই, বাকিদের শরীরী ভাষা আর মনঃপূত হচ্ছিল না বিধায় বাংলাদেশকে আর কিছু দেওয়ার নেই বলে মনে হয়েছে হাতুরাসিংহের। বিসিবি সভাপতির বয়ানে মনে হতেই পারে যে এসব নিয়ে অভিমান করেই সরে গেলেন তিনি। কিন্তু ওদিকে যে খবর হয়েছে ২০ ডিসেম্বর শ্রীলঙ্কার কোচ হচ্ছেন হাতুরাসিংহে! তার মানে, নিজের চাকরি নিশ্চিত করেই বাংলাদেশ ছাড়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন হাতুরাসিংহে। নাজমুল হাসানের কাছে অবশ্য এই খবরটি অস্বীকার করেছেন তিনি। যদিও, বিসিবির কাছে ই-মেইল করে হাতুরাসিংহের জন্য গত মাসেই ছাড়পত্র চেয়েছে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের শীর্ষ কর্তা।

যাহোক, যিনি বাংলাদেশ ক্রিকেটের আর অংশ নন, তাঁর ভবিষ্যৎ জীবিকা নিয়ে ভেবে লাভ কী? বিসিবির অন্দরমহলে সাম্প্রতিকালের হাবভাব এমনই। তবু আনুষ্ঠানিক বৈঠকের বাইরে ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের কারণে বোর্ডের একজন উদ্যোগী হয়ে র্যাডিসন হোটেলে গিয়ে দেখা করেছেন। আবার কয়েক হাত দূরে দাঁড়ানো তাঁরই এক সহকর্মীর বিরক্তি, ‘ওকে (হাতুরাসিংহে) নিয়ে এত আদিখ্যেতার কী আছে?’

পছন্দ-অপছন্দের কী গাঢ় বিভেদরেখাই না এঁকে দিয়ে গেলেন চন্দিকা হাতুরাসিংহে! অবশ্য একজন মানুষকে ঘিরে পক্ষ-বিপক্ষ থাকা মানে তিনি ‘দীর্ঘজীবী’ হবেন সেই সমাজের স্মৃতিতে। চন্দিকা হাতুরাসিংহেরও দীর্ঘায়ু নিশ্চিত হয়ে গেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটে।



মন্তব্য