kalerkantho


বোলারকে স্মার্ট হতে হয়

নোমান মোহাম্মদ, পার্ল থেকে   

১৯ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



বোলারকে স্মার্ট হতে হয়

—কোর্টনি ওয়ালশকে নিয়ে তো খুব সমালোচনা হচ্ছে।

‘তাই নাকি? কেন বলুন তো?’

—এই যে বাংলাদেশের পেস বোলাররা ভালো করতে পারছেন না।

‘এখানে কোর্টনির দোষ কোথায়? সর্বকালের অন্যতম সেরা একজন ফাস্ট বোলারকে কোচ হিসেবে পেয়েছে বাংলাদেশ। আপনাদের বোলাররা যদি ওর কাছ থেকে শিখতে না পারে, এটি তাদের ব্যর্থতা। তাই নয় কি?’

বলতে বলতে এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়েন ভদ্রলোক। যেন অবিশ্বাস্যে। যেন হতাশায়। ৫১৯ উইকেট নিয়ে টেস্টের সফলতম বোলারের সিংহাসনে বসে ক্যারিয়ার শেষ করেন যিনি, সেই ওয়ালশের সমালোচনা যেন মানতেই পারেন না। আবার কে জানে, হয়তো দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে বাংলাদেশের পেসারদের দুর্দশায়ও দুঃখ পান কিছুটা। খেলোয়াড়ি জীবনে তিনিও তো ছিলেন তাঁদেরই সমগোত্রীয়! সর্বকালের অন্যতম সেরা ফাস্ট বোলার হিসেবে তাঁর নামটিও সব সময় থাকে ওপরের সারিতে।

অ্যালান ডোনাল্ড!

এই পার্লেই থাকেন তিনি।

স্টেডিয়াম থেকে খুব দূরে নয়। কাল বাংলাদেশ-দক্ষিণ আফ্রিকা দ্বিতীয় ওয়ানডে দেখতে অল্প সময়ের জন্য আসেন মাঠে। পরনে জিন্স, গায়ে কালো টি-শার্ট। গাঢ় নীল রঙের জ্যাকেটটি কোলের ওপর ফেলে খেলা দেখছেন গ্যালারিতে বসে। চোখে রোদচশমা। দিন কয়েক আগে টেলিফোনে সাক্ষাত্কার দিয়েছেন ডোনাল্ড। সেই সূত্র ধরে পরিচয় দিয়ে কথা বলতেই হাসিমুখে স্বাগত জানান। কিন্তু সে হাসি উবে যায় ওয়ালশকে নিয়ে বাংলাদেশের আমজনতার সমালোচনা কথা বলতেই।

‘দেখুন, আপনাদের বোলারদের স্মার্ট হতে হবে। শুধু দক্ষতা থাকলেই সফল বোলার হওয়া যায় না; সাফল্য পেতে হলে স্মার্টনেসটা খুব জরুরি। যদি ওয়ালশের থেকে ওরা কিছু শিখতে না পারে, তাহলে বলব যথেষ্ট স্মার্ট ওরা নয়’—বলতে বলতে সাধারণ দর্শকের মতো হাততালি দিয়ে ওঠেন। এবি ডি ভিলিয়ার্স যে মাত্রই আরেকটি বাউন্ডারি মারলেন! এরপর পুরনো কথার সূত্র ধরে বলে যান, ‘বাংলাদেশের বেশ কিছু ভালো বোলার আছে। কিন্তু বুদ্ধি করে বোলিং করতে তেমন কাউকে দেখি না। অবশ্য এতটা বলা আমার হয়তো ঠিক হচ্ছে না। কারণ আপনাদের দেশের সব খেলা যে বল ধরে ধরে আমি দেখি, তা নয়। ’ তা হয়তো দেখেন না। কিন্তু ৭২ টেস্টে ৩৩০ উইকেট নিয়েছেন যে ফাস্ট বোলার, তাঁর ওই অল্প দেখার বিশ্লেষণকেও তো উপেক্ষার উপায় থাকে না।

বোলারদের স্মার্ট হওয়ার কথা বলছেন তিনি, বলছেন বুদ্ধি করে বোলিংয়ের কথা—সেটি কিভাবে? এবার ব্যাখ্যা করেই বলেন ডোনাল্ড, ‘আমি মনে করি, নিজের বোলিংয়ের সময় বোলাররাই অধিনায়ক। দলের অধিনায়ক ফিল্ডিং সাজাবেন সত্যি কিন্তু পরিকল্পনাটি বোলারের সঙ্গে মিলে করতে হয়। আমরা যেমনটা করতাম। হ্যান্সি (ক্রনিয়ে), আমি, শন (পোলক) মিলে খুঁজে বের করতাম ব্যাটসম্যানের দুর্বলতা। ওদের জন্য ফাঁদ পেতে কিভাবে আউট করা যায়। আমি তো আজ বাংলাদেশের কোনো বোলারকে দেখলাম না, অধিনায়কের সঙ্গে গিয়ে কথা বলতে। ’ ডোনাল্ড তো জানেন না, আমাদের পেস বোলাররা নিয়মিত অনুশীলনের বাইরে ওয়ালশের সঙ্গেও যেচে পড়ে কথা বলেন না খুব একটা। তাহলে ওই ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তির অভিজ্ঞতার নির্যাস নেবেন কিভাবে?

মাঠের ক্রিকেটে তখন বেধড়ক পিটুনি খাচ্ছে বাংলাদেশের বোলাররা। ৩৮তম ওভারের শেষ বলে ডি ভিলিয়ার্সের সেঞ্চুরিও হয়ে গেল। দর্শকরা সবাই হাততালিতে অভিনন্দন জানান ব্যাটসম্যানকে। ডোনাল্ডও হাততালি শেষে গা এলিয়ে পা ছড়িয়ে বলে চলেন, ‘বাংলাদেশের বেশ কিছু ভালো পেসার রয়েছে। কিন্তু যথেষ্ট স্মার্ট না ওরা। আপনাদের অধিনায়ককে শুধু দেখলাম বুদ্ধি করে বোলিং করছে। ও মার খেতে পারে, কিন্তু মনে হচ্ছে তারই কেবল একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে। ’ আর মুস্তাফিজুর রহমান? অভিষেকেই সাড়া ফেলে দেওয়া সেই পেসারকে কি দেখেছেন ডোনাল্ড? মাঠের খেলায় চোখ রেখে উত্তর দেন তিনি, ‘দেখেছি। ওই বাঁহাতি ছেলেটি তো আইপিএলে এক মৌসুম খুব ভালো করল। কিন্তু ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টির সঙ্গে টেস্টের অনেক পার্থক্য। উপমহাদেশের উইকেটের সঙ্গে বাইরের দেশের উইকেটের পার্থক্যও বিশাল। এই চ্যালেঞ্জটাই ওকে নিতে হবে। উপমহাদেশের স্টিকি উইকেটে হয়তো সাফল্য পেয়েছে কিন্তু বিশ্বমানের হতে হলে এমন ফ্ল্যাট উইকেটেও সফল হতে হবে। ’

সেই সাফল্যের রেসিপিটা কী? এবার খেলা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে চোখে চোখ রেখে বলেন ডোনাল্ড, ‘বোলারদের প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হবে। আর কোর্টনির কাছ থেকে বের করে নিতে হবে সেরাটা। তা না হলে সেটি হবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য বড্ড দুঃখজনক ব্যাপার। ’

বাংলাদেশের পেস বোলারদের কাছে কি পৌঁছবে ডোনাল্ডের এই হাহাকার!

 


মন্তব্য