kalerkantho


হকিতে পতনের পদধ্বনি!

সনৎ বাবলা   

১৭ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



হকিতে পতনের পদধ্বনি!

টেবিলের আলোচনা টেবিলেই থেকে গেল। মনের বাসনা মনেই মিলিয়ে গেল।

হকির ‘গৌরবের ৮৫’কে আর ফেরানো গেল না। ফ্লাডলাইটের আলোয়ও সেই অন্ধকারে ঢাকা পড়ে রইল বাংলাদেশের হকি।

হিরো এশিয়া কাপ হকির বিল্ডআপে ঘুরেফিরে এসেছিল ১৯৮৫ সালের এশিয়া কাপ। ৩২ বছর আগে ইরান ও পাকিস্তান ম্যাচে লাল-সবুজের গৌরবের মুহূর্তগুলোকে প্রেরণার ছবি করে তুলে ধরা হয়েছিল এই দলের সামনে। রাসেল-ইমরানদের স্টিকে যদি সেই ছবির নতুন সংস্করণ তৈরি হয়। তা হয়নি, তবে ক্ষয়ে যাওয়া হকির নতুন এক ছবি রিলিজ হয়েছে, যা অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে দেশের খেলাটিকে। হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সাদেক নিজেই হতাশ এই দলের খেলা দেখে, ‘তাদের খেলায় আমি ভীষণ হতাশ। ভারত-পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের কথা না হয় বাদই দিলাম। জাপানের সঙ্গে ম্যাচে কী হলো? একটি ড্র ম্যাচ হেরে গেল শেষ মুহূর্তে।

’ ভারত ও পাকিস্তানের বিপক্ষে কোনো প্রেরণাতেই কাজ হয়নি। দুটো ম্যাচে ৭-০ গোলের ব্যবধানে হেরে বাংলাদেশ বুঝিয়ে দিয়েছে ‘দিল্লি দূর-অস্ত্’! চোয়াল শক্ত করে মুখে খেলার প্রতিজ্ঞা করলেই শুধু হয় না। মাঠের খেলাটাও জানতে হয়। বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম কামালের অবশ্য খুব বেশি চাওয়া ছিল না এই দলের কাছে, ‘তারা ভালো খেলবে, লড়াই করবে। প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে গিয়ে হানা দেওয়ার চেষ্টা করবে। তাদের খেলায় মানুষ চেষ্টাটা দেখবে, সেটাই তো পিছিয়ে থাকা দলের করণীয়। ’

পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশ এশিয়ান জায়ান্টদের সঙ্গে পেরে উঠবে না, এটা সবাই বোঝে। তাই হারের নিয়তিও বদলানো যাবে না। তাই বলে কেন এমন অসহায়ত্বের চেহারা ফুটে উঠবে, সেটাই হলো প্রশ্ন। এই পাকিস্তান বড় অগোছালো, এখনো পরাশক্তির চেহারা ফিরে পায়নি। আর তাদের বিপক্ষে বিনা লড়াইয়ে মাথা নুইয়েছে রাসেল-আশরাফুলরা। ভারতের বিপক্ষে তা-ও একটু খেলার চেষ্টা করেছে। খেলেছে বললে, সেটা জাপানের বিপক্ষে। এ ম্যাচেই খুলেছে গোলের খাতা, কিন্তু ড্রমুখী ম্যাচটির পজিশন ধরে রাখতে পারেনি শেষ দুই মিনিট। তাতেই হলো সর্বনাশ—টানা তৃতীয় ম্যাচটি হেরেছে। তিন মাস ধরে তাদের ট্রেনিং হয়েছে, চীনে গিয়ে রাজ্য দলের সঙ্গে প্র্যাকটিস ম্যাচও খেলেছে। এর পরও জাপান ম্যাচ শেষে কোচ মাহবুব হারুন খেলোয়াড়দের ওপরই দোষ চাপিয়েছেন, ‘ম্যাচের শেষ দিকে তারা চাপ নিতে পারে না। মনঃসংযোগ ধরে রাখতে পারে না। এ নিয়ে অনেক কাজ করা হয়েছে, এর পরও এই ভুল থেকে বের হতে পারছে না খেলোয়াড়রা। ’

পাঁচজন বাদ দিয়ে এই দল ২০১০ সালের এশিয়ান গেমস থেকেই খেলছে একসঙ্গে। সুবাদে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতায়ও তারা এগিয়ে। দুর্ভাগ্য হলো নিজেদের দর্শক-সমর্থকদের সামনেও তারা সেই অভিজ্ঞতার ছাপ রাখতে পারেনি। অভিজ্ঞতার ঝুলিটি বড় হয়েছে বটে; কিন্তু বল রিসিভিং হয় শিক্ষানবিশের মতো। প্রতিপক্ষের ডি-তে গিয়ে স্কিল দেখাতে পারেন না ফরোয়ার্ডরা। নিতে জানেন না পেনাল্টি কর্নারও।

তাই খেলোয়াড়দের সার্বিক মানেও স্পষ্ট অধঃপাত। হালের রাসেল-চয়নরা যেন পঁচাশির জুম্মন-জামিলদের ছায়া। সেটা তো হওয়ারই কথা। জাতীয় দলের সাবেক কোচ কাওসার আলীর বিশ্লেষণে বিকেএসপি ছাড়া সারা দেশ হকির বিরানভূমিতে রূপ নিয়েছে, ‘বিকেএসপি ছাড়া অন্য কোথাও হকি খেলাই হয় না। এই জাতীয় দলের পুরোটাই তো বিকেএসপির খেলোয়াড় দিয়ে গড়া। দেশের একটা খেলা পুরোপুরি একটা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে থাকলে সেটি এগোবে কী করে? অন্যান্য জায়গায় খেলা হলে খেলোয়াড় সংখ্যা বাড়ত, প্রতিভার সংখ্যাও বড় হতো। ’

দেশের হকি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জাতীয় দল পুরো বিকেএসপিময়! এটা বিকেএসপির মহাপরিচালকের গর্ব আর হকি ফেডারেশনের জন্য লজ্জাকর। আগে ফরিদপুর, রাজশাহী, দিনাজপুরসহ আরো কয়েকটা জেলায় খেলা হতো নিয়মিত। এখন তিথিয়ে গেছে সেই হকি-চর্চা। একসময়ের হকি-উর্বরা ফরিদপুরে লিগ হয় না তিন বছর ধরে। তাই বিকেএসপিই হয়ে পড়েছে হকির একমাত্র আশ্রয়, যেখানে গিয়ে ধরনা দেয় ঢাকার ক্লাবগুলো। তা নিয়ে হয় কত দৌড়ঝাঁপ! কিন্তু কেউ উদ্যোগ নেয় না জেলা পর্যায়ে হকির চেহারা ফেরানোর। অনেকে কৃত্রিম টার্ফের দোহাই দিয়ে গা বাঁচিয়ে চলেন, দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত এড়ানো যায়নি। এই এশিয়া কাপে ধরা পড়েছে হকির বড় অসুখ। একই সঙ্গে হকি সংগঠকদের জন্য মহা সতর্কবাণী— বিকেএসপি কোনো কারণে হকি খেলা বন্ধ করে দিলে কিন্তু খেলাটির নামও মুছে যাবে দেশ থেকে!


মন্তব্য