kalerkantho


ম্যান্ডেলার স্মৃতি নিয়ে বেঁচে নাথান

নোমান মোহাম্মদ, পার্ল থেকে   

২০ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



ম্যান্ডেলার স্মৃতি নিয়ে বেঁচে নাথান

আপনার বাড়িতে যদি বেড়াতে আসে দেশের বর্তমান প্রেসিডেন্ট, ব্যাপারটি তাহলে কেমন হবে? আর সেই প্রেসিডেন্টের নাম যদি হয় নেলসন ম্যান্ডেলা?

নাথান বল্ডউইন নিজেকে ভাগ্যবান ভাবেন তাই। ভীষণ ভাগ্যবান।

১৯৯৯ সালে যে ম্যান্ডেলা ঘুরতে আসেন তাঁর বাড়িতে! আসেন আসলে স্মৃতি ঝালাই করে নেওয়ার জন্য। ‘মাদিবা’র ২৭ বছরের বন্দিজীবনের শেষ ধাপটি তো কেটেছে এই বাড়িতেই। ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পাওয়ার আগের ১৫ মাস পার্লের এই ভিক্টর ভেরস্টার কারাগারে থেকেছেন ম্যান্ডেলা।

ষাট পেরোনো নাথান এখন থাকেন পার্লে; আর তখন তিনি চাকরি করেন সেই কারাগারে। আর পরবর্তীতে তো হয়ে যান কারাপ্রধানই। সে সময় আবার কারাপ্রধানের থাকার বাসা হিসেবে ব্যবহৃত হতো ম্যান্ডেলার গৃহবন্দি থাকার সেই বাড়িটি। সেটি তাঁকে কতটা আপ্লুত করেছিল, বোঝা যায় নাথানের কথায়, ‘আমাকে যখন ওই বাড়িতে থাকার কথা বলা হলো, প্রথম দুই মাস একা একা থেকেছি। স্ত্রী-সন্তানদেরও নিয়ে যাইনি। একা একা থাকার সময় মাদিবার কেমন লাগত, সেটি বোঝার চেষ্টা করেছি।

১৯৯৭ সালে তো ওই বাড়িতে ওঠেন তিনি। আর ১৯৯৯ সালে ম্যান্ডেলা যান স্মৃতির সেই বাড়িতে। তাঁর স্ত্রী গ্রাসাকে নিয়ে। তাঁদের আপ্যায়নে ব্যস্ত সবাই। কিন্তু ম্যান্ডেলা একেবারে শান্ত। গ্রাসাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন চারপাশ। কত স্মৃতি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে! চা পানের জন্য একটি গাছের নিচে চেয়ার পেতে বসেন তিনি। কোলে ওই বাসার ছয় বছরের ছোট্ট মেয়ে থান্ডি। তখনই স্মৃতির সরণিতে ফিরে আসে বছর দশেক আগের এক ঘটনা। এত দিন পরও তা মনে করতে পারেন নাথান, ‘‘মাদিবা তাঁর স্ত্রীকে বলছিলেন গল্পটি। আমরা সবাই শুনছিলাম। এখানে বন্দি থাকার সময় একদিন তিনি দেখেন গাছের নিচে সাপ ঘুরে বেড়াচ্ছে। গ্রাসা জিজ্ঞেস করেন, ‘তখন তুমি কী করলে?’ মাদিবার উত্তর, ‘কিছুই করিনি। ’ আবার প্রশ্ন, ‘ওকে মারার চেষ্টা করবে না?’ উত্তর, ‘কেন মারব? সাপ তো আমার কোনো ক্ষতি করেনি। ’ আমার কাছে মনে হয়, এটিই মাদিবা। তাঁর মধ্যে এতটুকুন তিক্ততা কখনো দেখিনি। ’’

তা ম্যান্ডেলাকে তো কম দেখেননি নাথান। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ১৯৬২ সালে রিভোনিয়া ট্রায়ালে আজীবন কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয় ম্যান্ডেলাকে। ১৯৮২ সাল পর্যন্ত বন্দি ছিলেন রবেন আইল্যান্ডে। এরপর নিয়ে আসা হয় কেপ টাউনের পোলসমোর কারাগারে। এখানেই কর্মকর্তা হিসেবে ১৯৮৪ সালে যোগ দেন নাথান। ম্যান্ডেলাকে নিত্যদিন দেখলেও খুব বেশি মেশার সুযোগ হয়নি নাথানের, ‘কারণ সেই সময়ে কৃষ্ণাঙ্গদের অনুমতি ছিল না তাঁর কাছাকাছি যাবার। শুধু শ্বেতাঙ্গরাই মাদিবাকে পাহারা দিয়ে রাখত। আমাদের ওরা বিশ্বাস করত না। পরে ভিক্টর ভেরস্টার কারাগারে তাঁকে আনার পরও আমাদের কাছে ঘেঁষতে দেওয়া হতো না। ’

দক্ষিণ আফ্রিকার তখনকার শাসকরা ম্যান্ডেলাকে ওখানে আনেন ভিন্ন কারণে। ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক চাপে তাঁকে যে মুক্তি দিতে হবে, সেটি বুঝে যান তত দিনে। ম্যান্ডেলার সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন ছিল তাই। রবেন আইল্যান্ড কিংবা পোলসমোর কারাগার আলোচনার জন্য আদর্শ নয় মোটেও। সে কারণেই ১৯৮৮ সালের ৯ ডিসম্বর এই ভিক্টর ভেরস্টার কারাগারে আনা হয় ম্যান্ডেলাকে, যেটি অনেকটা ফার্ম হাউসের মতো। এখানে নাথানের সঙ্গে চাকরি করেন তাঁর স্ত্রী লু-ও। তবে এ জায়গাতেও মাদিবার সঙ্গে প্রকাশ্যে মেলামেশা নিষেধ ছিল কৃষ্ণাঙ্গদের। নাথানও তখন বদলি হয়ে সেখানে, টুকরো টুকরো স্মৃতি মনে করতে পারেন ঠিকই, ‘ভালো কিছু শ্বেতাঙ্গ কর্মকর্তার সঙ্গে খাতির হয়। তাঁদের সহযোগিতায় মাদিবার রুমে গিয়ে মাঝেমধ্যে সংবাদপত্র দিয়ে আসতাম। ওই শ্বেতাঙ্গরা তত দিনে বুঝে যায় যে, মাদিবার মুক্তি আসন্ন। সবাইকে লুকিয়ে গাড়ির ভেতরে করে ম্যান্ডেলাকে কারাগার থেকে বের করে কেপ টাউন শহর ঘুরিয়ে আনত মাঝেমধ্যে। ’

পরে ১৯৯৯ সালে ম্যান্ডেলা আবার ফেরেন সেই কারাগারে। এবার অতিথি হিসেবে। আর তাঁকে আতিথ্য দিতে পেরে নাথান ধন্য মনে করেন নিজেকে, ‘আমার বাড়িতে ম্যান্ডেলা এসেছেন! এই স্মৃতি তো সারাজীবনই আমার সঙ্গে থাকবে। ’ থাকবে যে, সেটি তখন নাথানের চোখের তারায়ই ঝিকঝিক করে ওঠে!


মন্তব্য