kalerkantho


মাখায়া এনটিনি এবং কুখ্যাত সেই ঘটনাস্থল

নোমান মোহাম্মদ, ইস্ট লন্ডন থেকে   

২২ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



মাখায়া এনটিনি এবং কুখ্যাত সেই ঘটনাস্থল

স্টেডিয়ামে ঢুকতেই লাল রঙের দালান। সোজা পথে ক্রিকেটারদের ড্রেসিংরুম।

একটু বাঁয়ে হাঁটলে ‘বাফেলো পার্ক সুইটস’। দুপাশে নীল রেলিংয়ের মাঝ দিয়ে ওপরে ওঠার সিঁড়ি। বাংলাদেশ-দক্ষিণ আফ্রিকা তৃতীয় ওয়ানডে উপলেক্ষে সেখানকার মেঝেতে লেপ্টে দেওয়া ধূসরের প্রলেপ কালও ছিল তাজা। বাতাসে রঙের গন্ধের ঝাঁজ। সিঁড়ি বেয়ে ১০ ধাপ ওপরে ওঠা যাক। ডানে এরপর ১৬ ধাপ। দেখা মিলবে সাধারণ এক পাবলিক টয়লেটের।

‘সাধারণ’ নয় অবশ্য। ১৯ বছর আগের এক ঘটনায় কুখ্যাত হয়ে আছে তো এই টয়লেটই! দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক ফাস্ট বোলার মাখায়া এনটিনি যে ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত হন, সেই ঘটনাস্থল এটিই!

এই ইস্ট লন্ডনের ঘরের ছেলে এনটিনি।

১৫ বছর বয়সের খালি পায়ে গরু চরানো ছেলেটিকে আবিষ্কার করেন বোর্ডার ক্রিকেট বোর্ডের অফিশিয়াল রেমন্ড লুই। মুগ্ধ হন ওই কিশোরের অ্যাথলেটিসিজমে। নিজে তাকে জুতা কিনে দিয়ে নিয়ে আসেন ফাস্ট বোলিং ক্যাম্পে। কয়েক বছরের মধ্যেই রূপকথার যুবরাজের মতো সেই ছেলেটি জায়গা করে নেয় দক্ষিণ আফ্রিকা জাতীয় দলে। দেশের ইতিহাসের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে। পুরো দেশের নায়ক তখন এনটিনি। কিন্তু খলনায়ক হয়ে যেতে সময় লাগেনি। ওই ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত হওয়ায় ১৯৯৯ বিশ্বকাপ স্কোয়াড থেকে এই ফাস্ট বোলারের নাম প্রত্যাহার করা হয় পর্যন্ত! ঘটনাটি ১৯৯৮ সালের ২ ডিসেম্বরের। এক ঝড়ের বিকেল। ২২ বছরের এক প্রতিবেশী ছাত্রীকে লিফট দেওয়ার জন্য নিজ গাড়িতে তোলেন এনটিনি। অন্য এক ক্রিকেটারের কাছে পাওনা টাকা আনার কথা বলে ওই তরুণীকে নিয়ে আসেন বাফেলো পার্ক স্টেডিয়ামে। এরপর টয়লেটে নিয়ে করেন ধর্ষণ। অন্তত তেমন অভিযোগেই তো মামলা দায়ের ওই তরুণীর। আর ১৯৯৯ সালের এপ্রিলে যে রায় হয়, সেখানেও দোষী সাব্যস্ত এনটিনি। ছয় বছর কারাবাসের শাস্তি হয় তাঁর। রায় ঘোষণার সময় আদালতে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠা এনটিনির ছবি ছাপা হয় দক্ষিণ আফ্রিকার সব সংবাদপত্রে। আর তাঁকে খুঁজে বের করা বোর্ড অফিশিয়াল রেমন্ড বুইয়ের বক্তব্যও, ‘আমার মন ভেঙে গেছে। কারণ মাখায়া ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার তারুণ্যের আদর্শ। ’

নিজেকে অবশ্য বরাবরই নির্দোষ দাবি করেন এই ফাস্ট বোলার। ঝড়ের কবলে পড়া এক প্রতিবেশীকে উপকার করার জন্য নিজ গাড়িতে কেবল লিফট দেন বলে জানান। আর দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট বোর্ডও সব সময় ছিল পাশে। ‘ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে মাত্র, কিছু প্রমাণ তো হয়নি। এর সঙ্গে এনটিনির বিশ্বকাপ স্কোয়াডে থাকা কিংবা না থাকার কোনো সম্পর্ক নেই’—বিবৃতি দিয়ে জানানো হয় এমনটা। এমনকি ’৯৯ বিশ্বকাপের ১৫ জনের স্কোয়াডেও রাখা হয় তাঁকে। কিন্তু এনটিনিকে যখন দোষী হিসেবে রায় দেওয়া হয়, তখন আর পাশে দাঁড়ানোর উপায় থাকে না বোর্ডের। বিশ্বকাপে তাঁর বদলে অন্তর্ভুক্ত করা হয় অ্যালান ডসনকে।

বোর্ড কিন্তু এনটিনির পাশ থেকে সরে যায়নি তবু। ছয় বছরের কারাবাসের বিরুদ্ধে করা আপিলে সাহায্য করে আইনজীবী দিয়ে। আর কী আশ্চর্য, সেখানে নির্দোষ প্রমাণিত এই পেসার! ১৯৯৯ সালের অক্টোবরে গ্রাহামসটাউন হাই কোর্ট যখন অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয় তাঁকে, আদালত প্রাঙ্গণে ভক্তরা উল্লাস করেন নেচে-গেয়ে। কিন্তু ফুঁসে ওঠে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো। ‘ওমেন অ্যাগেইনস্ট চাইল্ড অ্যাবিউস’-এর পরিচালক নিকোল বারলোই যেমন বলেন, ‘এই সিস্টেমের মাধ্যমে নারীরা পুনরায় ধর্ষিত হলো। আমাদের তো সন্দেহ হচ্ছে, এনটিনির জনপ্রিয়তা ও অর্থ তাকে বাঁচিয়ে দিল কি না। ’

দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা করা ইয়োহান ডি ইয়েগের ধারণাও তেমন। ‘ফোকসব্লাদ’-এর ক্রীড়া সম্পাদক কাল সেই বিশ্বাসের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন আরেকবার, ‘পুরো ব্যাপারটি ছিল ডক্টর আলী বাখারের হাতে। তিনি কিছুতেই চাননি ক্রিকেটাররা কলুষিত হিসেবে প্রমাণিত হোক। ওসব পুলিশ-আইনজীবীদেরও মুফতে কিছু অর্থ কামানোর সুযোগ করে দেন তিনি। মুক্তি পেয়ে যায় এনটিনি। ’ আর ইস্ট লন্ডনের ‘ডেইলি ডিসপ্যাচ’-এর ক্রীড়া সাংবাদিক রস রোশ বিষয়টি দেখতে চান ভিন্নভাবে, ‘আমি ঠিক নিশ্চিত নই, ঘটনাটি কী ঘটেছিল। সত্যিই কি তা ছিল ধর্ষণ নাকি নিছকই এক অভিযোগ! তবে এনটিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরে ঠিকই প্রমাণ করেছে, কেমন এক চ্যাম্পিয়ন বোলার ও। ’

তা অবশ্য প্রমাণ করেছেন এনটিনি। ওই ঘটনার আগ পর্যন্ত ২১ বছরের সেই ফাস্ট বোলারের অর্জন চার টেস্টে ১০ এবং এক ওয়ানডেতে দুই উইকেট। মামলা-টামলার কারণে দেড় বছরেরও বেশি সময় ছিলেন জাতীয় দলের বাইরে। কিন্তু ২০০০ সালের মার্চে যে ফেরেন, এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। ক্যারিয়ার শেষ করেন ১০১ টেস্টে ৩৯০ উইকেট নিয়ে; প্রোটিয়াদের মধ্যে এখনো কেবল শন পোলক (৪২১) ও ডেল স্টেইনের (৪১৭) উইকেট এনটিনির চেয়ে বেশি। আর ওয়ানডেতে জাতীয় দলের হয়ে তাঁর ২৬৫ উইকেটের বেশি কেবল পোলক (৩৮৭), অ্যালান ডোনাল্ড (২৭২) ও জ্যাক ক্যালিসের (২৬৯)। ইয়োহানের কথা অনুযায়ী ডক্টর বাখার যদি অর্থের বিনিময়ে এনটিনির মুক্তির ব্যবস্থা করেন, সেটিও দেশের ক্রিকেটের বৃহত্তর স্বার্থে ভুল ছিল না বলে দাবি করতে পারেন বোর্ডের এই সাবেক হর্তাকর্তা।

সে ঘটনার পর পেরিয়ে গেছে ১৯ বছর। সময়ের নিয়মেই যার ওপর পড়েছে ধূসরের প্রলেপ। রঙের ঝাঁজও নেই আগের মতো। কিন্তু মাখায়া এনটিনির ওই ধর্ষণের অভিযোগের সাক্ষী হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে এই স্টেডিয়াম। বাফেলো পার্কের এই টয়লেট!


মন্তব্য