kalerkantho


১০ বছর পর শ্রেষ্ঠত্বের আসনে ভারত

সনৎ বাবলা   

২৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



১০ বছর পর শ্রেষ্ঠত্বের আসনে ভারত

ছবি : মীর ফরিদ

ফাইনালের ভেন্যু ঢাকা না হয়ে দিল্লি কিংবা চেন্নাই হলে শহরজুড়ে ‘চাক দে ইন্ডিয়া’র মাতম উঠত নিশ্চিতভাবেই। রঙে রঙে রঙিন হতো ভারত।

আতশবাজির রোশনাইয়ে ১০ বছর পর এশিয়ান হকির শ্রেষ্ঠত্বের আসন ফিরে পাওয়ার উল্লাস হতো। দেওয়ালির আনন্দ বেড়ে দ্বিগুণ হতো। ঢাকায় অমন আবহ তৈরি হয়নি, শুধুই শিরোপার আবেগে ভেসে গেছে ভারতীয় দল। এই আবেগ আধুনিক হকির ঝাণ্ডা উড়িয়ে শিরোপার রং ছড়িয়ে এশিয়ান হকির শ্রেষ্ঠত্বের আসনে প্রত্যাবর্তনের। খুব কুশলী হকি খেলে তারা ২-১ গোলে মালয়েশিয়াকে হারিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।

এ-এক দুর্দান্ত ফাইনাল। প্রত্যাশার চেয়েও যেন বেশি পাওয়া। এশিয়া কাপের শুরু থেকে দুর্দান্ত ফর্মে ভারত, ফাইনালে তাদের সামনে মালয়েশিয়া এভাবে বুক চিতিয়ে লড়বে, এটা ছিল অভাবনীয়। অথচ ভারতীয়দের আধিপত্য শুরু হয় তৃতীয় মিনিট থেকেই।

সুনীলের ডানদিকে পাঠানো এক বলে রমনদ্বীপের পুশ প্রথমে পোস্টে ঠেকে গেলেও দ্বিতীয় চেষ্টায় জড়িয়ে যায় মালয়েশিয়ার জালে। আত্মবিশ্বাসী ভারতের এগিয়ে যাওয়ার শুরু। কিন্তু হতোদ্যম নয় মালয়েশিয়া, গোল শোধের জন্য তারা মরিয়া হয়ে খেলতে থাকলেও ফিনিশিং নিখুঁত ছিল না তাদের। যে জন্য পুরো দ্বিতীয় কোয়ার্টার ভালো খেলেও পায়নি সেই কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা। বরং এই কোয়ার্টারে শেষদিকে ২৮ মিনিটে দুর্দান্ত এক মুভে ভারত ২-০ গোলের লিড নেয়। মাঝমাঠে মালয়েশিয়া বলের নিয়ন্ত্রণ হারানোয় দ্রুত গতিতে আক্রমণে ওঠে প্রতিপক্ষ, তারপর সুমিতের রিভার্স হিটে শুধুমাত্র স্টিক ছুঁইয়ে দেন ললিত উপাধ্যায়। তাতে দলকে যেন এক ধাপ এগিয়েও দেন স্বপ্নের পথে। এরপর খুব সতর্ক ভারত আর মালয়েশিয়া পড়ি-মড়ি করে আক্রমণে ওঠে। লড়াই জমে ওঠে চতুর্থ কোয়ার্টারে। সাবাহ শাহরিল ৫০ মিনিটে এক গোল ফিরিয়ে দিলে স্নায়ুচাপে পড়ে যায় ভারতীয়রা। চড়াও হয় মালয়েশিয়া। শেষ ১০ মিনিটে হকিতে অনেক কিছুই হতে পারে, এমনকি ম্যাচও জিতে নিতে পারত মালয়েশিয়া। হুমকির মুখে পড়ে ভারতের ২-১ গোলের লিড। শেষ পর্যন্ত সেই ১০ মিনিটের চাপ নিঃসরণ করে মানপ্রীতের ভারত পৌঁছে যায় শিরোপার বন্দরে। সেখানে দাঁড়িয়ে ভারতীয় অধিনায়ক মানপ্রীত সিং পেছন ফিরে দেখেন, ‘এটা দারুণ এক জয়। গত জুনে লন্ডনে আমরা ভালো খেলতে পারিনি। তাই এ টুর্নামেন্টে নিজেদের প্রমাণ করার একটা দায় ছিল। সেটা আমরা করতে পেরেছি, এটা ভীষণ তৃপ্তির। ’ এর আগে ভারত সবশেষ এশিয়া কাপ জিতেছিল সেই ২০০৭ সালে। গতবার ফাইনালে উঠেও মাথা নুইয়েছে কোরিয়ার কাছে। তাই ১০ বছর পর এশিয়ান হকির শ্রেষ্ঠত্ব ফিরে পাওয়া ভারতীয় হকির জন্য বিশেষ ঘটনা বটে। সেটা হয়েছে নতুন ডাচ কোচ মারিন সোর্ডের তত্ত্বাবধানে। প্রথমবারের মতো কোনো পুরুষ জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়া এই কোচের ক্যারিয়ারেও এটা দুর্দান্ত কীর্তি, ‘দারুণ খুশি আমি। প্রথম অ্যাসাইনমেন্টে আমার দল ট্রফি জিতেছে। প্রত্যেক টুর্নামেন্ট জেতা এবং এই অগ্রগতি ধরে রাখাই আমার চ্যালেঞ্জ। ’ 

প্রথমবারেই জ্যাকপট জিততে পারেনি মালয়েশিয়া। এর আগে তারা ফাইনালেই ওঠেনি কখনো। সর্বোচ্চ সাফল্য ২০০৭ সালে টুর্নামেন্টের সপ্তম আসরে দিল্লিতে তৃতীয় হওয়া। তাই দশম আসরে এসে হুট করে তাদের পক্ষে শিরোপার হাওয়া তৈরি হবে, এমনও কেউ ভাবেনি। তবে টুর্নামেন্ট শুরুর আগে মালয়েশিয়ানরাই হাওয়া তৈরির চেষ্টা করেছিল শিরোপা স্বপ্নের কথা বলে। স্বপ্নের প্রথম সিঁড়ি অর্থাৎ গ্রুপ পর্বে তাদের পারফরম্যান্সে উন্নতির ছবি ছিল। গ্রুপ পর্বে গতবারের চ্যাম্পিয়ন কোরিয়াকে হারানোর মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়ান হকির রং বদলের ইঙ্গিত দিয়েছিল। সুপার ফোরে এসে সেই রং খানিকটা ধূসর হয়ে যায় ভারতের সামনে। তাদের কাছে ৬-২ গোলে হেরে আত্মসমর্পণের পর স্বাভাবিকভাবে ফাইনালের বিল্ডআপেও হাওয়াটা তাদের পক্ষে থাকে না। থাকে ভারতের দিকেই।

কিন্তু ফাইনালে ভারতের আধিপত্য অত থাকেনি। ফাইনালে দেখা গেল ভিন্ন মালয়েশিয়াকে। তারা আগের মতো অসহায় আত্মসমর্পণ করেনি। হারের আগে লড়াই করেছে। গোলের জন্য মাঠ উন্মুক্ত করে দেয়নি ভারতীয়দের। শেষে এই লড়াই এমন ঝাঁজালো রূপ নিয়েছিল যখন-তখন গোল শোধ করে ম্যাচে ফিরে আসতে পারত মালয়েশিয়া। শেষ পর্যন্ত তা হয়নি, তবে ভারতকে দারুণ চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দুর্দান্ত এক ফাইনাল উপহার দেওয়ার কৃতিত্ব অবশ্যই তারা পাবে। প্রথমবারের মতো রানার্স-আপ হওয়ার গৌরব তো সঙ্গে আছেই। সুতরাং তাদের মন খারাপের কিছু নেই। তাদের নতুন উপহার দিয়েছে ঢাকা। একই সঙ্গে দিয়েছে ভারতকেও। ১৯৮৫ সালে ঢাকায় হওয়া এশিয়া কাপ শিরোপায় শোভা বাড়িয়েছিল পাকিস্তান হকির, ৩২ বছর পর কাল ভারতীয় হকিকেও দিয়েছে দু-হাত ভরে।


মন্তব্য