kalerkantho


সতীর্থরাই রাঙাতে পারেন অধিনায়কের উপলক্ষ্য

২২ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



সতীর্থরাই রাঙাতে পারেন অধিনায়কের উপলক্ষ্য

উপলক্ষ তাঁকে আপ্লুত করে না কখনোই। নিজের জন্মদিনটাই তো পালন করেন না।

তবু বছর ঘুরে ওই দিন আসে ঠিকই। ঠিক যেমন অধিনায়কত্বের পথচলায় আজ আরেকটি মাইলফলকের সামনে দাঁড়িয়ে মাশরাফি বিন মর্তুজা।

৫০ ওভারের ফরম্যাটে ৫০তম বারের মতো অধিনায়ক হিসেবে তিনি টস করতে নামবেন যে আজ বাফেলো পার্কে!

ওয়ানডেতে মাশরাফির নেতৃত্বে বাংলাদেশ যে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছে, এমন নয়। হাবিবুল বাশারই যেমন অধিনায়কত্ব করেন ৬৯ ম্যাচে। সাকিব আল হাসান ৫০। তবে সাফল্যে সবাইকে ছাড়িয়ে মাশরাফি। সুমেরু শিখরের সূর্যকিরণের মতো জ্বলজ্বল করছে সেখানে তাঁর নাম। অধিনায়ক মাশরাফির নাম। হাবিবুলের অধিনায়কত্বের ৬৯ ম্যাচের মধ্যে বাংলাদেশ জেতে ২৯টিতে; হার ৪০ খেলায়।

সাফল্যের হার ৪২.০২%। সাকিবের নেতৃত্বের ৫০ ম্যাচের মধ্যে দল জেতে ২৩ খেলায়; হারে ২৬টিতে আর পরিত্যক্ত হয়ে যায় অন্য ম্যাচ। তাঁর সাফল্যের হার ৪৬.৯৩ শতাংশ। ম্যাচসংখ্যায় আজই সাকিবকে ছুঁয়ে ফেলবেন মাশরাফি। তবে সাফল্যের শতকরায় সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন সেই কবে! তাঁর অধীনে খেলা ৪৯ ওয়ানডের মধ্যে বাংলাদেশ জেতে ২৭ ম্যাচে; পরাজয় ২০ আর পরিত্যক্ত এক ম্যাচ। তাতে মাশরাফির অধিনায়কত্বে বাংলাদেশের সাফল্যের হার দাঁড়াচ্ছে ৫৭.৪৪%।

দেশের ওয়ানডে নেতৃত্বক্রমে এরপর রয়েছেন যথাক্রমে মোহাম্মদ আশরাফুল (৩৮ ম্যাচে ৮ জয়; সাফল্য ২১.০৫%), মুশফিকুর রহিম (৩৭ ম্যাচে ১১ জয়; সাফল্য ৩১.৪২%), খালেদ মাসুদ (৩০ ম্যাচে ৪ জয়, সাফল্য ১৪.২৮%), আমিনুল ইসলাম (১৬ ম্যাচে ২ জয়; সাফল্য .১২.৫০%) ও আকরাম খান (১৫ ম্যাচে ১ জয়; সাফল্য ৬.৬৬%)। সাফল্যে কেউ মাশরাফির ধারেকাছেও নন। আর খালেদ মাহমুদের ১৫, গাজী আশরাফ হোসেনের ৭, নাঈমুর রহমানের ৪ এবং মিনহাজুল আবেদীন ও রাজিন সালেহর দুটি করে ওয়ানডেতে তো জিততেই পারেনি বাংলাদেশ! তাঁদের নেতৃত্ব-সাফল্যের হালখাতায় উপস্থিতি কেবল বড় এক শূন্যের। ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে বাংলাদেশের অধিনায়ক হন মাশরাফি। ইনজুরির কারণে প্রথম টেস্টেই তো শেষ সফর! যে কারণে ওয়ানডেতে আর নেতৃত্ব দেওয়া হয়নি। ২০১০ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে প্রথমবারের মতো ওয়ানডেতে টস করতে নামেন এই পেসার। শুরুতেই সাফল্য। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে বাংলাদেশ ৫ রানে হারায় ইংল্যান্ডকে। এর মাধ্যমেই চক্রপূরণ! টেস্ট খেলুড়ে সব দেশের বিপক্ষে জয়ের পূর্ণতায় ভাসে বাংলাদেশ। মাশরাফির দল ১-২ ব্যবধানে হারলেও সিরিজ শেষ করে মাথা উঁচু করে। আয়ারল্যান্ড-নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে আবার অমনটা বলার উপায় নেই। আইরিশদের বিপক্ষে দুই ম্যাচের মধ্যে হারে একটিতে; ডাচদের বিপক্ষে তো এক ম্যাচেই এক! এরপর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পরের সিরিজেও অধিনায়ক ছিলেন মাশরাফি। কিন্তু প্রথম ম্যাচে বোলিং করার সময় পড়ে যান আবার ইনজুরিতে। ৭ ওয়ানডেতে তিন জয়ে তাই আপাত সমাপ্তি মাশরাফির অধিনায়কত্বের।

২০১৪ সালে ফেরেন আবার ওয়ানডে নেতৃত্বে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজে দল জেতে ৫-০ ব্যবধানে। সারা বছর যেমন হতচ্ছাড়া চেহারা ছিল বাংলাদেশের; তাতে ওই ফল যথেষ্টই ভালো। তবে সব কিছু ছাড়িয়ে যায় ২০১৫ সাল। সেটি কেবল ১৬ ওয়ানডেতে ১২ জয়ের কারণে না। এ বছর তো ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে বাংলাদেশ। পাকিস্তানকে ধবলধোলাই করে সিরিজ জেতে ৩-০ ব্যবধানে। ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেও আঁকা হয় সিরিজ জয়ের আলপনা। এ বছর শেষে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানের জয়টা তাই ছিল অনেক বেশি প্রত্যাশিত। অনেক বেশি আয়েশি। আর এসবে যে মাশরাফির নেতৃত্ব-জাদুর বড় ভূমিকা, তা অস্বীকার করার কাউকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সদর-অন্দরে খুঁজে পাওয়া ভার!

কিন্তু ২০১৫ সালের এই দুকূল উপচানো সাফল্য ধরে রাখা যায়নি পরের বছর। ২০১৬ সালে মাশরাফির দল ৯ ম্যাচের মধ্যে জেতে তিনটিতে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জিতলেও একটি পরাজয়ের কলঙ্ক লেপ্টে তাতে। আবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এক ম্যাচে জয় পেলেও রয়েছে সিরিজ জিততে না পারার ব্যর্থতা। এরপর নিউজিল্যান্ডে গিয়ে তো তিন ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ হারে সবকটিতে। শ্রীলঙ্কায় গিয়ে একটু সম্মানরক্ষা। তিন ম্যাচের মধ্যে এক জয়, এক হার ও এক পরিত্যক্ততে সিরিজ থাকে অমীমাংসিত।

এরপর ২০১৭ সাল। এ বছরের সাফল্যও মিশ্র। মাশরাফির দল ১২ ওয়ানডের মধ্যে জেতে মোটে চারটিতে। আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জেতে-হারে একটি করে ম্যাচ। এরপর চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সেই কিউইদের হারিয়েই ওঠে সেমিফাইনালে। বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম বড় অর্জন সেটি। কিন্তু চার মাস পর আবার ওয়ানডে খেলতে নেমে যেন খেলা ভুলে গেছে মাশরাফির দল। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দুই ওয়ানডের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ সে কথাই বলে।

আজ মাশরাফির নেতৃত্বে ওয়ানডের ৫০তম ম্যাচ। তিনি এসব পাত্তা না দিলে কী, সতীর্থরা তো রাঙিয়ে দিতে পারেন উপলক্ষটি। ঠিক  যেমন তাঁরা করেছিলেন টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট থেকে তাঁর অবসরের ম্যাচে! বিষণ্নতার অশ্রু সেদিন মুছে যায় জয়ের উল্লাসে। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের বিষাদের অন্ধকার দূর করার সুযোগও তো আজ বাফেলো পার্কে।

তা মাশরাফির ওয়ানডে অধিনায়কত্বের ৫০তম ম্যাচে হলে মন্দ কী!


মন্তব্য