kalerkantho


শহরে সোনাজয়ী অলিম্পিয়ানরা অথচ...

সনৎ বাবলা   

২৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



শহরে সোনাজয়ী অলিম্পিয়ানরা অথচ...

আলো কেড়েছেন... : ঢাকায় পা রেখেই আলোটা কেড়ে নিয়েছেন কি বো-বে। অনায়াসে তাঁকে সিনেমায়ও নামিয়ে দেওয়া যায়, তেমনি সুন্দরী তিনি। কিন্তু আর্চারিতে তাঁর খ্যাতি আরো বেশি, তিনটি অলিম্পিক সোনাজয়ী যে কোরিয়ান এই আর্চার। আজ মূল লড়াই শুরুর আগে কাল অনুশীলনে মগ্ন তিনি কোচের সঙ্গে। ছবি : লুৎফর রহমান

শহরে এসেছেন কোরিয়ান সুন্দরী কি বো-বে। এর পরও ঢাকার কোনো হেলদোল নেই, এক পলক দেখার জন্য গণজমায়েত নেই।

কোরিয়ার কোনো শহর হলে ব্যাপারটা উল্টো হতো, সিউল-গুয়াংজুর রাস্তায় হাঁটাও কঠিন হয়ে যায় এই সুন্দরীর। জনপ্রিয় কোরিয়ান পপ তারকা চে ইয়েনের চেহারার সঙ্গে তাঁর মিল-অমিল খুঁজে বেড়ায় মানুষ। কিন্তু এটা মোটেও তিনি উপভোগ করেন না। রূপের আগুনের চেয়ে তীরের নিশানায় জনতার হৃদয় জিততে চান কি বো-বে, ‘একজন অ্যাথলেটের শারীরিক সৌন্দর্যের চেয়ে তাঁর ক্রীড়া দক্ষতা এবং প্রতিভা ঢের গুরুত্বপূর্ণ। ’ আসলে তাই। কারণ ওই পপ তারকা কখনো অলিম্পিকের বিজয় মঞ্চে দাঁড়াতে পারবেন না অথচ আর্চার কি বো-বে অলিম্পিক গেমসে তিন-তিনটি সোনা জিতে এখন বিশ্ব তারকা।

এ দেশে আর্চারি গণমানুষের খেলা নয় বলে বেঁচে গেছেন এই অলিম্পিয়ান সোনাজয়ী। মানুষের হুল্লোড়হীন পরিবেশে কাল মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামে নিবিষ্ট মনে প্র্যাকটিস করে গেছেন। অথচ মেসি-জিদানকে এক পলক দেখার জন্য ঢাকার মানুষ কী পাগল না হয়েছিল।

সাফল্যের নিক্তিতে মাপলে একদিক থেকে বরং কি বো-বে-ই এগিয়ে থাকেন! ২০১২ সালে প্রথম লন্ডন অলিম্পিক রাঙিয়েছেন তিনি আর্চারির রিকার্ভ ইভেন্টের ব্যক্তিগত ও দলগতে সোনা জিতে। চার বছর বাদে রিও অলিম্পিকে ব্যক্তিগত ইভেন্টের সোনা হারালেও দলগত ইভেন্টের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছেন এই মহিলা আর্চার। সাকুল্যে তাঁর অলিম্পিক পদক দাঁড়িয়েছে তিনটি সোনা ও একটি ব্রোঞ্জ। এ ছাড়া বিশ্ব আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে আছে পাঁচটি সোনা। সুতরাং শহরে এমন বৈশ্বিক তারকার আবির্ভাব মানে আর্চারির এক বৈশ্বিক আয়োজনে মাতছে ঢাকা। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে আজ থেকে শুরু হচ্ছে ২০তম এশিয়ান আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপের আসর, ৩৩ দলের এই প্রতিযোগিতা চলবে আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত।

২০১৫ সালে ব্যাংককে হয়েছিল গতবারের এশিয়ান আর্চারি। সেখানে সর্বোচ্চ ৬টি সোনাজয়ী দক্ষিণ কোরিয়া অবধারিতভাবে ঢাকায়ও ফেভারিট। দলে কি বো-বে, লি সুং উনের (রিওতে রিকার্ভ পুরুষ দলগতে সোনাজয়ী) মতো সেরা অলিম্পিয়ানরা থাকলে অন্যদের মাথা তুলে দাঁড়ানো তো কঠিন। যেমন বো-বে কাল প্র্যাকটিসের ফাঁকেই জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আমি সোনা জিততেই এখানে এসেছি। দুটো ইভেন্টেই সেরা হতে চাই আমি। ’ সমস্যা হচ্ছে, তাঁর এই কথাগুলো শুনতেও অলিম্পিক পদক জেতার মতো কঠিন পরিশ্রম করতে হয়েছে! কারণ এই চ্যাম্পিয়ন আর্চার প্রথমে কথাই বলবেন না, এরপর ইংরেজি শুনে আরেক দফা তুচ্ছতাচ্ছিল্য। পরে ইংরেজি জানা ফিজিও কিম জিং তায়েকের অনুরোধে রাজি হয়েছেন। সেরার লড়াইয়ে তিনি চ্যালেঞ্জ দেখছেন নিজের দলের ভেতরেই, ‘এখানে অনেক ভালো আর্চার এসেছে। জাপান ও চাইনিজ তাইপের কিছু ভালো আর্চার আছে। তবে মনে হচ্ছে ব্যক্তিগত ইভেন্টে আমার দলের কেউ আমাকে কঠিন লড়াইয়ে ফেলবে। ’

২৯ বছর বয়সী এই আর্চার মাত্র এক সপ্তাহ আগে বিয়ে করেই ঢাকায় খেলতে এসেছেন। এ জন্য বোধহয় তাঁর কোচ কিম সুং হুনও বেশি আশা করছেন না তাঁর কাছ থেকে। কিন্তু তাঁর যে প্রথম ভালোবাসা আর্চারি, সেই ক্লাস ফোর থেকেই তাঁর সঙ্গী হয়েছে তীর-ধনুক। এগুলোর সঙ্গে তাঁর এমন মায়াবী বাঁধন ও বিশ্বস্ততা তৈরি হয়েছে, সেখানে কোনো তীর অলক্ষ্যে ছোটার কথাই যেন ভাবতে পারেন না। ‘ছোট বেলায় অনেক সময় গেছে আমার লেখাপড়া ও প্র্যাকটিস চলেছে মধ্যরাত পর্যন্ত। অন্যরা লেখাপড়া শেষ করে অবসর কাটালেও আমি সব সময় পড়ে ছিলাম তীর-ধনুক নিয়ে। প্রতিদিন পাঁচ শর মতো তীর ছুড়তাম। ওই ট্রেনিং-প্র্যাকটিসের জোরেই আমি আজ এখানে। এ ছাড়া চ্যাম্পিয়ন আর্চার হওয়াও যায় না’—স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছেন তিনি প্র্যাকটিস ছাড়া সেরা হওয়ার বিকল্প কোনো পথ নেই। স্কুলের বাচ্চাদের কঠিন মনোনিবেশ এবং পরিশ্রমের ফলেই দক্ষিণ কোরিয়া আজ অনন্য বিশ্ব আর্চারিতে। কোচ কিম সুং হুনের দাবি, ‘রিকার্ভ ও কম্পাউন্ড ইভেন্টে আমাদের তালিকাভুক্ত আর্চারের সংখ্যা পনেরো শর বেশি। ২০টি দলে থেকে ট্রেনিং করে এবং খেলে। সেরা কোচদের অধীনেই তারা প্রশিক্ষণ নেয়। ’

সামনে হয়তো এই প্রশিক্ষক দলের একজন হবেন কি বো-বে। কারণ বিভিন্ন সময়ে তিনি যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তাতে ক্যারিয়ার শেষ করার পরও বাকি জীবনটা থাকবে তাঁর আর্চারিময়। স্বপ্ন দেখেন গুয়াংজু বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্চারি নিয়ে পড়ানোর। দুনিয়া মাতাবে তাঁর হাতে তৈরি আর্চাররা। অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন স্বপ্ন দেখেন আইওসির (আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি) সদস্য হওয়ার। এই চ্যাম্পিয়নের হাত ধরেই দক্ষিণ কোরিয়া আয়োজক হবে আরেকটি অলিম্পিক গেমসের আর সেখানে উড়বে কোরিয়ান তীর-ধনুকের সাফল্যের রংমশাল।


মন্তব্য