kalerkantho


চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে ছাড়াই বিশ্বকাপ

বিশ্বকাপ-রংধনু থেকে খসে পড়ল নীল রং

নোমান মোহাম্মদ   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বিশ্বকাপ-রংধনু থেকে খসে পড়ল নীল রং

মিকেলেঞ্জোলোর মহান পাথুরে মূর্তি দাভিদের চোখেও যেন এখন চিকচিকে জল। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির অমর সৃষ্টি মোনা লিসার মিটিমিট হাসির জায়গা নিয়েছে বুঝি বিষণ্নতা।

মিলান, তোরিনো, ক্রেমোনা, পিয়াচেনসা, ফেররারা শহর চিরে ছুটে চলা পো নদীর নীল পানি হয়ে গেছে হয়তো আরো নীল। ইতিহাসের পাতা ঝেড়ে দীর্ঘশ্বাস শোনা যাচ্ছে রোমান সাম্রাজ্যের। কলোসিয়ামের যুদ্ধ-সাজের দুন্দুভি নয়, ভেসে আসছে বিষাদের বিউগল।

২০১৮ বিশ্বকাপ ফুটবলে যে খেলবে না ইতালি!

বৈশ্বিক শ্রেষ্ঠত্বের ওই টুর্নামেন্টে সাফল্যের নিরিখে তাঁদের চেয়ে এগিয়ে কেবল ব্রাজিল। ‘সেলেসাও’দের পাঁচের চেয়ে একটি করে কম শিরোপা ইতালি ও জার্মানির। ‘আজ্জুরি’দের সর্বশেষ শিরোপা খুঁজতে দুরবিন চোখ রাখতে হয় না, এই তো ২০০৬ সালের। সেই দলটিই কিনা আগামী বিশ্বকাপে খেলবে না! ১৯৫৮ সালের পর এমন কিছু দেখেনি বিশ্ব। পরশু সান সিরোতে সুইডেনের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে নিশ্চিত হয়ে যায় এই অপ্রত্যাশিত বিদায়। দেশের প্রধান দৈনিক ‘গাজেত্তা দেল্লো স্পোর্ত’ তাই পৃথিবীর চূড়ান্ত ধ্বংসের সঙ্গে মিলিয়ে করে যথার্থ শিরোনাম, ‘ইতালি, এটি অ্যাপোকেলিপস’।

বাছাই পর্বে স্পেনের গ্রুপসঙ্গী তাঁরা। তখনই বোঝা যায়, প্লে অফই হয়তো নিয়তি ইতালির। স্পেনের পেছনে থেকে তা ঠিকই নিশ্চিত করে আজ্জুরিরা; আরেক পরাশক্তি নেদারল্যান্ডসের মতো বাদ পড়েনি গ্রুপ পর্ব থেকে। এই প্লে অফে যখন সুইডেনের মুখোমুখি, তখনো আতঙ্কের পাগলাঘণ্টি বাজেনি। ফুটবল-ঐতিহ্য বা সামর্থ্যে তারা কিভাবে পাত্তা পায় চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের কাছে! প্রথম লেগে সুইডিশরা ১-০ গোলে জিতে গেলে নড়েচড়ে বসে বিশ্ব। তবু ওই ‘অ্যাপোকেলিপস’-এর ভাবনার ওড়াউড়ি ছিল না প্রবলভাবে। নিজেদের মাঠে দ্বিতীয় লেগ, সান সিরোর সেই ফুটবল-কলোসিয়াম থেকে নিশ্চয়ই বিজয়ীর হাসি নিয়ে ফিরতে পারবে না সুইডেন!

কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে হলো তো সেটিই। পুরো ৯০ মিনিটে কোনো গোল করতে পারে না ইতালি। জিউসেপ্পে মেয়াসসা, লুইগি রিভার মতো ধ্রুপদি ফরোয়ার্ডের দেশ, পাওলো রসসি, সালভাতর শিলাচ্চি, রবের্তো বাজ্জো, আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরোদের মতো শৈল্পিক স্ট্রাইকারদের দেশ থেকে গোল করার মতো একজনকেও খুঁজে পাওয়া যায় না পরশু। তাই তো দুই লেগ মিলিয়ে পরাজয়ের গহ্বরে ইতালি। বিষণ্নতার অন্ধকূপে নিক্ষিপ্ত ইতালিয়ান ফুটবল।

৬০ বছর পর বিশ্বকাপের গ্যালারিতে তাই দেখা যাবে না আকাশধোয়া, সমুদ্রসেচা সেই নীল জার্সি। শোনা যাবে না আবেগী সমর্থকদের ওই মনমাতাল গানের সুর, ‘ফ্রাতেল্লি দি’ ইতালিয়া’।

ইতালিজুড়ে চলছে এখন মাতম। সবাই স্তব্ধ, হতভম্ব। লা গাজেত্তা দেল্লো স্পোর্তের সম্পাদকীয়র প্রতিটি শব্দে কেমন হাহাকার ছড়িয়ে দেয়, ‘আমরা তোমার সঙ্গে থাকব না; তুমিও থাকবে না আমাদের সঙ্গে। ’ এ যেন প্রেমিক-প্রেমিকার বিচ্ছেদ, বিশ্বকাপের সঙ্গে ইতালির। হলোই বা তা সাময়িক, তবু তো অন্তত চার বছরের জন্য! ওই সম্পাদকীয়তে আর্তনাদের পাশাপাশি রয়েছে তাগিদও, ‘এই বিদায়ে প্রতিক্রিয়া অবশ্যম্ভাবী। ’ প্রতিক্রিয়ায় প্রথমেই কোচ জান পিয়েরো ভেনতুরার বিদায়। এমন বিপর্যয়ের পর তাঁর পদ আঁকড়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই। তবে শুধু কোচ বিদায়েই ইতালিয়ান ফুটবল ঘুরে দাঁড়াবে না। ফেডারেশন কর্তা থেকে মাঠের খেলা—সব কিছুই খোলনলচে বদলে ফেলাটা হয়ে উঠেছে সময়ের দাবি।

এমনিতেই জাতিগতভাবে প্রত্যাবর্তনে পারদর্শী ইতালিয়ানরা। তা জীবনে যেমন, তেমনি শিল্প-সিনেমা-ফুটবলেও। মাঠের সবুজে দারুণ এক প্রমাণ হয়ে আছে ১৯৪৯ সালে বিমান দুর্ঘটনায় তোরিনোর পুরো স্কোয়াডের ফুটবলারদের মৃত্যু। সেখানে প্রতিভাবান এক ঝাঁক আক্রমণাত্মক ফুটবলার ছিলেন। তাঁদের অন্য ভুবনে যাত্রার প্রতিক্রিয়াটি ছিল অন্য রকম। ভীষণ রক্ষণাত্মক ‘কাতেনাচ্চো’ ফরমেশন আত্মস্থ করে তাঁরা। ক্লাব ফুটবলে ইন্টার মিলান, সঙ্গে জাতীয় দল আজ্জুরিরাও। ওই পথ ধরেই ইতালির পরবর্তী সব সাফল্য। এবার বিশ্বকাপে উঠতে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁরা কিভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা কৌতূহলোদ্দীপক। দিন কয়েক আগে জর্জিও কিয়েল্লিনি অভিযোগের সুরে বলেছিলেন, ‘পেপ গার্দিওলার তিকি-তাকা ফরমেশনের প্রতি মুগ্ধতার কারণে আমরা নিজেদের ডিএনএ কিছুটা হারিয়ে ফেলেছি। হারিয়ে গেছেন ইতালির এক প্রজন্মের ডিফেন্ডাররা। ’ বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ার পর নতুন কোচ (হয়তো বা কার্লো আনচেলত্তি অথবা আন্তনিও কান্তে) কি তাঁদের ওই পুরনো ঘরানায় ফেরত নেবেন? নাকি আধুনিক ফুটবল আত্মস্থ করবে ইতালি?

উত্তর সময়ের হাতে। তবে এর আগের সময়টা কেবলই বিষণ্ন-বিলাপের। ইতালির বিদায়ে বিশ্বকাপ-রংধনু থেকে যে টুপ করে খসে গেল নীল রংটি!


মন্তব্য